somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হুমায়ুন আহমেদের ‘ দেয়াল ’ও একটি পর্যালোচনা

১৯ শে মে, ২০১৪ রাত ১১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হুমায়ুন আহমেদের ‘ দেয়াল ’ও একটি পর্যালোচনা

বোরহান উদ্দিন রুবেল

‘ দেয়াল ’ হুমায়ূন আহমেদের সর্বশেষ উপন্যাস । তিনি এই উপন্যাসটি শেষ করে যেতে পারেননি । তাঁর এই উপন্যাসটি হল একটি রাজনৈতিক উপন্যাস । বাংলা সাহিত্যের কল্পবিজ্ঞানের জনক বলে খ্যাত হুমায়ূন আহমেদ তাঁর এই অসমাপ্ত রাজনৈতিক উপন্যাস দেয়ালও তিনি কিছু কাল্পনিক চরিত্র এনেছেন । যথারীতি তিনি তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মত এইখানেও কিছু ভালবাসার সংলাপ দিয়েছেন তবে উপন্যাসটি অসমাপ্ত হওয়ার কারনে শেষ পর্যন্ত চরিত্রগুলো মিলানো যায়নি । উপন্যাসের অসমাপ্তের সাথে সাথে চরিত্রগুলোও অসমাপ্ত রয়ে গেছে । তবে তিনি এই কাল্পনিক চরিত্রের মাধ্যমে যুদ্ধের সময়ে ও যুদ্ধের পরবর্তীতে কিছু ভূমিকা রেখেছে । তবে মজার ব্যাপার হল যেই কারনে এই প্রখ্যাত লেখকের বইটি তিনবার সংস্করণের পর প্রকাশ হয়েছে সেই বিষয়টি বিতর্কই থেকে যাবে । তিনি এই বইটিতে মূলত যেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন তা হল যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সহিংসতা , যুদ্ধের পর রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার , আওয়ামীলীগের অত্যাচার , মুজিব হত্যা , খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা দখল , খালেদ মোশারফের হত্যা এবং জিয়া হত্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ।
তার মধ্যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হল :-
(১) অবন্তি নামের একটি মেয়েকে দেখানো হয় যে, মেয়েটির বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেছে , তাঁর দাদা সরফরাজ খান একজন অবসরপ্রাপ্ত এসপি(SP) , তাঁর বিয়ে হয় এক পীরের ছেলের সাথে ,তাঁর গৃহশিক্ষকের নাম হল শফিক আর তাঁর বাবার বন্ধু হল খালেদ মোশাররফ ।
(২) রাধানাথ নামের একজন হস্তরেখাবিদ আছে যিনি আদর্শলিপি প্রেসের মালিক তিনি মূলত এগুলোর ছত্রছায়ায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর এজেন্ট ।
(৩) যুদ্ধের সময় শান্তি কমিটির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন তবে শান্তি কমিটির যে কথা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে তাঁর কিছুই তিনি আলোচনা করেন নি ।
(৪) যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে দেশের যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তাঁর কিছু আলোকপাত তিনি করেছেন । যেমন
(ক) দ্রব্য মুল্যের দাম বৃদ্ধি । তিনি দেখান যে লবণেরই দাম ছিল ৫০ টাকা
(খ) আওয়ামীলীগের সমর্থকদের সাধারন মানুষের উপর অত্যাচার । যেমন , মোজাম্মেল নামের আওয়ামীলীগের এক সমর্থকের গাড়ি আটকিয়ে নববর আর ড্রাইবারকে বেঁধে নববধুকে ধর্ষণ ।
(গ) শেখ কামালের নামেও নাকি গুজব ছিল সারা দেশে যে, তিনি ব্যাংক ডাকাতি করেছেন ।
(ঘ) সর্বহারা যারা ছিল তাদের যেহেতু আর হারাবার কিছুই ছিল না তারা শ্রেণী খতমের নামে আওয়ামীলীগ নেতা কর্মী হত্যায় নেমে যায় ।
( ঙ)আর বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মাঠে নামে দেশকে বদলে দিতে । তারাও শুরু করে শ্রণীশত্রু খতম করতে ।
(৫) রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার সম্পর্কে তিনি অনেক আলোচনা করেছেন । আর রক্ষীবাহিনীর অত্যাচারের প্রত্যক্ষসাক্ষী হলেন তিনি নিজেই । কারন শহীদ পরিবার হিসেবে তাদের বরাদ্দকৃত বাড়িটাও তারা দখল করে নেয় । শুধু দখল নয় তাদেরকে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে বাহির করে দেয় সাথে তাঁর ছোট ভাই আমাদের জাফর ইকবাল স্যারকেও ।
(৬) এইদিকে স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সমাবর্তনে শেখ মুজিব উপস্থিত অবে এই উপলোক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে বাকশালে যোগদেয়ার হিরিক পরে যায় । কারন তাদের বলা হয় বিনিময়ে তাদেরকে বেতন বাড়ানো হবে , আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে এবং উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে ।
