somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কতিপয় শিশু-কিশোর

০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ ভোর ৫:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শহর থেকে একটু দূরে, হাইওয়ের পাশে, খোলা ঘেসো জমি। ছোট ছোট প্লটে বিভক্ত। হাইওয়ের সাথে লাগানো রেললাইন। প্রকৃতির স্তব্ধতা কাঁপিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ট্রেন। নিঃশব্দে। প্রকৃতি সব শব্দ শুষে নিচ্ছে। ট্রেনের দিকে ওরা, মানে কতিপয় শিশু-কিশোর অপলক তাকিয়ে আছে। চোখে প্রশ্ন কিংবা বিষ্ময় নেই। রহস্য ভর করেছে। অন্ধকারে সোডিয়াম আলো মিশে কালচে-হলুদ অবয়ব ধরেছে। আকাশ পরিচ্ছন্ন, ফকফকা জোৎস্না। গাড়ির শা্ শা্ আসা যাওয়া। সব মিলে বড় আয়োজন। প্রকৃতির এই আয়োজনের মাঝে ওরা কতিপয় শিশু-কিশোর, খোলা আকাশের নীচে রান্না-বান্নায় নিয়োজিত। প্রতি সন্ধ্যায় ওরা রান্না-বান্না করে। তবে এটা টোনাটুনির রান্না নয়। কতিপয় শ্রমজীবি শিশু-কিশোরের প্রতিদিনের খাদ্য গ্রহণ পর্ব। যেখানে জ্যামিতিক প্লট, সেখানে মাটিতে গর্ত করে, ইট বিছিয়ে ওরা চুলা বানায়। ছোট ছোট প্লট, সীমানা ঘেরা। ওদের কোন প্লট নেই, আবার বলা যায় সব প্লট ওদের। তবে প্লটের সীমানা ছোট হয়ে আসছে। ওরা প্লট হতে প্লটে লাফায়। কেননা খালি জায়গায় দালান হয়, টিনের ঘর হয়। এই সব না হলে, কাকতাড়ুয়ার মতো সাইনবোর্ড দাঁড়িয়ে থাকে, সদম্ভে লেখা থাকে: খরিদ সূত্রে এই জমির মালিক...।
মালিক যে-ই হোক, এখন ওরা 21 জন। এরা আপাতত দখল নিয়েছে একটি প্লট। জোছনার আলোয় রান্না-বান্না হচ্ছে। আজকে খিচুরি রান্না। চুলা কেন্দ্রে রেখে সবাই গোল হয়ে আছে, কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। খিচুরি উতরানোর গম্ গম্ শব্দ হচ্ছে, সে-সাথে ডাল-মশলার মিশেল এক গন্ধ। এই গন্ধটা সবাই উপভোগ করে, তারা আমোদিত হয়। কান্ত শ্র্ান্ত দেহে তেজ ফিরে আসে, মুখাবয়র চিক চিক করছে। চাঁদের জোছনায় আর সোডিয়াম লাইটের হলুদ আলোয়, অন্ধকার স্বরূপ হারায়, টুকরা টুকরা হয়ে বাতাসে ভাসছে। আকাশে বিপ্তি তারা, চাঁদের ম্লান উপস্থিতি। কখনও কখনও পাখা জাপটিয়ে মাথার ওপর দিয়ে ওড়ে যায় পাখি। কখনও শব্দের তীব্রতাসহ আকাশে বিমান ওড়ে, বিশাল বিমান ছোট হতে হতে শূন্যতায় মিলিয়ে যায়। ওরা এই শূন্যযাত্রার দিকে তাকিয়ে থাকে, বিমান অদৃশ্য হবার পরেও ঘোর কাটে না। বাতাসের সাথে খাদ্যের সুঘ্রাণ এসে যখন ধাক্কা মারে, তখন তারা আবার ধাতস্ত হয়। ডেকচির খোলা মুখে সরা ঠক্ ঠক্ করছে, আর বাষ্প বের হচ্ছে। সে-সাথে ছড়িয়ে পড়ছে খাদ্যের সুবাস। ওদের গোলাকার বৃত্তটা আরেকটু ছোট হয়ে আসে। দূর থেকে মনে হবে যেন পুতির মালা। চারদিকে