এই ব্লগের অন্যতম প্রিয় ব্লগার রাজীব নুর অল্প কিছুদিন আগে গত ঈদের দিন এক ব্লগে তার এক প্রিয় বন্ধু সৌদি আরবে হার্ট এটাকে মারা যান বলে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন । গত কাল আবার "আমি কিছু বলতে চাই" এ সম্ভবত সেই বন্ধুরই বাবা মা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে লিখেছেন, " সমাজে খারাপ বাবা মার অভাব নাই। কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু মারা গেলো সৌদিতে। এখন তারা লাস ঢাকায় আনবেন না । লাস আনতে অনেক টাকা খরচ । অথচ আমার বন্ধু তার সারা জীবনের ইনকাম তার মায়ের হাতে তুলে দিয়েছে । জায়গা জমি কিনেছে । আমার বন্ধুর মা এখন বন্ধুর বৌ ও বাচ্চা সহ তাড়িয়ে দিতে চাচ্ছে । কারণ তাহলে সম্পত্তি ছেলের বৌ আর সন্তান পাবে বলে । সে কিছুতেই জমি, বাড়ি মৃত ছেলের বৌ বাচ্চাকে দিবে না ।"
এখানে কয়েকটা বিষয় লক্ষ্য করা জরুরি,
প্রথমত , কোনো মহিলার স্বামী মারা গেলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া সম্বন্ধে কোরানে আল্লাহ পাক বলেন " আর তোমাদের মধ্যে থেকে যারা মারা যাবে এবং স্ত্রীদের রেখে যাবে, তারা তাদের স্ত্রীদের জন্য এক বছরের ভরণ পোষণের ওসিয়ত করে যাবে এবং তাদেরকে বাড়ি থেকে যেন বহিস্কার না করে, তবে তারা নিজেরা স্বেচ্ছায় বের হয়ে গেলে তোমাদের কোনো গুনা হবে না .." (সুরঃ বাকারা আয়াত ২৪০) . জোর করে বের করে দেয়া বা অন্যায় চাপ সৃষ্টি করে বের হতে বাধ্য করা সম্পূর্ণ হারাম ।
দ্বিতীয়ত : মৃত ব্যাক্তির সম্পত্তিতে জীবিত বাবা মা স্ত্রী ও সন্তানদের প্রত্যেকের হক নির্দিষ্ট করে আল্লাহ পাক সূরা নিসায় আয়াত নাজিল করেছেন যা অবশ্য পালনীয়। ১১ এবং ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,
'আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেনঃ একজন পুরুষের অংশ দু?জন নারীর অংশের সমান। অতঃপর যদি শুধু নারীই হয় দু' এর অধিক, তবে তাদের জন্যে ঐ মালের তিন ভাগের দুই ভাগ যা ত্যাগ করে মরে এবং যদি একজনই হয়, তবে তার জন্যে অর্ধেক। মৃতের পিতা-মাতার মধ্য থেকে প্রত্যেকের জন্যে ত্যাজ্য সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ, যদি মৃতের পুত্র থাকে। যদি পুত্র না থাকে এবং পিতা-মাতাই ওয়ারিস হয়, তবে মাতা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। অতঃপর যদি মৃতের কয়েকজন ভাই থাকে, তবে তার মাতা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ ওছিয়্যতের পর, যা করে মরেছে কিংবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে তোমাদের জন্যে অধিক উপকারী তোমরা জান না। এটা আল্লাহ কতৃক নির্ধারিত অংশ নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, রহস্যবিদ।
আর, তোমাদের হবে অর্ধেক সম্পত্তি, যা ছেড়ে যায় তোমাদের স্ত্রীরা যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে। যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তোমাদের হবে এক-চতুর্থাংশ ঐ সম্পত্তির, যা তারা ছেড়ে যায়; ওছিয়্যতের পর, যা তারা করে এবং ঋণ পরিশোধের পর। স্ত্রীদের জন্যে এক-চতুর্থাংশ হবে ঐ সম্পত্তির, যা তোমরা ছেড়ে যাও যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্যে হবে ঐ সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ, যা তোমরা ছেড়ে যাও ওছিয়্যতের পর, যা তোমরা কর এবং ঋণ পরিশোধের পর। যে পুরুষের, ত্যাজ্য সম্পত্তি, তার যদি পিতা-পুত্র কিংবা স্ত্রী না থাকে এবং এই মৃতের এক ভাই কিংবা এক বোন থাকে, তবে উভয়ের প্রত্যেকে ছয়-ভাগের এক পাবে। আর যদি ততোধিক থাকে, তবে তারা এক তৃতীয়াংশ অংশীদার হবে ওছিয়্যতের পর, যা করা হয় অথবা ঋণের পর এমতাবস্থায় যে, অপরের ক্ষতি না করে। এ বিধান আল্লাহর। