
আমরা সকলেই কোন না কোন ভাবে প্রাণ প্রকৃতি বা পরিবেশকে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য বসবাসের অযোগ্য করে তুলছি।। এখন পৃথিবী বিপদ জনক ধ্বংসের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় তিন ডিগ্রি সে: বেড়ে গেছে। দাবানল, বন্যা, ঝড়, খরা, সমুদ্র পৃষ্ঠের পানি বৃদ্ধি এখন আশংকা জনক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে মানব জাতি ধ্বংস হতে আর বেশি সময় লাগবে না।
মুনাফা লোভী পুঁজিবাদ প্রধানত এর জন্য দায়ী এতে কোন সন্দেহ নাই। যার একমাত্র লক্ষ্য মুনাফার জন্য পণ্য উৎপাদন। ফসিল জ্বালানী যার শক্তির উৎস। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টন ফসিল জ্বালানী পুড়িয়ে তারা বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়িয়ে চলছে। লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমি উন্মুক্ত করে তারা পণ্য-মুখি ফসল উৎপাদন করছে, ফলে একদিকে জমি যেমন তার প্রাকৃতিক উর্বরতা হারাচ্ছে তেমনি জমির পানি ধারণ ক্ষমতা নষ্ট করে তাকে মরুভূমির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অপরদিকে রাসায়নিক কীটনাশক ও সার ব্যবহার করে মাটি, নদী নালা, জলাশয় বিষাক্ত করে তুলেছে। হাড়িয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার প্রাণ বৈচিত্র্য। একমুখী চাষাবাদের ফলে হাড়িয়ে যাচ্ছে ফসলের বৈচিত্র্য। বন-জঙ্গল কেটে সাফ করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করে চলছে।
পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা জন মানুষের উন্নয়নের জন্য উৎপাদন করছে না, করছে মুনাফার জন্য উৎপাদন। সবকিছুই এখন পণ্য। ব্যবহার্য্য সামগ্রী তো বটেই, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি, রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা কোন কিছুই আজ পণ্যের বাইরে নয়। প্রচার, প্রচারণা, মিডিয়ার মাধ্যমে তারা প্রতিনিয়ত মানুষকে অধিক থেকে অধিক পণ্য ক্রয় করার জন্য মগজ ধোলাই করছে। সুখ, জীবন যাপন পদ্ধতি, নৈতিকতা,ফ্যাশন, রুচি-বোধ সবকিছুর সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে। এখন শিক্ষার অর্থ ক্রয় করা শিক্ষা বা নির্দিষ্ট দক্ষতা যা পুঁজিবাদীদের মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। সুখ স্বাচ্ছন্দ্য অর্থ একটা এপার্টমেন্ট ক্রয় করে প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় পণ্য বোঝাই করা।সবাইকে প্রতিযোগিতায় মত্ত রাখা, সমাজে বিভেদ তৈরি, পরজীবীদের সমাজের উঁচু স্তরে ও যারা নিজেদের কাজ নিজেরা করে তাদেরকে নিচু স্তরে রাখা, পারিবারিক কাজকে নিচু স্তরের ও অন্যের চাকুরী করাকে উঁচু স্তরের বিবেচনা করা ইত্যাদি বিষয়কে জীবনের আদর্শ বলে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মানুষকে করে তুলেছে নিঃসঙ্গ, অসহায়, পুঁজির পুতুল। মানুষ এখন নিজেকেই ভুলতে বসেছে। সে এখন চিন্তাশীল বা সৃষ্টিশীল ব্যক্তি নয়। সবকিছুই সে ক্রয় করছে, পুঁজিবাদী প্রচারণাকে নিজের চিন্তা বলে মনে করছে।
তবে পুঁজিবাদ শাশ্বত নয়। পুঁজিবাদ এখন নিজের অন্তিম অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য তাকে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাতেই হয়। এখন এই প্রযুক্তিই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রযুক্তি হোল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এই প্রযুক্তি হোল ইন্টারনেট। আঠারো শতকে বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও বিদ্যুতের আবিষ্কার যেমন সামন্ত ব্যবস্থার মৃত্যু ঘণ্টা বাজিয়েছিল, তেমনি বিংশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদের মৃত্যু ঘণ্টা বাজাচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি একদিকে যেমন মানুষে মানুষে যোগাযোগ ও জ্ঞান বিজ্ঞান সহজ লভ্য করে তুলেছে, অপরদিকে উৎপাদন ক্ষেত্রে প্রায় সম্পূর্ণ অটোমেশন সম্ভব করে তোলায় পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শ্রম ছাড়া পণ্যে মূল্য সংযোজিত হয় না ফলে মুনাফা করাও সম্ভব হয় না। একদিকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অটোমেশনে যেতে বাধ্য হওয়া অপরদিকে অটোমেশনে যাওয়ার ফলে মুনাফা কমতে থাকা, এই চক্র পুঁজিপতিদের শঙ্কিত করে তুলছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত জ্ঞান সহজলভ্য ও বিনামূল্যে হওয়ায় ব্যক্তি ও কমিউনিটি পর্যায়ে অনেক কিছুই এখন উৎপাদন করা সম্ভব। ফলে ক্রয় বিক্রয়ের বাজার ব্যবস্থাও সংকুচিত হয়ে পড়বে। মানুষ ঝুঁকবে যৌথ বিনিময় বা বিতরণ ব্যবস্থায়।