(৭) মুজিব হত্যার পরিকল্পনা নেয় মেজর ফারুক । তাতে যে কারণটা দেখানো হয় তা হল স্বৈরশাসনের অবসান হবে । তাঁর সাথে ছিল মেজর ডালিম এবং মেজর রশিদ । পরিকল্পনা নেয়ার পর ফারুকের সামনে দুইটি কাজ জরুরি হয়ে পরে ।
(ক) সেনাবাহিনীকে সামলানো । যার দায়িত্ব দেয়া হয় তাঁর ভায়রা মেজর রশিদকে ।
(খ) রাজনৈতিক মোকাবেলা । আর এই সমস্যা সমাধানে তারা খন্দকার মোশতাককে বিকল্প হিসেবে ঠিক করে রাখে ।
(৮) বাংলাদেশের রাজনিতিতে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর তীক্ষ্ণ নজর ছিল । যেটা আরও স্পষ্ট হয় একদিন যখন শেখ মুজিবের সাথে এক বৃদ্ধ দেখা করতে আসে করতে মূলত সে ছিল ‘র’ এর প্রধান মিস্টার কাউ । তিনি এসে মুজিবকে বলেন আপনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে । এটার পরিকল্পনা করা হয়েছে মেজর জিয়ার বাড়িতে বসে মেজর ফারুক , রশিদ ও জেনারেল ওসমানী । মুজিব তাঁর কথা বিশ্বাস করেন নি বলেছিলেন আমারদেশের মানুষ আমি জানি তারা আমার সন্তান সমতুল্য ।
(৯)শেখ মুজিব হত্যা করা হল আশ্চর্য ব্যপার হল হত্যার পর কোন প্রতিবাদ হয়নি । এমনকি রক্ষীবাহিনীও সেদিন নিরব ছিল । রক্ষীবাহিনীর হেড কোয়াটার ছিল সাভার । সেখানে উপস্থিত ছিলেন তোফায়েল আহমেদ তিনিও কোন প্রতিবাদ করেননি ।তিনিও নাকি ঝিম খেয়ে গিয়েছিলেন । যেই আওয়ামীলীগের অত্যাচারের বিচার না করায় মানুষ তাঁকে ঘৃণা করতে শুরু করলো তারাও কোন প্রতিবাদ করেন নি ।
(১০) শেখ মুজিব মরার পর ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় মিছিল হয়েছিল তবে তা শোক মিছিল ছিলনা তা ছিল আনন্দ মিছিল । এমনকি তাঁর গ্রামের বাড়িতেও হামলা করেছিল সাধারণ জনগণ । যদিও লেখক তা স্বীকার করেন নি ।
(১১) মুজিবের হত্যার পর ক্ষমতায় বসেন খন্দকার মোশতাক । তিনি শেখ মুজিবকে যারা হত্যা করেছে তাদেরকে ‘ সূর্য সন্তান ’ বলেছেন অথচ তিনি মুজিবের খুব কাছের লোক ছিলেন । মন্ত্রী সভায় ছিল পুরুনো আওয়ামীলীগের দশ জন মন্ত্রী , সাত জন প্রতিমন্ত্রী ও তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্টও বহাল ছিলেন । খন্দকার মোশতাক ক্ষমতায় ছিলেন মাত্র আশি দিন । সে ক্ষমতা থেকে যাওয়ার আগের দিন আওয়ামীলীগ যাতে আর ক্ষমতায় না আসতে পারে তার জন্য খুন করা হয় ৪ নেতাকে ।
(১২) ৪ নভেম্বর মোশতাককে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন খালেদ মোশাররফ । যদিও তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন না তিনি ছিলেন সেনা প্রধান । তবে তাঁর হাতেই ছিল সব ক্ষমতা । জিয়াকে তিনি বন্দি করে রেখে ছিলেন । জিয়াকে মুক্তি করার জন্য জিয়া তাঁর বন্ধু তাহেরকে চিঠি পাঠায় । জিয়াকে মুক্তির জন্য ৭ নভেম্বর সিপাহী বিপ্লব হয় কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে কারন সৈনিকদের মধ্যে জিয়াউর রাহমানের অনেক প্রভাব ছিল । তারা জিয়াকে মুক্ত করে এবং খালেদ মোশাররফকে হত্যা করে ।
(১৩) তারপর ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান তাহেরকে বন্দী করে । তাহেরকে ১৯৭৬ সালের ২১ নভেম্ভর তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয় । হত্যার কারন হিসেবে দেখানো হয় সিপাহীদের নিয়ে তিনি বিপ্লব করতে চেয়েছিলেন ।
(১৪) লেখক জিয়াউর রাহমানের প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রশংসা করেছেন । তিনি জিয়াউর রহমানকে একজন সৎ প্রেসিডেন্ট বলে উল্লেখ করেছেন । তাঁর আমলে দ্রব্য মুল্যের দাম ছিল নিয়ন্ত্রিত । তাঁর আমলে বাংলাদেশের সাথে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক বৃদ্ধি পায় ।
(১৫) সেনাবাহিনীর আভ্যন্তরীণ শৃংখলা রক্ষা করার জন্য তিনি অনেক সেনাবাহিনীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ছিলেন । লেখকের মতে তাদের দীর্ঘ শ্বাস এসে জমা হয় ১৯৮১ সালের ৩০মে সার্কিট হাউসে । তাঁকে হত্যা করা হয় তাঁর একজন বিশ্বস্ত সেনা অফিসার মঞ্জুর এর নির্দেশে ।
এখানেই শেষ হয়ে যায় তাঁর উপন্যাস । কারন তিনি তা শেষ করে যেতে পারেননি ।

