somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কল্প-গল্প : অনুভূতিই সত্যি

০৭ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ১১:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১।
ড. অনিরুদ্ধ সেন সারা জীবন আকাশ দেখেই কাটিয়েছেন।

ঢাকার বাইরে পাহাড়ঘেরা তার বাড়ির ছাদে বসে তিনি নক্ষত্রের আলো বিশ্লেষণ করেন, মহাবিশ্বের জন্ম-মৃত্যুর হিসাব কষেন। বাড়ির নিচের একটি কক্ষকে তিনি ল্যাব বানিয়েছেন। রিটায়ারমেন্টের এই সময়টা তিনি সখের গবেষণা করেই দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছেন। স্ত্রী নেই, একমাত্র মেয়ে মায়াকে নিয়ে এখানেই থাকেন তিনি। মায়ার বয়স চৌদ্দ বছর। আর তার নিজের বয়স মেয়ের প্রায় চার গুণ। সন্ধ্যার পর ছাদের উপর বসে আয়েশ করে চায়ে চুমুক দেওয়া তার বহু দিনের অভ্যাস। কিছুক্ষণ পর পর তিনি টেলিস্কোপের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকেন আকাশের দিকে। কী বিশাল এই আকাশ। আকাশের বিশালতার কাছে নিজেকে বেশ তুচ্ছ মনে হয় ড. সেনের।

মহাবিশ্ব নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউসের সেই কাব্যিক উক্তিটি তার খুব প্রিয়। মেয়ে মায়া ছাদে এলে তিনি প্রায়ই উক্তিটি আওড়ান, “আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে সবচেয়ে কাব্যিক যে সত্যটা আমি জানি তা হলো, আপনার দেহের প্রতিটি অণু-পরমাণু একসময় লুকিয়ে ছিল একটি বিস্ফোরিত নক্ষত্রের অভ্যন্তরে। অধিকন্তু আপনার বাম হাতের পরমাণুগুলো হয়তো এসেছে এক নক্ষত্র থেকে, আর ডান হাতেরগুলো এসেছে অন্য আরেকটি নক্ষত্র থেকে। আমরা আক্ষরিক অর্থেই সবাই নক্ষত্রের সন্তান। আমাদের সবার দেহ তৈরি হয়েছে নাক্ষত্রিক ধূলিকণা দিয়ে।”

তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন “বল-তো মা মায়া, এই উক্তিটি কার?”

মায়া বিরক্ত মুখে বলে “বাবা, আর কতবার একই প্রশ্ন করবে? সেই ছোটবেলা থেকে একই প্রশ্ন করে যাচ্ছ।” মেয়ের মুখে অভিমানের সুর।

সেদিনের রাতটা আলাদা ছিল।

তিনি একা ছাদে বসে টেলিস্কোপের ফাঁক দিয়ে গভীরভাবে আকাশে তাকিয়ে ছিলেন। টেলিস্কোপের ডেটা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি হঠাৎ অদ্ভুত এক প্যাটার্ন দেখতে পেলেন। সূর্যের আলোতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিরতি। মাইক্রোসেকেন্ডের জন্য ফ্রেম ড্রপের মতো, যেন আলো অবিচ্ছিন্ন নয়, বরং ডিজিটাল সিগন্যাল। প্রথমে তিনি ভাবলেন যন্ত্রের ত্রুটি। আবার পরীক্ষা করলেন। ডেটা মিলিয়ে দেখলেন চাঁদের আলোতেও একই সমস্যা। দূরের গ্যালাক্সিতেও। অদ্ভুত, এমন হওয়ার কথা নয়। হঠাৎ লক্ষ করলেন যেন পুরোনো দিনের টেলিভিশনের মতো হালকা ঝিরঝিরে বিকৃতি দেখা গেল। এক মুহূর্তের জন্য স্ক্রিনের মতো আকাশও কেঁপে উঠল।

আরও অদ্ভুত কিছু ঘটল। আলোর পরিবর্তে মাঝে মাঝে সংখ্যাগুলো নিচের দিকে ঝরে পড়ছে, ০ এবং ১। তার বুক ধক করে উঠল।

“এটা… কোন বিশেষ নাম্বার মনে হচ্ছে?” ফিসফিস করে বললেন তিনি।

আরও বিশ্লেষণে দেখা গেল, মহাবিশ্বের ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনে পুনরাবৃত্ত কোডের মতো এক গঠন। যেন এক ধরনের বাইনারি প্যাটার্ন। ড. সেন বুঝলেন, এটা প্রাকৃতিক নয়। তার গবেষণা সারারাত ধরে চলল। তিনি টেলিস্কোপ দিয়ে দূর নক্ষত্রের ভিডিও ধারণ করে নিচে ল্যাবে এলেন। ভিডিওটির ওপর অ্যালগরিদম চালিয়ে তিনি এক ভয়াবহ সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন। সিমুলেশন সিস্টেমে রিসেট কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে।

সময় বাকি—
৭২ ঘণ্টা।

২।
প্রথমে তিনি কাউকে কিছু বলেননি।

কাকে বলবেন?

