কার্ল মার্কস এশিয়াটিক মোড অব প্রডাকশন-এ এশিয় গ্রাম সমাজের যে মডেল নির্মাণ করেন, সেখানে তিনি এর অন্যতম লণ হিসাবে এই সমাজের নিশ্চলতা বা গতিহীনতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এশিয়াটিক সমাজ সবচেয়ে বেশীদিন ধরেই সব চেয়ে অনড় অবস্থায় টিকে থাকে। আমাদের সমাজ অবধারিতভাবে কৃষি সমাজ। তবে শিল্পও ছিল পাশাপাশি। এখানে কৃষিজাত ও শিল্পজাত উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে ঐক্য ছিল। কোনরূপ সামাজিক ব্যবধান ছিল না। পারস্পারিক নির্ভরতার উপর ভিত্তি করেই একটি গ্রামে কৃষি ও শিল্পের জন্য শ্রমশক্তি যৌথভাবে নিয়োজিত হত। এইজন্যই গ্রাম সমাজ পূর্ণভাবে স্বয়ম্ভর হত। মার্কসের ভাষায়, শিল্প ও কৃষির ঐক্য বন্ধনের ফলে ুদ্র সমাজ সম্পূর্ণভাবে স্বয়ম্ভর হয় এবং নিজের মধ্যেই উৎপাদন ও উদ্বৃত্ত উৎপাদনের শর্তকে পূরণ করে। মার্কস আরও বলেন, এখানে গ্রামীন সমাজ গড়ে ওঠেছিল যৌথ মালিকানার উপর। জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল অনুপস্থিত। গ্রাম্য সমাজ ছিল শ্রেণীবিহীন। অবশ্য এর পাশাপাশি ছিল আরেকটি ব্যবস্থা, উধর্্বতন একটি ুদ্র গোষ্ঠী, এরা ছিল মতাধারী। অবশ্য, ইতিহাসকার গৌতম ভদ্র এশিয়াটিক সমাজকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন: এশিয়াটিক সোসাইটি একদিকে শ্রেণিবিহীন আদিম সাম্য সমাজ, দাস সমাজ এবং শ্রেণি বিভক্ত সামন্ততান্ত্রিক সমাজের মাঝামাঝি একটা অবস্থা। এই থেকে অন্ততঃ একটা ব্যাপারে আমরা ঐকমত্য হতে পারি যে আমাদের প্রাচীন সমাজে পাশাপাশি দুটো শ্রেণির অস্তিত্ব ছিল। ফলে সমাজ নিস্তরঙ্গ থাকার কথা না। দ্বন্দ্ব থাকা স্বাভাবিক। মার্কসও তাই মনে করেন, এশিয় সমাজে অন্যান্য সমাজ ব্যবস্থার তুলনায় পরিবর্তন ধীর গতিতে আসে। তবে ক্রমশ তা বদলাতে থাকে। উধর্্বতন গোষ্ঠীটি ক্রমশ শোষকে পরিণত হতে থাকে। শ্রেণি বিভক্তি প্রকট হতে থাকে। তারপরও বহু শতাব্দী ধরে স্বয়ম্ভর গ্রাম সমাজ ছিল নিশ্চল, পরিবর্তনহীন, স্থবির। তবে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের পরেই এশিয় সমাজ পুরাপুরি শ্রেণি বিভক্ত দ্বন্দ্বমুখর সমাজে পরিণত হয়। বিভিন্ন রূপে অবয়বে এখনও আমরা সাম্রাজ্যবাদের বলয়ে রয়েছি। আর এই বলয়ে থেকে আমাদের গ্রাম ব্যবস্থা কিভাবে ভেঙে গেল, বিকৃত হল, আরোপিত হল, অপদস্ত হল তারই আখ্যান হল হরিপদ দত্ত'র উপন্যাস দ্রাবিড় গ্রাম। প্রায় তিন হাজার বছরের দ্রাবিড়গ্রাম কালের যাত্রা পেরিয়ে অভিশপ্ত গ্রামে পরিণত হয়েছে। বদলে গেছে চিরায়ত গ্রামের অবয়ব। হাজার বছর ধরে প্রাচীন গ্রামের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির আত্মিক ভিত তৈরী হয়েছিল, পুঁজির প্রভাবে তা ধ্বসে পড়ার আখ্যান হল এই উপন্যাস।
