somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ (দুই)

১৮ ই মে, ২০০৭ দুপুর ১২:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পার্বত্য চট্টগ্রামে দুদশকেরও বেশী সময় ধরে দগদগে ত হয়ে আছে অন্থায়ী বাঙালি সেটেলারদের সমস্যা। এই সময়ে পাঁচটি সরকারের আমলে কোনো সরকারই হত -- দরিদ্র, মানবেতর জীবন যাপনকারী সেটেলার সমস্যার সমাধান দেয়নি।

পার্বত্য বিশ্লেষকরা বলছেন, বরং পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বারের আগে পাহাড়ে সেটেলার ইস্যু সৃষ্টি করে তাদের ব্যবহার করা হয়েছে সাবেক গেরিলা গ্র“প ‘শান্তি বাহিনী’ দমনের নামে পাহাড়িদের ওপর একাধিক নৃশংস হামলার হাতিয়ার হিসেবে। এখনো তাদের একই কায়দায় উস্কে দিয়ে একটি মহলের স্বার্থে অশান্ত রাখা হচ্ছে পার্বত্য পরিস্থিতি।

এছাড়া ভোটের রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে এখন বাবহৃত হচ্ছে সেটেলার ইস্যু। শান্তিচুক্তিতেও সেটেলার সমস্যার সমাধান কি হবে -- সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

উপরন্তু উগ্র ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদি দৃষ্টিকোন থেকে সেটেলার সমস্যা জিইয়ে রাখার কারণে এখনো অশান্তি হচ্ছে পাহাড়ে। ভূমিহীন, পুনর্বাসনহীন, সরকারি রেশন নির্ভর এই সব সেটেলারের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় পাহাড়ে বাড়ছে জমির বিরোধ।

সরজমিনে বাঙালি সেটেলার সমস্যা -- সংকুল এলাকা খাগড়াছড়ি জেলার প্রত্যন্ত এলাকা উত্তর ভূয়াছড়ির সাড়ে ৭০০ পরিবারের ‘গুচ্ছগ্রাম’ ঘুরে দেখা গেছে অমানবিক জীবনের খন্ডচিত্র। ২০০৪ সালের এপ্রিলে জমির বিরোধকে কেন্দ্র এই ভূয়াছড়ির সেটেলাররাই কমলছড়িতে পাহাড়ি গ্রামে হামলা চালিয়ে ১৫ -- ২০ টি বাড়িতে আগুন দেয়। এর পর ২৬ আগস্ট মহালছড়িতে সেটেলারদের হামলায় নিশ্চিহ্ন হয় অন্তত ১০ টি পাহাড়ি গ্রাম। খুন হন বর্ষিয়ান ইউপি চেয়ারম্যান বিনোদ বিহারী খীসা। গণধর্ষণের শিকার হন তিনজন আদিবাসী পাহাড়ি নারী।

পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট আয়তন পাঁচ হাজার ৯৩ বর্গমাইল। পাহাড়ের শতকরা তিন ভাগ জমি চাষ --বাসের উপযোগি; ১৯ ভাগ বাগান -- বাগিচা করার মতো। আর অবশিষ্ট সমস্ত জমি, পাহাড় ও অরণ্য সরকারের মালিকানাধীন। পার্বত্যাঞ্চচলের মোট পাহাড়ি ও বাঙালির সংখ্যা আনুমানিক ১৫ লাখ।

সেটেলার নেতা ও ভূয়াছড়ির ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য শাজাহান ফরাজীর (৩৩) আদি বাড়ি পাবনার আটগড়িয়ার বিশ্রামপুর গ্রামে। এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, ১৯৮২ -- ৮৩ সালে পত্রিকায় ভূমিহীনদের পাহাড়ে পুনর্বাসন সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞাপন দেখে তারা উত্তর ও দণি বঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে তালিকাভূক্ত হয়ে এখানে আসেন। সে সময় তাদের পাঁচ একর করে খাস জমি বন্দোবস্ত, গৃহ নির্মাণ অনুদান, হালের বলদ, রেশন প্রদান -- ইত্যাদি গালভরা প্রতিশ্র“তি দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু এখনো সেসব প্রতিশ্রতির প্রায় কিছুরই বাস্তবায়ন হয়নি।