সরকারকে?

সহকর্মীদের?

মানুষ হাসবে। তাকে পাগল বলবে। তবুও তিনি তিনজনকে ডেকে পাঠালেন, তার সহকারী তিশা, পুরোনো বন্ধু সাংবাদিক রাশেদ, আর তার মেয়ে মায়া। রাতের অন্ধকারে ল্যাবে বসে তিনি স্ক্রিনে দেখালেন সূর্যের আলোর ভেঙে যাওয়া পিক্সেল।

তিশা বলল, “স্যার, এটা কি সৌর ঝড়ের কোনো ইফেক্ট?”

“না,” শান্ত স্বরে বললেন ড. সেন।

“এটা কোড ব্রেকডাউন?” পূনরায় তিশার প্রশ্ন।

“তুমি বলতে চাও আমরা ভিডিও গেমে আছি?” রাশেদের গলায় তাচ্ছিল্যের স্বর।

ড. সেন একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার দিকে তাকালেন। “হ্যাঁ।”

ঘর নিস্তব্ধ।

মায়া কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে ৭২ ঘণ্টা পর?”

“সার্ভার রিসেট হবে। সব ডেটা মুছে যাবে।” বললেন ড. সেন।

তিনি থামলেন। পূনরায় বললেন “আমরা… থাকব না।”

৩।
সংবাদটি গোপন রাখা গেল না।

রাশেদ দ্বিধা সত্ত্বেও পরের দিন প্রতিবেদন লিখে ফেলল, “পৃথিবী কি সিমুলেশন?”

কেউ বিশ্বাস করল।

কেউ বলল ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।

কেউ বলল পাগলামি।

কিন্তু পরের দিন সূর্যাস্তের সময় সবাই থমকে গেল। আকাশের কমলা আলো হঠাৎ ঝিকমিক করে উঠল। পুরোনো দিনের রেডিওর মতো অদ্ভুত শব্দ হলো। দিগন্তের রেখা এক মুহূর্তের জন্য ভেঙে ছোট ছোট স্কোয়ারে বিভক্ত হয়ে গেল।মানুষ ভিডিও করল। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ল অসংখ্য পোস্ট, আমরা কি সত্যিই কোনো উচ্চমাত্রার প্রাণীর তৈরি সিমুলেশনে বাস করছি?

হ্যাশট্যাগ ছড়িয়ে পড়ল, #PixelSunset

দ্বিতীয় দিন সূর্যাস্তে আকাশের রঙ এক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ কালো হয়ে গেল। তারপর আবার ফিরে এল। ভয় ঢুকে গেল মানুষের ভেতরে। কেউ মসজিদে ছুটল, কেউ মন্দিরে, কেউ গির্জায়, কেউ প্রেমিকাকে ফোন করল, কেউ শত্রুকে ক্ষমা করল। হঠাৎ মানুষ বুঝল, সময় সীমিত। এই পৃথিবীটা হয়তো মায়া।

৪।
শেষ দিন।

সময় বাকি দুই ঘণ্টা।

ড. সেন ল্যাবের ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছেন। পাশে মেয়ে মায়া।

মায়া ধীরে বলল, “বাবা, আমরা যদি কোড হই, তাহলে আমি কি সত্যিই তোমার মেয়ে?”

ড. সেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর গভীর মমতায় মেয়ের মাথায় হাত বুলালেন।

“তোমাকে আমি কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছি। তুমি অসুস্থ হলে আমি সারারাত জেগে থেকেছি। তুমি যখন প্রথম ‘বাবা’ বলেছিলে, আমি কেঁদেছিলাম।” তার গলা কাঁপছে।

“যদি এগুলো কোডও হয়, অনুভূতিটা কি মিথ্যা?” থেমে বলল ড. সেন।

মায়ার চোখ ভিজে উঠল।

“তাহলে অনুভূতিই সত্যি?”

