somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জাগো বাহে কোনঠে সবায়

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ বিকাল ৪:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রায় আড়াইশো বছর আগের ঘটনা।

ইংরেজদের শোষণ এবং লুণ্ঠনের সহযোগী এবং গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এর প্রিয়পাত্র দেবী সিংহের ভয়াবহ অত্যাচার এবং নির্যাতনে রংপুর এবং দিনাজপুর অঞ্চল মৃতপ্রায়। দেবী সিংহ ছিলেন ইংরেজ মনোনীত এই অঞ্চলের ইজারাদার। কিন্তু, তাঁর সীমাহীন লোভ লণ্ড-ভণ্ড করে দিয়েছিলো এই জনপদকে। শুধু এই অঞ্চলে নয়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা ও বিহারের দেওয়ানী লাভের পর সমগ্র বাংলাদেশ ও বিহারে যে অবর্ণনীয় অরাজকতা দেখা দিয়েছিলো, তার প্রধান কারণ ছিলো দেবী সিংহের লুণ্ঠন ও উৎপীড়ন। তাঁর অপরিসীম অত্যাচার ও অন্তহীন অবাধ লুন্ঠনে রংপুর এবং দিনাজপুর অঞ্চল পরিণত হয়েছিলো শ্মশানে। চারিদিকে ভেসে বেড়াচ্ছিলো অসহায় কৃষকদের হাহাকার আর গগনভেদী দীর্ঘশ্বাস।

দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে অসহায় হরিণও ঘুরে দাঁড়ায়, এই অঞ্চলের নিরীহ এবং নির্বিবাদী কৃষকেরাও তেমনি ঘুরে দাঁড়িয়েছিলো। এমনিতেই মৃত্যু হচ্ছে মহামারীর মতো, কাজেই মৃত্যুকে নিয়ে তাদের আর কোনো ভয় ডর ছিলো না। বরং পরম পরাক্রমশালী দেবী সিংহ এবং সীমাহীন শৌর্যবান ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিপুল বিক্রমে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তারা।

খনির ঘন অন্ধকার থেকে যেমন করে উঠে আসে উজ্জ্বল হীরকখণ্ড, তেমনি সাধারণ কৃষকদের মধ্য থেকে উঠে আসেন এক অসামান্য মানুষ, একজন অমিতবিক্রমশালী সিংহ-হৃদয় পুরুষ। নিপীড়িত জনগণকে সংঘবদ্ধ করে দেবী সিংহের বিরুদ্ধে প্রবল তেজে রুখে দাঁড়ান তিনি।

সেটি সতেরো শো তিরাশি সাল। এ বছরই এই অনন্য মানুষটি দেবী সিংহকে করে তোলেন নেংটি ইঁদুরের মতো ভীত এবং অসহায়। ইতর প্রাণীর মতো প্রাণভয়ে পলাতক হন দেবী সিংহ আর এই মুক্তিকামী মানুষটি কাঁপিয়ে দেন বাংলার বুকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে। একের পর এক যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে বিপর্যস্ত করে তোলেন তাদের। তবে, শেষ রক্ষা হয় না। এরকমই এক যুদ্ধে আহত হয়ে বন্দি হন তিনি। তারপর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই বন্দি দশায় মৃত্যু ঘটে তাঁর। কৃষকদের এই সর্বব্যাপী সশস্ত্র বিদ্রোহই রংপুর বিদ্রোহ নামে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে।

আর এই বিদ্রোহের যিনি নায়ক, জনগণের জন্য আত্মত্যাগকারী সেই বীরের নাম নূরুলউদ্দীন।

ইতিহাসে অন্ধকার পৃষ্ঠা থেকে নূরুলউদ্দিনের বিস্তারিত পরিচয় উদ্ধার করা যায় না। শুধু এইটুকুই জানা যায় যে, তিনিই প্রথম রংপুরের কৃষকদের সংঘবদ্ধ করেছিলেন। তিনি তাদের নিয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন নিরীহ কৃষকদের রক্তনালী থেকে রক্ত চুষে খাওয়া দূর্বৃত্তসম দেবী সিংহের হাত থেকে রক্ষা করতে।

