দুশো বছরের পুরানো ও ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি মন্দির আবার নতুন করে দাঁড় করাতে হবে। এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে
ইঞ্জিনিয়ার তারেক আহমেদকে। তিনি তাঁর দলবল নিয়ে এই অজ পাড়াগাঁয়ে এসেছেন আজ সাতদিন হলো। ঢাকায়
তাদের ফার্মের বেশ সুনাম থাকাতে এধরনের একটি ঝুঁকিপূর্ণ আর স্পর্শকাতর স্থাপনা তৈরির দায়িত্ব সরকারের তরফ
থেকে তাদের উপরেই ন্যস্ত হয়েছে।
অনেক দিনের পুরানো মন্দির। এখন শুধু ওটার ধ্বংসাবশেষই আছে। সেটাকে ভেঙে একটা নতুন মন্দির দাঁড় করানোটাকে
প্রথম দিকে তারেক আর তার দলবল চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন বুঝতে পারছেন কত বড় ভুল হয়েছে।
এই অজ পাড়াগাঁয়ে নূ্যনতম নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে তাঁরা এই সাতদিনেই বেশ হাঁপিয়ে উঠেছেন। তার উপর
আবার চার-পাঁচদিন ধরে শুরু হয়েছে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। থামার কোন লক্ষণ নেই। বছরের এ সময়ে এটা একেবারেই
বেমানান। তারেক আহমেদ নিজে তো বিভিনড়ব সমস্যায় ভুগছেনই, তাঁর সাথে যারা এসেছে তারাও নানাজন নানা রকম
অভিযোগ করছে। বৃষ্টির পানিতে মাটি হয়ে উঠেছে থকথকে কাদা। কোথাও কোথাও বুট পরা পায়ের অর্ধেক কাদার
ভেতরে দেবে যায়। তখন আরেকজন এসে তাকে টেনে তোলে। সবকিছু মিলিয়ে কিছুদিন ধরে এক নারকীয় অবস্থার সৃষ্টি
হয়েছে।
অথচ প্রথম দুটি দিন কি সুন্দর ছিল! কি চমৎকার রৌদ্রালোকিত দিন! কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই কে জানে সে রোদ
কোথায় হারিয়ে গেল। প্রকৃতি যেন এরপর রুদ্ররোষে ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু এরপরও ওরা কাজ বন্ধ করেনি।
সকলেই চেষ্টা করেছে যতটুকু সম্ভব কাজ করার। কিন্তু এভাবে আর কত। কাজের অগ্রগতি হয়েছে খুব সামান্য।
তারেক মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, আজকের দিনটা দেখে কাল ঢাকায় যোগাযোগ করে আপাতত কিছুদিনের জন্যে কাজ বন্ধ
রাখার কথা বলবেন।
স্থানীয় দশ-বারোজন লোককে মাটি খোঁড়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা এই দুর্যোগেও পুরোদমে কোদাল চালিয়ে যাচ্ছে।
তারেক একটি বর্ষাতি গায়ে দিয়ে এমুহূর্তেও ওদের কাজ তদারকি করছেন। ভাঙা মন্দির থেকে সামান্য কিছুটা দূরে
তারেকরা থাকার জন্যে পাশাপাশি তিনটি তাঁবু গেড়েছেন। সেটার একটি থেকে কেউ একজন দৌড়ে এসে ওঁকে কি যেন
বলল। তারেক তড়িঘড়ি করে তাঁবুতে চলে এলেন। ঢাকা থেকে জরুরী ফোন কল এসেছে। ফোন তুলে ধরতেই ওপাশ
থেকে ওদের ঢাকা অফিসের ইনচার্জ সাদেকুল করিমের গলা শুনতে পেলেন। 'তারেক সাহেব, কাজ বন্ধ করে দিন।
তল্পিতল্পা গুটিয়ে সবাইকে নিয়ে চলে আসুন। সরকার এ ফান্ডে যে টাকা দিয়েছিল, সেটা উইথড্র করেছে। সুতরাং বুঝতেই
পারছেন, এর পরে আর আমাদের পক্ষে কাজ চালিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। তবে ভাববেন না, সরকার ক্ষতিপূরণ হিসেবে
আমাদেরকে একটা বড় ধরনের অ্যামাউন্ট দিতে রাজী হয়েছে।' সাদেকুল করিমের গলায় বেশ খুশি খুশি ভাব।
এপ্রান্তে তারেক মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। যাক বাবা, বাঁচা গেল। এ ধরনের বিশ্রী পরিবেশে আর কাজ করতে
হবে না। আর তাছাড়া, ওর অধীনস্থদের এরকম পরিবেশে আর দুদিনও রাখা যেত কিনা সন্দেহ। শেষ পর্যন্ত ওকে ফেলেই
হয়তো সবাই ঢাকা চলে যেত। স্বস্তি গোপন করে তারেক বললেন, 'কিন্তু কেন, স্যার? আমাদের দিক থেকে কোন
সমস্যা?'
