গত এক সপ্তাহ ধরে দেশে মোবাইল সংক্রান্ত কিছু গুজব বাতাসে ভাসছে । জনসাধারনের শিক্ষিত ও টেকএ্যাওয়ার অংশ স্বাভাবিকভাবে এসমস্ত হাওয়ায় ভাসা কথাগুলো গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন । তবে আমার মতে এসব গুজবের একটা অংশ সত্য হওয়াটা সম্ভব । জার্মানীতে আমি যে কোম্পানীতে আমি কাজ করি সেটা নোকিয়ার রিসার্চ এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের একটা পার্ট হিসাবে কাজ করে । গত একবছরের কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই এ পোস্টটা লিখছি ।
গুজব ১
আপনার কাছে একটা ফোন আসবে ও কলার বলবে কোন কি প্রেস করতে । #০৯ বা ঐ ধরনের কোন নাম্বার । সেটা প্রেস করলেই মোবাইল কোন এক হ্যাকারের নিয়ন্ত্রনে চলে যাবে । হ্যাকার তখন আপনার ফোনের নিয়ন্ত্রন নিয়ে নেবে । নিয়ন্ত্রন নেবার পর সে যেকোন লঙডিসট্যান্স কলের জন্য আপনার ফোন ব্যবহার করতে পারবে ।
এগুজবটা আংশিক সত্য । মানে একসময় সত্য ছিলো । যদিও বর্তমানে এধরনের কোন ট্রিক মোবাইল বা অন্য কোন ফোনে কাজে লাগে না । কিন্তু ৯০ দশকের শুরুতে পিবিএক্স ফোনগুলো এধরনের হ্যাকিংয়ের শিকার হতো । বর্তমানে এটা নিয়ে চিন্তার কোন কারন নেই । আমি নোকিয়ার যতগুলো প্রোটোটাইপ নিয়ে কাজ করেছি তার কোনটাতেই এধরনের কোন সার্ভিস কোড দেখি নাই । এইকিওয়ার্ড নোকিয়ার কোন ফোনে কোন কমান্ড এক্সিকিউট করবে না । অতএব এটা থেকে আপনি নিরাপদ ।
গুজব ২
এসএমএস বা কোন অজানা নাম্বার থেকে কল আসছে এবং সেটা রিসিভ করা মাত্রই ব্যবহারকারী অসুস্থ হয়ে পড়ছেন ।
গাজাখুরির সীমা থাকা উচিত একটা । এনিয়ে আর কথা বলার দরকার নেই । সবাই বুঝতে পারছেন এটা গুজব নাকি অন্য কিছু ।
গুজব ৩
তিন নাম্বার গুজবটা আজকে মদন নামে এক ব্লগার পোস্ট করেছেন । পোস্ট পড়ে যেটা জানা গেলো সেটা হলো “অজানা নাম্বার থেকে ফোন এসেছে, ফোন ধরার সাথে সাথে বিকট শব্দে বিস্ফোরন। এখন রাজশাহী মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে শুয়ে কাতরাচ্ছেন একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা।“
এগুজবের দুটো অংশ । একটা অংশ হলো ফোন বিস্ফোরন ও পরেরটা হলো ফোন রিসিভ করার পর ফোনের বিস্ফোরন । আমি প্রথমে দেখাতে চেষ্টা করবো আসলে বাস্তব জীবনে ফোন বিস্ফোরিত হতে পারে কিনা । তারপর আমরা দেখবো ফোন করে ফোনকে বিস্ফোরিত করা সম্ভব কিনা ।
