বিজ্ঞাপনটি শরীফ আকন্দের খুব পছন্দ হল। ছোট টাইপে লেখা ঃ
সব সমস্যার সমাধান থাকে নাব্জঙ্
কিন্তু যদি থাকে
আমরা সেটা বের করে দেব !
পাশে একটা চিন্তিত মানুষের ছবি। মানুষটিকে ঘিরে পটভূমিতে কিছু কঠিন সমীকরণ, কিছু
যন্ত্রপাতি। একটা ভাস্কর্য, কয়েকটা খোলা বই। কঠোর চেহারার একজন সৈনিক এবং কিছু
ক্ষুধার্ত শিশুর ছবি। বিজ্ঞাপনটি দেখলেই বোঝা যায় 'সমস্যা' বলতে শুধু বিজ্ঞান বা গণিতের
সমস্যা বোঝানো হচ্ছে না, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি এমনকি রাজনীতির সমস্যও বোঝানো হচ্ছে।
শরীফ আকন্দ জিভ দিয়ে পরিতৃপ্তির একটা শব্দ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে সামনে বসে
থাকা নজীবউলব্জ্থাহকে জিজ্ঞেস করল, "কী মনে হয় তোমার নজীব ? এইবারে কী হবে ?" কথার
মাঝে জোর থাকল 'হবে' কথাটির মাঝে।
নজীব আঙ্গুল দিয়ে টেবিলে ঠোকা দিয়ে বলল, "কেমন করে বলি ? এর আগেরবারও তো
ভেবেছিলাম হয়ে যাবে - সেবারেও তো হল না।"
শরীফ ভুরু কুঁচকে বলল, "কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায় তার সংজ্ঞা নিয়ে সমস্যা ! এবারে
অন্তত সেরকম কিছু তো নেই।"
"তা নেই। কিন্তু কোনো ঝুঁকি নেব না। যখনই আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে আমাদের
সিস্টেম কী - পব্জ্থাটফর্ম কী - আমরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছি। বড়জোর বলা হবে নিজস্ব
সুপার কম্পিউটার, আলট্রা কম্পিউটার আর নিউরাল কম্পিউটার !"
"নিউরাল কম্পিউটার !" শরীফ দরাজ-গলায় হা হা করে হেসে উঠল, "এই নামটা খুব
ভালো দেয়া হয়েছে।"
নজীব ভ্রুকুটি করে বলল, "কেন ? নিউরাল কম্পিউটার কি ভুল হল ?"
"না না - ভুল হবে কেন ?" শরীফ আকন্দ দুলে দুলে হেসে বলল, "ভুল নয় বলেই তো
তোমাকে বলছি।" শরীফ টেবিলে রাখা গব্জ্থাসের তরল পদার্থে একটা চুমুক দিয়ে বলল, "তোমার
এই বিজ্ঞাপনের রি-একশান কী ?"
"ভালো। খুব ভালো। কাল পর্যন্ত তেতালিব্জ্থশটা খোঁজ এসেছে।"
"কারা কারা সমস্যার সমাধান চাইছে ?"
"সব রকম আছে। দুজন মন্ত্রী, তিনটা কর্পোরেশনের সি.ই.ও. থেকে শুরু করে স্মাগলিং
সিণ্ডিকেটের মাস্তান এবং ব্যর্থ প্রেমিকও আছে।"
"কী মনে হয় তোমার ! পারব তো করতে ?"
"কেন পারব না ?" নজীব সোজা হয়ে বসে বলল, "আমরা কয়টা টেস্ট কেস করলাম ?
কমপক্ষে দুই ডজন, সবগুলো ঠিক হয়েছে।"
শরীফের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল, বলল, "ঠিকই বলেছ। কয়েকটা কেস দেখে ভয় লেগে
যায়। বিশেষ করে সেই-যে আত্দহত্যার কেসটা - মনে আছে ?"
"হঁ্যা। দিন তারিখ সময় থেকে শুরু করে কিভাবে আত্দহত্যা করবে সেটাও বলে দিল।"
"চিন্তা করলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। এই দেখ।" শরীফ তার হাতটা এগিয়ে দেয়।
সত্যিই তার গায়ের লোমগুলো দাঁড়িয়ে গেছে।
নজীব আঙ্গুল দিয়ে টেবিলে ঠোকা দিয়ে বলল, "আমাদের সবচেয়ে বড় কাস্টমার হবে
পুলিশ ডিপার্টমেন্ট। চিন্তা করতে পার আমাদের এই 'নিউরাল কম্পিউটার' কীভাবে প্প ঙ্কইম সলভ
করবে ?"
"হঁ্যা।" শরীফের চোখ চকচক করে উঠে, "ঠিকই বলেছ।"
"তবে আমাদের খুব সাবধান থাকতে হবে। বাঘে ছুঁলে আঠার ঘা আর পুলিশে ছুঁলে বত্রিশ
ঘা !"
হঠাৎ করে শরীফ সোজা হয়ে বসে বলল, "আচ্ছা নজীব -"
"কী হল ?"
"আমাদের এই প্রোজেক্ট কাজ করবে কি না সেটা আমাদের নিউরাল কম্পিউটারকে
জিজ্ঞেস করলে কেমন হয় ?"
নজীব চিন্তিত-মুখে শরীফের দিকে তাকাল, বলল, "হঁ্যা তুমি ঠিকই বলেছ। আমরা
জিজ্ঞেস করতে পারি। কিন্তু -"
"এর মাঝে আবার কিন্তু কি ? এত টাকাপয়সা খরচ করে এত হৈ চৈ করে একটা প্রোজেক্ট
শুরু করেছি, সেটা যদি কাজ না করে খামোখা তার পিছনে সময় দেব কেন ?"
