
কেরামত মওলা সাহেবকে চেনেন না এমন মানুষ সচিবালয়ে কমই আছেন। তিনি মন্ত্রিপরিষদের একজন সিনিয়র সচিব। আজ নতুন পে স্কেল নিয়ে গঠিত সচিবদের কমিটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি হলেন তিনিই। সরকারের চোখের মণি এই মানুষটার মাথায় নাকি সব সময় দারুণ সব প্যাঁচ খেলে। আমলারা আড়ালে ফিসফিস করে বলন তাঁর মাথায় যে ধরনের বুদ্ধি , তা একসময় বাংলা সিনেমা বা নাটকের কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির অভিনয়ে দেখা যেত। তাই জুনিয়ররা ভালোবেসে হোক কিংবা ভয়ে হোক, আড়ালে তাকে হুমায়ুন ফরীদি নামেই ডাকে। তবে আজ এই মহা গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে এসে কেরামত মওলার মাথাটা কেমন যেন পুরোপুরি হ্যাং হয়ে গেছে। কোনোভাবেই নতুন কোনো চিকন বুদ্ধি মাথায় আসছে না।
আসল ঝামেলাটা বেধেছে নতুন পে স্কেল নিয়ে। দীর্ঘ বারো বছর পর অবশেষে সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল ঘোষণার একটা মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছে। এর মাঝে এক আমলে দেশ চালাতে এসে গরিব দুঃখী জনতার সেবক সেজে বসা এক সরকার সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়াতে একপ্রকার বাধা দিয়ে রেখেছিল। আমলারা অবশ্য নানা রকম প্যাঁচ কষে সেই চরম বাধা থেকে অবশেষে মুক্তি পাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু বিদায় নেওয়ার ঠিক আগে সেই আগের সরকার এমন এক ফাঁদ পেতে গেছে, যা এখন সবার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যখন পুরোপুরি বেগতিক ছিলো , তখন আগের সরকার আইএমএফের কাছ থেকে বিশাল ঋণ নিয়েছিল। আর এই আইএমএফ হলো এমন এক চুতিয়া সংস্থা, যারা ঋণ তো দেবেই, সাথে হাজারটা সংস্কারের কঠিন নির্দেশনাও দেবে। তাদের কথা মতো না চললে মাঝপথে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিতেও তারা দুবার ভাবে না। এই সংস্থাই এখন পুরো পে স্কেল কমিটির সামনে এক বিশাল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে গেছে ।
কেরামত মওলা সাহেব টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসটা তুলে এক নিশ্বাসে পানিটুকু শেষ করলেন। মাথা কাজ না করলে পানি খাওয়া ছাড়া আর কী বা করার আছে। এদিকে বিভিন্ন নন ক্যাডার ও কর্মচারী ঐক্য পরিষদ নামের সংগঠনগুলো বারবার তার কাছে এসে আকুতি মিনতি করছে যেন তিনি একটা কিছু করেন। বাজারের যা অবস্থা, তাতে ছোট কর্মচারীদের না খেয়ে মরার দশা হয়েছে। জনগণকে নিজের পকেট থেকে সেবা দিতে দিতে তাদের নিজেদের পকেট এখন সাহারা মরুভূমি হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই টেবিলের ওপাশ থেকে কথা বলে উঠলেন জি কে শামীম নামের আরেক জাঁদরেল আমলা। তিনি বেশ চিন্তিত মুখে বললেন, "স্যার, আইএমএফ বেশ জ্বালাতন করছে। ঢাকায় এসে সরকারকে কুবুদ্ধি দিয়েছে যাতে পে স্কেলটা পিছিয়ে দেওয়া হয়। এখন কী করা যায়? আজকে নিয়ে ছয়বার মিটিং হচ্ছে, কিন্তু কোনো আলোর দিশা পাচ্ছি না। তবে কি পে স্কেলের গেজেট হবে না?"
