somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিষয়: ১৪৪ ধারা ও মেট্রোপলিটন এলাকা

০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৪:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"১৪৪ ধারা" শব্দদ্বয় সম্পর্কে বাংগালীর অভিজ্ঞতা অনেক পুরনো এবং জানাশুনাও অনেক পুরনো। বাংলা সিনেমার বদৌলতে দন্ডবিধির ৩০২ ধারা সম্পর্কে আমজনতা জানলেও আমাদের আলোচ্য ধারাটা বাংগালী জাতির গোচরীভূত হয় স্বাধিকার আন্দোলনের সময় থেকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ৭ টি ধাপেও অংগা অংগিভাবে জডিত ছিল এই ধারা, এই ধারা ভেংগেই আমরা পেয়েছিলাম বাংলা ভাষা, এবং এই ধারা লংঘনের কারনে রাজপথে রক্তও কম দেই নি। শুধু তাইনা স্বাধীনতার পরেও বিভিন্ন সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিরোধী দলের সভা সমাবেশ করার রাজনৈতিক অধিকারকে হরন করার জন্য এই ধারাটিকে এখনও ব্যাবহার করে যাচ্ছি। কাজেই এই ধারার গুরুত্ব আমাদের ব্যাক্তি ও রাজনৈতিক জীবনে অপরিসীম। সম্প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার গাজীপুর এর সমাবেশসস্থলে ১৪৪ ধারা জারি করে সরকার আবারও ঝালিয়ে নিল এই ধারার ক্ষমতা আর বেগম জিয়াও ১৪৪ ধারার কথা শুনে আর গাজীপুর মুখো হলেননা। তাহলে এতক্ষনে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন এই ধারার ক্ষমতা কত! কি আছে এই ধারাতে? কেন বিরোধী দলগুলুও এই ধারাকে এত ভয় পায়? এই দুইটা প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে বলে রাখি এই ধারাটি ১৮৯৮ সাল থেকেই এই দেশে বলবত আছে, যদিও বৃটিশরাই এই ধারাটির জনক ছিলেন কিন্তু বৃটিশরা এই ধারাটিকে খুব বেশী ব্যাবহার করেন নি, এই ধারাটির রেকর্ড সং্খ্যক ব্যাবহার হয়েছে যথাক্রমে পাকিস্তান আমলে ও স্বাধিনতার পরে বাংলাদেশ আমলে। এই বার বলি কেন বিরোধী দলগুলু এই ধারাকে এত ভয় পায়! কারন হল, এই ধারা যদি ভংগ করা হয় তবে সরকার বা রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটি তার সুশিক্ষিত পেটোয়া বাহিনি দিয়ে আইনগত ভাবেই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, পাখির মত গুলি করে মানুষ মারতে পারে একেবারেই বৈধ ভাবে। আর যারা মারা যাবে তারা শুধুই আইন ভংগকারী হিসাবে মারা যাবে এবং যারা মারা গেলে রাষ্ট্রকে মানবাধিকার লংঘনের ন্যুনতম দায়ও নিতে হয় না।
এবার দেখা যাক কি আছে এই ধারাতে? এই ধারায় মোট ৭ টা উপধারা রয়েছে, এই গুলু একসাথে পড়লে যা দাঁড়াবে তা হল: এই ধারাটির দুইটা রুপ আছে: ১. আদালতগত রুপ ২. অফিসগত রুপ। প্রথমটা আদালতে হয় যাতে আইনজিবিরা উপস্থিত থাকেন তাদের উপস্থিতিতেই আদেশ দেয়া হয়। অপরটা উনারা নিজেরা নিজেরাই সারেন। আদালতের বিষয়টি মোটামূটি আমরা সবাই জানি তাই আমি আলাপ করব এর অফিসিয়াল দিকটি নিয়ে। ১৪৪ ধারা মানে বুঝেনতো? এইটা প্রশাসনের একটা বিশেষ ক্ষমতা যা দিয়ে শান্তি শৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা বা গন উৎপাতের দোহাই দিয়ে যেকোন জায়গায়, যেকোন কিছু করতে, যে কাউকে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ক্ষমতা, এক কথায় বললে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ক্ষমতা( সর্বোচ্চ দুই মাস পর্যন্ত)।
এই আদেশটা কে দিতে পারে? যেকোন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অথবা সরকার কতৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত যেকোন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ( ধারা -১৪৪)(১)/ ৩৬/৩৭ ততসহ তফসীল ৩ ও ৪ ফৌজদারী কার্যবিধি, ১৮৯৮)। কোন ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে যেকোন ব্যাক্তির আবেদনের ভিত্তিতে অথবা স্যু মটো বা স্ব: প্রনোদিত হয়ে এই নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিতে পারে। দুইপক্ষকে শুনে অথবা একতরফাও এই আদেশ দেয়া যায়। সাধারনত আদালতে এই বিষয়টি