শিক্ষার্থী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ন্যায়ের আন্দোলন হোক নিয়মতান্ত্রিক ভাবে....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৩৭

শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্দোলনরত গুটিকয়েক শিক্ষার্থীদের সাথে ভুয়া আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে অরাজকতা প্রিয় অ ছাত্রদের বিরাট একটা অংশ অশ্লীল ভাষায় অশোভন উক্তি করে চলছে। একশ্রেণীর মেয়েরা এহেন অশ্লীল নোংরামির হোতা-... ...বাকিটুকু পড়ুন

গভীর ক্রন্দন

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৫৮


মেম্বার বাড়ি আর সরকার বাড়ির শত্রুতা দীর্ঘদিনের। জমিজমা লইয়া আজ এমন একখানি ঘটনা ঘটিয়া যাইবে, কেহ বোধহয় কল্পনাও করিতে পারেন নাই।

সকাল আটটায় কাঠের ব্যাপারী খসরু আসিয়া হাজির। দলিল লেখক আবু... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাজারের আগুন নিভবে পে-স্কেলে, প্রবৃদ্ধি ছুঁয়ে যাবে দশ শতাংশ ...

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৩৮


কেরামত মওলা সাহেবকে চেনেন না এমন মানুষ সচিবালয়ে কমই আছেন। তিনি মন্ত্রিপরিষদের একজন সিনিয়র সচিব। আজ নতুন পে স্কেল নিয়ে গঠিত সচিবদের কমিটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামাবাদে জুলাই শহীদদের স্মরণে অনুষ্ঠান

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৭ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:৪৩



পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মরণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বক্তারা দাবি করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের একক অর্জন নয়; এটি ছিল ছাত্র-জনতার সম্মিলিত আন্দোলনের ফল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপা আর ফিরে আসবে না......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৭ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৪১

যুগে যুগে গণ-আন্দোলন ও তীব্র জনরোষের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসকদের তালিকাঃ

(১) মোহাম্মদ রেজা পাহলভিঃ (ইরান - ১৯৭৯)১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের সময় লাখ লাখ মানুষের প্রবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×