(অনুদিত)
1940 সাল। স্লোভাক বংশোদ্ভূত এক ইউরোপীয় নান তার নিজ এলাকা কলকাতা ছেড়ে এসে দরিদ্রতম মানুষের মাঝে কাজ করার ডাক পেলেন। মাদার তেরেসার দাতব্য মিশনারীগুলো আজ যেন সিস্টার, ব্রাদার, প্রিস্ট এর স্বেচ্ছাসেবকের সমন্বয়ে গড়া ছোট রণবাহিনী যারা সারা পৃথিবীব্যাপী 71 টি দেশের অসুস্থ, ুক্ষুধার্ত আর গৃহহীন মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছে সেবা আর ভালোবাসার স্বগর্ীয় মন্ত্র।
মাদার তেরেসা কে? কেনইবা তার কর্মধারা এখনও বিকশিত হয়ে চলছে, যেখানে অন্যসব মিশনারী গ্রুপগুলোর সংখ্যা পতন্মুখ? তিনি তার জীবন কে গড়ে তুলেছেন একটি বিশ্বাসের উপর যে , দরিদ্রতম মানুষের সেবার মাঝেই আমরা সরাসরি ঈশ্বরের সেবা করি। তার ও তার সহচরদের জীবনাচারের সংক্ষিপ্ত কাহিনী তুলে ধরা হবে এ 12 পর্বের ধারাবাহিক লেখায়।
প্রথম পর্বঃ
নতুন দিল্লীর হোয়াইট চ্যাপেল। ভোর ছয়টার গণ প্রার্থনার পূর্বে এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসিনী পরিচ্ছন্ন মেঝেতে একাকী প্রার্থনারত। তারপর নীল পাড়ে সাদা সূতি শাড়ি পরিহিত বারোজন সিস্টার সমবেত স্বরে উচ্চারণ করলেন,
"ঈশ্বর ভালো, ঈশ্বর সত্য, ঈশ্বর ভালোবাসা, তার প্রশংসা কর"। বিভিন্ন বিশ্বাসের একদল অবিবাহিত মাদার রা এসেছেন। নবীন সিস্টাররা কিছু ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছেন। সিস্টারদের একজন আদর দিয়ে চেষ্টা করছেন ক্রন্দনরত আট মাসের এক বাচ্চা ছেলে শিশুকে থামাতে।
পুরোহিত গণ প্রার্থনা অনুষ্ঠান সমাপনের ঘোষণা দিলেন। মিশনারীরা খোশ গল্প করতে করতে বেরিয়ে গেল। পিছে পিছে বেরিয়ে এলো তরুণ মাদার, 15জন উৎফুল্ল ্ল শিশু পুরোহিত এবং একজন বিদেশী পরিদর্শক।
কিন্তু চ্যাপেলের মেঝেতে একা থেকে গেলেন নীল কার্ডিগেনের মাঝে আবদ্ধ খর্বাকায় এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসিনী, উচ্চস্বরে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে র্ প্রার্থনা করেই চলেছেন।
ইনিই হলেন মাদাম তেরেসা, কলকাতার কিংবদন্তী সাধু সন্ত। চ্যাপেল হতে একসময় তিনি বের হয়ে আসেন, তারপর বিশাল ইউকেল্পিটাস গাছের নিচে দাড়িয়ে আশর্ীবাদ করেন তরুণীদের মাথায তার শীর্ণ দীর্ঘ হাতের পরশ বুলিয়ে। এক পঙ্গু বাচ্চা শিশুকে জড়িয়ে ধরে, মমতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন আর সব শিশুদের দিকে।
"কী সুন্দর!", তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন। তারপরই পরিদর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্বশব্দে বলে উঠলেন, "এরা থাকার জন্য ভালো বাসস্থান পাবে। আমরা পরিত্যক্ত শিশুদের দত্তক নিয়ে এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলেছি। " সিস্টার প্রিসিলা বললেন, "আমরা আরো 108 টি অনুরোধ বিবেচনাধীন রেখেছি। আমাদের সাধ্যমত তাতে আমরা সাড়া দেব।"