'সেই প্রাচীন গ্রামের লোকেরা একদিন দিনান্তে শীতল্যার পারে অতিকায় জাহাজ ভিড়তে দেখে। কী ঘটতে যাচ্ছে এ বিষয়ে তারা জ্ঞাত ছিল বলেই গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া শোকাহতগণ নদী তীরে ভীড় জমায়। ওরা দেখতে পায় জাহাজের খোল থেকে বুলডোজারটি কচ্ছপের মতো নেমে আসে নদীর ঢালু পাড়ে। গ্রাম ভেঙে কারখানা হবে বলে, সবকিছু পাল্টে যাবে বলেই ওরা ওই দৃশ্যের সাী হয়ে থাকে। পরবর্তী প্রজন্মকে শোনাবে রূপকথা।' তারপরের কাহিনী সত্যিই রূপকথাময়। ল্যা নদীর পাড়ে রাসয়নিক সারের কারখানা হল। এই শিল্পায়নে স্থানিক কোন চর্চা কিংবা অভিযোজন ছিল না। ছিল না স্থানীয় শ্রমশক্তির সাথে সমন্বয়। বরং স্থানীয় অর্থনীতিক চালচিত্র ও কৃষিসমাজের বুনিয়াদি ভিত্তির সহিত সমন্বয়রহিত আরোপিত এক শিল্পোদ্যগ হিসাবে পরিগণিত হয়। পরিণতিতে যা উপহার দেয় নানাবিধ বিপর্যয়। সার কারখানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ছোট্ট এক উপশহর, এরই টানে স্থাপিত হয় কৃষি-ভিত্তিক শিল্প। ধান চাষের বদলে আনারস চাষে কৃষকদের বাধ্য করা হয়। এর ফলে, কৃষকের কাছে "এতদিন খাদ্য ছিল ফসলের মাঠে। এখন দোকানে। সেই পলাশবাজারে"। আর একদিকে স্থানীয়রা হয় বাস্তুহারা, গ্রামছাড়া আর অপরদিকে বহিরাগতদের ভীড় জমতে থাকে। কারখানাকে ঘিরে গড়ে ওঠে আলাদা এক জগত, কলোনি, যার সাথে গ্রামের লোকদের দূরবর্তী সম্পর্ক। স্থানীয়দের পেশার ধরন বদলাতে থাকে। নতুন পেশা তৈরি হতে থাকে। শেকড়চু্যতির বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকার দায়ে অনেকে নতুন পেশায় অভিযোজিত হয়, কিন্তু মনে সুখ পায় না। নষ্টালজিক নানা টান বুক মুষড়ে দেয়। সে-সাথে বাড়তে থাকে প্রজন্ম-ব্যবধান। নতুন প্রজন্ম উদভ্রান্ত, যৌবন খরচ করে মিশে যাচ্ছে নানা অনৈতিক চর্চায়, নিজস্ব পরাণভূমির স্বরূপ ভুলে মেনে নিচ্ছে বায়বীয় নগদ প্রাপ্তি। পুঁজি শুধু অর্থনীতি ও মানুষের মধ্যেকার আন্তঃসম্পর্কের বিন্যাসই বিপর্যস্ত করেনি, নষ্ট করেছে প্রকৃতির অকৃত্রিমতা। শীতল্যা পরিণত হয়েছে জলকঙ্কালে, প্রাণবৈচিত্রে বিপর্যয় নামে, বৃগুলো সবুজতা হারাচ্ছে, বাতাস বিষ বয়ে বেড়ায়। এরই সাথে আরেক ভয়াবহ বিষের লণ মেলে, তাহলো_ রাজনীতি। তথাকথিত এই রাজনীতি মানবিক সৌন্দর্যগুলো তিরোহত করে। হিংসা, দ্বেষ, সংঘর্ষ, খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি হয় রাজনীতির অনুসঙ্গ। এখানে বলে রাখা দরকার, এই উপন্যাসের সময়ব্যাপ্তি হল_ বিগত আওয়ামি