ঘেরা দেয়ালের কারণে, বাইরে থেকে তাদের সবাইকে দেখা যায় না, যে কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে, তাদের উপরের উর্ধাংশ ছায়ার মতো মনে হয়, যখন নড়ে ভুতুরে লাগে। মাঝে মাঝে উচ্কে ওঠা আলোর ফুল্কিতে অনেকে চমকে ওঠে, তারপর দৃষ্টিবিভ্রম ভেবে পথচারী স্বাভাবিক পথ চলে। আর ওরা যখন রাস্তার দিকে তাকায়, দেখে সারি সারি গাড়ি চলছে, যদিও গাড়ির অবয়ব চোখে পড়ে না। দেখে মনে হয় আগুনের গোলা গড়িয়ে গড়িয়ে ছুটছে, এই সব আগুনের মিছিল যেন শহর পুড়িয়ে দেবে, বহু দূর দূর থেকে এই সব আগুনের আগমন। আর ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দেখা মানুষগুলোকে মনে হয় যন্ত্র, ডানে বামে কারও চোখ নেই, উপরে নিচে তাকায় না, পথ চলে সমান্তরালে, চু বরাবর।
শিশু-কিশোর এরা, নানা কাজ-কামে নিয়োজিত। কেউ কাচাবাজারের দোকান কর্মচারী, কুলি, বাসের হেলপার, ওভার-ব্রিজের হকার, কাজের বুয়ার পোলা। কেউ আবার এই বয়সেই রিক্সা ভ্যান চালায়, ঠেলা গাড়ি ঠেলে। সন্ধ্যায় কাজ শেষে, ওভার-ব্রিজের উপরই হতো এদের দিন শেষের মোলাকাত। এমনিই চলছিল দিনের পর দিন, মাসের পর মাস! রাত বাড়তে থাকে, সে-সাথে গল্প-গুজব, খুনসুটি। কখনও গার্মেন্টের মেয়েদের সাথে টাংকি মারা_ হাসি, কথা, অঙ্গভঙ্গি ছুড়ে মারা। এ-ও এক ধরনের বিনোদন, তারা রোমাঞ্চিত হত। ওদের কথাবাতর্ায়ও বৈষয়িক বিষয় থাকত। আলাপচারি করতো যেন সংসার পাকা পৌঢ়। কখনও সবাই মিলে সিনেমায় যেতো। এক সাথে হৈ রৈ আর নাচ-গানের সাথে সাথে তারা শিষ দেয়। চেচামেচিতে ছবিঘর শব্দ ঘরে পরিণত হতো। সিনেমা শেষে এক সাথে বেরিয়ে আসতো হুড়মুড় করে, তারপর লোকাল বাসে হৈ হৈ করে পেঁৗছত গন্তব্যে। ওভার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে কখনও ধেয়ে আসা গাড়ির চলার পথে অপলক তাকিয়ে থাকতো, এই চলার যেন শেষ নেই, কান্তি নেই। কিন্তু চোখের কান্তি হতো, তখন তারা ব্রিজ থেকে নেমে, আশে-পাশে ছড়িয়ে পড়তো। রাস্তার পাশে হাঁটতো, চলে যেতো অনেক দূর। কখনও ঘাষের উপর বসে, শুয়ে গল্প করতো। কখনও রাস্তার পাশে নেমে পড়া খালি জমিতে চলে যেত, এদিক-সেদিক জংলা ছিল, ছিল পাখির ফিসফাস। জায়গাটার রহস্য ওদের ভালো লাগত। ঘুরে ফিরে আবার আসত ব্রিজের উপর, এটা যেন ঘর-বাড়ি, আসলেই তেমনই। এদের অধিকাংশের ঘর নেই। ব্রিজের উপর মধ্যরাত পর্যন্ত গল্পগুজবে মত্ত থাকতো। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে সন্ধ্যায় শরীর ভেঙ্গে আসতো, অবসন্ন দেহে হেলে দুলে কোথায়ও একটু ফাঁক-ফোকর পেয়ে দেহ গলিয়ে দিত, তারপর ধীরে ধীরে ব্রিজের কাছে এসে, কাছের জনদের কাছে পেয়ে দেহ উছলে উঠত, কান্তি মিলিয়ে যেত। এমনি করে মধ্যরাত, তখনই পুলিশের হুইসেল, চোটপাত। কখনও দুয়েকজনকে ধরে নিয়ে যায়। হরতাল ধর্মঘট হলে পুলিশের ধাচানি বাড়ে। তাই পুলিশের গন্ধ পেলেই ওরা মরার মতো ঘুমায়, ঘুমানোদের পুলিশ ডিস্ট্রাব করে না।