ভবিষ্যৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় এমন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে যে বিক্রয়ের জন্য পণ্য উৎপাদন অসম্ভব হয়ে পরবে। বৃহৎ উৎপাদন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাবে ভেঙ্গে আঞ্চলিক, কমিউনিটি ও পারিবারিক পর্যায়ে চলে আসবে। বিজ্ঞাপনের অহেতুক প্রচারণা আর থাকবে না। মানুষ তাদের নিজেদের যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু নিজেরাই তৈরি করে নিবে। ক্ষুদ্র স্কেলে এই উৎপাদন হবে পরিবেশ বান্ধব। অর্থাৎ কমিউনিটি লিভিং এখন অবাস্তব কোন কিছু নয়। বস্তুগত কারণেই মানুষ এখন এই ধরণের জীবন যাপনের দিকে ঝুঁকবে।
তবে সমাজের বৈপ্লবিক বিকাশকে সব সময় পুরাতন সমাজ ব্যবস্থার বিরোধিতার সন্মুখিন হতে হয়। বিভিন্ন সামাজিক অবস্থা এই বিকাশকে বিভিন্ন দিকে পরিচালিত করতে পারে। পুঁজিবাদ টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন ধরনের জন বিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফলকে করায়ত্ত করে অনেক রাষ্ট্র ব্যক্তি পর্যায়ে জনগণের সকল তথ্য সংরক্ষণ করে একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় জনগণকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে। সুতরাং কোন রাষ্ট্রে যত দ্রুত কমিউনিটির যৌথ শক্তি বিস্তার লাভ করবে এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আনুভূমিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে তত শক্ত ভাবে বিভিন্ন ধরণের অপশক্তিকে রুখা সম্ভব হবে।
সমাজকে উপর থেকে জোর পূর্বক পরিবর্তন করা যায় না। সমাজকে পরিবর্তন করতে হয় ভিতর থেকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অফ-গ্রিড কমিউনিটি ছড়িয়ে পড়ছে। এর বস্তুগত ভিত এখন মজবুত হচ্ছে।
প্রকৃতির নিয়মে যৌথ বসবাসের ধারণাগুলি:
১। প্রকৃতিকে বদলে ফেলা নয়, প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে রক্ষা করে জীবন-যাপন।
২। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে এ ধরনের পণ্য ও সেবা বর্জন।
৩। ভোগবাদী জীবন থেকে সরে এসে স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হওয়া।
৪। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সামগ্রী যথাসম্ভব নিজে অথবা সমবায় ভিত্তিতে উৎপাদন করা।
৫। আন্ত কমিউনিটিতে বিনিময় প্রথা চালু করা।
৬। দৈনন্দিন বর্জকে সারে পরিণত করে পুনরায় ব্যবহার করা।
৭। বৃষ্টির পানিকে যথা সম্ভব সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা।
৮। সৌর শক্তির ব্যবহার।
৯। পার্মাকালচার পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও বাগান তৈরি।
১০। শিশুদের প্রকৃতির কোলে খেলাধুলা ও কাজের মধ্যদিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদান। শিক্ষার ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের ব্যবহার।
১১। কমিউনিটির মধ্যে সুস্থ বিনোদন, আর্ট, ক্রাফটের ব্যবস্থা করা।
১২। কমিউনিটির মধ্যে সকল সিদ্ধান্ত নেতা ভিত্তিক নয় বরং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গ্রহণ করা।
১৩। সকল ধরনের বৈষম্য দূর করা।
পুঁজিবাদী শ্রম-দাসত্ব মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। কোভিড কালে যখন সকল দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে সেই সময় চাকুরী হাড়িয়ে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। তারা দেখেছে দুঃসময়ে তাদের পাশে চাকুরিদাতারা তো ছিলই না, সরকারও তাদের কোন মদদ দেয়নি। এই সময় তারা বুঝতে পেরেছে জনগণের স্বাস্থ্যখাতের কি দুরবস্থা। তারা এখন চাকুরী নিয়ে নতুন করে ভাবছে। আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশে পেনডেমিকের পর চাকুরীজীবীরা আর চাকুরীতে ফিরে যাচ্ছেন না। তারা এখন বিকল্প স্ব-শ্রমের কাজ খুঁজে নিচ্ছেন। ইন্টারনেট যুগে তাদের এই বিকল্প কর্ম সংস্থান সম্ভব করে তুলছে। তারা এখন অনিশ্চিত জীবনে ফিরে যেতে চায় না। চায় না পণ্য উৎপাদন ও ক্রয়ে সহায়তা করে পরিবেশ বিপর্যয়কে আরও ত্বরান্বিত করতে। তারা চায় একটি অর্থবহ পারিবারিক জীবন।
আগামী দিনের সমাজ এই পথেই হাঁটবে আশা করা যায়।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০২১ সকাল ৮:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