লীগ সরকারের শেষার্ধ ও বর্তমান বিএনপি জোট সরকারের প্রথমার্ধ। কিন্তু শ্রেণি চরিত্রের েেত্র মুক্তিযুদ্ধ চেতনাধারী আওয়ামি লীগ সরকার ও বিএনপি-জামাত জোট সরকারের মধ্যে লেখক কোন প্রার্থক্য খোঁজে পান না। উভয়েরই সময় মানবিক বিপর্যয় বর্তমান থাকে। আওয়ামি পান্ডা দ্বারা নির্যাতিত জোবেদাকে তার বাবা পানু আশ্বাস দেয়, "মজিবরের মাইয়ার কাছে যে বিচার তুই পাইলি না, জিয়ার বিবির কাছে তুই পাইবি"। কিন্তু দল বদলায় অথচ শাসকের চরিত্র বদলায় না। বরং নমো পাড়ার বিধবা ও তার মাইয়া দর্ষিতা হয়, খাঁ বাড়ির পোয়াতি বউয়ের গর্ভনাশ হয়। এবং অত্যাচারের সংযুক্তি হিসাবে হিন্দু নির্যাতন নতুন মাত্রা পায়। রাজাকারদের সামাজিক প্রতাপ বাড়তে থাকে। মুক্তিমুক্তির চেতনা হয় ভুলুন্ঠিত। বাম রাজনীতি স্থবির, প্রতিবাদি মনোভঙ্গি নিরুত্তেজ। এমনই এক উম্মূল, উদভ্রান্ত, মাৎসন্যায় সমাজব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয় দ্রাবিড় গ্রাম। এই অবস্থা লেখকের স্পর্শকাতর মন মেনে নিতে পারে না, তাই মাঝেমধ্যে লেখকই কাহিনীতে ঢুকে পড়েন; কখনও বর্ণনায়, কখনও সংলাপে লেখকের কণ্ঠস্বর উচ্চকিত হয়। এতে উপন্যাসের গতি বিচু্যত হয়, ফলে দ্রাবিড় গ্রামের প্রত্নরূপকে নিয়ে পরিবেশবাদি ও বিশ্বায়ন-বিরোধী উপন্যাসের যে চমৎকার উদ্যেগটি ছিল, তা আর পুরাপুরি সম্পন্ন হয় না।
এই উপন্যাসে একটি বৈশিষ্ট হল কেন্দ্রীয় ব্যক্তিচরিত্র বা নায়কের অনুপস্থিতি, অনেকগুলো চরিত্রের সমাহার। অনেক স্বরের প্রতিনিধিত্বে সমাজ সমগ্রভাবে ওঠে এসেছে। এবং এই স্বরগুলোকে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়: প্রথমত, পুঁজি-জাত সমাজ, যারা পুঁজির ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠেছে, এবং মতার শক্তি দখল নিয়েছে; দ্বিতীয়ত, যারা পুঁজির প্রভাবে নিষ্পেষিত, পুঁজি-উদ্ভূত ুদ্র গোষ্ঠীটি দ্বারা এরা নিষ্পেষিত, প্রতিবাদের নূন্যতম শক্তি যাদের নেই। এছাড়া পুঁজি প্রবেশের পথ ধরে গ্রাম জীবনে যে সব বিষয় ও প্রভাব দাগ কাটে, তা হল: বিশ্বায়ন প্রতিক্রিয়া, এনজিও তৎপরতা, প্রজন্ম ফাঁরাক, নারীনিসর্গবাদী চেতনা, আদিমতাবাদ। খনা বিবি, হোসেন, গনি মাস্টার, রবিউল, মমতাজ, জোবেদা, আকালি বুড়ি এই উপন্যাসের সরব চরিত্র। চৈতন্য মাঝি চমৎকার একটি চরিত্র হয়ে উঠছিল, কিন্তু শীতল্যার দূষিত জলের মড়ক লাগা মাছ খেয়ে সে মারা যায়। খনা বিবি ফসল ফলাতে কৃষকদের নানা বিষয়ে সমাধান দেয়, কিন্তু পুঁজির প্রভাবে ফসলের চারিত্র যায় বদলে, আর কৃষকরা খনার বচনের প্রতি আগ্রহ হারায়। খনা এই উপন্যাসের একটি সমৃদ্ধ চরিত্র। প্রকৃতির সাথে