দিনগুলি কাটছিল, এমনি ভাবেই। একটা নিয়ম করে। ঘুরছিল, ফিরছিল। তখনই চোখে পড়ে বড়সর খোলা জমি। আইলের বদলে, ইটের ঘের। ভেতরে বুনো গুল্ম, ঘাষ। প্রথম প্রথম লুকোচুরি খেলতো। ফড়িং-এর পেছনে ছুটতো। কখনও গোল হয়ে বসে গল্প-গুজব করতো। এটা-সেটা খাবার নিয়ে আসতো। বাদামের খোসা টাস টাস করে খসিয়ে চিবুত। কেউ কেউ বিড়ি সিগারেট ফুকতো। কখনও কখনও কলা পাউরুটি দিয়ে রাতের খাবার খেতো। অতপর গল্প করতে করতে সেখানেই কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়তো। এভাবে সপ্তাহে দুয়েকদিন সেখানে থাকার একটা প্রবণতা দেখা দেয়। যেন বাড়ি থেকে দূরে শহরে বেড়িয়ে আসা। এমন ছিল প্রথম দিকের অনুভূতি। আস্তে আস্তে বদলে যায় তা। এখানেই তাদের থাকার ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়। তারা নিজেদের মতো টিকে থাকার একটা কৌশল রপ্ত করে। নিজেদের মতো নিয়ম তৈরি করে। তারা একুশ জন মিলে যেন এক প্রশাসন বানিয়ে নেয়। সেখানে প্রত্যেকে কিছু কিছু দায়িত্ব কর্তব্য মেনে চলে। তাদের বেশ কিছু কর্মবিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল খাদ্য বিভাগ। প্রতি সন্ধ্যায় প্রত্যেকে সাত টাকা করে চাঁদা দেয়। অতপর কেউ বাজারে যায়, কেউ চুলা তৈরি করে, কেউ হাড়ি-পাতিল সাজায়, কেউ জ্বালানি ও পানির ব্যবস্থা করে। বাজার থেকে চাল ডাল আসে, সাথে তরিতরকারি। সাথে মাছ, কখনও ফার্মের মুরগী। এরপর খাবার রান্নায় চড়ে। রান্নার টগবগ শব্দে, তাদের বুকের ছাতি উঠানামা করে। শ্বাস-প্রশ্বাস বাড়ে। নিজেদের মধ্যে আস্তে আস্তে কথাবার্তা কমতে থাকে। শব্দ কমতে কমতে ফিসফাস হয়। একসময় কানাকানি। আরও পরে চোখের চাহনি বিনিময়, সে-সাথে মুখাবয়বের আভা।
রান্না শেষে সবাই গোল হয়ে বসে। তাদের সামনে বাসন, সান্কি, বোল: যার যেমন যা আছে। মাঝখানে খাদ্যের ডেকচি। যার যার মতো নিয়ে আসনে গিয়ে বসে। একে একে সবাই। অতপর নীরবে খাদ্য গ্রহণ। অথচ শব্দ ঠিকই হয়। চ দিয়ে তৈরী বিভিন্ন রকম শব্দ। আলোময় রাত, সোডিয়াম লাইটের হলুদ, শূন্যতায় কালচে অন্ধকার_ সব কিছু তখন জমাট, চুপ চুপ। ওরা খায়, প্রতি নলা তুলে সুখের ঢেকুর তোলে। আস্তে আস্তে খায়, এতে করে তৃপ্তির স্থায়িত্ব বাড়ে। খাবার শেষে ওরা পরস্পরের দিকে তাকায়, এত সুখ এক সাথে দেখে ভিড়মি খায়, অতপর স্বাভাবিক হয়, মৃদু হাসে। গুন গুন গান করে, গুঞ্জন তৈরী হয়।
