somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আক্ষেপে বিনষ্ট করি অন্তরের সুখ

০৭ ই নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



পিচঢালা সরু পথের পাশেই একটি খাল। রিকশায় পথ পেরোতে পেরোতে আমরা সেই খালটি দেখি। আকারে আয়তনে এর চেয়ে অনেক উল্লেখযোগ্য খালের দেখা দেশের বহু স্থানেই মেলে, কিন্তু এই খালের বিশেষত্ব অন্যত্র। বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার আগরপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা এই খালটি আড়িয়াল খাঁ এবং সন্ধ্যা নদীর আপাত বিভেদপূর্ণ জলধারার মাঝে ঐক্য গড়ার চেষ্টা করেছে, পরিস্থিতি প্রতিকূল জেনেও চেষ্টা করেছে দুটি বিপরীতমুখী প্রবহমানতার মধ্যে সমন্বয় সাধনের। প্রতিকূল যে কোনো পরিস্থিতিতে ঐক্য গড়ার কিংবা যেকোনো ধরনের বৈপরীত্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টাটাই আসল! আজ থেকে অনেক দিন আগে, ১৯৫০ সালে, ঠিক এই খালটির মতোই সুকঠিন এক চেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন আগরপুরের আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদ। সাম্প্রদায়িক বিভেদের আগুন থেকে অসহায় মানুষের প্রাণ রক্ষার চেষ্টায় বিসর্জন দিয়েছিলেন নিজের প্রাণ।

১৯০৮ সালে আগরপুরের বিখ্যাত মিয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদ। পটুয়াখালী লতিফ সেমিনারি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু হয় তাঁর। কিন্তু শিক্ষাজীবন সুসম্পন্ন হওয়ার আগেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেন আলতাফ উদ্দিন, জড়িয়ে পড়লেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। বরিশালে বেশ তীব্র ছিল আন্দোলনের প্রকৃতি। আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হলো। শুধু তা-ই নয়, আন্দোলনের ব্যাপকতা স্তিমিত করতে সাম্প্রদায়িক বিভেদনীতির আশ্রয় নিল ইংরেজ প্রশাসন। প্রশাসনের কূটকৌশলে দীর্ঘ যুগ সহাবস্থানে অভ্যস্ত হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সৃষ্টি হলো সহিংস বিরোধ। শুরু হলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার রক্তাক্ত অধ্যায়। বিনষ্ট হলো শান্তি। এভাবেই তিরিশ দশকের রক্তস্নাত পথ পেরিয়ে চল্লিশের দশকে পদার্পণ করল উপমহাদেশ। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট, সৃষ্টি হলো পাকিস্তান। কিন্তু শান্তি কি ফিরল আমাদের এই ব-দ্বীপাঞ্চলে? বন্ধ হলো কি সাম্প্রদায়িক হানাহানি? না। হলো না। ১৯৫০ সালে, ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম পাদে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক মদদপুষ্ট স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সামান্য এক গুজবকে পুঁজি করে বৃহত্তর বরিশালের বিভিন্ন স্থানে শুরু করল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই দাঙ্গার আগুনে হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু মানুষের সহায়-সম্বল তো পুড়লই, ভস্মীভূত হলো সহস্রাধিক তাজা প্রাণও।

আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদ তখন মানবিক গুণসমৃদ্ধ পরিণত বয়স্ক যুবা। সক্রিয়ভাবে মুসলিম লীগের রাজনীতি করতেন তিনি। কিন্তু হীন রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল চিরকালই জোরালো। সুতরাং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের নব এ উদ্যোগে বিচলিত হলেন আলতাফ উদ্দিন। সিদ্ধান্ত নিলেন আগরপুর এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কিছুতেই দাঙ্গা সংগঠিত হতে দেবেন না তিনি। আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সহমত পোষণ করলেন শরিকলের আলাউদ্দিন মিয়া, নলচিড়ার মনু মিয়াসহ আরও অনেক উদারমনা মুসলমান মহাপ্রাণ। তাঁরা একত্রিত হয়ে গঠন করলেন দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি। দাঙ্গাকারীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এলাকার প্রবেশপথগুলোয় সতর্ক পাহারার ব্যবস্থা করলেন নবগঠিত এই কমিটির সদস্যরা। কিন্তু রাতদিন পাহারা সত্ত্বেও ১৮ ফেব্রুয়ারি আগরপুরে পা রাখল দাঙ্গাকারীরা। আতঙ্কিত হিন্দু সম্প্রদায়ের শত শত মানুষ আশ্রয় নিল পার্শ্ববর্তী গ্রাম ব্রাহ্মণদিয়ার কবিরাজ বাড়িতে। সকাল ১০টা তখন। মৃত্যুভয়ে ভীত মানুষগুলোকে আগলে আছেন আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদ। হাতে বন্দুক তাঁর। এমন সময় দাঙ্গাকারীদের দেখা গেল কবিরাজ বাড়ির দিকে এগোতে। দূর থেকেই আলতাফ উদ্দিন চিত্কার করলেন। দাঙ্গাকারীদের ফিরে যেতে বললেন উচ্চস্বরে। কিন্তু দাঙ্গাকারীরা উল্টো আলতাফ উদ্দিনকে এ স্থান ত্যাগ করার পরামর্শ দিল। আলতাফ উদ্দিন হাসলেন, তারপর বললেন, জীবন থাকতে এ স্থান ত্যাগ তো করবেনই না তিনি, দেবেন না প্রাণভয়ে ভীত হিন্দু সম্প্রদায়ের কারও কোনো ক্ষতি হতেও। এ নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হলো দুই পক্ষে। তর্কাতর্কি থেকে জন্ম নিল তুমুল উত্তেজনা, সৃষ্টি হলো দারুণ হট্টগোল। এই হট্টগোলের মধ্যেই দাঙ্গাকারীরা অতর্কিতে আক্রমণ করল আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদকে। ধারাল অস্ত্র দিয়ে একের পর এক আঘাত করল সজোরে। আঘাতে আঘাতে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লেন তিনি। মৃত্যুতে বিলীন হলো আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদের প্রাণসত্তা।

আলতাফ উদ্দিনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টে গেল দাঙ্গা পরিস্থিতি। অসাম্প্রদায়িক মানুষ প্রতিবাদমুখর হলো। প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলল তারা। দাঙ্গাকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাল যে যার মতো। শুধু আগরপুরেই নয়, আলতাফ উদ্দিনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দাঙ্গা থেমে গেল সমগ্র বরিশালে। শোকের ছায়া নেমে এল সর্বত্র। কেমন ছিল সেই শোকের প্রকৃতি? তীব্র? তীক্ষ? ভাবতে ভাবতে অনেকটা পথ পেরিয়ে আগরপুর বাজারে পৌঁছালাম আমরা। সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত একটা মাঠ বাজারের পাশেই। কাছেই একটা স্কুলের প্রধান ফটক। ফটকের উপরিভাগে লেখা ‘আগরপুর আলতাফ মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়’। সেখানে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করি আমরা, আক্ষেপে বিনষ্ট করি অন্তরের সুখ। কারণ, দিন যতই অতিক্রান্ত হচ্ছে, ততই যেন এ দেশ থেকে কমে যাচ্ছে শহীদ আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদের মতো মানবিক গুণসমৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা।


ছবি: শহীদ আলতাফ উদ্দিন মোহাম্মদের পারিবারিক সংগ্রহ



সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:২৯
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা - প্রমাণ

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:১২



ব্লগার সাহেব আমেরিকা থেকে লিখেছেন, “অমুক আসলে মুক্তিযোদ্ধা নন।”

আমি বন্ধুকে ফোন করলাম।
বললাম, “তুমি নাকি ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা?”

সে বলল, “বুঝতে পারছি না।”

“কেন?” আমি প্রশ্ন করলাম।

“১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন লা-মাযহাবিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কারণ কী ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৩২


আজকে নতুন চারটি মুখ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হলো। এর মধ্যে একজনকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে । বলছি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকনের কথা। তিনি একজন লা মাযহাবি বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবীপ্রসাদ যাত্রা

লিখেছেন জ্যোতির্ময় ধর, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:২১


আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। চট্টগ্রামের মোমিন রোডের রুচিশীল বই বিপণি কথাকলির বুকশেলফে চোখ বুলাচ্ছিলাম । হঠাৎ একখানি বইয়ের ওপর এসে থমকে গেল আমার চোখ । "ক্ষুদে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুর্ভিক্ষের আওয়াজ কি আমরা বাংলাদেশিরা শুনতে পাচ্ছি?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩

মুচলেকা দিয়ে, গোপন সমঝোতা করে মীর জাফর কিংবা মীর কাসিমের মতো “কথিত ক্ষমতার” সিংহাসনে বসা যায় ঠিকই কিন্তু বসে বসে জনগণের সর্বনাশ দেখা ছাড়া তাদের বিশেষ কিছু করার থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×