আমি আরো কাছে এগিয়ে গেলাম। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া , কুঞ্চিত চামড়ার সেই বৃদ্ধার আমি আবার দেখা পেলাম, দুই বছর পর । তিনি আজ সত্যই বড্ড ক্লান্ত। তার অধীনে ভারতের 146 টা আশ্রম, সারা পৃথিবীব্যাপী 71 টি দেশে রয়েছে 350 টি আশ্রম যেখানে তার দাতব্য মিশনারীরা পৃথিবীর দুস্থতম মানুষের মাঝে কাজ করেন। তারই একটা আশ্রমের পরিদর্শনে এসেছিলেন তিনি।
এটা পরিষ্কার যে যেকোন মহান নেতার মত তার নিজস্ব ব্যবস্থাপনাও একটা সফলতা পেয়েছে, যেখানে 1 ল 26 হাজার পরিবার খেতে পাচ্ছে, 97 টি স্কুলে 14 হাজার শিশু পাচ্ছে শিক্ষা, সেবা পাচ্ছে 1 লক্ষ 86 হাজার কুষ্ঠ রোগীর শিকার আর 22 হাজার অসহায়, দুস্থ মৃতপ্রায় মানুষ।
"প্রয়োজন অনুসারে, " , কিছুটা সংক্ষেপেই তিনি ব্যাখ্যা করলেন কেননা নিজের কাছে তা খুবই পরিষ্কার। "ঈশ্বর হলেন ভালোবাসার বাস্তব রূপদান", তিনি ব্যাখ্যা করলেন। "তিনি যদি তোমাকে কোন সেবা করার প্রয়োজনীয়তা দেখান, তিনি নিজেই তার সহায়ক সম্পদ দান করেন। কাজেই পুরোপরি বিশ্বাস রাখতে হবে, এবং (এর জন্য) খুব বেশি কিছুর বন্দোবস্তব করতে হবেনা।"
তারপরও তিন হাজার সিস্টার আর চারশ ব্রাদার নিয়ে গড়ে তোলা মোটে 40 বছরের পুরোনো (1988)এই ধমর্ীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য একজন নারীই পেলেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, 1979 সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কার। "এটা ঈশ্বরের কাজ, আমার কাজ নয় , তিনিই এটা করেছেন", মাদার তেরেসা নরম সুরে বললেন। "কারণ মানুষ হয়ে বলছি, এটা কখনই সম্ভব ছিলনা। তিনিই এটা করেছেন।"
"জি্ব, মাদার, কিন্তু আপনি আর তিনি (ঈশ্বর) মিলে কিভাবে তা সম্পন্ন করলেন? আরো 119 টা কেন্দ্র, ভাসমান চিকিৎসা কেন্দ্র (745টা ), এবং একটি মিশনারী আশ্রম গড়ারর সিদ্ধান্ত কিভাবে নিলেন?"
"প্রয়োজন অনুসারে", তিনি সাড়া দিলেন। আপনি কি যাত্রাকালে বা প্রতিদিনের জন্য কোন পরিকল্পনা করেন?
"না, প্রয়োজন অনুসারে, যতবার বাইরে যাবার প্রয়োজন হয়, ততবারই, যেখানে যীশু আমাকে নিয়ে যেতে চান সেখানেই"।
দুই বছর যাবৎ আমি চেষ্টা করেছি কোন নির্দিষ্ট দিন ক্ষণ ঠিক করে মাদার তেরেসার সাথে কলকাতায় দেখা করবো। কিন্তু তাকে সেভাবে পাওয়া ছিল দুষ্কর। শীঘ্রই আমি দেখলাম তার কার ণ। তিনি সব জায়গায় যাত্রা করছেন। একবার তাকে আমি কানাডার টরেন্টোতে খুজে পেলাম এবং বিনয়ের সাথে বললাম, "আপনি কলকাতায় আছেন কিনা না জেনে আমি সেখানে যেতে পারিনা।"
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


