
শফি অপেক্ষা করছে, প্রথমে কিছু শরণার্থী পার হোক; সে জানে আশেপাশের বাড়ীতে কয়েকটা গ্রুপ অপেক্ষা করছে। শফি তার ছোট কালো কাপড়ের থলির মাঝে হাত ঢুকিয়ে ছোট টর্চের আলোয় সময় দেখলো, শফি টর্চের কাঁচে কালো কাপড় লাগিয়ে, খুবই ছোট ছিদ্র করে আলো নিয়ন্ত্রণ করছে; রাত একটা'র থেকে সামান্য বেশী; থলির মাঝে সে একটা লুংগি বহন করে; লুংগির মাঝে দুইটি ক্যামি ঘড়ি ও এক ডজন উইংসাং কলম লুকানো আছে; সে এগুলো ত্রিপুরায় বিক্রি করবে। সবার দৃস্টি মাঠের উপর, কেহ পার হচ্ছে কিনা! পনের বিশ মিনিট পর, যামিনী হাত নেড়ে উত্তর দিকে সবার দৃস্টি আকর্যন করলো; তাদের থেকে এক'শ দেড়'শ গজ উত্তরে অন্ধকারে কিছু মুর্তি পুর্ব দিক থেকে দ্রুত হেঁটে গ্রামে প্রবেশ করছে; শফি ফিশফিশ করে বললো"
-স্যার, এগুলো মুক্তিযোদ্ধা হবে, দেশে প্রবেশ করছে।
-পাকী সৈন্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে? সীতানাথবাবু প্রশ্ন করলেন।
-না, রাতে পাকীরা মাঠের মাঝ দিয়ে গ্রামের দিকে আসতে সাহস করবে না, স্যার। আমরা আরো ১৫ থেকে ২০ মিনিট অপেক্ষা করে যাত্রা শুরু করবো।
যামিনীর বুকের মাঝে একটা উত্তেজনা অনুভব করলো, অবশেষে মুক্তির সময় এসেছে; সে মায়ের হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল; মায়ের হাতটা সামান্য কাঁপছে। ঠিক ১৫ মিনিট পর, শফি উঠে দাঁড়ালো:
-স্যার, সময়!
কল্পনা মনে মনে বিধাতাকে স্মরণ করলো; সামনে শফি ও সীতানাথবাবু; তদের থেকে ৫ গজ পেছনে কল্পনা, একটু পেছনে উ্ত্তর পাশ দিয়ে হাঁটছে যামিনী; তারা দ্রুতপদে হাঁটছে। মাঠের মাঝ বরাবর একটি মজে-যাওয়া পুকুর ছিল, সেটার পাশ দিয়ে সামনে আসতেই অন্ধকারে ট্রাংকরোডের গাছপালাগুলো দৃস্টিসীমার মাঝে এলো। যামিনীর নিশ্বাস প্রশ্বাস একটু দ্রুত বইছে, সামনে সুক্ষ্ম দৃস্টি; তারা এখন ট্রাংকরোডের কাছাকাছি। হঠাৎ সামনে ট্রাংকরোডের উপর যেন এক মহর্তের জন্য বিজলীর আলোর মতো কি একটা আলো জ্বলে উঠলো; এবং কিছু বুঝার আগেই ভয়ংকর কি এক বিস্ফোরণে শব্দে পা অবশ হয়ে, সে মাটিতে পড়ে গেলো। সে মাটিতে পড়ে আছে, গত তিন মাসের পরিচিত ব্রাশ ফায়ারের শব্দে তার কান ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো; সে দুইহাতে কান চেপে ধরে পড়ে রলো; মনে, হলো এই ব্রাশের শেষ নেই; তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, সে মুখ দিয়ে নিশ্বাস নেয়ার চেস্টার করছে।
এক সময় ব্রাশ ফায়ারের আওয়াজ বন্ধ হলো, যামিনী উঠে বসার চেস্টা করলো; তার হাত-পা কাঁপছে, শরীরে একফোঁটা শক্তিও নেই; সে নিজের শরীরে হাত বুলায়ে অনুভব করার চেস্টা করলো; সে শোয়ার মাঝে যেন মায়ের গলা শুনতে পেলো; মা তাকে যেন অস্ফুট গলায় ডাকছে, "যামিনী, যামিনী, মা তুই কোথায়?" যামিনী সমস্ত শক্তি যোগাড় করে উঠে বসলো; তার থেকে ৮/১০ হাত দুরে মা অসাড় হয়ে পড়ে আছে; সে হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের কাছে আসলো। মায়ের নড়াচড়া নেই; সে নাকে হাত রেখে অনুভব করলো, মা নিশ্বাস নিচ্ছে; সে মায়ের শরীরে হাত দিয়ে অনুভব করছে, মা আহত কিনা; ডানপায়ের হাঁটুর নীচ দিয়ে গরম রক্তের ধারা লাগলো হাতে; পাটা যেন দু'ভাগ হয়ে গেছে। মায়ের ব্যাগটা পাশে পড়েছিল; তাড়াতাড়ি একটা শাড়ী বের করে ছিঁড়ে, বড় একটা টুকরা নিয়ে হাঁটুর উপর শক্ত করে বাঁধলো; রক্তক্ষয় বন্ধ হবে। তারপর সারা শরীর আবার পরীক্ষা করলো, না আর কোথায়ও গুলি লাগেনি।
সে দৌঁড়ে সামনে গেলো, শফিক পড়ে আছে; বসে ঝুকে তাকে দেখছে; তার মাথার বিরাট অংশ নেই; সে বুঝলো শফি আর নেই; তবুও হাতটা হাতে নিয়ে নাড়ী অনুভব করার চেস্টা করলো; ওর নিজের হাত এত কাঁপছিলো যে, সে কিছুই অনুভব করতে পারছিলো না। ৩/৪ হাতে দুরত্বে তার বাবা পড়ে আছে; সে নিচু গলায় ডাকলো, "বাবা, বাবা"। কোন সাড়া নেই; বাবা উপুড় হয়ে পড়ে আছে; সমস্ত শক্তি দিয়ে বাবাকে ঘুরায়ে পিঠের উপর শোয়ালো; বাবার মুখ ও মাথায় সামের অংশ নেই; সে বুঝলো, বাবা নেই; তবুও বাবার বুকে কান রেখে শোনার চেস্টা করলো; কোন আওয়াজ নেই। দুই চোখ ঝাপসা, সে যেন কিছুই দেখ্তে পারছে না। হঠাৎ পুর্বদিক থেকে কয়েকটা টর্চের আলো এদিকে এসে পড়লো; সে দ্রুত বাবার কোমর থেকে টাকা ও স্বর্ণের বেল্টটা খুলে নিয়ে মায়ের কাছে গেলো; উনার টাকার পুটলীটা খুলে পাশে রেখে দিলো। মায়ের বাঁধা পা'টাকে মায়ের গায়ের শাড়ী দিয়ে ঢেকে দিয়ে, মাকে উপুর করে দিলো; তারপর মজা-পুকুরের দিকে দৌড়াতে লাগলো।
*** ছবিটি ব্লগার "হাসান কালবৈশাখী"র সৌজন্যে...
আমি টাইপিং এ শ্লো, ছোট আকারে লেখাতে বিরক্ত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মার্চ, ২০১৬ রাত ৮:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