ওদের কেউ কেউ এখানে থাকতে শুরু করে। পলিথিন দিয়ে ছই-ঘর বানায়। সে-ঘরে থাকতে ওদের অনেক আনন্দ হয়। নিজের ঘর, যেন নিজের বাড়ি। দিনে দিনে থাকাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ওভার ব্রিজ ছেড়ে ওদের নয়া ঠিকানা হয়। নিজেদের মতো ঘরদোর সাজিয়ে নেয়। পাশেই একটি কৃত্রিম ডোবা রয়েছে। এখান থেকে মাটি কেটে ট্রাক অন্যখানে ভরাট করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেখানে ওরা দলবদ্ধভাবে গোসল করে, তবে সবসময় সম্ভব হয় না, শুক্রবারে তারা একসাথে গোসল-উৎসব করে।
দূর থেকে তাদের কার্যকলাপ দেখে কারও চকিত কোতুহল জাগলেও, বেপরোয়া আগ্রহ নেই। কখনও হয়তো রাস্তায় কেউ থমকে দাঁড়িয়ে তাদের লম্ফঝম্ফ দেখে, রান্না-বান্না দেখে, তারপর যে যার পথে। আর তাদের নিকটে পৌছাও কঠিন, রাস্তার সঙ্গী হয়ে সমান্তরাল একটি খাল বয়ে গেছে। তাই ওদের কাছে পৌছতে ঘূর্ণিপথ ধরতে হয়, যা সময় খায় অনেক। তাই নিরপদ্রব তাদের দিন-যাপন।
শীঘ্রই ওদের সাথে এক লোকের দেখা হয়, বয়স প্রায় চলি্লশ, চেহারা বাবা টাইপের। গাড়ি নিয়ে আসে, বেশীর ভাগ সময় সাথে জনা তিন চারেক যুবক, সুবেশধারী, ফিটফাট। কাছেই ওনার প্লট। টিন সেড দালান বানাচ্ছেন। তদারকিতে আসেন। আর ওদের প্রতি কৌতুহলী হোন। মাঝে মাঝে ওদের সাথে গল্প করেন। তাদের পরিবারের কথা জানতে চায়। ইদানিং সাথে করে চকলেট চুয়িংগাম নিয়ে আসেন। এভাবে লোকটার সাথে তাদের সম্পর্ক গাঢ় হয়। লোকটার প্রতি আস্থা জাগে। লোকটা আপন হয়। লোকটা দীর্ঘ দিন না আসলে, তারা তার অভাব বোধ করে। লোকটা কয়েকবার তাদের সান্ধ্য-ভোজে অংশ নেয়।
এরই মধ্যে টিনসেড দালান তৈরী সম্পন্ন হয়। এবং তারা সবাই আশ্রয় পায় সেখানে। এই যেন তাদের রাজপ্রাসাদ। তারা হৈ-হুল্লোর করলো। ঘরে প্রবেশের দিন, লোকটা-ই খাবারের ব্যবস্থা করে। একটা ছাগল জবাই করা হয়। ঘর ও খাবার পেয়ে তারা উৎফুল্ল। লোকটার বাবাসুলভ আদর, তার প্রতি তাদের বাধ্যগত করে। তারা তার আদেশ নিষেধ উপদেশ মেনে চলে। এবং সাধ্যমতো কিছু করার চেষ্টা করে। ঘরের সামনে তারা ফুলের বাগান করেছে, আর চারিদিকে গাছ লাগিয়েছে। বাড়িঘর তারা পরিচ্ছন্ন্ রাখে। জোছনা রাতে, আঙ্গিনায়, তারা ফুলের জলসায় বসে, আকাশ দেখে। ফুটি ফুটি নত্র তাদের মোহিত করে। চাঁদের আলোর মুগ্ধতায় মন হয় ওড়ো ওড়ো। নেশার জগতের বাসিন্দা যেন তারা। দূর থেকে ওভার ব্রিজের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বহু পরনো স্মৃতি ফিরে আসে। তাদের টানে। কেউ কেউ সে-ই টানে সাড়া দেয়। যেন নির্জন প্রান্তরে, পরিত্যক্ত ব্রিজ, চাঁদের আলোয় কয়েকটা ছায়া সে-দিকে এগিয়ে যায়। বাকীরা কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে, ঘরে বাইরে। এমনই তাদের ইদানিংকার জীবন। তবে সপ্তাহে একদিন তারা ঠিকই রান্না উৎসব করে, তাদের সেই আগের নিয়মে, আগের জায়গায়।
