somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস: ঢাকার রাজপথ, ধারণক্ষমতার সংকট এবং গণপরিবহনের বাস্তবতা

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আজ ২২ সেপ্টেম্বর—বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস। কল্পনা করুন তো, কর্মব্যস্ত এক মঙ্গলবারের সকালে ঢাকার রাজপথে কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি নেই! কানে তালা লাগানো অহেতুক হর্নের গর্জন নেই, নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় আটকে থাকার মানসিক যন্ত্রণা। ধুলাবালি আর কালো ধোঁয়ার বদলে শহরের বাতাসটা যেন একটু নির্মল। যে সড়কে প্রতিদিন সেডান কার, এসইউভি কিংবা প্রাইভেট কারের জটলা লেগে থাকে, সেখানে মানুষ স্বচ্ছন্দে হাঁটছে বা সুশৃঙ্খল গণপরিবহনে গন্তব্যে ছুটছে।

এক দিনের জন্য এমন দৃশ্য কল্পনা করতে চমৎকার লাগে সন্দেহ নেই। কিন্তু কল্পনার জগৎ থেকে চোখ ফেরিয়ে যখন আমরা ঢাকার বাস্তবতায় তাকাই, তখন এক ভয়াবহ ও বিশৃঙ্খল চিত্র ভেসে ওঠে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিসংখ্যান বলছে, ২০১০ সালে ঢাকায় মোট নিবন্ধিত বিভিন্ন ধরণের গাড়ি ছিল প্রায় সাড়ে ৫ লাখের মতো। আর ২০২৬ সালের মে মাস নাগাদ এই সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজারে! যার মধ্যে ৩ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি সেডান কার এবং প্রায় ৯৫ হাজার এসইউভি (জিপ)। অর্থাৎ রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা দিন দিন বহুগুণ বাড়ছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার রাস্তার প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গা দখল করে রাখে এসব ব্যক্তিগত গাড়ি, অথচ এতে যাতায়াত করে মাত্র ৯ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে ৫৩ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করা বাসগুলো রাস্তা ব্যবহারের সুযোগ পায় মাত্র ১৫ শতাংশ।

তবে শুধু সংখ্যা বা পার্সেন্টেজ দিয়ে কি ঢাকার পুরো সমস্যা ব্যাখ্যা করা সম্ভব?

আসলে আমাদের মূল সমস্যা হলো—ঢাকার যে আয়তন বা জমি রয়েছে, তার ধারণক্ষমতার চেয়ে অন্তত চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি মানুষ এখানে বসবাস করে। একটি আদর্শ শহরের জন্য মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা প্রয়োজন হলেও ঢাকায় তা আছে অর্ধেকেরও কম। এই অপরিসর রাস্তায় যখন ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষ ও যানবাহন একসাথে নামায়, তখন যানজট অনিবার্য হয়ে ওঠে।

ঢাকার সড়কের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার বা রিকশা। পরিসংখ্যান বা বিভিন্ন সংস্থার মতে, ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। রাস্তায় সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি যতটা জায়গা দখল করে, তার চেয়েও বেশি জায়গা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করে অলিগলি থেকে হঠাৎ মূল সড়কে উঠে আসা এবং প্রধান পথগুলো দখল করে রাখা এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা।

অনেকে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে সাইকেলের কথা বলেন, ইউরোপ-আমেরিকার দিবসের প্রভাবে সাইকেল লেন তৈরির প্রেসক্রিপশন দেন। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো—ঢাকার বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাইকেল চালানো প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। সাইকেল চলাচলের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ ও আলাদা ডেডিকেটেড লেন। ঢাকার যে সংকীর্ণ রাস্তাঘাট, তাতে নতুন করে সাইকেল লেন তৈরি করার মতো জায়গা কোথায়?