প্রথম প্রশ্ন, ফোন বিস্ফোরিত হতে পারে কিনা । এটার উত্তরে বলা যায় এটা খুবই সম্ভব । প্রকৃতপক্ষে ফোন বিস্ফোরিত হয় না । ফোনের ব্যাটারীটা বিস্ফোরিত হয় । আধুনিক ফোনগুলো বেশীরভাগ লিথিয়াম আইওন ব্যাটারীতে চলে । সম্প্রতি নোকিয়া ফোনে এর উন্নত ভার্শন লিথিয়াম পলিমান আইওন ব্যাটারীসহ ফোন বাজারে ছেড়েছে । অনেক সুবিধার পাশাপাশি এর একটা অসুবিধা হলো উচ্চতাপে এব্যাটারী বিপদজনক । উচ্চতাপ দুভাবে আসতে পারে । প্রথমত: পারিপার্শ্বিক উচ্চতাপ । লিথিয়াম আইওন ব্যাটারী আগুনে দিলে সেটা নিশ্চিতভাবেই বিস্ফোরিত হবে । একারনে পশ্চিমা দেশগুলোতে মৃতদেহ ক্রিমেটোরিয়ামে দেবার আগে কর্তৃপক্ষ মৃতদেহ থেকে লিথিয়াম আইওন ব্যাটারী লাগানো পেস মেকার খুলে ফেলতে বলে । দ্বিতীয়ত: ফোনের সাথে সংযুক্ত অবস্থায় লিথিয়াম আইওন ব্যাটারী উত্তপ্ত হতে পারে । মাত্রাতিরিক্ত চার্জই এটার কারন হতে পারে ।
উচ্চতাপে লিথিয়াম আইওন ব্যাটারী বিস্ফোরিত হবার ঘটনা কোন নতুন ঘটনা না । জাপানের সনি ইলেকট্রনিক্স গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে এ পর্যন্ত ১ কোটি ল্যাপটপ ব্যাটারী বাজার থেকে উঠিয়ে নিয়েছে শুধুমাত্র বিস্ফোরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে । মোবাইল কোম্পানীগুলোর মধ্যে লেনোভো সম্প্রতি এরকম ২ লক্ষাধিক ব্যাটারী বাজার থেকে তুলে নিয়েছে ।
এবার আসি দ্বিতীয় প্রশ্নে । প্রশ্নটা হলো, কল করে কি মোবাইল ফোন বিস্ফোরিত করা সম্ভব ? তর্কের খাতিরে ধরে নেই একটা ফোন বিস্ফোরনের সর্বাপেক্ষা অনুকুল অবস্থায় আছে । অর্থাৎ, ফোনটি এমন হিটেড অবস্থায় আছে যে যেকোন সময় এটার বিস্ফোরন ঘটবে । এমন সময় একটা ইনকামিং কল এলো । ঐ মুহুর্তে ফোন সেট আইডল স্টেট থেকে বের হয়ে ব্যাটারী থেকে কিছু অতিরিক্ত চার্জ রিঙটোন বা ভাইব্রেশন করতে ব্যবহার শুরু করবে । ফোন রিসিভ করার সাথে সাথে আরোও কিছু অতিরিক্ত চার্জ ফোনসেট নিতে শুরু করবে নেটওয়ার্ক ডাটা ট্রান্সমিশনের জন্য । এই কাজগুলোর ফলাফল কি হবে সেটা আমার জানামতে কেউ টেস্ট করে দেখেনি । অতএব ইনকামিং কল ইগনিশন স্টার্ট করবে একথাটার কোন প্রমান নেই ।
অতএব, দেখা যাচ্ছে মদনের পোস্টের ফোন বিস্ফোরিত হবার কথাটা সত্য হতেও পারে । উন্নত দেশগুলোতে এধরনের ঘটনা ঘটলে হৈচৈ পড়ে যেত । ব্যাটারীর পুরো ব্যাচ রিপ্লেস করে নিতো । পোড়ার বাংলাদেশে হয়তো এগুলো কিছুই হবে না । কিন্তু ঘটনা যদি আসলেই ঘটে থাকে তাহলে সঠিক অনুসন্ধান মানুষকে হয়তো আরেকটু সচেতন হতে সাহায্য করবে ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