'না, না, এটা পুরোটাই সরকারের নিজস্ব ব্যাপার। তারা আমাদের কোন ফল্ট খুঁজে পায়নি। আচ্ছা রাখি, আপনি যত
শিগ্গির পারুন চলে আসুন।'
দু'ঘণ্টা পর। সবাই সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই সবাই ঢাকার পথে রওনা হবে। সেজন্যে সবাই বেশ
ফুরফুরে মেজাজে আছে। আগের সেই বিমর্ষ ভাব আর নেই। মাটি খননের কাজে নিয়োজিত স্থানীয় শ্রমিকদের পাওনা
অনেক আগেই মিটিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের সবাই চলে গেলেও, একজন লোক এখনও যায়নি। তারেক তাঁবু থেকে
বেরিয়ে শেষবারের মত যখন জায়গাটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন, এই সময় লোকটার দিকে ওঁর নজর পড়ল। লোকটা একা
একা খনন করা গর্তটার সামনে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। তারেক তার দিকে এগিয়ে যান। 'কি ব্যাপার, তুমি দাঁড়িয়ে আছ!
তোমার পাওনা মিটিয়ে দেয়া হয়নি?'
লোকটি মাথা চুলকে স্বভাবসুলভ সরল হাসি দিয়ে বলে ওঠে, 'হইছে স্যার, তয় যাওনের আগে আপনেরে একটা জিনিস
দেখাইতাম।'
'কি জিনিস?'
সে এদিক ওদিক তাকায়। 'আপনের তাঁবুর ভেতরে চলেন।'
তারেক লোকটাকে ওঁর তাঁবুতে নিয়ে আসে। লোকটা লুঙ্গির ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটা পুরানো পলিথিন বের করে আনে।
ভেতর থেকে ধাতব কি যেন একটা বের করে তারেকের দিকে এগিয়ে দেয়। তারেক সেটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে
থাকেন। জিনিসটা নিরেট পাথরের তৈরি একটি পা। সাইজে পাঁচ থেকে ছয় ইঞ্চির মত হবে। অবিকল ছোট বাচ্চাদের
পায়ের মত। একেবারে জীবন্ত। ভাঙা দিকটা দেখলে মনে হয় জিনিসটা একসময় ছোট্ট কোন মূর্তির শরীরের অংশ ছিল।
তারেকের মুখ দিয়ে নিজের অজান্তেই অস্ফুটে বেরিয়ে আসে। 'এটা কোথায় পেলে?'
'মাটি খোঁড়ার সময় পাইছি, স্যার। কাউরে দেহাই নাই। আপনেরে দেহামু বইলা লুকায়া রাখছি।'
'কিন্তু মূর্তিটার বাকি শরীর কোথায়?'