একটি শহরের মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করাতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী ‘পাবলিক ট্রানজিট সিস্টেম’। দুঃখজনক হলেও সত্য, ঢাকা শহরে দীর্ঘদিন ধরে কোনো পরিকল্পিত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ভাঙাচোরা বাস, রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির অভাব এবং অরাজকতার কারণে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট বাহন বা প্রাইভেট কারের দিকে ঝুঁকেছে।বর্তমানে ঢাকায় প্রকৃত অর্থে যদি কোনো মানসম্মত ও সুসংগঠিত পাবলিক ট্রান্সপোর্টের কথা বলতে হয়, তবে তা হলো মেট্রোরেল। মেট্রোরেল আমাদের দেখিয়েছে—সময়মতো, সুসংগঠিত ও নিরাপদে কীভাবে হাজার হাজার মানুষ একসাথে যাতায়াত করতে পারে।



ঢাকার মতো একটি অতি-ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটিকে সচল রাখতে হলে কেবল এক দিন প্রতিকীভাবে 'গাড়িমুক্ত দিবস' পালন করে বা সেমিনার করে খুব একটা লাভ হবে না। আমাদের প্রয়োজন বাস্তবমুখী পরিকল্পনা:

১. আধুনিক বাস সার্ভিস: পুরো শহরজুড়ে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতির অধীনে সুশৃঙ্খল, উন্নত ও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পর্যাপ্ত বাস নামাতে হবে।
২. মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ: শহরের প্রধান সড়কগুলোকে মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসতে হবে, যাতে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি গ্যারেজে রেখে ট্রেনে চড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
৩. ছোট ও অবৈধ বাহন নিয়ন্ত্রণ: মূল সড়কগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ছোট যানবাহনের যথেচ্ছ চলাচল বন্ধ করতে হবে।

দিনশেষে, মানুষ যখন জানবে বাস বা মেট্রোরেলে চেপে সে সঠিক সময়ে ও আরামে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে, তখন সে নিজ থেকেই রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ি নামানো কমাবে। কেবল তখনই আমাদের ঢাকা সত্যিই বসবাসযোগ্য, ধোঁয়া মুক্ত এবং গতিশীল হয়ে উঠবে।

তথ্য সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো। ২২-০৯-২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৩৩
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দোষটা কি কপালের, নাকি রক্তের.... :-0 :-ls :#|

লিখেছেন সাইবার সোহেল, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫১

ঐতিহাসিক ভাবেই মনে হয় এই ভুখন্ড বা এই অঞ্চলের জনগন একটু বেশীই লোভী, আত্নকেন্দ্রিক, আর চরমমাত্রার স্বার্থপর । এবং যুগযুগ ধরে এটা চলমান থাকার কারণে আমাদের রক্তের সাথে মিশে... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১



রাজধানী ঢাকা সহ দেশের নানা অঞ্চলে টমটম, অটোরিক্সা, নসিমন, করিমন চলাচল করে। বেশ মানুষজন পরিবহন সহ মালামালের বস্তাও টানাটানি করতে দেখা যায়। কিন্তু এইগুলোর দেশ হচ্ছে গ্রাম গঞ্জের বাজার আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৪


আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
আমার ডক্টর উপাধিটি মুছে দিও
জ্ঞানী, কবি, দরবেশ, সাধক, সফল, ব্যর্থ
এসব কোনো শব্দই যেন
মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমাকে আলাদা না করে।

কারণ আমি দেখেছি
অহংকার খুব সূক্ষ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৬

১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু!

শিশুর অধিকার রক্ষা অবশ্যই সভ্য সমাজের দায়িত্ব। কিন্তু প্রশ্নটা তখনই কঠিন হয়ে ওঠে, যখন ১৭ বছর ১১ মাস ২৯ দিন বয়সী কেউ ধর্ষণ বা হত্যার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুনফুনা ফুন

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩



ছয় হাজার হাজার আগে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিলো মাত্র দশ লাখ।
হ্যা দশ লাখ। পুরো পৃথিবীর সব জায়গায় মানুষ থাকতো না। বনজঙ্গল ছিলো। আর সমুদ্র এবং নদী। পাহাড় পর্বত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×