somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হোমোসেপিয়ান্সঃ তাদের তথ্যভাণ্ডার ও আচরণের উৎস এবং সমাজিক বিন্যাস

১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ সকাল ৯:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছবিঃ সংগ্রহীত
হোমোসেপিয়ান্স তথা মানুষ একটি উন্নত প্রাণী বিশেষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মতই তার কিছু প্রবৃত্তি রয়েছে যার দ্বারা তার মৌলিক আচরণ নির্ধারিত হয়। জীনগত ও শরীরবৃত্তীয় তাড়না তাকে সব সময় পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল থাকতে বাধ্য করে। শরীরবৃত্তীয় কিছু সেন্সর তাকে পরিবেশের তথ্য যোগান দেয় এবং সেই অনুযায়ী তার আচরণ চালিত হয়। এই তথ্যগুলো তার মস্তিষ্কের স্মৃতি ভাণ্ডারে জমা হতে থাকে, অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে। পরবর্তিকালীন আচরণ তার এই অভিজ্ঞতার আলোকে যাচাই হয়ে তার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। এই আচরণগুলো হলো ব্যক্তি কেন্দ্রিক। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক আচরণ মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।

জিনগত ভাবে মানুষ সামাজিক জীব। জীনগত ভাবেই তার রয়েছে মাতৃস্নেহ, পিতৃ-স্নেহ। সামাজিকভাবে সে একটা টেরিটরিতে থাকতে পছন্দ করে। তার সমাজের হায়ারিকিকে সে মেনে নেয়। ব্যক্তিগত ভাবে সে আলফা পুরুষ বা নারী হতে চায়। কিন্তু যদি না পারে তাহলে আলফা পুরুষ বা নারীর বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। জীবন ধারণ ও বংশ বৃদ্ধির জন্য সে জীনগত সামাজিক আচরণের অধীনে থাকে। মানুষ ভাষা ও সংস্কৃতির জগতে প্রবেশের পূর্বে এই প্রাকৃতিক নিয়মের দ্বারাই চালিত হত।

বিবর্তনের ধারায় মানুষের মস্তিষ্ক উন্নত হতে থাকলে মানুষ ভাষা ও সাংস্কৃতিক জগতে প্রবেশ করে। সামাজিক জীব ও উন্নত মস্তিষ্কের কারণে শিকার করার জন্য, জঙ্গলের খাবার সংগ্রহের জন্য, টেরিটরি রক্ষা করার জন্য পারস্পরিক যোগাযোগের তাগিদ থেকে ভাষার উন্নতি ঘটে।
ব্যক্তিগত স্মৃতি ভাণ্ডার তখন সামাজিক স্মৃতি ভাণ্ডার থেকেও তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে এবং তার আচরণ এই দুইয়ের প্রভাব দ্বারা চালিত হয়। লোকগাথা, গল্প, গান, নাচ, চিত্র, কারুশিল্প ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক তথ্য ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হতে থাকে। হায়ারিকি, বংশ বিস্তার ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক আচরণের সাথে আরও কিছু নিয়ম কানুন যোগ হয় যা ব্যক্তি আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহৃত হয়। মানুষের আচরণ প্রাকৃতিক নিয়ম কানুনের পাশাপাশি সামাজিক নিয়ম কানুন দ্বারাও পরিচালিত হতে থাকে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে প্রাকৃতিক নিয়মের ভিত্তির উপরেই সামাজিক নিয়ম গড়ে উঠে।

ব্যক্তি মানুষের মস্তিষ্কে সঞ্চিত তথ্য ভাণ্ডার তার আগ্রহের উপর নির্ভর করে নিজ পরিবার, নিজ টেরিটরি, ভৌগলিক, আন্তর্জাতিক সামাজিক তথ্য ভাণ্ডার দ্বারা সমৃদ্ধ থাকে। সেখান থেকে নিজ মস্তিষ্কের যাচাই বাছাই ক্রিয়ার পর নিজস্ব একটি ধারণা তৈরি হয়, যার দ্বারা তার প্রতিক্রিয়া বা আচরণ পরিচালিত হয়।

