
ভোলা মিয়া একজন নিতান্ত গরীব মানুষ ছিলেন; তিনি চট্টগ্রামের পাহাড়ে একাকী জীবন যাপন করতেন; একাকী থাকার ফলে হয়তো, তাঁর চলাফেরা কিছুটা আলাদা ছিলো; মানুষ তাঁকে 'ভোলা পাগল' ডাকতেন, আমি তাঁর মাঝে কোন পাগলামী দেখিনি; এই পোষ্টটি তাঁর স্মৃতি নিয়ে।
আমি ছোটকাল থেকে ভোলা মিয়াকে আমাদের বাড়ীতে ও গ্রামের বাজারে দেখে আসছিলাম; ভোলা মিয়াকে আমি প্রথম দেখেছি আমাদের বাড়ীতে; পরে আমি বাজারে যাওয়া শুরু করলে, প্রতি বাজারবারে ভোলা মিয়াকে বাজারে পাহাড়ী কচুর লতি, তারার বকলী, ঢেকির শাক, কাউ, ঘৃতরসা, আমলকি বিক্রয় করতে দেখেছি। উনার আয় ছিলো খুবই সীমিত, কিন্তু তিনি অন্যদের তুলনায় পরিস্কার ও ভালো কাপড় পরতেন, এটিও মানুষ উনার পাগলামীর অংশ হিসেবে নিতেন। বর্ষাকালে বাজারে ক্রয় বিক্রয় সেরে আমাদের বাড়ীতে প্রায়ই আসতেন ভোলা মিয়া। তিনি পাহাড়ে থাকতেন; বৃষ্টির সময় বাজারে এলে, বৃষ্টির মাঝে পাহাড়ে ফিরে যেতেন না; পাহাড়ের কাছে, ট্রেন লাইনের পশ্চিম পাশে উনার নিজ বাড়ীতে উনার নিজের একটা ঘর ছিলো, কিন্তু উনি ওখানে থাকতেন না, আমাদের বাড়ীতে এসে কাছারীতে থাকতেন ২/১ দিন, তারপর পাহাড়ে ফিরে যেতেন।
আমার বাবাকে নানা ডাকতেন; উনার নানার সাথে আমার বাবার পরিচয় ছিলো, সেদিক থেকে নানা; আমাদের বাড়ীতে তিনি স্বাচ্চন্দ বোধ করতেন, কেহ পাগল ডাকতো না, বাবার নিষেধ ছিলো। বাবার মৃত্যুর পরও ২/৩ বছর উনার যাওয়া আসা ছিলো; পরে, ক্রমেই আর আসতেন না; আমার মা উনার কথা মনে করায়ে দিলে, আমি বাজারে দেখা হলে আসতে বলতাম, তিনি আসবেন বলতেন, কিন্তু আসতেন না।
আমার ১০ম শ্রেণীর শুরুর দিকে একবার খেয়াল করলাম, উনি বাজারে আসেন না কিছুদিন; আমি একদিন পাহাড়ে উনার টংঘরে গেলাম, দেখি উনি নেই; হয়তো ২/১ মাস নেই, ঘরের আশে পাশে লতা ও কিছু আগাছা বড় হয়ে গেছে। উনার গ্রামের বাড়ী গিয়ে শুনলাম, উনি সেখানে আছেন, খুবই অসুস্হ। থানা দাতব্য চিকিৎসালয়ের ডাক্তার ছিলেন আমার পরিচিত, ক্লাশমেটের বাবা, তিনি ভালো করে দেখে ম্যালেরিয়ার ঔষধ দিলেন; আমাদর বাড়ী আনতে চাইলাম, আসলেন না; উনার বাড়ীর লোকজন দেখাশোনা করছেন, বললেন। সেই যাত্রা উনি সেরে উঠলেন; আবার পাহাড়ে থাকার শুরু করলেন; আমি নিষেধ করলাম; কিন্তু প্রকৃতিই বুঝি উনার সব ছিলো, তিনি পাহাড়েই থাকতে লাগলেন।
আমার কলেজের ২য় বর্ষের মাঝামাঝি সময়ে, পরপর ২ দিন বাজারে গিয়ে উনাকে দেখলাম না; এবার সোজাসুজি উনার টংঘরে না গিয়ে, উনার গ্রামে গেলাম; গ্রামের মুখে চা দোকানে উনার খবর পেলাম, মাস'খানেক আগে উনার মৃত্যু হয়েছে ম্যালেরিয়ায়। শুরুতে উনার জীবনটা এই রকম নির্লিপ্ত ছিলো না, উনার জীবনটা ছিলো সংগ্রামী জীবন; ১৯৪৩ সালের মহা দুর্ভিক্ষের সময় তিনি ৯/১০ বছরের কিশোর ছিলেন, সেই সময় নিজ চেষ্টায় তিনি নিজে, এবং নিজের মাকে নিয়ে পাহাড়ে বেঁচেছিলেন; এবং গ্রামের কিছু পরিত্যক্ত বয়স্ক মানুষকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছিলেন। (বাকীটুকু পরে লিখবো)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০২০ রাত ৯:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



