somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্মৃতিচারণঃ ভেজা বিকেলের দিনগুলো

২০ শে মে, ২০২৬ রাত ৩:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের সেমিস্টার শেষ হলো গত সপ্তাহে। সেমিস্টার শেষ হলে আমার ভালো লাগে, লম্বা ছুটি পাওয়া যায়। বিশেষ করে স্প্রিং সেমিস্টারের পর প্রায় তিন মাসের ছুটি! তবে এবার সামার ভ্যাকেশনে শুয়ে-বসে কাটাব না। নিউইয়র্কে একটি ন্যাশনাল ল্যাবে সামারে কাজ করব, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে। আমার জয়েনিং আর দু সপ্তাহ পরে। উদ্দেশ্য কিছু এক্সট্রা মালপানি কামানো! মালপানি কামাতে ভালো লাগে! তাছাড়া আমার নিজের প্রজেক্টে কয়েকজন ষ্টুডেন্ট আমার ল্যাবে কাজ করে, তাদের কাজও সুপারভাইজ করতে হবে। তারপরও সামার ভ্যাকেশন বলে কথা, একটা ছুটি-ছুটি আমেজ থেকেই যায়! তার উপর আমার কখনও নিউইয়র্ক তেমনভাবে দেখা হয়নি। এর আগে সেখানের এয়ারপোর্টে ট্রানজিট ছিল, তবে বের হওয়ার সুযোগ পাইনি।

আমি ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় থাকি। এখানে সবকিছু হাতের নাগালে পাওয়া যায় না। যেমন ইলিশ মাছ, পোলাওয়ের চাল, দেশি মসলা, এসব পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়! আমি মোটামুটি ভোজনরসিক। নিউইয়র্কে অ্যাপ্লাই করার আগে আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল সেখানকার খানা-খাদ্য খাওয়া এবং শহরটা ঘুরে দেখা! শুনেছি সেখানে খানা-খাদ্য অনেক সুস্বাদু, হাতের কাছেই সবকিছু পাওয়া যায়! অনেক দিন ধরে ইলিশ মাছ খাই না। কয়েক মাস আগে ওহাইও-এর কলম্বাসে গিয়েছিলাম দেশি মসলা আর মাছ আনতে। তবে মাছ কিনে ঠকেছিলাম! হাতির সমান দুইটা ইলিশ মাছ কিনেছিলাম, একটা আবার নষ্ট বের হয়েছিল! আমার ডলার জলে!

যাইহোক, অনেক দিন দেশে যাই না। ইচ্ছে হয় দেশ থেকে ঘুরে আসি, তবুও কেন জানি আর যাওয়া হয় না। দেশ ছাড়লাম সেই আন্ডারগ্র্যাজুয়েটের সময়, তাও অনেক বছর হয়ে গেল। একবার প্রিয় নীড় ছাড়লে আর সেই নীড়ে ফেরা হয় না! তবে আমি চেষ্টা করেছিলাম দেশে ফেরার। ব্লগিংয়ের প্রথম থেকেই আমি নিজের স্বপ্ন, আর ফেলে আসা অনেক কিছু লিখে রাখি এই ডিজিটাল আর্কাইভে। অনেকে পড়ে থাকতে পারেন, আমি পড়াশোনার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় হিজরত করেছিলাম। পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরেছিলাম, তবে সেই ফিরে যাওয়াটা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বছর দুয়েক পর দেশে থাকার পর আবার পড়াশুনার জন্য ডেনমার্কে হিজরত করি!

দেশে মালপানি কামানো খুব কঠিন। আসলে মান-সম্মান নিয়ে টিকে থাকাই মুশকিল। অনেকে দেশে আছেন, আমি তাদের শ্রদ্ধা করি। দেশের প্রতি দেশে থেকে যাওয়া মানুষের অবদান অনেক বেশি। ছোটবেলায় মনে হতো সময় খুব ধীরে যায়। যত বড় হই, মনে হয় সময় কত দ্রুত চলে যায়! আর আজকাল তো মনে হয় চোখের নিমিষেই বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, বুলেট ট্রেনও ফেল! যত সময় যায় ততই নস্টালজিক হই, পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে যায়।

আমরা যারা নব্বই দশকে বড় হয়েছি, তাদের শৈশবটা সত্যিই অন্যরকম ছিল। আসলে প্রত্যেক জেনারেশনই ভাবে তাদের শৈশব বিশেষ। তবে সত্যিই বায়াস না হয়েই বলছি, নব্বইয়ের বাচ্চারা অনেক কিছুর সাক্ষী হয়েছে। এক টাকার আইসক্রিম, শুক্রবারের মুভি, স্কুলের সামনের আচারের দোকান, মার্বেল আর ঘুড়ি ওড়ানো, অথবা রাতে লোডশেডিং হলে ছুটোছুটি, সব মিলিয়ে খাপে-খাপ! আমাদের সময়ে আরেকটা জিনিস ছিল, পরীক্ষার আগে তালমিছরি কিনে খেতাম! অনেকেই বলত তালমিছরি স্মৃতিশক্তি বর্ধন করে। তাই আমরা ধুমায়া কিনে খেতাম পরীক্ষার আগে!