সামাজিক তথ্য ভাণ্ডার টেরিটরি, অঞ্চল, ভৌগলিক অবস্থান ভেদে ভিন্ন হয়। সময় ও অবস্থান পরিবর্তনের কারণে তথ্য ভাণ্ডারেও পরিবর্তন ঘটে। আবার যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে তথ্য ভাণ্ডারের অনেক কিছুর আদান প্রদান ঘটে। যুগ যুগ ধরে এই তথ্য ভাণ্ডারের বিকাশ হচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, কবি, লেখক, গায়ক, দার্শনিক, সাধু, বাউল, সাধক, বুদ্ধিজীবী, ধর্মীয় প্রচারক ইত্যাদি উৎস থেকে এই বিকাশ ক্রম বিকাশমান। তবে সকল টেরিটরিতে এই বিকাশ সমান নয়। আবার নিজ টেরিটরির স্বার্থ অনুযায়ী, গ্রহণ বর্জনও বিভিন্ন হয়। টেরিটরির প্রতি একাত্মতা মানুষের জীনগত বৈশিষ্ট্য। ফলে অঞ্চল, জাতি, বর্ণ অনুযায়ী সামাজিক তথ্য ভাণ্ডারের গ্রহণ বর্জন চলতে থাকে। অঞ্চল ভেদে গড়ে উঠে বিভিন্ন মতামত।

'ভয়' জীনগত প্রতিক্রিয়া। আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে যায়, এটা মানুষের অভিজ্ঞতা লব্ধ তথ্য। জঙ্গলে আগুন লাগলে সবাই পালিয়ে যায় এটা জীনগত তাড়না। আবার পুড়ে যাওয়া মাংস বেশি সুস্বাদু এটাও তার অভিজ্ঞতা লব্ধ তথ্য। এই তথ্যগুলো বস্তুগত। সকল টেরিটরিতেই এই তথ্যগুলো গ্রহণযোগ্য। আকাশের বিদ্যুৎ প্রচণ্ড শব্দ করে ও আলোর ঝলসানিতে ভয় পাইয়ে দেয়। কখনো কখনো এই বিদ্যুৎ গাছ পালা পুড়িয়ে দেয়। মানুষ বা পশু পাখী নিহত হয়। এগুলো বস্তুগত তথ্য। কিন্তু বিদ্যুতের ভয়ংকরতা দেখে বিভিন্ন কমিউনিটিতে গল্পকারে বিভিন্ন ব্যাখ্যা, কাহিনীর প্রচলন ঘটে। সমাজে প্রচলিত এই সমস্ত কাহিনী ভাবগত সামাজিক তথ্য। এর উপর ভর করে বিভিন্ন টেরিটরিতে বিভিন্ন মতবাদ, সংস্কৃতি, রিচুয়াল তৈরি হয়। ভাবগত তথ্যের উপর ভিত্তি করে এই যে মতামতের ভিন্নতা সৃষ্টি হয় এইগুলো টেরিটরির মধ্যে অনৈক্য তৈরি করে। সামাজিক তথ্য ভাণ্ডারে রয়েছে বস্তুগত ও ভাবগত তথ্যের সংমিশ্রণ।

সামাজিক তথ্যভাণ্ডারে নারী, পুরুষ ও শিশু কিশোরদের ভিন্ন ভিন্ন তথ্য রয়েছে। আদিম সমাজে জীবন পদ্ধতি যখন খাবার সংগ্রহ, শিকার বা পশু চারণের উপর নির্ভরশীল ছিল। শিকারের উদ্দেশ্যে আদিম মানুষেরা যখন শিকারের পিছু পিছু ছুটে যেত তখন স্বভাবতই নারী ও শিশু ও বৃদ্ধরা পিছিয়ে পড়ত। তখন তারা পিছনেই কোন নিরাপদ স্থানে অপেক্ষা করত, তাদের পাহারায় থেকে যেত কিছু সক্ষম পুরুষ। সেখানে নারীরা পাতা লতা দিয়ে আশ্রয় তৈরি করত, শিশু বৃদ্ধ অসুস্থদের দেখ ভাল ও খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করত। বস্তুগত কারণেই এইভাবে প্রাথমিক শ্রম বিভাজন তৈরি হয়। কিন্তু একটা সময়ে সমাজ এটাকে নিয়মে পরিণত করে ফেলে। কেউ যদি এই নিয়মের অন্যথা করে ফেলে তবে তাকে ভাল চোখে দেখা হয় না। ব্যক্তিগত তথ্যভাণ্ডারেও এটা এমন ভাবে বসে যায় যে নারীরা ভাবে এটাই নারীর কাজ এবং পুরুষেরা ভাবে এটা পুরুষের।
এভাবে বস্তুগত কারণ থেকে শুরু হলেও সমাজ এটাকে ভাবগত কারণে পরিণত করে। কারণ নারীরা শিকারেও যেতে পারে এবং পুরুষেরা সন্তান পালনও করতে পারে কিন্তু ভাবগত সামাজিক তথ্য এই স্বাধীনতা দেয় না।

