1. কয়েকদিন বাড়িতে কি জানি নেই। কিছুতেই বুঝতে পারি না। শুধু বুঝতে পারি একটা শূন্যতা - কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারি না ... শেষ পর্যন্ত হটাৎ আবিস্কার করি পাশের বাসার পেপে গাছটা নেই। জিজ্ঞাসা করে জানলাম পাচদিন আগে ওটি কেটে ফেলা হয়েছে। একটি পেপে গাছ - কোনদিন ওকে ওইভাবে খেয়াল করা হয় নি আলাদাভাবে - সেই পেপে গাছটিও মনের অজান্তে কেমন জড়িয়ে গিয়েছিল নিজস্ব পৃথিবীর বাস্তবতায় - আর একজন মানুষ না থাকলে, সে চলে গেলে কেমন করে তার শুন্যতা পূরন হয় ?
2. এটি তারও অনেক আগের ঘটনা - সামনের পাড়ার বাবুলভাই এর মা মারা গেলেন ... এরপর বাবুলভাইকে যখন হাসতে দেখি তখন অবাক হয়ে ভাবি ববিুল ভাই কেমন করে হাসে- বাবুলভাইকে যখন খেলতে দেখি - তখন অবাক হয়ে তাকাই বাবুল ভাই কেমন করে খেলে - বাবুল ভাই এর না মা নেই ?
3. আমার মা যেই রাতে মারা গেলেন তখন আমি ক্লাশ টেনে পড়ি - মা যেদিন মারা যান সেদিন বিশ্বকাপ কিক্রেটের খেলা ছিলো - মার মৃতু্যর পরদিন - মা শেষবারের মতন বাড়িতে শুয়ে - আমি চুপচাপ বসে- কেমন একটা অচেনা অনুভূতি মাথা জুড়ে - ঠিক শোক বলা যাবে কিনা জানি না (বোধহয় না) - চোখে কান্না নেই - পাড়ার মহিলাদের বলতে শুনি - ছোট ছেলে তো - পাথর হয়ে গেছে - আমি ভাবলেষহীন চোখে দেখি জটলা - সবার এঘর ওঘর ঘোরাফেরা - ওদের টুকরো টুকরো কথা ভেসে আসে - আমার মাকে কে কবে শেষ কিভাবে দেখেছে - মা শেষ কথা কি বলেছে তার সাথে - মরা ছেলে মেয়ে গুলোর কি হবে - আমি পরিস্কান্ধরতে পারি তাদের খুটি নাটি সব - এই দিনে মায়ের মৃতু্যর দিনে - মার কথা ভেদ করে এতসব কথা আমার কানে উকি দিয়ে চলে যায়- ভাবি ওরা যদি আমার চিন্তাকে পড়তে পারতো তবে আমাকে অভিশাপ দিতো পাষান নির্দয় বলে - আমি বিষন্নতার গাম্ভীর্য্য এটে ঘুরে বেড়াই - খাবার খাই - সান্তনা শুনি - সব সব - ভিড়ের আড়ালে চোখে পড়ে নিপাট সংবাদপত্র - হেডলাইনে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনে প্রিয়দলের পরাজয়ের খবরে শোক জাগে - মা তখন শুয়ে আছেন শেষযাত্রার অপেক্ষায় - তাকে পৌছে দিয়ে আসি তার শেষঘরে - সন্ধ্যার আকাশে তখন কি দারুন রঙের খেলা - আমার আকাশ দেখতে ভাল লাগে - পড়শী ভাবে মায়ের শোকে শোকাহত দৃষ্টি বুঝি - আসল ঘটনাটি আজো এতদিনে কাউকে বোঝাতে পারি না(বাসায় তো বটেই) - মা যে মারা গেছেন এই খবরটা আমার মগজে পৌছায় নি - আজো আমি যখন ঘরের বাইরে তখন মনে হয মা আমার ঘরে বসে রয়েছেন - আবার আমি যখন ঘরে থাকি তখন মনে হয় মা স্কুলে গেছেন ( উনি স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন) কিংবা কোথাও -ফিরে আসবেন একটু পড়েই - এটা একটা আজব কথা - আমি জানি না আর কারো ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে কিনা - মৃতূ্যর এত বছর পরও ( যুগ পার হয়ে গেছে অনেক আগে) মা যে মারা গেছেন - মা নেই এই অনূভুতি ঠিক একবারও হয় নি। আমি সচরাচর মায়ের মৃতূ্যদিনগুলোতে বাড়ি থেকে দুরে থাকি - আমার বাবা ভাই বোন ওরা মাকে মনে করে অথচ তিনি যে মারা গেছেন এটা ঠিক বুঝতে পারি নি - তাই ওদের মনে করার পর্বগুলো আমার কাছে অচেনা ঠেকে ... এটা সম্ভবত কাউকে বোঝাতে পারবো না - কারন আমি বলে দেখেছি ঠিক এই ব্যাপারটা কেউ কমূ্যনিকেট করতে পারে না - কল্পনায় - মনে বেচে থাকা নয় একজন ফিজিক্যালি মৃতমানুষ কিভাবে বেচে থাকেন .... ( আমার বাসায় আমার বড় বোন আমাকে মাঝে মধ্যে বলেন তুই তো নিষ্ঠুর - আমি তাকে বলতে পারি না মাতো - মরে নি.....)