আমলাদের এই হতাশা দেখে কেরামত মওলা সাহেব তার চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে একগাল হেসে বললেন, "মিস্টার শামীম, আমার ওপর কি আপনাদের ভরসা আছে?" জি কে শামীমসহ রুমের বাকি সবাই তখন সমস্বরে বলে উঠলেন, "জি স্যার, আপনার বুদ্ধির ওপর আমাদের একশো পার্সেন্ট আস্থা আছে।" তখন কেরামত মওলা মৃদু হেসে বললেন, "চলেন আমরা শুরু থেকে আবার শুরু করি।" সবাই তখন একসঙ্গে বলে উঠল, "স্যার, আবার শুরু থেকে? এই নিয়ে ছয়বার মিটিং হলো, কিন্তু কোনো সমাধান নেই।"
কেরামত মওলা তাদের বোঝালেন, "দেখেন, প্রতিটা মিটিং আমাদের জন্য একটা নতুন সুযোগ। মিটিংয়ের জন্য আপনারা ভাতা টাতা পান না?" সবাই খুশি হয়ে একসঙ্গে বলে উঠল, "জি স্যার, তা তো পাই।" কেরামত সাহেব তখন চোখ টিপে বললেন, "তাহলে আর সমস্যা কোথায়? দরকার পড়লে আরও ছয় বার মিটিং হবে। লাগে ভাতা দেবে গৌরী সেন। কী বলেন?" এই কথা শোনার পর পুরো রুমে একচোট হাসির রোল পড়ে গেল।
রুমের পরিবেশ কিছুটা হালকা হতেই পিরু মোল্লা নামের আরেক সচিব বেশ উৎসাহ পেয়ে বলে উঠলেন, "স্যার, তাহলে কি আমরা পুরো বেতন ভাতা সব সুপারিশ করে সরকারের কাছে পাঠাব? সরকার স্যার খুবই আন্তরিক, মনে হয় বললেই দিয়ে দেবে।" কেরামত মওলা গ্লাসের বাকি পানিটুকু শেষ করে মাথা নেড়ে জবাব দিলেন, "আমার মনে হয় না সরকার একবারেই পূর্ণ বেতন ভাতা মেনে নেবে।
iBASS++ এর গাণিতিক হিসাব দেখিয়েছিলাম সরকারের এক মন্ত্রীকে । বলেছিলাম স্যার, পে স্কেল ধাপে ধাপে দিলে iBASS++ এর হিসাবে বড় জটিলতা তৈরি হবে। তখন মন্ত্রী সাহেব বলেছিলেন, আপনাদের কি চাওয়া আমাদের সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকুক নাকি না থাকুক? সরকার টিকে না থাকলে আপনাদের পে স্কেল দেবে কে? আমাদের মতো আমলা বান্ধব সরকার আর একটাও খুঁজে পাবেন?'"
কেরামত মওলা যেন কথাগুলো বলতে বলতেই বাস্তবে ফিরে এলেন এবং নিজের স্বভাবসুলভ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারায় ফিরে গেলেন। তিনি সবার উদ্দেশে বললেন, "iBASS++ এর জটিল লজিকটা মনে হয় সরকার বুঝে গেছে। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে, বেতনের পূর্ণ অংশ এই আর্থিক বছরে সুপারিশ করি আর ভাতাটা পরের অর্থবছরে দেওয়া হোক।" জি কে শামীম তখন ফিসফিস করে বললেন, "স্যার, আইএমএফ কি সরকারের সাথে কোনো ঝামেলা করতে পারে?" কেরামত মওলা হেসে বললেন, "আইএমএফকে তো আর ম্যানেজ করতে পারব না। তবে সরকারকে একটা হিসাব বানিয়ে হাতে ধরিয়ে দিতে পারি, যাতে দেখানো যায় পে স্কেল দিলে দেশের প্রবৃদ্ধি দশ পার্সেন্ট বেড়ে যাবে।" জি কে শামীম মৃদু হেসে বললেন, "স্যার আপনি দেখি ভালোই রসিকতা করেন।"
এর মধ্যে শাহেদ উল ইসলাম নামের আরেক সচিব বেশ চিন্তিত মুখে বললেন, "স্যার যদি ভবিষ্যতে আইএমএফ লোন দিতে গিয়ে ঝামেলা করে, আর তখন সরকার যদি আমাদের দোষ দেয়?" কেরামত মওলা আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিলেন, "আমি ফুলপ্রুফ ছাড়া কোনো প্ল্যান করি না। আমরা এমনভাবে সিদ্ধান্ত আর কাগজপত্র রেডি করব যাতে সরকারের মন্ত্রীরা নিজেদের মধ্যে মিটিং করে পুরোপুরি কনভিন্সড হয়ে পড়েন। আর দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে মন্ত্রীদের ব্যুরোক্র্যাটিক মেধাও আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।"
জি কে শামীম তখন জানতে চাইলেন, "কেরামত স্যার, গেজেট কখন দিতে সরকারকে সুপারিশ করবেন?" কেরামত সাহেব বললেন, "সরকার এখন আইএমএফের ভিজিট নিয়ে ব্যস্ত। তারা অনেক টেনশনে আছে এই বিষয়গুলো নিয়ে। আমাদের এত তাড়া নেই, আরও তিন চারটা মিটিং করার পর না হয় গেজেট নিয়ে কথা বলা যাবে। গেজেট যখনই হোক, পে স্কেল কার্যকর ধরা হবে জুলাইয়ের প্রথম তারিখ থেকেই।"
জি কে শামীম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, "এই আইএমএফই টাই যত ভেজালের মূল। আর এদের ডেকে এনেছিল আগের সরকার।" কেরামত মওলা তখন জিভে কামড় দিয়ে বললেন, "ছি ছি, এভাবে বলে না। এসব বিষয় নিয়ে সরকারি মিটিংয়ে আলোচনা হতে পারে না। সামনের দিনের কথা চিন্তা করুন। পুরনো দুঃখ ভুলে যান। কবিগুরু লিখেছেন না, মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা।" এই বলে গুনগুন করে গান ধরলেন কেরামত মওলা। ঠিক তখনই মিটিং রুমের পেছনের দেয়ালের টিভিতে ব্রেকিং নিউজ ভেসে উঠল, আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ।
photocard courtesy: আলাপ অনলাইন নিউজ মিডিয়া হাউজ
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


