
চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হওয়ার পর, শুরুতে একটা একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম, চট্টগ্রাম শহরের ছেলেরা গ্রামের ছেলেদের সাথে বেশ খারাপ ব্যবহার করে; ইহা নিয়ে একদিন আমার সাথে লেগে যায় ৮/৯ জনের একটা গ্রুপের সাথে; আমার হয়ে প্রথমে ২ জন এগিয়ে আসে; পরে দেখি ২ জনই শিবির, আমাদের মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেনি; এটা সেই ঘটনা।
কলেজে ক্লাশ শুরু হয়েছে, আমি 'বি' সেকশনে; ইহাতে ৭০ ভাগই গ্রামের ছেলেমেয়ে, ৩০ ভাগ শহরের ছেলেমেয়ে; শহরের ছাত্ররা বিবিধ স্কুলের হলেও, এরা মোটামুটি নিজেদের সাথে পরিচিত ছিলো; তদুপরি, পুলিশ স্কুল, কলেজিয়েট, আগ্রাবাদ কলোনীর ছেলেরা প্রানবন্তের নামে আসলে কিছুটা বেয়াদব ছিলো; এসব স্কুলে কো-এজুকেশন ছিলো না; এরা পারলে ক্লাশের মেয়েদের নিজেদের ঘরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করতে লাগলো; এরা জোর করে মেয়েদের পেছনের বেন্চের সীটগুলো দখলে রাখতো।
ক্লাশের সামনের বেন্চে বসার জন্য ভালো ছাত্রদের মাঝে ভালোই প্রতিযোগীতা ছিলো; এরা স্যারদের লেকচার শুনতো; ১০০ জন ছেলেমেয়ের ক্লাশে স্যার কি বলছেন, তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাতাম না, আমি সবচেয়ে পেছনের বেন্চে বসতাম, অনেক সময় পুরো বেন্চে আমি একা, স্যার কোন সাবজেক্ট নিয়ে কথা বলছেন, আমার এলাকা অবধি আসতো না, আমি বসে বসে টেক্সট বই পড়তাম।
তখনো হোষ্টেলে সীট পাইনি, বাসে পোর্ট-কলোনী থেকে আসতাম, পথে আগ্রাবাদ কলোনীর গ্রুপ উঠতো; এরা ছিলো খুবই নীচু মানের, ৪ মাইলের পথ যেতে এদের বাসের সীটের দরকার হতো ও এরা টিকেটের পয়সা দিতে চাই তো না; এদের ৪/৫ জনের একটা গ্রুপ ছিলো, এরা ছিলো আসলেই ছোট লোক। এদের সর্দার ছিলো মাসুদ নামের এক ছেলে; সে একদিন আমাকে বলে,
-এই, তুই তো গ্রামের ছেলে, থাকিস কোথায়?
-পোর্ট কলোনীতে।
-আমাদের সাথে চলবি।
-তোমরা বাসের ভাড়া দাওনা, তোমাদের সাথে কি করে চলবো?
-এভাবে কথা বললে পিঠের ছামড়া তুলে নিবো, বুঝলা বাবাজী।
ক্লাশে আমার তথকথিত ১ মামা ( আমার স্কুল বন্ধুর আপন মামা ) ছিলো, উহা ছিলো পুলিশ স্কুলের ছেলে; সে কলেজিয়েটের ছেলেদের সাথে মিলে গন্ডগোল করে বেড়াতো; সে আমাকে সেই দলে ভেড়াতে চাইলো, আমি বললাম,
-মামা, আমি গ্রামের ছেলে, আমার এসব পোষাবে না, তোমরা যেভাবে ক্যাম্পাসে হাউকাউ কর, ইহা আমার দ্বারা হবে না।
-মামা শহরে এসে গেছ, এখানে গরু চরানোর যায়গা নেই, বিপদে পড়লে মামাকে স্মরণ করিও।
এর সপ্তাহ'খানেকের মাঝে বিপদের দিন ঠিকই এসে গেলো; একদিন শেষ ক্লাশের পর, শহরের সব ছেলেমেয়েরা মিলে ঘোষণা করলো, একটা মিটিং আছে, সবাইকে থাকতে হবে। তারা গ্যালারীর দরজা বন্ধ করে মিটিং শুরু করলো। ৮/৯ জন লেকচার ষ্টেজে উঠে "বি-সেকশন কালচারেল গ্রুপ" নামে একটি কমিটির নাম ঘোষণা করলো; এতে আমাদের ক্লাশের ৬ জন ছেলে ও ১ জন মেয়ের নাম আছে; এরা আমাদের ক্লাশের পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ করবে, ম্যাগাজিন বের করবে, অনুষ্ঠান করবে; সবাইকে মাসে ২ টাকা করে চাঁদা দিতে হবে। সভাপতি হচ্ছে, আমারই মামা।
মামাকে পরিচয় করে দেয়া হলো, মামা ২/৩ মিনিট বক্তব্য দিয়ে, সবাইকে হাত তুলে সমর্থন করতে বললো; ভয়ে হোক, বা আনন্দে হোক, সবাই সবাই হাত তুললো; আমি পেছন থেকে দাঁড়িয়ে বললাম,
-মামা, কমিটি করার আগেও তো আমাদের মতামত নেয়ার দরকার ছিলো, তাই না?
-এখন নিচ্ছি তো, তোমার আপত্তি কোথায়?
-আমার আপত্তি হলো, কমিটি তোমরা করেছে, চাঁদাও তোমরা দাও, আমি ইহাতে নেই।
চারিদিক থেকে হঠাৎ প্রতিবাদ উঠার শুরু করলো; ছেলেমেয়েরা প্রশ্ন করার শুরু করলো, এই ৭ জনকে কারা নিযুক্ত করেছে? মামা ও মন্চের লোকজন ক্ষেপে চীৎকার দিয়ে সবাইকে চুপ করায়ে বললো, ১ বছর পর, ভোটের মাধ্যমে ইহাকে ঠিক করা হবে, এখন এভাবে চলবে। মামা আমাকে লক্ষ্য করে বললো,
-মামা, ইহা শহর, এখানে ভিলেজ পলিটিক্স করলে পিঠের চামড়া থাকবে না!
-তাই নাকি?
আমি সবেগে পেছন থেকে দৌঁড়ে মন্চে এসে উঠলাম; মামাকে ধরার চেষ্টা করতে বাকীরা আমাকে ঠেলে মন্চ থেকে নামিয়ে দিলো; আমাকে হুশিয়ারী দিলো যে, কলেজে থাকতে দেবে না। আমি চীৎকার দিয়ে বললাম,
-যারা এই কমিটির বিপক্ষে, তারা মন্চে নেমে আসেন।
প্রথমে ২ জন আসলো, একটু পরে ৫০ জনের মতো আসলো, কমিটি শেষ। যেই ২ জন প্রথমে এলো, পরে দেখি ২ জনই শিবির (ততকালীন সময়ের 'ইসলামী ছাত্র সংঘ' ), আমি জানতাম না; এরা কয়েকদিন আমার সাথে চলেছিলো; ১ সপ্তাহ পরে টের পেলাম যে, ইহারা শিবির, বন্ধুত্ব শেষ।
( চলবে )
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মে, ২০২১ রাত ১০:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