'কইতে পারতাম না, স্যার। তয় মনে করছিলাম ঠ্যাংটা যখন পাইছি, পুরা শইলডাও পামু। কিন্তু অনেক খুঁইজাও আর কিছু
পাই নাই। তাইলে স্যার আমি যাই।'
'আচ্ছা, যাও।'
লোকটা চলে যাওয়ার জন্যে ঘুরতেই তারেক তাকে কি মনে করে থামান। পকেট থেকে বকশিশ স্বরূপ লোকটাকে সে কিছু
টাকা দেন।
সেদিন বিকেলে গরুর গাড়িতে করে ওরা যখন চলে আসছিল, তারেক সেসময় পেছনে চেয়ে চেয়ে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষটা
দেখছিলেন। মন্দিরের সামনে ওদের খোঁড়া বিরাট গর্তটা ইতিমধ্যে বৃষ্টির পানিতে ভরে গেছে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে
যাওয়াতে মন্দিরটাকে কেমন ভূতুড়ে লাগছে। তারেক চোখ ফিরিয়ে নেন।
সেরাতে শুতে যাবার আগে হঠাৎ করে তারেকের ওই ভাঙা পায়ের কথা মনে পড়ে। ওটা আজ দুপুরে ওকে তাঁবুর ভেতর
অপরিচিত লোকটি দিয়েছিল। ট্রাভেল ব্যাগ খুলে পলিথিনে মোড়ানো পা'খানি বের করেন তিনি। জিনিসটা হাতে নিয়ে
তারেকের শরীর শির শির করে ওঠে। কেন জানি মনে হয়, তিনি জীবন্ত কোন কিছু ধরে আছেন। নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে
তিনি আরেকটি জিনিস দেখে বিস্মিত হন। পায়ের গোড়ায়, অর্থাৎ যেখান থেকে পা'খানি ভেঙেছে, সেখানে ছোপ ছোপ
শুকনো রক্তের দাগ। কেমন কালচে লাল। মনে হচ্ছে ওখানটায় একসময় প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল। কিন্তু সেটা কি করে
হবে? জিনিসটা তো নিরেট পাথর বৈ আর কিছু নয়। ওঁর মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। ব্যাপারটার কোন কুলকিনারা করতে
পারেন না। শেষে যেভাবে ছিল সেভাবে আবার জিনিসটা ব্যাগে ভরে রেখে শুয়ে পড়েন। সারাদিনের ক্লান্তিতে কিছুক্ষণের
মধ্যেই ইঞ্জিনিয়ার তারেক আহমেদ গভীর ঘুমে তলিয়ে যান।
সারাদিনের টিপ টিপ বৃষ্টি এখন এই গভীর রাতে তুমুল বর্ষণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তার সঙ্গে শুরু হয়েছে তীব্র বাতাস।
তুমুল ঝড়-বৃষ্টি ভাঙাচোরা মন্দিরটাকে কুয়াশার মত ঢেকে ফেলেছে। বৃষ্টির পানিতে মন্দিরের ছোট্ট উঠান ডুবে গেছে।
মাঝখানে করা বড় গর্তটা অনেক আগেই পানিতে তলিয়ে গেছে। মন্দিরের পেছনে ঝোপ-জঙ্গলে ভরা জায়গাটাতে বহু
বছরের পুরানো একটি বটগাছ রয়েছে। সেটার নিচে এই তুমুল বৃষ্টিতে আশ্রয় নিয়েছে একজন মানুষ। মানুষটা মানসিক
ভারসাম্যহীন। একজন উন্মাদ। গ্রামের সবাই তাকে বাতাসী পাগলী বলে চেনে। সে দু'হাতের মধ্যে ছোট্ট একটা পাথরের
মূর্তি ধরে আছে। নিজের শরীরের শতচ্ছিনড়ব কাপড়টুকু দিয়ে সে বার বার পাথুরে মূর্তিটাকে মুছে দিচ্ছে। কিন্তু মূর্তিটার
ক্ষতস্থান থেকে পড়া রক্ত কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। টকটকে লাল তাজা রক্ত। মূর্তিটার একটি পা নেই। চারদিকে নিকষ
কালো অন্ধকার হলেও ওটার পাথুরে চোখদুটো ভাটার মত জ্বলজ্বল করছে।
লন্ডন। প্রফেসর রবার্টসন তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে বসে একটি বইয়ের উপর ঝুঁকে আছেন। বইটি বহু বছরের পুরানো
