somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জেনো’র প্যারাডক্স- ‘একিলিস এবং কচ্ছপ’ এর দৌড়

১১ ই নভেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গণিতের অন্যতম বিখ্যাত আর বহুল আলোচিত এক ধাঁধাঁ এটি। প্রাচীন ইটালীয়ান দার্শনিক জেনো তখনকার সময়ের প্রায় ৪০টি অসাধারণ গাণিতিক প্যারাডক্স দিয়ে যান যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত আর জনপ্রিয় এই ‘একিলিস এবং কচ্ছপ’ প্যারাডক্স।
বিখ্যাত ট্রোজান যুদ্ধের গ্রীক বীর একিলিস আর এক কচ্ছপের মাঝে দৌড় প্রতিযোগীতা হচ্ছে। বীর হিসেবে একিলিসের যথেষ্ঠ সুনাম। সুতরাং সে ঠিক করল ছোট্ট এই কচ্ছপের সাথে প্রতিযোগীতায় সে কছপের চেয়ে (মাত্র) দ্বিগুণ বেগে দৌড়াবে। আর রেসের শুরুতে কচ্ছপ ‘ফেয়ার প্লে’ বজায় রাখার জন্য গ্রীক বীরের চাইতে ১ মিটার সামনে থেকে দৌড় শুরু করতে চাইল। শর্ত অনুযায়ী প্রতিযোগীতা শুরু হল।



উপরের ছবিটির মত, কচ্ছপ শুরু থেকে যতক্ষণে ০.৫ মিটার অতিক্রম করল, একিলিস অতিক্রম করল ১ মিটার, অর্থাৎ কচ্ছপটির আগের অবস্থানে। কারণ শুরুতেই বলা হয়েছে একিলিস কচ্ছপের দ্বিগুণ বেগে দৌড়াচ্ছে। দুজনের মধ্যে দূরত্ব এখন (১.৫-১) ০.৫ মিটার। কচ্ছপ যতক্ষণে পরবর্তী ০.২৫ মিটার গেল, একিলিস ততক্ষণে আগের অবস্থান থেকে ০.৫ মিটার এগিয়েছে। অর্থাৎ এখন দুজনের ব্যবধান (১.৭৫-১.৫) ০.২৫ মিটার।

তো শুরু থেকে প্রত্যেকটি অবজার্ভেশন এ একিলিস এবং কচ্ছপের মধ্যে ব্যবধান পর্যায়ক্রমে ১ মিটার, ০.৫ মিটার, ০.২৫ মিটার ইত্যাদি। লক্ষ্য করি, প্রত্যেকবার ব্যবধান আগের ব্যবহারের অর্ধেক হচ্ছে। এদের মধ্যে ব্যবধান কমছে ঠিকই কিন্তু ব্যবধান শূণ্য হচ্ছেনা, বরং একটি গুণত্তর ধারা সৃষ্টি করছে (১, ০.৫, ০.২৫, ০.১২৫, ……) যেটির উপাদান যত ক্ষুদ্রই হোক, কখনো শুণ্য হবেনা, যদিও একিলিস দৌড়াচ্ছে কচ্ছপের দ্বিগুণ বেগে! অর্থাৎ এভাবে অনন্তকাল দোড়ালেও একিলিস কখোনই কচ্ছপটিকে পেছনে ফেলতে পারবেনা!!!!!!!

ব্যাখ্যাঃ

এই প্যারাডক্সটির সমাধান আমাদের দৈলন্দিন বাস্তবতা থেকেই গাণিতিক হিসেব নিকাশ ছাড়া অনেক সহজেই অনুমান করা যায়। কেননা, একিলিসের বেগ যেহেতু কচ্ছপের দ্বিগুণ, একটি নির্দিষ্ট সময়ে একিলিস এর অতিক্রান্ত দূরত্ব অবশ্যই কচ্ছপের চাইতে বেশী হলবে। সুতরাং কিছু সময় পরেই একিলিস এর মোট অতিক্রান্ত দূরত্ব কচ্ছপের মোট অতিক্রান্ত দূরত্বে্র চাইতে পুরোপুরি ১ মিটার বেশী হবে, অর্থাৎ তারা মূহুর্তের জন্য এক সারিতে পাশাপাশি অবস্থান করবে এবং এরপর থেকে তার সাথে কচ্ছপটির ব্যবধান বাড়তে থাকবে। কিন্তু সমস্যাটি দার্শনিক জেনো এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যে আমাদের চিন্তার ধারাটাই শুরু থেকে ভ্রান্তিকর পথে এগোতে থাকে!

