somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিশির জন্যে ভালোবাসা - মুহম্মদ জাফর ইকবাল (3য় খন্ড)

১৩ ই মে, ২০০৬ ভোর ৫:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"জানি না। যোগাযোগ মডিউল খুলে দেখি।"
রন যোগাযোগ মডিউলের নিয়ন্ত্রণ স্পর্শ করতেই ঘরের ভেতরে একজন মানুষের
হলোগ্রাফিক প্রতিচ্ছবি ভেসে এল। মধ্যবয়স্ক কঠোর চেহারার মানুষ, বুকের উপর চারটি লাল
রঙের তারা দেখে বোঝা যায় সে নিয়ন্ত্রণ বাহিনীর অত্যন্ত উচ্চপদস্থ কর্মচারী। মানুষটি কঠোর
গলায় বলল, "পৃথিবী আবার ভয়ংকর বিপদের মুখোমুখি। মানুষের একটি বিশেষ সংখ্যায় পৌছে
গেলে পৃথিবী তাকে বহন করতে পারে না, একটি অপ্রতিরোধ্য বিপর্যয় দিয়ে পৃথিবীর জনসংখ্যা
কমে আসে। আমরা সেই অপ্রতিরোধ্য বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে যেতে চাই না। সেই বিপর্যয়
নিয়ন্ত্রণহীন এবং তার ভেতর থেকে বের হয়ে আসা খুব কঠিন।
"অতীতে জনসংখ্যা যখনই আশঙ্কার সীমা অতিপ্প ঙ্ক করেছে তখনই মানুষের সংখ্যা কমিয়ে
নূতন শিশুর জন্ম দেয়া হয়েছে। যারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে ইচ্ছুক তাদের তালিকা করে
পৃথিবী থেকে অপসারণ করা হয়েছে। সেই সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল হওয়ায় লটারির মাধ্যমে
নির্বাচন করে মানুষকে অপসারণ করা হয়েছে। মানুষকে অত্যন্ত দ্রুত হত্যা করতে পারে এরকম
ভাইরাস তৈরি করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়ে একবার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ কমিয়ে দেয়া
হয়েছিল। কিন্তু অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটেছে, এখন এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে হত্যা করেও
পৃথিবীকে রক্ষা করা যাবে না। এখন পৃথিবীর অর্ধেক মানুষকে কমিয়ে আনতে হবে। যেভাবেই
হোক।
"পৃথিবীর জনসংখ্যা কমানোর জন্যে এবার সম্পূর্ণ নতুন এবং কার্যকর একটি পদ্ধতি গ্রহণ
করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই পদ্ধতি অবলম্বন না করা হলে মহা-বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার
কোন উপায় নেই। পদ্ধতিটি অত্যন্ত সহজ। আজ রাতের জন্যে মানুষ হত্যাসংপ্প ঙ্কন্ত
বিধিনিষেধটি পৃথিবী থেকে তুলে নেয়া হল। পৃথিবীর প্রত্যেকটি জীবিত মানুষ অন্য একজন
মানুষকে পৃথিবী থেকে অপসারণ করবে। এই হত্যাকাণ্ডের জন্যে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে
হবে না, বরং সে পৃথিবীতে বসবাসের সুযোগ পাবে। তাকে যেন হত্যাকাণ্ডের অপরাধবোধে
ভুগতে না হয় সেজন্যে কাল ভোরের আগেই তার পুরো স্মৃতিকে অপসারিত করে দেয়া হবে।
"মানুষ হত্যা করা খুব সহজ ব্যাপার নয়। এর কার্যকর কয়েকটি পদ্ধতি সবাইকে জানিয়ে
দেয়া হচ্ছে। পদ্ধতিগুলি হচ্ছে -"
নিশি চিৎকার করে যোগাযোগ মডিউলটি বন্ধ করে দিতেই ঘরের মাঝামাঝি বসে থাকা
কঠোর চেহারার মানুষের হলোগ্রাফিক প্রতিচ্ছবিটি অদৃশ্য হয়ে গেল। নিশি উদভ্রান্তের মতো
রনের দিকে তাকাল, বলল, "এটা হতে পারে না। এটা কিছুতেই হতে পারে না।"
রন বিষনড়ব গলায় বলল, "কিন্তু এটা হয়ে গেছে।"
"একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে হত্যা করতে পারে না।"
"প্রয়োজনের খাতিরে মানুষ অনেকবার অনেক মানুষকে হত্যা করেছে। পৃথিবীর ইতিহাস
হচ্ছে যুদ্ধের ইতিহাস। যুদ্ধের অর্থ হচ্ছে হত্যাকাণ্ড। পরিকল্পিত সুসংবদ্ধ হত্যাকাণ্ড।"
নিশি ব্যাকুল হয়ে বলল, "কিন্তু এটি তো যুদ্ধ নয়।"
"কে বলেছে যুদ্ধ নয় ? মানবজাতিকে বেঁচে থাকার জন্যে এটিও একধরনের যুদ্ধ। এখানে
মানুষ নিজেরা নিজেদের শত্রু। তাই এখন একে অন্যকে হত্যা করবে। মানুষকে যেন সেই
হত্যাকাণ্ডের অপরাধবোধ বহন করতে না হয় সেজন্যে তার স্মৃতিকে পুরোপুরি অপসারণ করে
দেয়া হবে। সে জানতেও পারবে না সে একটি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে।"
নিশি হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মত মাথা নেড়ে বলল, "না-না-না। এটা হতে পারে না। কিছুতেই
হতে পারে না। একজন মানুষ অন্যকে খুন করতে পারে না।"
রন বিষনড়ব গলায় বলল, "এটি সেরকম খুন নয়। এর মাঝে কোন প্পে ঙ্কধ, জিঘাংসা, স্বার্থ বা
লোভ নেই। এটি একটি প্রপ্পি ঙ্কা, পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার একটি প্রপ্পি ঙ্কা। এর সিগ্ধান্ত কোনো
মানুষ নেয়নি, তারা শুধুমাত্র নিয়মটি পালন করেছে।"
নিশি এবার মুখ ঢেকে আকুল হয়ে কেঁদে ফেলল, কাঁদতে কাঁদতে বলল, "কিন্তু আমি
কেমন করে একজন মানুষকে খুন করব ? কাকে খুন করব ? কেমন করে খুন করব ?"
রন কিছু বলল না, গভীর মমতায় নিশির দিকে তাকিয়ে রইল। নিশি ব্যাকুল হয়ে রনের
দিকে তাকাল, রন তাকে গভীর ভালোবাসায় আলিঙ্গন করে বলল, "নিশি, তোমার কাউকে খুন
করতে হবে না। আমি তোমাকে রক্ষা করব নিশি।"
"কেমন করে তুমি আমাকে রক্ষা করবে ?"
রন কোন কথা বলল না, গভীর মমতায় সে নিশির মুখে হাত বুলিয়ে বলল, "এই যে।
এইভাবে।"
নিশি অনুভব করল রনের শক্ত দুটি হাত তার গলায় চেপে বসেছে, নিশি নিজেকে মুক্ত
করার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। একবিন্দু বাতাসের জন্যে তার বুকের ভেতর হাহাকার করতে
থাকে কিন্তু রনের হাত এতটুকু শিথিল হল না। নিশি বিস্ফারিত চোখে রনের মুখের দিকে
তাকিয়ে রইল, সেই মুখে কোনো প্পে ঙ্কধ নেই, কোনো জিঘাংসা নেই, কোনো প্রতিহিংসা নেই।
সেই মুখে গভীর বেদনা এবং ভালোবাসা।
নিশির জন্যে ভালোবাসা এবং পৃথিবীর জন্যে ভালোবাসা।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুসা নবী এবং ফেরাউন