প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাসের উপর লেখা। ইতিহাসের উপর প্রফেসরের প্রচণ।ড ঝোঁক থাকায় তাঁর একজন বন্ধু সুদূর
ভারত থেকে এই বইটি পাঠিয়েছিলেন বছর দেড়েক আগে। তারপর থেকে তিনি নাওয়া খাওয়া ভুলে এই বইয়ের উপরই
পড়ে আছেন। বইটি বহু আগের প্রাচীন ভাষায় লেখা। আর তাই বইটা পড়ে বুঝতে বা অর্থ উদ্ধার করতে তাঁর বেশ কষ্ট
হচ্ছে। পুরানো পার্চমেন্ট অনেক জায়গায় খসে পড়ে গেছে। লেখাগুলো ঝাপসা হতে হতে কোথাও একেবারে মিলিয়ে
গেছে। তারপরও প্রফেসর অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে বইটি পড়ার চেষ্টা করছেন। তবে মাস ছয়েক ধরে তিনি বইটার একটি
প্যারার মর্ম উদ্ধার করতে পারছিলেন না। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে তাঁর মনে হলো, তিনি সেটা পেরেছেন। আর তাই
উত্তেজনায় বইটির উপর ঝুঁকে পড়েছেন। প্রফেসর অনুবাদ করা প্যারাটা পড়তে শুরু করলেন।
'রাজা ছিলেন খুব অত্যাচারী। সবাই তাঁর আনুগত্য মেনে নিলেও মন্দিরের ওই পুরোহিত তাঁর আনুগত্য মেনে নেননি।
তিনি কিছু লোকসহ রাজার বিপক্ষে বিদ্রোহ করেন। এতে রাজা ক্ষুব্ধ হয়ে মন্দিরটি জ্বালিয়ে দেন। আর পুরোহিত সহ ওই
লোকগুলোকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারার হুকুম দেন। ওই সময় রানী ছিলেন গর্ভবতী। অনেক দিন পর তিনি সন্ত
ানসম্ভবা হয়েছিলেন। মারা যাবার সমসয় পুরোহিত রাজাকে ভয়ঙ্কর এক অভিশাপ দিয়ে যান। বলেন, 'রাজা, তোমার কোন
উত্তরাধিকার থাকবে না। তোমার স্ত্রী যে সন্তান প্রসব করবে সে জন্মের পর পাথর হয়ে যাবে।'
বলা বাহুল্য অত্যাচারী রাজা তাতে কান দেননি। এর কিছুদিন পর রানী একটা ফুটফুটে পুত্র-সন্তান প্রসব করেন। রাজার
মনে খুশির জোয়ার বয়ে যায়। কিন্তু পুরোহিতের অভিশাপ মত কিছুদিনের মধ্যেই সে সন্তান ধীরে ধীরে পাথরে রূপান্তরিত
হতে থাকে। রাজা অনেক ওঝা অনেক কবিরাজ ডাকেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। সবার চোখের সামনে দিয়ে ফুটফুটে
সেই সন্তান একসময় নিরেট পাথর হয়ে যায়। রাজা তাঁর ভুল বুঝতে পারেন। কিন্তু তখন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
পরবতর্ীতে রাজা তাঁর পাপের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ পাথর হয়ে যাওয়া সন্তানটিকে ওই ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের সামনের উঠোনে
সমাহিত করেন।' প্যারাটি এখানেই শেষ। নিচে কোথাও এ প্রসঙ্গে আর কিছু লেখা নেই। এমনিতে প্রচণ্ড বাস্তববাদী মানুষ
প্রফেসর রবার্টসন। যুক্তিহীন কোন কিছুকে তিনি একেবারেই প্রশ্রয় দেন না। আর তাই ইতিহাসের বইতে এ ধরনের একটি
রূপকথার মত কাহিনী পড়ে স্বভাবতই তিনি বেশ বিরক্ত বোধ করতে থাকেন। মনে মনে ভাবেন, তাঁর গত ছ'মাসের
পরিশ্রম হয়তো একেবারেই বৃথা গেল।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