কৃষিজীবী ও পশুপালন সমাজে শিকারের পিছনে দৌড়াতে হয় না। তাই সেখানে দেখা যায় নারী পুরুষ উভয়েই সকল ধরণের কাজই করছে। শ্রম বিভাজন সেখানে এতটা প্রকট নয়। কিন্তু পূর্বের সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী অনেক সমাজেই পুরুষেরা আশ্রয়স্থলে অলস পাহারায় বসে আছে বা শিশুদের কিছুটা দেখাশোনা করছে আর নারীরা চাষবাস, পশু পালন ও ঘর গৃহস্থালির সকল কাজই করছে। সামাজিক তথ্যভাণ্ডার থেকে পাওয়া নিয়মকেই তারা বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছে। কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নের পর সারা বছরের খাবার মজুদে রাখা সম্ভব হয়। কৃষি ভূমি বেদখল হওয়ার ভয় থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়নের প্রয়োজন পড়ে। পুরুষেরা যুদ্ধ কলা কৌশল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের উপর অধিক মনোযোগ দিতে থাকে। কৃষি ফসলের যথেষ্ট উৎপাদনের ফলে সামাজিক ভাবে তারা কৃষি কাজ না করেও ফসলের একটা অংশ ভোগ করতে পারে। এক সময় এই যোদ্ধারা অন্য টেরিটরির কৃষি ভূমি দখল করে নেয় এবং সেই ভূমির মালিকানা দাবী করে। পরাজিত কল্যাণদের সেই ভূমি থেকে উৎপাদিত ফসলের একটি অংশ খাজনা হিসেবে সংগ্রহ করতে বাধ্য করে। নিজেদের সুরক্ষার জন্য তারা পৃথক আবাস স্থল তৈরি করে। এইভাবে উদ্ভব ঘটে ভূমি মালিক শ্রেণীর এবং ভূমি দাসদের। মালিকানা সুরক্ষিত করার জন্য এর যৌক্তিকতা সম্বলিত নতুন সামাজিক তথ্য ও নিয়ম কানুন প্রবর্তন করে। এভাবে সমাজে উৎপাদনের উপায়ের উপর মালিকানার ভিত্তিতে শ্রেণী বৈষম্যের উদ্ভব ঘটে। সামাজিক তথ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ এই সময় থেকেই শুরু হয়। সামাজিক তথ্যের উৎস বস্তুগত উৎসের বাইরে ভাবগত উৎসকে জোরদার করতে থাকে। ভূমি দাসেরা ক্রমশ এই ভাবগত তথ্যকেই সত্য বলে মানতে থাকে এবং তাদের সামাজিক আচরণ সেইভাবেই পরিচালিত হয়।