4. আমার মাঝে আরো কয়েকজন মৃত মানুষ কখনো মৃত হয়ে উঠতে পারেন নি ... তাদের একজন সংবাদের সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন, যার লেখা পড়ে একসময় মনে হয়েছিলো পথের সাংবাদিক হবো ...
5. আবার কেউ কেউ মৃতু্যর সাথে এত বেশি জড়িয়ে আছেন - কান্ট্রি গায়ক জন ডেনভার আমার কাছে দুইভাবে মৃতূ্যকে অনূভূতির সাথে জড়িয়ে আছেন .. প্রথমটি আমার মৃতু্য বিষয়ক কিছু ঘোরের স্মৃতির সঙ্গে আর দ্বিতীয়টি লুকিং ফর স্পেস গানটির কথামালার মতো আটলান্টিকে তার বিমান নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ার ঘটনাটি ... মৃতু্যর মধ্য দিয়ে আমার জীবনের প্রথম নায়কের জন্ম... অতি শৈশবে .. আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির নেতা ববি স্ট্যান্ডস আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের এক রাজ্য সরকারের ( মাগর্ারেট থ্যাচার) বিরুদ্ধে অনশন করে মারা গিয়েছিলেন। প্রতিদিন তার অনশনের খবর শুনতাম ভাইয়ার কাছে। মৃতু্যর মধ্যে দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন আমার প্রথম বীর।
6. একজন মানুষের মৃতু্যশোকের কথা মেনে নিতে পারি না - সংবাদ সাময়িকীর পুরানো কিছু সংখ্যা পড়তে আমি সংবাদ অফিসে যেতাম ... ওখানে দেখতাম বৃদ্ধ একজন মানুষকে - কোনদিন কথা হয় নি - তাকে দেখতাম কুজো হয়ে ধীরে ধীরে হেটে যেতে - সন্তোষ গুপ্ত - তার সেই হাটা - প্রায়ই মনে পড়ে আর তখনই আজব এক কষ্ট হতে থাকে ..
7. মৃতু্য নিয়ে এত কথা লিখবার কারন হচ্ছে - শামসুর রাহমানের মৃতু্য - আমি বারবার ভুলে যাবার চেষ্টা করছি এবং ভাববার চেষ্টা করছি - তিনি আছেন। কবিতার মধ্য দিয়ে বেচে থাকা এইসবতো আছেই ... কিন্তু আমি বলছি শামসুর রাহমান নামক কবি মানুষটার কথা ... তিনি বেচে আছেন বেচে থাকবেন সবই সত্য কথা - কিন্তু সমস্যা হলো খুব মনে হচ্ছে আমরা এমন একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যখন কিছু মানুষের সাইকোলোজিক্যালি নয়, লিটারারি নয় ... ফিজিকালি বেচে থাকার খুব দরকার... এমন কি তিনি যদি কাজের অর্থে ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তবুও... শ্রেফ বেচে থাকার দরকার ... আমদের সামনে একটা জীবন্ত মানুষের একসাম্পল খুব দরকার... আমি জানি না কেন হয়তো এ কারনেই খুব মনে হতো উনি বেচে থাকুন... ঘুমিয়ে হলেও ... কিন্তু ... আমার খুব কষ্ট হচ্ছে..... উনার জন্য নয় - আমার জন্য ... আমাদের এই সময়ের জন্য
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০০৬ বিকাল ৫:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



