ছেলেটার চোখে ভারি চশমা। ছেলেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। মহসিন হলে থাকে। ছেলেটির বাবা পুলিশ অফিসার। অনেকগুলো ভাইবোনের মধ্যে সে সবার বড়।
ছেলেটা বই পড়তে খুব ভালবাসে। আর ভালবাসে ম্যাজিক। অতি প্রাকৃতিক যেকোন বিষয়ে তার সাংঘাতিক আগ্রহ! ভারি চশমার ভেতর দিয়ে অবাক চোখে ছেলেটা তার চারপাশের মানুষ জন দেখে। কি আশ্চর্য্য! প্রত্যেকটা মানুষ একেক টা আলাদা জগত!! শিশু কিশোর তরুণ তরুণী যুবক বৃদ্ধ সবাই নিজ নিজ বিশ্বাস ধ্যান ধারণাকে চুড়ান্ত ধরে নিয়ে একেক জন একেক রকম আচরণ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই আচরণ গুলোর হাস্যকর দিকটা কেউ দেখেনা। এই আচরণের লুপে আটকা পড়ে তৈরি হয় অনন্ত দূঃখের দিনরাত্রি।
কিন্তু ছেলেটার চশমার কাঁচ মোটেও ঝাপসা নয়। চশমার কাঁচের ভেতর দিয়ে দূ’দিক টাই দেখতে পায়। যুগ যুগ ধরে নির্মিত এবং প্রবাহিত কৌশলী কুসংস্কারের খাঁচায় বন্দী অসহায় মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকা যে মানবিক সম্ভাবনা, যে খন্ড খন্ড প্রতিরোধ, যে ছোট ছোট সুন্দর গুলো ভবিষ্যতে তাকে মুক্তি দিতে পারে স্ব-নির্মিত খাঁচা থেকে সেগুলোও সে দেখে।খুব ভালভাবেই দেখে। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ পড়ে কেঁপে উঠে মানুষ! এত অনায়াস বর্ণনায় কেমনে ফুটে এ অসাধারণ জোছনার ফুল!
জোছনার ফুল ফুটতেই থাকল। যে শ্যামল ছায়ার জন্য মুক্তি যোদ্ধারা আজীবন লড়ে যায় সেই শ্যামল ছায়ার আজন্ম চলমান ইতিহাসের যে টুকরো টা আমাদের হৃৎপিন্ড ভেদ করে যায় সেটাকেও ধরে ফেলে তার ‘আশ্চর্য্য সাধারণ কলম’। এই কলমের সবচেয়ে বড় জাদু, এর কোন জাদু নেই!
নির্বাসন এর পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা যখন একটি মাত্র সংলাপে( ‘একটা যুদ্ধে অনেক কিছু হয় পরি!’) ঘোষণা করে মুক্তিযোদ্ধারা কেন জিতে যায় পৃথিবীর সব দেশে সব কালে তখন এই জাদুহীন কলমের জাদুকরীতে পাঠক আবার থমকে যায়।
জোছনা কারিগর পথ চলতে থাকেন। বিটিভির একজন প্রযোজক ভাবেন জোছনার একটা ধারা এই টেলিভিশন চ্যানেলে প্রবাহিত করলে কেমন হয়! টেলিভিশন চ্যানেলে প্রবাহিত হওয়া শুরু হয় জোছনাধারা। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’ মানুষ শুধু নাটক হিসেবে দেখেনা। নিজেদের চলমান জীবনের পাশাপাশি এও এক অবিচ্ছেদ্য জীবন! পরিবারে বাবা মা ছেলে মেয়ে নানি দাদি কাজের মেয়ে লজিং স্যার সবাই মিলে একসাথে দেখে নিজের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। চোখের সামনে মেলে ধরা সাদা কাগজে সবাই দেখে তার নিজের জীবনটাই আঁকা। শুধু একটু স্বপ্নের মোড়কে ঢাকা। এই স্বপ্নের মোড়ক জোছনা কারিগরের চোখের জল। এই চোখের জল ই তার বুকের ভালোবাসা জোছনা। এই জোৎস্নাবেগে আগে নিজে মাখামাখি হয়েই উনি লিখতে বসেন। কাজেই এই স্বপ্নমোড়ক কে ক্ষমা করা যায়।
নক্ষত্রের পথ চলার সাথে সাথে পৃথিবীতে চলতে থাকে নক্ষত্রের পতনের আয়োজন ! নক্ষত্র যেদিন থেকে হলুদ হিমু হয়ে জোছনা চরাচরে খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি শুরু করে সেদিন কি কিছুটা হলেও বদলে যায় নক্ষত্রের গতিপথ? উত্থান এবং পতনের একটা সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যায় ভারি একটা চশমার দিগন্ত রেখা হতে?? হিমু হাঁটে, চারপাশের সমস্ত সীমাবদ্ধতা নিজের মধ্যে নিয়ে অসীম হয়ে হাঁটে। হিমুর এই অসীমতাই এক সময় কাল হয়! রসায়নের দ্বি-মুখী বিক্রিয়ার নিয়ম মেনে হিমু একসময় রচনা করতে শুরু করে হুমায়ুন কে! হিমু রচিত এই হুমায়ুন মিঃ হাইড হয়ে রচনা করে কিছু অর্থহীন নাটক। জীবনে এবং পর্দায়!
জোছনা কারিগরের এটুক সীমাবদ্ধতায় নিজেকে আটকে ফেলে তার জোছনা সরোবরে স্নান করা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করাটাও অনেক বড় সীমাবদ্ধতা। বলাবাহুল্য এই সীমাবদ্ধতায় আটকে পড়া পাঠক এবং অপাঠকের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