পশু চারণ সমাজে ভূমির ব্যক্তি মালিকানার ধারণা ছিল না। এরা ছিল যাযাবর। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, মঙ্গোলিয়া ও ভারতে এখনো এদের দেখা মিলে। ঘাসের পিছু পিছু এরা অনবরত অবস্থান বদলাতে থাকে। কিন্তু কৃষিজীবী সমাজে ভূমির ব্যক্তি মালিকানার ধারণা সামাজিক তথ্যে পাকাপাকি হয়ে যায়। প্রাচীর দিয়ে ঘেরা দুর্গ নগরে আলফা পুরুষ ও তাদের সঙ্গী আলফা মহিলাদের নিয়ে গড়ে উঠে এলিট সমাজ। নগরের বাইরে গ্রামীণ সমাজ হল তাদের খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্যের যোগান দাতা। এখানে থাকে সেবা দাসেরা। একই সামাজিক টেরিটরিতে সমাজ দুই ভাগ হয়ে পরে। সমাজের প্রভুরা সকল সম্পদের মালিক, তারা বাস করে সুরক্ষিত নগরে। অন্যদিকে যারা সম্পদ হারা তারা বাস করে নগর প্রাচীরের বাইরে গ্রামীণ সমাজে। নগর থেকে হয়েছে শহর। প্রভু তথা এলিট শ্রেণীর নগর ব্যবস্থা, ভোগবিলাস ও গ্রামাঞ্চলকে শোষণ, নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণির। বিভিন্ন ধরণের কারিগর, সাধারণ সিপাহী, পরিচ্ছন্ন কর্মী, ছুতার, কোচ, মালামাল সরবরাহকারী, ব্যবসায়ী ইত্যাদিদের নিয়ে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠে। গড়ে উঠে বাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক দফতর, আদালত, কাচারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিনোদন প্রতিষ্ঠান, সরাইখানা এবং এর সাথে যুক্ত কর্মচারী বাহিনী। এই বিরাট সংখ্যক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর খাবার ও রসদের যোগানদারও শহরের বাইরের সুবিধা বঞ্চিত গ্রামীণ সমাজ। গ্রাম, হাট , বাজার ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে শহর নগরের উন্নয়ন ও বেতনাদি পরিশোধ করা হয়। রাজসভা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষালয়, মক্তবে নিয়োগ করা হয় কবি, গায়ক, সাহিত্যিক, পণ্ডিত, ধর্মগুরুদের যারা প্রতিনিয়ত ক্ষমতা কাঠামোর যৌক্তিকতা প্রচার করতে থাকে। এভাবে সামাজিক তথ্য ভাণ্ডারে শ্রম বিভাজন, শ্রেণী, তাদের মধ্যেকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের রূপরেখা সঞ্চিত হয়।

প্রভু দাসের সম্পর্ক যে স্বাভাবিক নিয়মের অধীন এবং ঈশ্বর প্রদত্ত এই প্রচারণা চালানোর জন্য তৈরি করা হয় বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। সামাজিক তথ্য ভাণ্ডারও দুই ভাগ হয়ে পরে এবং সব কিছুই এই ব্যবস্থাকে স্থায়ী রাখার জন্য। এই সমস্ত প্রচারণা প্রতিষ্ঠান সমাজ প্রভুদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠে। প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন যে নৈতিকতা সকল মানুষকে সামাজিক ও সহযোগিতা মূলক সমাজের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল, সেই নৈতিকতাকে বাতিল করে দিয়ে ঈশ্বর প্রদত্ত নৈতিকতা আমদানি করা হয় যা বৈষম্যকে যৌক্তিকতা প্রদান করে। সামাজিক তথ্যভাণ্ডারে এই ভাবগত নৈতিকতা স্থায়ী হয়ে যায়। মানুষ মনে করে সামাজিক অবস্থান ঈশ্বর প্রদত্ত। একে মেনে নেয়ার মধ্য পুণ্য আছে যা পরজন্মে স্বর্গের প্রতিশ্রুতি দেয়। আর এর বিরোধিতা পাপ ও নরকের পথ। আলফা পুরুষ বা নারীর বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে হায়ারিকি বজায় রাখার যে জীনগত বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যে রয়েছে সেই প্রবৃত্তিই এক্ষেত্রে এলিট শ্রেণীর বশ্যতা মেনে নেয়ার আচরণ তৈরি করেছে।

