চা-এর কাপটা ধপ করে টেবিলে রাখল নীল। গরম চা উপচে পড়ল কাঠের চকচকে ট্রে-তে।
"একটু দেখে রাখা যায় না? কোনটা কত কষ্টে গুছিয়ে রাখি, তোমার কি তার বিন্দুমাত্র খেয়াল আছে?" রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে উঠল সায়েরা।
নীল পেপার থেকে চোখ না তুলেই ঠাণ্ডা গলায় বলল, "অত চিৎকার করার দরকার নেই। দু ফোঁটা চা পড়েছে, কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হয়নি।"
"মহাভারত অশুদ্ধ হয়নি?" সায়েরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল। "সবটাতেই তোমার এই গা-ছাঁড়া ভাব! আমার কষ্টের কোনো দামই নেই তোমার কাছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একা হাতে এই সংসারটা টানি, আর তুমি এসে এক মিনিটে সব তছনছ করে দাও।"
নীল এবার পেপারটা মুড়ে পাশে রাখল। তার চোখে ক্লান্তি আর একরাশ বিরক্তি। "তুমিও শুরু করলে? অফিসে সারাটা দিন কাজের চাপ সামলে বাড়ি আসি একটু শান্তির জন্য। আর ঘরে ঢুকলেই শুরু হয়ে যায় তোমার অভিযোগের পাহাড়।"
"আমি অভিযোগ করি? আমি তো শখ করে ঝগড়া করি, তাই না?" সায়েরা গলায় ক্ষোভের আগুন। "দিন দিন তুমি কেমন জানি পর হয়ে যাচ্ছ নীল। আমাদের কথা বলার সময় নেই, ছুটির দিনে একসঙ্গে বসার সময় নেই। এই ঘরের চারটে দেয়ালই কি শুধু আমাদের দাম্পত্য?"
কথাটা বলেই সায়েরা পড়ার ঘরের দিকে পা বাড়াল, দরজাটা বেশ জোরেই ভেজিয়ে দিল সে। একমুহূর্তে নীরবতা নেমে এল চারপাশের আলো-আঁধারি লিভিং রুমে।
নীল একা বসে রইল। ট্রে-তে জমে থাকা চা-টুকু ততক্ষণে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। ও চশমাটা খুলে চোখ দুটো বুজল। ঝগড়াটা চায়ের কাপ থেকে শুরু হয়নি, নীল সেটা বোঝে। বেশ কিছুদিন ধরেই তাদের সম্পর্কের মাঝে একটা অদৃশ্য দেয়াল উঠছে—কর্মব্যস্ততা, ব্যস্ত জীবন আর নিজেদের সময় না দেওয়ার অভ্যাসে জমে থাকা ক্ষোভ।
টেবিলের ওপর চোখ যেতেই নীলের চোখে পড়ল সায়েরার ডায়েরি আর একটা ছোট চশমা। সায়েরা আজকাল চোখের সমস্যায় ভুগছে, কদিন ধরেই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা বলছে, কিন্তু নীল সময় দিতে পারেনি।
নীল আস্তে আস্তে উঠে সায়েরার ঘরের দরজায় টোকা দিল। ভেতর থেকে কোনো শব্দ এল না। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখল, সায়েরা বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো তার লালচে, জলের ঝিলিক।
নীল গিয়ে চুপচাপ সায়েরার পাশে দাঁড়াল। একটু সময় চুপ থেকে বলল, "কাল বিকেলে আমার কোনো মিটিং নেই। কাল আমরা সেই নতুন চশমার ফ্রেমটা দেখতে যাব? আর রাতে বাইরে কোথাও খাওয়া যাবে।"
সায়েরা ঘুরে তাকাল না, তবে তার কঠিন চোয়াল কিছুটা নরম হলো। "আমার কোনো চশমা লাগবে না।"
"আমার লাগবে," নীল সায়েরার কাঁধে মৃদু হাত রাখল। "তোমার চোখ দুটোতে জমে থাকা এই মেঘগুলো বড্ড বেশি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আজ। সেগুলো মোছার জন্য একটা নতুন চশমা সত্যিই আমার দরকার।"
সায়েরা এবার নীলের দিকে তাকাল। রাগটা তখনও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি, কিন্তু অভিমানের বরফ গলে জল হতে শুরু করেছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "চা-টা আবার গরম করে আনছি..."
"থাক," নীল সায়েরার হাত দুটো চেপে ধরল, "আজ চা আমি বানিয়ে আনি? চল, একসাথে বারান্দায় বসে খাই।"
বাইরে তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি নামছে। মেঘের মেঘে ঘর্ষণে যেমন বজ্রপাত হয়, আবার সেই মেঘ থেকেই নামে বৃষ্টি—যা সমস্ত ধুলোবালি ধুয়ে সাফ করে দেয়। দাম্পত্যের ছোট্ট এই ঝড়টাও হয়তো তাদের সম্পর্কের ওপর জমে থাকা অভিমানের ধুলোবালিগুলো ধুয়ে দিয়ে গেল।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