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।
১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সাবধান করছেন , "যে কেউ আল্লাহ ও রসূলের অবাধ্যতা করে এবং তার সীমা অতিক্রম করে তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সে সেখানে চিরকাল থাকবে। তার জন্যে রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।"
কাজেই রাজীব নুরের মৃত বন্ধুর টাকায় কেনা সকল সম্পত্তিতে তার স্ত্রী ও সন্তানদের পাওনা অংশ অবশ্যই দিয়ে দিতে হবে ।
ওই ছেলের টাকায় যদি জমি বাড়ি ইত্যাদি বাবা বা মা তাদের নিজের নামে কিনেন, তখন সে সম্পত্তি উক্ত ছেলের বলে সাধারণ ভাবে গণ্য হবে না। তবে যদিও আমি নিশ্চিত নই, কোর্টে ওই ছেলের টাকায় কেনা প্রমান করতে পারলে তার অংশ স্ত্রী সন্তানেরা পেতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা না বললেই নয় । অনেকেই বিদেশে হাড় ভাঙা খাটুনি খেঁটে টাকা রোজগার করে দেশে বাবা মার কাছে পাঠান এবং বাবা মা সেই টাকায় দেশে জমি কেনার সময় ওই ছেলের নামে না কিনে নিজেদের নামে কেনেন । বাবা বা মার মৃত্যুর পর সব ওয়ারিস তার ভাগিদার হন । এতে পরবর্তীতে ওয়ারিসদের ভিতর কলহের কারণ হয়ে দাঁড়ায় ! বাবা মার উচিত যে ছেলের টাকায় জমি কেনা হয় তা সেই ছেলের নামে কেনা যাতে তার মালিকানা নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো দ্বন্দ্ব না দেখা দেয়।
আমার জানা এক মহিলা বিদেশে থেকে অনেকদিন আগে বাবাকে দশ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন । বাবা সেই টাকায় একটা জমি কিনেন তার নিজের নামে । বাবা মারা যাওয়ার পর এখন এ জমিতে তার ভাই বোনরা সবাই ওয়ারিস । এখন সে জমির দাম কোটি টাকার উপর। ভাই বোনরা কেউ তাদের অংশ ছাড়তে রাজি নয় ; তারা বলে, 'তোমার দশ হাজার টাকা কেটে নাও, বাকি টাকা সবাই আইন মতো ভাগ হবে!" এ কলহ এখনো চলছে !!
তৃতীয়ত : বাবা মার দেখাশুনা করা বা তাদেরকে একটু ভালো ভাবে জীবন ধারণ করতে দেয়া সব ছেলে মেয়েরই কর্তব্য; এবং আমরা সবাই তা চাই । তাই বলে সব টাকা তাদেরকে দিয়ে নিজে বা নিজ স্ত্রী সন্তানদের নিঃস্ব রাখা কোনো মতেই কাম্য হতে পারে না । ইসলামও নিশ্চয় একথা বলে না । যারা বিদেশে থাকেন তারা নিজেরা এবিষয়ে একটু সতর্ক হবেন । কিছু টাকা আলাদা করে নিজেদের জন্য সঞ্চয় করুন বা নিজেদের নামে বিনিয়োগ করুন যাতে একসময় যখন বিদেশে থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে তখন দেশে এসে কিছু একটা করে খেতে পারেন, কারো দয়ার পাত্র হতে না হয় !
আশা করবো আল্লাহ রাজীব নুরের মৃত বন্ধুর বাবা মাকে এবং আমাদের সবাইকে সুমতি/হেদায়েত দান করেন এবং যে কোনো অন্যায় জুলুম করা এবং জুলুমের শিকার হওয়া থেকে হেফাজত করেন ।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ৯:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