প্রাণী জগতে ভয় একটি জীনগত বৈশিষ্ট্য। সংবেদনশীল ইন্দ্রিয় দিয়ে সে বাইরের জগতের বিপদ আঁচ করতে পারে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় সে পালিয়ে যায় বা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে ভয়ের উৎস বস্তুগত। ভাষার উন্নতির পর মানুষ পারিপার্শ্বিক সব কিছুকেই সংজ্ঞায়িত করে, ভাষা সামাজিক বিষয়, সামাজিক তথ্যভাণ্ডারে এটা সঞ্চিত থাকে। সকল সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যাও সামাজিক তথ্যভাণ্ডারে জমা থাকে। অজানা ভয় যার বস্তুগত উৎস নির্ধারণ করা যাচ্ছে না, সেটাকেও মানুষ সংজ্ঞায়িত করছে এবং ভাবগত বিভিন্ন ব্যাখ্যা যুক্ত করছে। মানুষের অনিশ্চিত জীবন ও মঙ্গল অমঙ্গলের সাথে এই অজানা শক্তিকে জুড়ে দিয়ে তৈরি করেছে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যাখ্যা, আচার আচরণ। টেরিটরি ভেদে ভিন্নতা থেকেই বিভিন্ন সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছে। এই সংস্কৃতি মেনে চলার মধ্য থেকেই সে নিজ টেরিটরি ও সমাজের সাথে একাত্বতা, নির্ভরতা অনুভব করে। মানুষের মাঝে এই একাত্মবোধের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। ক্ষুধা, আশ্রয়, যৌনতার বস্তুগত চাহিদার তুলনায় এই একাত্মবোধের তাড়নার শক্তি অনেক বেশি। অন্যান্য সামাজিক প্রাণীর মতই মানুষ প্রথমে সমাজবদ্ধ থাকতে চায়। তারপর সমাজ নির্ধারিত পথে তার বস্তুগত চাহিদা মিটায়। বৈষম্যমূলক সমাজে একই টেরিটরিতে বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর মানুষ থাকলেও তাদের পেশা ও শ্রেণীগত স্বার্থের চাইতেও সে যে সংস্কৃতিতে জন্মলাভ করেছে তার প্রতি অধিক নৈকট্য বোধ করে এবং তার আচরণ সে ভাবেই প্রকাশ পায়। মানুষের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বৈষম্যমূলক সমাজে দুই ধরণের সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করে। একটি আলফা এলিট সমাজের সংস্কৃতি আর একটি সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি এবং সেরকম বিরোধ ছাড়াই এরা পাশাপাশি চলতে থাকে।

নগর সভ্যতার উদ্ভবের পর থেকে নগর সংস্কৃতির অনেক বিকশিত হয়েছে, বিকাশ হয়েছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তির। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির বিকাশ উৎপাদন শক্তির বিকাশ ঘটার। পরিবর্তন ঘটে উৎপাদন ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের। কিন্তু গ্রাম থেকে সম্পদ সংগ্রহ করে শহর নগরের উন্নয়ন এক মুখিই থেকে যায়। শহরে বিকাশ লাভ করে বিরাট এক মধ্যবিত্ত শ্রেণী। যাদের শিকর গ্রামে কিন্তু এলিট শ্রেণীতে উত্তরণ এদের স্বপ্ন। শহর হয়ে উঠে অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। মধ্যবিত্ত শ্রেণী শহর ও রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার রক্তধারা হিসেবে কাজ করে। ভাষা সংস্কৃতির একটি বিরাট মাধ্যম। এর মধ্যেই একটি সমাজের সকল সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা সঞ্চিত থাকে। নগরের এলিট শ্রেণী ভাষার একটি রূপকে লিখিত ভাষা হিসেবে পৃথক করে ফেলে। এই লিখিত ভাষার সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যাগুলোকে এলিট শ্রেণীর উপযোগী করে পরিবর্তন করা হয়। এই ভাষাতেই চলে শিক্ষা, সাহিত্য রচনা, প্রশাসনিক কার্যক্রম। আবার ধর্মগুলোও ভিন্ন ভিন্ন ভাষার রূপকে তাদের ধর্মগ্রন্থের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে। এভাবে গ্রামীণ ও আঞ্চলিক ভাষা হয়ে পরে অবহেলিত। এভাবে ভাষার মধ্যমেও একই সমাজের মানুষ দুইটি শ্রেণিতে ভাগ হয়ে যায়। একটা ভাষার লোকজন নিজেদের শাসকের অংশ মনে করে অন্য অংশটি মনে করে তারা জন্মান্তরের জন্য শাসিত শ্রেণী এবং ধর্মের ভাষা বলে এটাই সৃষ্টি কর্তার ইচ্ছা ও এতেই মঙ্গল।