তার সম্পর্ক নাড়ির। পরিবেশের বিপর্যয় তাই সে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে। শীতল্যা তার দুঃখ যন্ত্রনা তাকেই নিবেদন করে, "এখন আমি কোথায় মাছের ডিম প্রসব করমু, কইয়া দিবি সই? আমার বুকের সব পানি বিষ হইয়া গেছে। সারের কারখানাটা কী সর্বনাশ করলো?" খনা বিবি যেন নারী নিসর্গবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে চিত্রিত চরিত্র। খনার সই আকালি বুড়ি, উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে কালের সাী হয়ে। হোসেন কৃষকের ছেলে কিন্তু কৃষক হতে পারে না। টিকে থাকার যুদ্ধে সে নানা পেশায় জড়িয়ে পড়ে, শেষ পর্যন্ত পেশাদারি সন্ত্রাসী হয়। মমতাজ এনজিও'র মাইক্রোক্রেডিট গ্রহীতা, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন চরিত্র। মমতাজ এক সময় দর্ষিতা হয় তার ভাললাগা মানুষ এবং তার প্রতি প্রেম-তাড়িত যুবক হোসেন ও তার সাঙ্গাতদের দ্বারা। হোসেনের এই অনৈতিক স্বভাবের দ্বারা সমাজের তীব্র পচনটি স্পষ্ট হয়। গনি মাষ্টার, গ্রাম সমাজের এই আদর্শিক চরিত্রটিও বদলে গিয়ে পুঁজির মুরিদ হয়, মানবিক সুস্থতা হারিয়ে ফেলে। রবিউল কমু্যনিস্ট পার্টি করা লোক, এখন এনজিও কর্মী। পুরানো প্রতিবাদি চিন্তাভাবনাগুলো মাঝেমধ্যে মোচড় কাটলেও, শেষ পর্যন্ত বৃত্তবন্দী হয়েই থাকে। এদের মধ্যে জোবেদাই অমতা স্বত্ত্বেও প্রতিবাদে ঝলসে ওঠে।
এই উপন্যাসটি বাংলাদেশের সমাজকাঠামোর ভাঙন, রণ, রাজাকারদের আস্ফালন, নারী অবদমন, নৈতিক অবয়, আদর্শিক সংকটের প্রামাণ্য উপস্থাপন। ঔপন্যাসিক হরিপদ দত্ত তার লেখনির স্বভাব অনুযায়ি এই বিষয় ব্যতিক্রমী উপন্যাসের কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন। আর এতে তাঁর সচেতন প্রস্তুতিও ছিল। খনা ও খনার বচনগুলো তিনি চমৎকারভাবে কাহিনীতে সংযুক্ত করতে পেরেছেন। চরিত্র উপস্থাপন ও সংলাপ তৈরিতে মুনশিয়ানা ছিল। তিনি গোমরফাঁক করে দেন যে, বিশ্বায়ন নামক এক প্রপঞ্চ আমাদের কিভাবে দূষিত করছে, বিকৃত করছে আমাদের সমাজমন, এর ফলে তৈরি হচ্ছে যে বিষ তা মানুষ ও প্রকৃতি ধ্বসের কারণ হয়। গদ্য হলেও তিনি কোথায় কোথায়ও চিত্রকল্প তৈরিতে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। সব মিলে বর্তমানে রচিত বহু স্থুল উপন্যাসের পাশে দ্রাবিড় গ্রাম সচেতনতা প্রসূত ভাল উপন্যাস। একে আমরা বিশ্বায়ন বিরোধী উপন্যাসও বলতে পারি।
দ্রাবিড় গ্রাম। হরিপদ দত্ত। ঐতিহ্য প্রকাশনী, ফ্রেব্রুয়ারি 2003। প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ। মূল: 110 টাকা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