ইদানিং লোকটার সাথের সুবেশধারীরা তাদের দেখভাল শুরু করেছে। এতে করে তারা ধীরে ধীরে একটা বৃত্তে সীমাবদ্ধ হতে থাকে। কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয়। লোকগুলোর কণ্ঠও কঠিন হতে থাকে। গাড়িঅলা লোকটা মাঝে মাঝে আসে, সাথে চকলেট চুয়িংগাম আর হাসিমাখা ভরসার কথা। এতে তারা সবাই উৎফুল্ল হয়। ধেই ধেই করে নাচে। লোকটা একদিন একজন ডাক্তার নিয়ে আসে। ডাক্তার তাদের টেপাটেপি করে, সবার রক্ত পরীা করে। খাতায় ওদের শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে গচ্ গচ্ করে কি যেন লিখে। কয়েকদিন পর পরই ডাক্তার আসতে থাকেন, খাতা দেখে দেখে ওদের নাম ধরে ডাকেন, ঔষধ পত্তর দেন। এই সব ওদের ভালই লাগে। ঔষধ-পত্তর হাতে পেলে আরও ভাল লাগে। খুব তৃপ্তি নিয়ে ওরা ঔষধ খায়, তারপর দীর্ঘশ্বাস তুলে কিছুণ গম্ভীর হয়ে থাকে, এতে করে অসুখ-অসুখ একটা ভাব আসে, এতে খুব আনন্দ হয়।
ওদের এই আনন্দের মাঝে হঠাৎ শোক আচড় কাটে। ওদের এক সঙ্গী উদাও হয়ে যায়। একদিন, দু'দিন, তিনদিন..., ফিরে আসে না। সাথীর নিখোজ হওয়া, বেদনা দেয়। অভিমানও হয়, এভাবে না বলে চলে যাওয়ায়। ওরা আস্তে আস্তে এই ঘটনা বিস্মৃত হয়। ছোট্ট এই জীবনেই শিখেছে, অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। জোছনা রাতে সবাই সবাই যখন ঘেষো জমিতে গোল হয়ে বসে, স্বপের জগতে চলে যায়, তখন অনেক মনে ত আলোয় মুছে যায়।
কিন্তুু মনের ত বাড়তেই থাকে। তাদের আরও একজন হারিয়ে যায়। অনেক খুঁজেও পায়নি। ভগ্নহৃদয়ে তারা ঘেষো জমিতে লেপ্তে বসে। কারও মুখে শব্দ নেই। আকাশে বিশাল চাঁদ, আলোর দু্যতি ছড়িয়ে দিচ্ছে। আলোর নিচে চাপা পড়ে থাকে, কতগুলো হৃদয়ের কষ্ট।
তাদের স্বাধীনতার বৃত্ত দিন দিন ছোট হয়ে আসে। তাদের আশ্রয়দাতার সদা হাস্যময় মুখাবয়বের আড়ালে অনিষ্টকর পর্দার দৃশ্যমানতা তারা দেখতে পায়। এবং আশ্রয়দাতাকে ঘিরে থাকা লোকগুলো কেমন রহস্যময়, তাদের চোখ রক্তাভ, যেন রক্তচোষা। তাদের শীতল কথামালায় শাসন ও শোষনের তেজ লেপ্টে থাকে। ওরা তাদের থাবার নিচে মিইয়ে থাকে। তারা এদের আশ্রয় দিয়েছে, মাঝে মাঝে খেতে দেয়। চালার নিচে ঘুমাবার অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন আর ব্রিজের ওপর, খোলা আকাশের নিচে ঘুমাবার স্বাদ হয় না।
ইদানিং মাঝে মাঝে রাতের খাবার শেষে, তারা গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে। আকাশের তারা দেখা হয় না। জোছনার আলোয় গোসল হয় না। হয় না গলা-ছেড়া গান। গভীর ঘুমে, স্বপ্ন না দেখা ঘুমে ডুবে যায়। যখন ভাঙে ঘুম, মাথা ভো ভো, আর সূর্যের তেজ ধাঁ ধাঁ করে। শরীর নড়াচড়ায় ব্যথা হয়। স্থির হয়ে থাকে। দূর্বলতা ঝেঁকে ধরে। সে-সাথে ভয়। চোখের মনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চারদিকে দেখে নেয়। দেখে আরও কিছু নিথর মানুষ, তারা তখন চোখের ভাষায় কথা বলে। অনেক কষ্টে ওঠে বসে। স্বভাববশতঃ বাহুতে চোখ বুলায়, দেখে লাল ঘা, পুরনোর পাশে নতুন ঘা, পাশাপাশি অনেকগুলো। আস্তে আস্তে হাত বুলায়।