"ঠিকই বলেছ।" নজীব চিন্তিত-মুখে বলল, "কিন্তুব্জঙ্"
"কিন্তু কি ?"
"আমাদের এই নিউরাল কম্পিউটার সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে, কখনো কখনো কি
হবে তার ভবিষ্যৎবাণীও করে দিতে পারে কিন্তু সেগুলোর সাথে তার নিজের ভবিষ্যত জড়িত
থাকে না। কিন্তু এটার সাথে নিউরাল কম্পিউটারের নিজের ভবিষ্যত জড়িত।"
"তাতে কী হয়েছে।"
"এটা একটা প্রকৃতির সূত্র, কেউ যদি নিজে একটা সিস্টেমের ভেতরে থাকে তাহলে তারা
সেই সিস্টেমকে বিশেব্জ্থষণ করতে পারবে না। অনেকটা হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার সূত্রের
মতো।"
"রাখো তোমার বড় বড় কথা। গিয়ে চলো জিজ্ঞেস করে দেখি।"
"সত্যি জিজ্ঞেস করতে চাও ? আমার মন বলছে কাজটা ঠিক হবে না।"
"কেন ঠিক হবে না ? চলো যাই। ওঠো।"
"এখনই ?"
"অসুবিধে কি ? জিজ্ঞেসই যদি করতে হয় পুরোপুরি শুরু করার আগেই জিজ্ঞেস করা
যাক।"
"ঠিক আছে।" নজীবউলব্জ্থাহ খানিকটা অনিচ্ছা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। টেবিলে রাখা পানীয়টা
এক ঢোকে শেষ করে দিয়ে হাতের পেছন দিয়ে মুখ মুছে বলল, "চলো।"
দুজন বিল্ডিঙের সংরক্ষিত লিফটে করে সাততলায় উঠে যায়। লিফটের দরজা খোলার
আগে দুজনকেই রেটিনা স্কেন করে নিশ্চিত হতে হল যে তারা সত্যিই প্প ঙ্ক কম্পিউটিং-এর
মালিক শরীফ আকন্দ এবং চীফ এক্সিকিউটিভ অফিসার নজীবউলব্জ্থাহ। ধাতব দরজাটি খোলার
সাথে সাথে সার্ভেলেন্স ক্যামেরাগুলো তাদের দুজনের উপরে স্থির হল। শরীফ আকন্দ
মাইপ্পে ঙ্কফোনে মুখ লাগিয়ে বলল, "সিকিউরিটি, দরজা খুলো।"
"কিছু মনে করবেন না স্যার। পাসওয়ার্ডটি বলতে হবে।"
বাড়াবাড়ি সিকিউরিটি দেখে শরীফ আকন্দ বিরক্ত না হয়ে বরং একটু খুশি হয়ে উঠল, হা
হা করে হেসে উঠে বলল, "এই কোম্পানিটি আমার ব্যাক্তিগত সম্পত্তি।"
"হতে পারে স্যার। কিন্তু আমরা প্রফেশনাল।"
"আজকের পাসওয়ার্ড হচ্ছে, 'বব্জ্থ্যাক হোল'। কালো গহ্বর।"
খুট করে একটা শব্দ হতেই ঘরঘর শব্দ করে দরজা খুলে গেল, দেখা গেল অন্যপাশে
অনেকগুলো মনিটরের সামনে দুজন সিকিউরিটির মানুষ বসে আছে। একজন উঠে দাঁড়িয়ে
বলল, "ওয়েলকাম স্যার - আমাদের এই নির্জন কারাবাসে আমন্ত্রণ।"
"নির্জন বলছ কেন ?" শরীফ আকন্দ হেসে বলল, "তোমার এই ফ্লোরে সবচেয়ে বেশি
মানুষ। সব মিলিয়ে চৌদ্দজন।"
সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা মানুষটি বলল, "আপনি যদি ব্যাপারটা এভাবে দেখেন তাহলে
অবশ্যি আমার কিছু বলার নেই।"
খুব উঁচুদরের একটা রসিকতা করা হেয়েছে এরকম ভঙ্গি করে শরীফ আকন্দ এগিয়ে
গেল। নজীবউলব্জ্থাহ পকেট থেকে ছোট একটা কার্ড বের করে দরজায় প্রবেশ করাতেই একটা
ছোট শব্দ করে দরজা খুলে গেল। লম্বা করিডর ধরে তারা একেবারে শেষপ্রান্তে গিয়ে থেমে
গেল। জায়গাটি শীতাতপ নিয়স্ত্রিত তবুও শরীফ আকন্দের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে যায়।
একটা বড় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "নজীব দরজাটা খুলো।"
নজীবের মুখে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠে, সে চোখ মটকে বলল, "তোমার কাছেও চাবি
আছে।"
শরীফ মাথা নাড়ল, "কিন্তু আমার খুব নার্ভাস লাগে - এখনো আমি অভ্যস্ত হতে পারিনি।
প্রত্যেকবার বুকের ভিতরে কেমন যেন ধ্বক করে ধাক্কা লাগে। তুমি বিশ্বাস করবে না আমি
এখনও মাঝে মাঝে দুঃস্বপড়ব দেখি।"
"কী দুঃস্বপড়ব দেখ ?"
"দুঃস্বপড়ব দেখি যে আমি একটা ছোট বাথটাবে শুয়ে আছি আর আমার চারপাশে বারোটা -"
"বারোটা কি ?"
"তুমি জানো কি ! দরজা খুলো নজীব।"
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



