কেউ কেউ টর্নেডোর মতো। চোখের পলকে সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ভ্রুপেও করে না তার সৃষ্টি কিংবা ধ্বংসের প্রতি। আবার কেউ কেউ পাথরের মতো। যুগ যুগ ধরে সন্ন্যাস-মুগ্ধ হয়ে বসে থাকে, কোনো কিছু বলতে বা বুঝতে তার সময় বয়ে যায়। যখন সে কিছু করতে চায় তখন সে ছিটকে পড়ে বিযুক্ত হয় অতল গহ্বরে। কেউ কেউ সাগরের মতো। বিশাল বুকে বিছানা পেতে বসে থাকে, সবাইকে আশ্রয় দিয়ে তার সুখ। সে নিজে কারো কাছে যায় না। সবাইকে আবিষ্ট করে। কেউ কেউ ফলভরা বুরে মতো, তৈরি হয়ে নুয়ে থাকে, কাউকে দু'একটা ফল খাইয়ে সে কৃতার্থ বোধ করে।
তুমি টর্নেডোর মতো, আমি তোমাকে টর্নেডো বলবো। ইচ্ছা করলে তোমাকে ঝর্ণা কিংবা পাহাড়ের কোনো নদীর সাথে তুলনা করতে পারতাম। কিন্তু তা কেন করলাম না ? অতটা মেয়েলি উপমা তোমাকে মানায় না, যতই চঞ্চল হও না কেন, তুমিতো পুরুষ। তাই তোমাকে আমি...
এবার তুমি ভিসুভিয়াস হও। নয় হও ধুমকেতু। বর্ষার বিদু্যৎও হতে পার, তবে সেটা বড় ণস্থায়ী।
আর আমি? আমি কি বা কে? আমি কেউ না। আমাকে সম্বোধন করার মতো কোনো নাম বা সংজ্ঞা এখনও উদ্ভাবন করা হয়নি। এখনো কেউ আমাকে একটা নাম দিতে পারল না। এমনকি তুমিও না।
আগে আমার অনেক কিছু হতে ইচ্ছে করত। এখন অত কিছু হতে আর ইচ্ছে করে না। এখন আমি শুধু একটা কিছু হতে চাই, তা হল, এখন আমি টুনটুনি হতে চাই। খুব ুদ্র ুদ্র চাওয়া তাই না। খুব তুচ্ছ বটে, কি বল। তবুও আমি তা-ই হব।
খুব ভোরে তোমার জানালার পাশে ছোট্ট শিউলি গাছটার ডালে গিয়ে বসব, ফর ফর করে এ ডালে থেকে ও ডালে যাব। চিরিৎচিরিৎ করে তোমাকে ডাকবো। তুমি হয়তো ঘুম ভাঙ্গার বিরক্তিতে খুব েেপ যাবে। ঢিল মেরে টুনটুনিকে তাড়িয়ে দিবে। আমি এক সমুদ্র কষ্ট নিয়ে উড়ে যাব। সারাদিন ছাদের কার্ণিসে কাঁটাঝোপ কিংবা তারখাম্বাায় মুখ বার করে বসে থাকব। কিন্তু সকাল হলে সব কিছু ভুলে যাব। মান-অভিমান ভুলে আবার যাব তোমার ঘুম ভাঙাতে। সব দিন তো আর তুমি খারাপ ব্যবহার করবে না। কোনো রাতে হয়তো তুমি তোমার প্রিয় নারীর কথা ভেবে জেগে থাকবে। মনটা বেশ একটু বিরহ আর মিলনের মাঝামাঝি অবস্থায় থাকবে, সেদিন শিউলি ডালের টুনটুনিকে তোমার হয়তো ভালো লাগতেও পারে, ওকে দেখলে মন ফুরফুরে হয়ে উঠবে, গ্যাসে ভরা হালকা বেলুনের মতো। তুমি সেদিন মনের আনন্দে তোমার ঘরে লাল মেঝেতে দু'চারটি খুদ ছিটিয়ে দেবে। আমি পুচ্ছ নেড়ে ডানা ঝাপটিয়ে সারা ঘরময় ছুটাছুটি করবো আর খুদ খাবো। তুমি ভাববে, আহা! বেচারি টুনটুনি! কতদিন ধরে ওর পেটে দানাপানি পড়ে না।
তোমার সারা ঘরে আমার বুকের দামি শিশি থেকে ভালোবাসার পারফিউম ছিটাবো। ঐ পারফিউম কোনো দোকানে বিক্রি হয় না। টাকা পয়সা দিয়েও তা কেনা যায় না।
আমি ভালোবাসা দেবো, নেবো না। তোমার প্রেম-ভালোবাসা অন্য কারো জন্য তুলে রেখো। প্রয়োজন মতো যাকে খুশি বিলিয়ে দিও। আমাকে নয়। তুচ্ছ পাখিটার জন্য খুব বেশি মায়া হলে তোমার ঘরের ঘুলঘুলিতে খড়কুটো দিয়ে একটা বাসা বাঁধার সুবন্দোবস্ত করে দিতে পার। কিন্তু নিশ্চিত থেকো তোমার ঘুলঘুলিতে আমি কখনো সংসার বাঁধব না। ইচ্ছা হলে ভালবাসা নিও, বিনিময় চাই না। যদি দুঃখ দাও-তাই নেবো।
দুঃখের কোনো প্রতিদান দেবো না। দুঃখগুলো যদি খুব বেশি ভারি হয়ে যায়, আমার ুদ্র বুকে আর না অাঁটে, তবে দূরে উড়ে যাব।
বসন্ত নয়, আমি যাব শীতের দেশে। বরফ কুচির উপর বসে থাকবো জড়োসরো হয়ে। হাঁটব না, খেলবা, লাফাব না, কথা বলব না। কেবল স্বপ্ন দেখবো আর স্মৃতি গুণব। এমনি করে একদিন মরে যাব।
আমার ছোট্ট ছোট্ট পালকগুলো এদিক ওদিক উড়ে বেড়াবে। দু'একটা হয়তো তোমার কাছেও উড়ে যেতে পারে। ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে তুমি তোমার জানালার কাছ থেকে সে পালক তুলে নিবে, হয়তো অবাক হয়ে ভাববে, এটা এল কোত্থেকে! তুমি কি আমাকে চিনবে? না চেন তি নেই। তবে একটা অনুরোধ রেখো- হে আমার গোপন ভালবাসা, তুমি একটা নাম দিও... মোলায়েম মনোরম, ঝুরঝুর, ফুরফুর, অসাধারণ, অমূল্য। নাহ্, আমার জন্য নয়। একটা পাখির পালকের জন্যে একটা সুন্দর নাম তুমি দিও।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


