"এই তো আমি দেখছি, তুমি নিজ থেকে কোন কথা বলছ না, আমি কিছু জিজ্ঞেস করলে
উত্তর দিচ্ছ। তাও ছাড়া-ছাড়া ভাবে, কাটা-কাটা ভাবে।"
রন নিশিকে নিজের কাছে টেনে এনে বলল, "আমি দুঃখিত নিশি। কয়দিন থেকে কেমন
যেন অস্থির-অস্থির লাগছে।"
"কেন ? কি হয়েছে ?"
"জানি না কেন। আমার বয়স প্রায় দুই হাজার বৎসর হয়ে গেছে কিন্তু এখনো মনে হয়
নিজেকে বুঝতে পারি না।"
নিশি রনের গলা জড়িয়ে খিলখিল করে হেসে বলল, "তোমার বয়স দশ হাজার বৎসর
হলেও তুমি নিজেকে বুঝতে পারবে না। কিছু কিছু মানুষ নিজেকে বুঝতে পারে না।"
রন কোমল চোখে নিশির দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি কি নিজেকে বুঝতে পারো ?"
নিশি মাথা নাড়ল, বলল, "পারি। এই যেমন মনে করো তোমার পাশে বসলেই আমার মনে
হয় আমার বয়স এক হাজার বৎসর কমে গিয়েছে!"
"সত্যি ?"
"সত্যি।"
রন মাথা নাড়ল, বলল, "আমি বিশ্বাস করি না। এক হাজার বৎসর আগে তোমার কেমন
লাগত সেটি তোমার মনে নেই। তোমার মনে থাকার কথা নয়।"
নিশি হাসি-হাসি মুখে বলল, "মনে না থাকলে নেই - সবকিছু মনে রাখতে হবে তোমাকে
কে বলেছে ?"
"আমার মাঝে মাঝে খুব মনে করার ইচ্ছে করে।" রন একধরনের উদাস-চোখে বলল,
"আমার কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি মনে করার ইচ্ছে করে জানো ?"
"কোন জিনিসটা ?"
"আমার শৈশবের কথা। আমি শৈশবে কি করেছি খুব জানার ইচ্ছে করে।"
"সেটি তুমি কেমন করে জানবে ? গত দুই হাজার বৎসরে তুমি নিশ্চয়ই তোমার স্মৃতি খুব
কম করে হলে পাঁচবার মুছে দিয়েছ।"
"নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই দিয়েছি।"
"তুমি যতবার তোমার নূতন জীবন শুরু করেছ ততবার তুমি তোমার স্মৃতি মুছে দিয়েছ।"
রন মাথা নাড়ল, "আমার নূতন জীবনটি কতটুকু নূতন কে জানে !"
নিশি খিলখিল করে হেসে বলল, "এডভেঞ্চারের দিকে তোমার যত ঝোক আমি নিশ্চিত
তুমি এক দুইবার ছেলে থেকে মেয়ে হয়েছ, মেয়ে থেকে ছেলে হয়েছ ! দুই হাজার বৎসরে কত
কী করা যায় !"
রন কোন কথা না বলে একটু হাসল। নিশি হঠাৎ মুখ গম্ভীর করে বলল, "আমার কী ইচ্ছে
করে জানো ?"
"কী ?"
"আমার খুব সন্তানের মা হতে ইচ্ছে করে। এরকম ছোট একটা বাচ্চা হবে, অাঁকুপাকু
করে নড়বে, আমি বুকে চেপে ধরে রাখব, ভাবলেই আমার বুকের ভিতর কেমন জানি করতে
থাকে।"
রন নিশিকে স্নেহভরে কাছে টেনে নিয়ে বলল, "তুমি খুব ভালো করে জান সেটি হবার
নয়। পৃথিবীতে নূতন শিশুর জন্ম দেয়া বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় এক হাজার বৎসর আগে।"
"জানি। তবুও ইচ্ছে করে।"
"পৃথিবী যত মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে এখানে তার থেকে অনেক বেশি মানুষ। আমার
শুধু কী মনে হয় জানো ?"
"কী ?"
"পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা আবার বুঝি আশঙ্কা-সীমা পার হয়ে গেছে।"
নিশি চমকে উঠে বলল, "কী বলছ তুমি !"
"হঁ্যা। মনে নেই গত কয়েক মাস থেকে খাবার পরিবহনে ত্রুটি দেখা দিয়েছে, পানীয়ের
সরবরাহ কম।"
"হঁ্যা।"
"আমার ধারণা এগুলো পরিবহনের বা সরবরাহের ত্রুটি নয়।"
নিশি ভয়-পাওয়া গলায় বলল, "তাহলে এগুলো কী ?"
"এগুলো অভাব। শুধু-যে খাবারের অভাব তাই নয়, জ্বালানির অভাব, জায়গার অভাব।
তুমি লক্ষ্য করেছ আমাদের এই দুইহাজার তলা দালানে একটি এপার্টমেন্ট খালি নেই? দেখেছ?
"হঁ্যা। দেখেছি।"
"মনে আছে পোশাকের মূল্য শতকরা বিশভাগ বাড়ানো হলো। মনে আছে ?"
নিশি মাথা নাড়ল, তার মনে আছে। রন গম্ভীরমুখে বলল, "আমার এইসব দেখে মনে হয়
কী জানো ?"
"জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের একটা ব্যবস্থা নেয়া হবে ?"
"হঁ্যা।"
নিশির বুক কেঁপে উঠে, পৃথিবীতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যে গত দুই হাজার বৎসরে বেশ
কয়েকবার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সেই স্মৃতি তাদের মস্তিষ্ক থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে, কিন্তু তবু
তারা সেগুলো জানে। পৃথিবীর মানুষ এখন এই ভয়াবহ আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকে, কখন পৃথিবীর
প্রয়োজনে তাকে পৃথিবী থেকে অপসারণ করিয়ে দেয়া হয়।
নিশির ভয়-পাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে রন গভীর ভালোবাসায় তাকে বুকের মাঝে টেনে
নেয়। অপূর্ব রূপসী এই রমণীটিকে সে মাত্র তিনশত বৎসর আগের থেকে চেনে। ছেলেমানুষী
সরল এই মেয়েটিকে তার বড় ভালো লাগে।
গভীর রাতে তীক্ষ্ন সাইরেনের শব্দে নিশি চমকে জেগে উঠল। বিছানায় তার পাশে শূন্য
জায়গা, রন আগেই উঠে গেছে। নিশি ভয়-পাওয়া গলায় ডাকল, "রন। কোথায় তুমি ?"
জানালার কাছে ছায়ামূর্তির মত রন দাঁড়িয়েছিল, বলল, "এই যে, আমি এখানে।"
"কি হয়েছে রন ? সাইরেন বাজছে কেন ?"
"পৃথিবীর মানুষের এখন খুব বড় বিপদ নিশি।"
"কি হয়েছে ? কেন বিপদ ?"
"পৃথিবীর জনসংখ্যা আশঙ্কা-সীমা পার হয়ে গেছে।"
"পার হয়ে গেছে ?" নিশি আতঙ্কে চিৎকার করে বলল, "পার হয়ে গেছে ?"
"হঁ্যা। শুনছ না বিপদের সাইরেন ?"
"এখন কি হবে ?"
"জনসংখ্যা কমাতে হবে।"
"কীভাবে কমাবে ? কাকে কমাবে ?"
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