বলছিলাম, এখন অনেক সময় নস্টালজিক হই, পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে যায়। আমি পুরান ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়েছি। আমার স্কুলজীবনে খুব বেশি বন্ধু ছিল না। তবে কলেজে গিয়ে অনেক বন্ধু জুটে গেল। তার মাঝে দুজন ছিল খুব ঘনিষ্ঠ, একজন ইমতিয়াজ আর আরেকজন ইস্তিয়াক। তারা আবার চাচাতো ভাই, গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুর। ওদের গাড়ির টায়ারের দোকান ছিল পোস্তগোলায়। আমি বাসা থেকে কলেজে যাওয়ার পথে ওদের সাথে পোস্তগোলা হয়ে যেতাম। তিনজন এক রিকশায় কলেজে যেতাম, তারপর সকালের নাস্তাও করতাম কলেজের সামনের এক রেস্তোরায়। কলেজ পাশ করার পরও বেশ অনেকদিন যোগাযোগ ছিল। কিন্তু যখন কোরিয়ার স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশ চলে যাই, তারপর আর যোগাযোগ থাকেনি। আসলে ওদের ফোন নাম্বার ছিল আমার কাছে, কিন্তু পরে হারিয়ে ফেলেছিলাম।

আন্ডার গ্রাজুয়েট শেষ করে দেশে ফিরে ওদের দোকানে গিয়েছিলাম। তবে কাউকেই আর পাইনি। সেই দোকানও অন্য কেউ চালায়।ব্লগে তাদের নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম আগে। আমার সেই বন্ধুদের এখনো খুব মিস করি। অনেক দিনের ইচ্ছে, আবার যদি যোগাযোগ করতে পারতাম! আসলে হুট করে কোরিয়ান স্কলারশিপ পাওয়ার পর প্রথমে আর যেতে ইচ্ছে হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত চুপিসারে চলে গেলাম, কাউকেই তেমন জানালাম না। এটা নিয়ে এখনো মনখারাপ হয়। যোগাযোগ রাখাটা উচিত ছিল।

তবে এরপর চলার পথে অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সবার সাথেই যোগাযোগ আছে, কিন্তু সেই দুই বন্ধুকে আর খুঁজে পাওয়া হয়নি। মাঝে মাঝে ফেসবুকে ওদের নাম দিয়ে খুঁজি, তবে আর পাই না।

কয়েকদিন আগে ফেলে আসা সময় আর ছোটবেলার স্মৃতি রোমন্থন করে একটি গান লিখলাম। তারপর এ-আয়ই দিয়ে গাওয়ালাম (ইউটিউবে গানের লিংক)। গানটি উৎসর্গ করলাম আমার সব বর্তমান এবং হারিয়ে ফেলা বন্ধুদের।

ভেজা বিকেল
আজও মনে পড়ে
ওই ভেজা বিকেল,
মাঠে বন্ধুদের সাথে
ফুটবল খেলা।
শুকনো দিনে ক্রিকেট,
আর সেই উচ্ছ্বাস,
জানালার কাঁচ ভাঙলে
পালিয়ে যাওয়া হাস।

ভেজা বিকেল তুমি
ফিরে এসো আজ,
শুকনো বিকেল তুমি
এসো ফিরে আবার।
হারিয়ে যাই আমি
সময়ের গহীনে,
আমার ঘিয়ে-ভাজা দিন তুমি
চিরকাল এই গানে।

স্কুল ফাঁকি দিয়ে
ভিডিও গেমের সময়,
অথবা পাড়ায় পাড়ায়
অকারণ আড্ডায়।
সন্ধ্যে নামলেই লোডশেডিং,
হারিকেনের আলো,
বন্ধুদের সাথে ছুটোছুটি
সেই ছিল ভালো।

বিটিভির সেই কার্টুন,
শুক্রবারের সিনেমা,
অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে ধরতাম
অস্পষ্ট সেই সীমা।
মিনা আর সিসিমপুর
রঙিন শৈশব জুড়ে,
আজও তাদের স্মৃতিগুলো
মনটাকে যায় ছুঁয়ে।

পুরোনো সেই গলিটা
আজও একই আছে,
শুধু আমার ভিতর
নস্টালজিয়া বাঁচে।
পারার ছাদের সেই চিৎকারগুলো
হারিয়ে গেছে কবে,
ঘুড়ির সাথে উড়ে গেছে
আমার ছোটবেলা তবে।