দেখাশুনা করার জন্য যেই ম্যাজিস্ট্রেটটি বসেন উনি কিন্তু জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নয় কিম্বা সাধারন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও (সরকার কতৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত)নন, উনাকে বলা হয় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা এ ডি এম কিন্তু কথা হল আইনেতো এই বিষয়টা দেখার ক্ষমতা উনাকে দেয়া হয় নাই তাইলে তিনি বসেন কিভাবে? উনি বসেন ডিসি সাহেবের নির্দেশে, এখন জানা যাক ডিসি সাহেব এইক্ষমতা কাউকে হস্তান্তর করতে পারেন কি না? ধারা- ৩৭ মতে, সরকার যদি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে এই ক্ষমতাটুকু অন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে হস্তান্তর করার জন্য অথোরাইজেশন দিয়ে থাকে তখন পারবে, এবং এই ক্ষমতা দিয়েই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব অন্য আরেকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে এই ক্ষমতাটা অর্পন করতে পারেন।
এখন কথা হল, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা এই ক্ষমতাটা সমগ্র বাংলাদেশে প্রয়োগ করতে পারেন কিনা? উত্তর হল: না। ধারা- ১৪৪(৭) এ বলা হয়েছে, মেট্রোপলিটন এলাকায় এই ধারা প্রযোজ্য নয়। তাহলে মেট্রোপলিটন এলাকায়ই তো এই ধারার বেশী প্রয়োজন কারন রাজনৈতিক দল বা যেকোন সংগঠনের আধিপত্য মেট্রোপলিটন এলাকাতেইতো সবচেয়ে বেশী। গ্রামে গঞ্জে এদের তৎপরতা খুব বেশী দেখা যায়না। যদিও আমাদের দেশের সাংবাদিকেরা মেট্রোপলিটন এলাকায়ও ১৪৪ ধারা জারির খবর পরিবেশন করেন নিয়মিত, বিষয়টি আইন সম্পর্কে ন্যুনতম জ্ঞান না রেখে আইন বিষয়ে সাংবাদিকতার ফলে হয়ে থাকে।
মেট্রোপলিটন এলাকা মানে কি? সবাই সচক্ষে প্রতিদিন মেট্রোপলিটন এলাকা দেখে থাকলেও সাধারন মানুষের মধ্যে মেট্রোপলিটন এলাকা সম্বন্ধে ন্যুনতম ধারনাও নাই। মেট্রোপলিটন এলাকা বলতে কি বুঝায় তা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫২ তে নাই, জেনারেল ক্লজেস এক্টে নাই এমনকি ফৌজদারী কার্যবিধিতেও নাই তাহলে জিনিসটা কি? অনেকে আবার সিটি কর্পোরেশন এর সাথে এইটাকে গুলিয়ে ফেলেন তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই বাংলাদেশে এই মুহুর্তে ১০ টি সিটি কর্পোরেশন থাকলেও মেট্রোপলিটন এলাকা রয়েছে মাত্র ৬ টা, যথা- ঢাকা, চট্রগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা ও সিলেট। তাইলেতো বুঝতেই পারলেন, মেট্রোপলিটন এলাকা আর সিটি কর্পোরেশন এলাকা যে এক না! মেট্রোপলিটন এলাকা তৈরী করা হয় মেট্রোপলিটন পুলিশ আইন দিয়ে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা তৈরী করা হয়েছে Dhaka Metropolitan Police Ordinance, 1976 এর তফসীল ১ দিয়ে, এই আইনের ধারা- ৪ এ ফৌজদারী কার্যবিধিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে দেয়া সমস্ত ক্ষমতাকে বাতিল করা হল এবং ধারা- ২৯ এ পুলিশ কমিশনারকে ক্ষমতা দেয়া হল এই এলাকার মধ্যে সভা সমাবেশ নিষিদ্ব করার, সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য, অবশ্য নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়াতে হলে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি (sanction) নেয়ার প্রয়োজন আছে।
চট্রগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা তৈরী করা হয়েছে Chittagong Metropolitan Police Ordinance, 1978 এর তফসীল ১ দিয়ে, এই আইনের ধারা- ৪ এও ফৌজদারী কার্যবিধিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে দেয়া সমস্ত ক্ষমতাকে বাতিল করা হল এবং ধারা- ৩০ এ পুলিশ কমিশনারকে ক্ষমতা দেয়া হল এই এলাকার মধ্যে সভা সমাবেশ নিষিদ্ব করার, সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য অবশ্য নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়াতে