লিখেছেন রাজীব নুর, ৩০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮



মুসার নবীর নির্দেশ অমান্য করে এবং আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কারণে-
লোহিত সাগরে ডুবে ফেরাউনের করুণ মৃত্যু হয়। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এমন এক ফেরাউনের আমলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন- যিনি রামেসিস... ...বাকিটুকু পড়ুন

যুদ্ধ ও প্রেমের দিন

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ৩০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪১




অরুনিমা, এখন যুদ্ধ চলছে চারদিকে
তাই হুটহাট ঘর থেকে বের হবেনা, আমার অপেক্ষায় থেকো না বাগানে বসে
কখন যে বোমারু বিমান বোমা ফেলে দেয় বলা তো যায় না।

তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বেজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭২০১৪

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ৩০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৫৮

"ভাই, এইখানেই নামবেন?"

হেল্পার ছেলেটা দরজার হাতল ধরে আমার দিকে ঠিক এমনভাবে তাকালো, যেন আমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করতে যাচ্ছি। বাসের ভেতরের হলদে আলোয় ওর মুখটা কেমন বিবর্ণ দেখাচ্ছিল। চোখের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯২

লিখেছেন রাজীব নুর, ৩০ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১৯



বিএনপি সরকার দেশে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই দেশে প্রতারকের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
প্রতারক সব আমলেই ছিলো। কিন্তু বিএনপির আমলে যেন প্রতারকের উৎসব শুরু হচ্ছে। দেশে বেড়ে গেছে মারামারি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার পছন্দের বাংলা গানগুলো

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১:১১


অনেকদিনের ইচ্ছে পছন্দের বেশকিছু গান নিয়ে একটা পোস্ট দেব। দেওয়া হয়নি, কারণ, বিষয়টা সময়সাপেক্ষ। আজ হুট করে বসেই পড়লাম। রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুলগীতি, লালনগীতিসহ নানান ধরনের গানের একটা তালিকা করছি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×