সেটেলার নেতা ফরাজী বলেন, “আমরা আর গুচ্ছগ্রামের বন্দি জীবন চাই না। আমাদের আদি জন্মভূমিতে কোনো সহায় -- সম্বল নেই। আমরা চাই পাহাড়েই সরকার প্রতিশ্র“ত জমির বন্দোবস্ত।”

একই গুচ্ছগ্রামে প্রায় ২০ বছর ধরে বসবাসকারি শেরপুরের ফকরুদ্দিন (৭০) আহাজারি করে বলেন, “মাত্র ২০ হাত জায়গায় তিনটি ঝুপড়ি ঘরে আমরা বাস করি তিনটি পরিবার । অনিয়মিত, সামান্য রেশনে আমার পরিবারের ১০ জনের চলে না। এখন আমার ঘরে এক পোয়া চালও আছে কি না সন্দেহ। দিনের পর দিন চাঁপা শুটকি দিয়ে আমরা কোনো রকমে আধপেটা খেয়ে বেঁচে আছি। পরিবার -- পরিজনের পরনে কাপড় নেই, বাচ্চাদের স্কুলে দেওয়া তো দূরের কথা।”

বাগেরহাটের ইউনুস আলী (৪২) বলেন, “উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা আমাদের বন্দোবস্তকৃত জমি দখল করে রেখেছে। আমরা সেখানে যেতে পারছি না নিরাপত্তার অভাবে। তারা সেখানে ঘরবাড়ি তুলতে গেলে বাধা দেয়। আমাদের ফলের বাগান, ধানি জমি -- সবই নিজেদের বলে দাবি করছে। উপরন্তু শান্তিচুক্তির পে -- বিপরে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা ১০ -- ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে উড়ো চিঠি দিচ্ছে।”
জামালপুর থেকে আসা সেটেলার যুবক নূরুল আমিন(২৭) ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাশ করে এখনো বেকার। বাবা আব্দুল জলিলের মৃত্যূর পর নিজে সেটেলার রেশন কার্ডের মালিক হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা সেটেলার জীবনের অবসান চাই। পাহাড়ে সেটেলার শব্দটি এখন একটি গালি। ছোটবেলা থেকে এই গালি শুনতে শুনতে অতিষ্ট। সেটেলাররাও তো মানুষ। আমরাও চাই মানুষের মর্যাদা নিয়ে খেয়ে -- পড়ে বাঁচতে।”

এদিকে পাহাড়ি নেতারা বরাবরই দাবি করে আসছেন, সেটেলারদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সন্মানজনক পুনর্বাসন। এ দাবির বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়ে সেটেলার নেতা ফরাজী বলেন, “আমরা এ দেশেরই নাগরিক। তাহলে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে যেতে হবে কেনো?”

সেটেলার সমস্যা প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সাবেক উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান স্বয়ং নিজেই স্বীকার করে বলেন, কয়েক দশক ধরে সেটেলারদের রাজনৈতিক দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি মহালছড়িতে পাহাড়িদের ঘর -- বাড়িতে সেটেলারদের নৃশংস হামলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এটি হয়েছে পাহাড়ি -- বাঙালি উভয় স¤প্রদায়ের নেতাদের উদার রাজনৈতিক দৃষ্টিবোধের অভাবে।

মনিস্বপন দেওয়ান বলেন, সেটেলারদের পাহাড়ের বাইরে পুনর্বাসন একটি অসম্ভব ব্যাপার। এখানে পাহাড়ি -- বাঙালি সকলকেই মিলেমিশে বাস করতে হবে। পার্বত্য ভূমি কমিশন কার্যকর হলে পাহাড়ে জামিজমার বিরোধ কমে আসবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল || একটা রোমান্টিক গান

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৪ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল
ওওও
বহুবার সে তাকিয়েছিল
আমি ভাবতে চেয়েছি
আমাকে তার ভালো লেগেছিল



সে দেখতে এতটা সুন্দরী
তার উপমা যেন সে নিজেই
মাঝে মাঝে অধরে তার ফুটছিল হাসি
মুগ্ধতায় আমি হারিয়েছিলাম খেই
তখন মিহিসুতোর মতো বৃষ্টিরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সময়ের ব্যবধানে তারা দুজন

লিখেছেন সামিয়া, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৩



কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×