সেন ধীরে বললেন, “আমারা যেটা-কে বাস্তবতা হিসেবে জানি, সেটা হয়তো কোনো অত্যাধুনিক কম্পিউটার কোড। আমরা হয়ত কোন উচ্চ মাত্রার প্রাণিদের তৈরি সিমুলেশোন কিন্তু ভালোবাসা, সেটা অভিজ্ঞতা। এটা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, অভিজ্ঞতাই সত্য।”

“তাহলে রিয়েলিটি কি বাবা?” প্রশ্ন মায়ার।

“আমরা যা দেখি, শুনি, যা অভিজ্ঞতা অর্জন করি এগুলোই রিয়েলিটি। তুমি আমার মেয়ে এটাই রিয়েলিটি।” বললেন ড. সেন।

আকাশে তখন সূর্য ডুবছে, পিক্সেলগুলো এবার স্পষ্ট, মেঘগুলো গ্রিডে বিভক্ত। হাওয়া কাঁপছে, যেন প্রসেসর ওভারলোড।

হঠাৎ আকাশজুড়ে বিশাল এক আলোকরেখা,

SYSTEM RESET IN 00:00:10

মানুষ চিৎকার করছে, কেউ প্রার্থনা করছে, কেউ প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরেছে, ড. সেন মায়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।

কাউন্টডাউন—
৫…
৪…
৩…
২…
১…

৫।

নিস্তব্ধতা।
তারপর, সকাল, পাখির ডাক। সূর্যের আলো জানালায় পড়ছে। ড. সেন হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে বসলেন। তার বুক ধড়ফড় করছে, সবকিছু স্বাভাবিক। তিনি ছুটে ল্যাবে গেলেন, ডেটা চেক করলেন, কোনো প্যাটার্ন নেই, কোনো গ্লিচ নেই, সব ঠিক।

হঠাৎ পিছন দিক থেকে মায়া এসে দাঁড়াল।

“বাবা… কাল রাতে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেছি।”

“কেমন?”

“মনে হচ্ছিল পৃথিবী ভেঙে যাচ্ছে। আর তুমি আমাকে বলছিলে “অনুভূতিই সত্যি।”

ড. সেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি ধীরে আকাশের দিকে তাকালেন, সূর্য স্বাভাবিক। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য, খুব সূক্ষ্মভাবে, আলোর কোণে যেন ক্ষুদ্র এক পিক্সেল ঝিকমিক করে উঠল। সম্ভবত রিসেট হয়েছে। সম্ভবত নতুন সিমুলেশন শুরু। কিন্তু যদি জীবন সিমুলেশনও হয়, তাহলে কি ভালোবাসা, ভয়, কান্না, আশা, এসব মিথ্যা? নাকি স্রষ্টা যেই হোক, তিনি জানতে চান, কোডের ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া অনুভূতি কতটা সত্য হতে পারে।

-সমাপ্ত-

বিঃদ্রঃ কাল থেকে আমাদের পুরো এক সপ্তাহের ছুটি, স্প্রিং ব্রেক-কোন ক্লাস নেই। অনেকদিন ধরে গল্পটি মাথায় ছিল, ছুটির আবহে অবশেষে মাথা থেকে বেরিয়ে এল!

আমার সব নির্বাচিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী সমূহের লিংক
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৯:৪৩
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেবদাস, কালজয়ী উপন্যাস এবং চিত্রনাট্যের পটভূমি

লিখেছেন মেহবুবা, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৮


প্রথম ১৯২৮ সনে নির্বাক "দেবদাস" মুক্তি পায় ফনী বর্মা এবং তারকবালা অভিনীত ছিল সেটি। এরপর প্রমথেশ বড়ুয়া এবং যমুনা বড়ুয়া অভিনীত সবাক দেবদাস মুক্তি পায় ১৯৩৫ সনে। তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৪৩




যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে
শান্ত গৌরবে, সেই আত্মারা কোথায় বেঁচে রয়।
দয়ার প্রতিটি বীজ সর্ন্তপণে বপন করা হয়,
সপ্তাকাশে উজ্জ্বল ফসল তবে অবধারিত রয়।

সাত আকাশের চরাচরে , ছায়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

"দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন"- হলো একটি সনাতন নীতি...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



"দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন"- হলো একটি সনাতন নীতি, যার অর্থ খারাপ বা অন্যায়কারীকে শাস্তি দেওয়া এবং ভালো বা সৎ মানুষকে রক্ষা করা। এটি মূলত সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারো নামে মিথ্যা অপবাদ কাম্য নয় তবে ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩৯


ঘটনাটি মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের এবং তার সঙ্গে থাকা এক সাংবাদিক বন্ধুকে ঘিরে। পরিবাগ ওভারব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কী-বোর্ড কাহিনী: ডেল কেবি২১৬

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:০০


আমি ১৯৯৬ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কী-বোর্ড ব্যবহার করছি। দেশে থাকতে কী-বোর্ড তেমন প্রয়োজন পড়েনি। মাঝে মধ্যে কেনা হতো। একবার বাংলা লিখার জন্য "বিজয়" সফটওয়্যারের প্রলোভনে, বিজয় এর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×