এই সময় এলিট শ্রেণীর শিক্ষা ব্যবস্থা ও তাদের পৃষ্ঠপোষক ধর্ম গুরু ও দার্শনিকেরা 'সত্যের' সন্ধানে নেমে পরে। প্রকৃতি থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় ও সেই অনুযায়ী আচরণকারীদের মানুষের সংজ্ঞা থেকে বাদ দেয়া হয়। সত্য হোল বস্তুগত অভিজ্ঞতার বাইরে অন্যকিছু ভাবগত বিষয়। এই সত্যে উপনীত হওয়ার বিভিন্ন ভাবগত পদ্ধতি আবিষ্কার করা হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় বিভিন্ন চিন্তার পাঠশালা। বস্তুগত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সেই অনুযায়ী শ্রেণী স্বার্থের বাইরে বিভিন্ন পাঠশালার চিন্তা অনুযায়ী একই সমাজের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মতামত ও সংস্কৃতি গড়ে উঠে। বস্তুগত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনুযায়ী শ্রেণী স্বার্থ এখানে গৌণ হয়ে যায়। মানুষ যে সমাজে জন্ম গ্রহণ করে সেই সমাজের তথ্য ভাণ্ডারই তার আচরণের উৎস। একটি ভৌগলিক খণ্ডে বা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জাতি, বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ অনুযায়ী বিভিন্ন সংস্কৃতির লোক বাস করে এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই বিভিন্ন টেরিটরি গড়ে উঠে। শ্রেণী বিভাগ বা শ্রেণী স্বার্থ তাদের এই সামাজিক একাত্বতাকে ভাঙ্গতে পারে না।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ সকাল ৯:৩০
৮টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সমুদ্রের থেকে সুন্দর আর কিছু নেই পৃথিবীতে

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৭



ঢেউয়ের পরে ঢেউয়ে ঢেউয়ে ক্লান্ত কথা,
লোনাজলে রোদ্দুর রঙে মন রাঙে,
ডোবার আগে সূর্য যেমন একটু থামে,
এত পাওয়ার পর ও কেন হৃদয় ভাঙে।

বালির বুকে পায়ের ছাপে অস্থায়ী ঘুম,
পাথরের গায়ে লেগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন সমগ্রঃ পর্ব ২

লিখেছেন গিয়াস উদ্দিন লিটন, ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪



আকবর শেঠ।



'বৈঠকি খুনের জনক' আকবর শেঠ এর জন্ম ১৯৫০ এর দশকে। আকবরের প্রথমদিককার জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়না। আকবর শেঠ প্রথম লাইমলাইটে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ মুজিব হল → ওসমান হাদি হল: নতুন বাংলাদেশের শুরু ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৩


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে দেশের শিক্ষাঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে ডাকসু নেতারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট নাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাত কোটি বাঙালির হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করনি‼️রবিন্দ্র নাথ সঠিক ছিলেন বঙ্গবন্ধু ভুল ছিলেন। বাঙালি আজও অমানুষ!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:১৩


১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের জনগন সহ সমগ্র বিশ্বের প্রতি যে নির্দেশনা। তা এই ভাষণে প্রতিটি ছত্রে ছত্রে রচিত করেছিলেন। ৭ই মার্চের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো ভাষণের নির্দেশনাগুলো! কি অবলীলায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মের শুভেচ্ছা হে রিদ্ধী প্রিয়া

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:০১



জন্মের শুভেচ্ছা নিও হাজার ফুলের
শৌরভে হে রিদ্ধী প্রিয়া, তোমার সময়
কাটুক আনন্দে চির।স্মৃতির সঞ্চয়
তোমার নিখাঁদ থাক সারাটা জীবন।
শোভাতে বিমুগ্ধ আমি তোমার চুলের
যখন ওগুলো দোলে চিত্তাকর্ষ হয়
তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×