ইতোমধ্যে তারা আরও একজন সঙ্গী হারায়। এইবার কেউ আর তাকে খুঁজতে যায়নি। ওরা যন্ত্রের মতো গোল হয়ে বসে ছিল। আর নিজেদের গুনছিল। নতুন নতুন মুখ যোগ হয়েছে। পুরাতন কিছু মুখ নাই হয়ে গেছে। তাদের ঘরের মধ্যে নতুন ছোট্ট একটি ঘর তৈরী হয়েছে। সেখানে প্রবেশ নিষেধ। শুধুমাত্র যখন ডাকে, তখন অবশ্যই যেতে হয়। সে-ই ছোট্ট ঘরে, একেবারে একজন প্রবেশাধিকার পায়। বাইরে থেকে তখন শোনা যায়, চিৎকার, গোঙানি... অতপর হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া। এখন আর তাদের ঘুম পাড়ানো হয় না। বাহুতে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে, নল দিয়ে রক্ত টেনে নেয়া হয়। ব্যাগ ভর্তি রক্ত নিয়ে, গাড়িটা যখন ভো করে চলে যায়, মনে হয় তাদের দেহেরই একটি অংশ দৌড়ে বাইরে চলে গেল। এমনি করে তাদের অনেক কিছুই হারিয়ে যেতে লাগল। কারও চোখ, কারও কিডনি। কিডনি ব্যাপারটা কী, তাদের বুঝতে সময় লেগেছে। ছোট্ট ঘরে ঢুকিয়ে অচেতন করে রাখা হত। কি ঘটত বুঝত না। যখন চেতন ফিরত, উপলব্ধি করতো তলপেটে প্রচণ্ড ব্যাথা, আর সেলাই করা। পেট চিরে যে কী বের করে নিয়েছে, তা বুঝতে পারতো না। তলপেটে মাঝে মধ্যেই ব্যাথা মোচড় কাটত। আর তখন মনে হত, কি যেন নেই। পরে জেনেছে, মূলতঃ লোকগুলোর মুখে মুখে শুনে, হারানো জিনিষটার নাম কিডনি। এমনি করে, এটা-সেটা হারাতে হারাতে পুরো দেহটাই হঠাৎ করে হাওয়া হয়ে যায়।
একদিন ওরা, কতিপয় শিশু-কিশোর সন্ধ্যার পর ঘরে ফেরে না। ওভারব্রিজের ওপর থায় দাঁড়িয়ে থাকে। দেখে দ্রুতগামী গাড়ির আসা যাওয়া। সোডিয়াম লাইটের নিচে, মানুষের আবছা চলা-ফেরা, যেন ভুতুরে গতর। এইসবে তাদের ভয় হয়। সিঁড়ির গোড়ায় একচু এক বালক, পাশে বিকলাঙ্গ এক কিশোর। কেমন যেন চেনা চেনা, ওরা এগিয়ে আসে, মুখামুখি হয়। হঁ্যা, তারাই, যারা হারিয়ে গিয়েছিল, পাশে আরেকজন, লিকলিকে ভাঙা শরীর, কি যেন বলতে চায়, পারে না। ওরা তাকেও চিনতে পারে। ওরা কেউ কথা বলতে পারে না, ওদের ঠোঁট নড়ে, চোখ পিল পিল করে, শরীর কাঁপে। অতপর শীতল এক বাতাসের ঝাপটা শরীরে আছড়ে পড়ে। সে-সাথে ভয়ে গুটিয়ে আসে শরীর। দেঁৗড়ে কোথায়ও পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে যেন এখানে থাকলেই কালো একটা থাবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খুবলে খাবে। অথচ পালাতে পারে না, দেহে যেন শিকড় গজিয়েছে, নড়তে পারে না। কয়েকজন পথচারি রাস্তা আগলে রাখার দায়ে ওদের গালমন্দ করে গেল। কেউ কেউ তাদের ধাক্কিয়ে গেল। অতপর কয়েকজন খাকিপোশাকে এসে পটাপট লাঠি চালালো। ওরা তখন সচল হল, ধীর স্থিরভাবে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল, অতপর হাঁটতে লাগল।