তারপর দিন গেল,
রোদে পুড়ল মন,
হারিয়ে গেল ধীরে ধীরে
সেই সম্পর্কের ক্ষণ।
তবু মাঝে মাঝে
স্মৃতির গহীনে,
থেমে যাই আবার
পুরোনো দিনে।
হারিয়ে খুঁজি প্রিয়
শৈশব আমার, হায়,
চায়ের দোকান, ক্যারাম বোর্ড,
সন্ধ্যার সেই চায়ের দোয়ায়।

ভেজা বিকেল তুমি
ফিরে এসো আজ,
শুকনো বিকেল তুমি
এসো ফিরে আবার।
হারিয়ে যাই আমি
সময়ের গহীনে,
আমার ঘিয়ে-ভাজা দিন তুমি
চিরকাল এই গানে।

যদি ফেরো একদিন
সেই বিদ্যুৎহীন রাতে,
মোমবাতির আলো জ্বেলে
ছাদের নীরবতায়।
অথবা ঈদের সকালে
নতুন জামার ঘ্রাণে,
সেমাইয়ের মিষ্টি গন্ধ
ভাসতো চারপাশে।

ভিউ-কাটের দোকানে
বন্ধুদের ভিড়,
এক টাকার আইসক্রিমে
শৈশব ছিল ধীর।
লাটিম খেলায় ফিরো তুমি,
মার্বেলের রঙে,
রিকশার বেলের শব্দগুলো
বাজে আজও সঙ্গেই।

ভেজা বিকেল,
তুমি কোথায় হারালে?
যদি ফিরো একদিন
রাখবো বুকের কাছে।
সেই ভেজা বিকেল,
শুকনো দুপুর আমার,
সময় কেন কেড়ে নেয়
এত আপন ঘর?

সময়ে হারায় সব,
সম্পর্কের সমীকরণ,
কত পরিবর্তনে
বদলে যায় জীবন।
আপন হয় পর,
পর হয় আপন,
তবু স্মৃতির শহরে
সবাই থাকে গোপন।

ভেজা বিকেল ফিরে
এসো স্বার্থবিহীন
এই ব্যস্ত সময়ে,
পাড়ায় পাড়ায় আড্ডায়।
আমার পুরোনো সব
হারিয়ে ফেলা বন্ধুদের
আগলে রেখো যতনে
আজীবন হৃদয়ে।

ভেজা বিকেল তুমি
চিরকাল এই গানে।
(শেষ)




সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মে, ২০২৬ রাত ৩:৫৯
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অর্ধগলিত মাথার রহস্য

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে মে, ২০২৬ সকাল ৮:০৩

মুগদা থানার সামনে তখনো ভোরের কুয়াশা ঝুলে আছে। পিবিআই-এর ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান পুলিশের জিপ থেকে নামতেই বাতাসে একটা চেনা গন্ধ ভেসে এল—ভেজা মাটি আর পুরোনো ড্রেনের গন্ধ

রাস্তায় ওপাশে ওয়াপদা কোয়ার্টারের ম্রিয়মাণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

খাদ্য অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করা উচিৎ

লিখেছেন সামিউল ইসলাম বাবু, ১৯ শে মে, ২০২৬ সকাল ৯:৩৫

এই সংবাদ কি সরকার দেখেনা?
অথচ ১৩সালের দিকে ইউরোপে বাংলাদেশ চিংড়ি পাঠাতো। সেখানে হালকা শিসা থাকায় আর কোন প্রকার মাছ ওই দেশে আর নেয়না। সমস্ত চুক্তি বাতিল।

অনেক দেশ আছে যেখানে খাদ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দরখাস্তটা দোলে নিমডালে

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ১৯ শে মে, ২০২৬ সকাল ১১:১৭



তোমার বাড়ির দরজা খোলা
অথচ প্রবেশ নিষেধ আমার...
দরখাস্তটা ঝুলে আছে নিম ডালে
বাতাসে ভাসে
আন্নাকে সাথে নিয়ে ঘুমাতে যাও...
নিম ডালে দোলে বিষণ্ণতা, হাহাকার এক বুক—
তোমার বিছানা জুড়ে তলস্তয়, আন্না কারেনিনা।

গল্পের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দলি, শাপলা শালুক শতদল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল.........

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ১৯ শে মে, ২০২৬ দুপুর ২:২৫


পুকুরের টলটলে জলে যখন বড় বড় লাল শাপলা ফুটে থাকে, তখন সেটি দেখতে এতোটাই সুন্দর লাগেযে তাতে মন উদাস হয়ে যায়। মন চায় জলে নেমে তুলে নিয়ে আসি কয়েকটি। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

UAE প্রতিষ্ঠানকে বর্জন করা হোক.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে মে, ২০২৬ রাত ৮:৪৩

চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনা নিয়ে বর্তমানে UAE এর DP WOARLD এবং KSA এর RSGT এর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। তবে দেশীয় প্রতিষ্ঠান MGH GROUP উল্লেখ্য দুইটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের চাইতে বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×