রংপুরের বুকে নূরুলউদ্দিন যে বিপ্লবের লাল আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, তাকে নির্বাপিত করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। আর যাকে কেন্দ্র করে এই বিদ্রোহ, সেই দেবী সিংহকে রংপুর ছেড়ে পালাতে হয়েছিলো জান হাতে নিয়ে। জনগণের চুড়ান্ত জয় হয়তো হয় নি সেদিন, কিন্তু এই সাময়িক জয়ও ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়ে আছে সগৌরবে। আর সেটাই যুগে যুগে সাহস এবং প্রেরণা যুগিয়েছে ভবিষ্যতের গণ বিদ্রোহ এবং জন-আন্দোলনকে।

সুপ্রকাশ রায় তাঁর “ভারতের কৃষক-বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম” পুস্তকে এবং সুধাংশু পাত্র তাঁর “বাংলার বীর বিদ্রোহী” বইতে এই বীর বিদ্রোহীকে চিহ্নিত করেছেন নূরুলউদ্দিন নামে। অন্যদিকে, সব্যসাচী সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক তাঁর বিখ্যাত নাটক “নূরলদীনের সারাজীবন”-এ নূরুলউদ্দিনকে আখ্যায়িত করেছেন নূরলদীন নামে।

বাংলাদেশে নূরুলউদ্দিনকে কেউ চেনে না, কিন্তু বহু সংখ্যক মানুষ নূরলদীনের কথা জানে। সেটা সৈয়দ হকের এই বিখ্যাত ঐতিহাসিক নাটকের কারণে। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর “নূরলদীনের সারাজীবন” নাটকের ভূমিকাতে লিখেছেনঃ

“ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় নামটি লিখেছেন – নূরুলউদ্দিন, আমরা বলবো ওটা হবে নুরুদ্দিন, কিন্তু আমি ব্যবহার করেছি – নূরলদীন, রংপুরের সাধারণ মানুষেরা যেমনটি উচ্চারণ করবে।”

আমার এই লেখাতেও আমি ব্যবহার করবো নূরলদীন। এই নামটার মধ্যে একটা ইস্পাতসম কাঠিন্য আছে, আছে অগ্নিশিখার অমিত আহবান, আছে আমার দেশের মাটির গন্ধের সাথে মিশে থাকা মাতাল এক অনুভূতি, আছে কাল পূর্ণিমায় রক্তলোলুপ হায়েনার হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য গগনবিদারী কণ্ঠে ডেকে ওঠা এক প্রতিধ্বণির আশ্বাস। জাগো বাহে কোনঠে সবাই।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চন্দ্রপ্রভা

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

চন্দ্রপ্রভা
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

তোমাকে দেখে মোহিত হই চন্দ্রপ্রভা
রোদ পড়লে চকচক করে
এতই সুন্দর লাগে
একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি।
তোমাকে ছুঁতে ইচ্ছে করে
কিন্তু পাই না যে সাহস।
তুমি নাই বলে কি এত ঝড়?
তুমি পাশে নাই বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি কি পেলেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬



বাংলার দুই নোবেল জয়ী রবি ঠাকুর আর ডঃ ইউনুসের পিছনে অনেক কথাই তো বললেন।
ব্লগ লেখায় ভরিয়ে ফেললেন!
খোদা তাঁদেরকে যে জায়গা দিয়েছেন, তা থেকে এক চুল কি নিচে নামাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমরা নেহা বোরা কে বাংলাদেশের কথা বোলো না

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২


নেহা বোরাকে তোমরা বাংলাদেশের কথা বোলো না। বোলো না যে, তিনি যখন বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করছেন, তখন বাংলাদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুনেরা ক্যাম্পাসে গরু জবাই করে জেয়াফত খাওয়ার আন্দোলন... ...বাকিটুকু পড়ুন

জগন্নাথবাসীগণ, আমার কথা শুনছেন কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

জগন্নাথবাসীগণ,
আপনাদের গরু কোরবানি যদি হযরত জাবের (রাঃ)-এর মতো
নবীজীর সম্মানে হয়ে থাকে, তাহলে মোবারকবাদ।
আর, শুধু প্রতিবাদ দেখাতে একটি অবলা পশুকে হত্যা করে থাকলে,
তার জন্যে খোদার দরবারে বিচার দিলাম।
...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×