কিছুণ হাঁটার পর তারা থমকে দাঁড়ায়, সামনে রেলস্টেশন। সেখানে তাদের মতো আরও কয়েকজন, সবাই মিশে যাওয়ার জন্য একত্রিত হল। পেছনে আরো কান্নার শব্দ শুনতে পেল। তারা দু'হাতের তালুতে কান চেপে ধরে।


সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গুপ্তদের সকল অপকর্মের তদন্ত হোক....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:৪৮


সময় যত যাচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে অস্বস্তিকর সত্য!
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে- আর অতীতের অনেক ঘটনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য ও তথ্য সামনে আসছে-
যেখানে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী... ...বাকিটুকু পড়ুন

হযরত ইব্রাহীমের (আ.) কুরাইশ আহলে বাইতের মধ্যে হযরত আলীর (রা.) মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের সময় সবচেয়ে কম

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৫৯



সূরাঃ ২ বাকারা, ১২৪ নং আয়াতের অনুবাদ-
১২৪। আর যখন তোমার প্রতিপালক ইব্রাহীমকে কয়েকটি বাক্য (কালিমাত) দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন, পরে সে তা পূর্ণ করেছিল; তিনি বললেন নিশ্চয়ই আমি তোমাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষকের মর্যাদা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:২৩


কবিতাটার কথা কি মনে আছে? বাদশাহ আলমগীর একদা প্রভাতে গিয়ে দেখলেন, শাহজাদা এক পাত্র হাতে নিয়ে শিক্ষকের চরণে পানি ঢালছে, আর শিক্ষক নিজ হাতে নিজের পায়ের ধূলি মুছে সাফ... ...বাকিটুকু পড়ুন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:০৯

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে গত এক দশকে ব্যাপক উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অদৃশ্য ছায়া: সমুদ্রের সাক্ষী

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬



ঢাকার বনানীর সেই ক্যাফেতে বৃষ্টির শব্দ এখন আরও তীব্র। আরিয়ান তার কফির মগে আঙুল বোলাচ্ছিল, তার চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ। সাঈদের দিকে তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলতে শুরু করল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×