সংখ্যারেখার যেকোন পূর্ণসংখ্যার মাঝে অসীম সংখ্যক দশমিক সংখ্যা রয়েছে যাদের কখনো গুণে শেষ করা অসম্ভব। একইভাবে বাস্তবে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বকে ইচ্ছেমত যত খুশি তত (অসীম সংখ্যক) ভাগে ভাগ করা যায়, কিন্তু তাদের সম্মিলিত যোগফল কিন্তু ওই সসীম নির্দিষ্ট দূরত্বটিই। ব্যাপারটা আরেকটু সহজে বোঝা যায় এভাগে- একটি কুমড়াকে যদি প্রতিবার অর্ধেক করে কেটে যেকোন একটি টুকরোকে রেখে অপরটিকে যদি আবার অর্ধেক করা হয় এবং এভাবে যদি অনন্তকাল কাটতে থাকা হয় তাহলে কুমড়াটির অসীম সংখ্যক বিভাজন সম্ভব। কিন্তু সবগুলো টুকরোর যোগফল কিন্তু ওই একটি কুমড়াই!!
এই প্যারাডক্সে দুভাবে উপরে বর্ণিত সহজ সরল হিসেবের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রথমত একটি সসীম দৈর্ঘ্য বা দূরত্বকে অসীম সংখ্যক ভাগে ভাগ করে, দ্বিতীয়ত দূরত্বে্র প্রতিটি অংশের জন্য আলাদা আলাদা সময় গনণা প্রবর্তন করে। জেনো’র প্যারাডক্সে একিলিস এর অতিক্রান্ত দূরত্বগুলোর যোগফল-
১+০.৫+০.২৫+০.১২৫+……(অসীম পর্যন্ত)= ২.০০ মিটার! (অসীম ধারার সমষ্টি)
একইভাবে সমান সময়ে কচ্ছপটির মোট অতিক্রান্ত পথ-
০.৫+০.২৫+০.১২৫+……(অসীম পর্যন্ত)= ১.৫ মিটার!
দেখা যাচ্ছে একটি নিদৃষ্ট সময় পর একিলিস আর কচ্ছপের মধ্যে কোন দূরত্ব থাকবেনা! অর্থাৎ এর পর মুহুর্ত থেকে একিলিস এগিয়ে যাবে, এবং এটিই বাস্তবে ঘটবে। কিন্তু প্যারাডক্সে বর্ণিত নিয়মে আমাদের একিলিস কিংবা কচ্ছপের অতিক্রান্ত মোট পথ বের করার জন্য অসংখ্যবার দূরত্ব যোগ করে যেতেই হবে, যেটি কখনো শেষ হবার নয়। আর এই কারণেই অনন্তকাল পরেও একিলিস এর কচ্ছপকে পেছনে ফেলা সম্ভব নয়!

দৃশ্যত অসীমসংখ্যক সংখ্যা যোগ করার এই সহজ সাধারণ সমাধানটির মধ্যেই ‘অসীম’ এর সৌন্দর্য নিহিত। এই ধরণের ‘কনভারজেন্ট’ অসীম ধারার (যার প্রত্যেকটি পদের মান আগের পদের চাইতে নিদৃষ্ট অনুপাতে কম) প্রত্যেকটি পদ আলাদা করে যোগ করতে থাকলে সেই যোগ কখনোই শেষ হবেনা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধারাটির মোট যোগফল কত হবে তা আমরা বলে দিতে পারি সুত্রের সাহায্যে। যেমন কুমড়াটিকে ভাগ করতে থাকলে তা অনন্তকাল ধরে করা যাবে, কিন্তু সব মিলিয়ে মোট কুমড়ার সংখ্যা অর্থাৎ যোগফল একটি কুমড়াই!
এবার আসি সময় ব্যবধানকে আসীম সংখ্যক ভাগে ভাগ করা বিষয়ে। আমরা জানি একিলিস রেস এ এগিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত অতক্রান্ত দূরত্ব ২ মিটার। স্বাভাবিকভাবেই এই দুই মিটার এর প্রথম অর্ধেক সে একটি সসীম সময়ের মধ্যে শেষ করলে বাকি অর্ধেকও একই সময়ে শেষ করবে, যেহেতু তার বেগের কোন পরিবর্তন হচ্ছেনা। কিন্তু জেনোর প্যারাডক্সে এই সময় ব্যাবধানকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ভাগে ভাগ করে ফেলার কারণে সময় ‘প্রবাহিত’ হওয়ার হার আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে যেটি বাস্তবে কখনোই সম্ভব নয়! কারণ সময় সবসময় একই ‘গতি’তে প্রবাহিত হয়। সুতরাং সসীম সময়কালকে এভাবে অসীম সংখ্যক ভাগে ভাগ করা গাণিতিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে অসম্ভব! আর এই কারণেই প্যারাডক্সটিকে গাণিতিকভাবে অনন্তকাল ধরে চলতে থাকা একটি প্রক্রিয়া মনে হলেও বাস্তবে তা সসীম।

আরেকটি প্রাসঙ্গিক ধাধার মাধ্যমে লেখাটি শেষ করি- বিখ্যাত ‘থম্পসনের ল্যাম্প’। একটি টেবিল ল্যাম্পকে ৬০ সেকেন্ড জ্বালিয়ে রেখে পরের ৩০ সেকেন্ড বন্ধ করে রাখা হল। আবার একে ১৫ সেকেন্ড জ্বালিয়ে রেখে পরের ৭.৫ সেকেন্ড বন্ধ করে রাখা হল। এভাবে প্রতিবার আগের সময়ের অর্ধেক সময় ধরে এই জ্বালানো-নেভানো প্রক্রিয়া চলতে থাকল। প্রত্যেকটি ধাপের সময়কাল চিন্তা করলে দেখতে পাই, এটিও একটি কনভার্জেন্ট অসীম ধারা, যার অসীমতক যোগফল ১২০ সেকেন্ড বা ২ মিনিট-
৬০+৩০+১৫+৭.৫+৩.৭৫+………… = ১২০ সেকেন্ড
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ঠিক ২ মিনিট বা ১২০ সেকেন্ড পর-
১. বাতিটি কি অবস্থায় আছে? জ্বালানো অথবা নেভানো?
২. যদি শুরুতে বাতিটিকে জ্বালিয়ে না রেখে ৬০ সেকেন্ড নেভানো অবস্থায় প্রক্রিয়াটি শুরু করা হত, তাহলে প্রথম প্রশ্নের উত্তর অন্যরকম হত কি না?
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:৫৯
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×