হলে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি (sanction) নেয়ার প্রয়োজন আছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন এলাকা তৈরী করা হয়েছে Khulna Metropolitan Police Ordinance, 1985 এর তফসীল ১ দিয়ে, এই আইনের ধারা- ৪ এ ফৌজদারী কার্যবিধিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে দেয়া সমস্ত ক্ষমতাকে বাতিল করা হল এবং ধারা- ৩০ এ পুলিশ কমিশনারকে ক্ষমতা দেয়া হল এই এলাকার মধ্যে সভা সমাবেশ নিষিদ্ব করার, সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য অবশ্য নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়াতে হলে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি (sanction) নেয়ার প্রয়োজন আছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকা তৈরী করা হয়েছে বরিশাল মহানগরী পুলিশ আইন, ২০০৯ এর তফসীল ১ দিয়ে, এই আইনের ধারা- ৪ এ ফৌজদারী কার্যবিধিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে দেয়া সমস্ত ক্ষমতাকে বাতিল করা হল এবং ধারা- ৩১ এ পুলিশ কমিশনারকে ক্ষমতা দেয়া হল এই এলাকার মধ্যে সভা সমাবেশ নিষিদ্ব করার, সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য, অবশ্য নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়াতে হলে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি (sanction) নেয়ার প্রয়োজন আছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকা তৈরী করা হয়েছে সিলেট মহানগরী পুলিশ আইন, ২০০৯ এর তফসীল ১ দিয়ে, এই আইনের ধারা- ৪ এ ফৌজদারী কার্যবিধিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে দেয়া সমস্ত ক্ষমতাকে বাতিল করা হল এবং ধারা- ৩১ এ পুলিশ কমিশনারকে ক্ষমতা দেয়া হল এই এলাকার মধ্যে সভা সমাবেশ নিষিদ্ব করার, সর্বোচ্চ ৩০ দিনের জন্য, অবশ্য নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়াতে হলে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি (sanction) নেয়ার প্রয়োজন আছে।
এবার বুঝা গেল? ১৪৪ ধারা কি?, মেট্রোপলিটন এলাকা কি? মেট্রোপলিটন এলাকায় কিভাবে নিষেধাজ্ঞা দিতে হয়?
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৪:৪৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০১৮ সালের পর ঢাকাতেই ৪টা এক্সপ্রেসওয়ে

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৫৩



একটা দেশের উন্নয়ন কতটা এগিয়েছে, সেটা বোঝার অনেকগুলো উপায় আছে। তবে সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সেই দেশের রাস্তা, সেতু আর যোগাযোগব্যবস্থা। কারণ এগুলোর পরিবর্তন সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯৭

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৪



শরতের সকাল! সকাল ৮ টা।
ভাদ্র মাস। ইংরেজি সেপ্টেম্বর মাস। ২০২৬ সাল। ঘটনাটা কি হয়েছে, আমি বলি। মোটামোটি ভয়াবহ ঘটনা বলা যেতে পারে! যে কোনো সময় রোদ উঠবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: দায় কার?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৭


সংক্ষিপ্ত রায় সবচেয়ে বড় দায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নীতির। এর মধ্যে ২০০৯–২০২৪ সময়কালের সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর দায় তুলনামূলকভাবে বেশি, কারণ ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো হলেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাপিত জীবন.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৭


১।মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে জুম্মার নামাজ পড়ার সুযোগ হয়েছে। ১২.৫০ এ আজান তারপর ১.১৫ দিকে জুম্মার নামাজের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ। আজানের কিছুক্ষণ পর খুতবা শুরু তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×