গদ্যকার্টুনের নিয়মিত পাঠকেরা জানেন, ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে নিউইয়র্ক যাওয়ার পর তিনি আমাকে একটা বই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বইটার নাম দি ম্যামথ বুক অব বেস্ট জোকস। বইয়ের তিন নম্বর পাতায় তিনি লিখেছিলেন,
আনিসুল হক,
তোমার রসিকতাগুলি
পানসে হয়ে যাচ্ছে।
ফরেন হেল্প নাও
হুমায়ূন আহমেদ
২৯.১১.১১
জ্যামাইকা
নি. ই.।
হুমায়ূন স্যারের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে খুব কম। কিন্তু যতবার দেখা হয়েছে, তিনি বলেছেন, ‘শোনো, আমি কিন্তু তোমার লেখা পড়ি।’ তিনি যে পড়েন, সেটার প্রমাণ দেওয়ার জন্যই হয়তো বলতেন, ‘তোমার এই কৌতুকটা ভালো হয়েছে। আর ওই কৌতুকটা ভালো হয় নাই।’
আমাকে একটা বই উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু আমার যেটা ভালো লাগে, যতবার দেখা হয়েছে, ভিড়ের মধ্যে, অন্যদের সামনে, তিনি আমাকে কাছে টেনে নিয়েছেন, বলেছেন, ‘আনিস, তুমি কাছে আসো।’ আমাকে পাশে বসিয়ে অন্যদের বলেছেন, ‘আনিস লেখক, ও বুঝবে।’ এ কথা বলার পর তাঁর বলতে থাকা গল্পটা আবার বলতে শুরু করতেন।
তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা হওয়ার দিনটা কি আমি আর কোনো দিনও ভুলতে পারব? মে ২০১২, বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে ঘেটুপুত্র কমলার প্রদর্শনী হবে। আমি দুটো আমন্ত্রণপত্র পেয়েছি। একটা এসেছে ইমপ্রেস থেকে। আরেকটা এসেছে দখিন হাওয়া থেকে। স্যার নিজে পাঠিয়েছেন বা নিজে কাউকে বলেছেন পাঠাতে—আমার এটা মনে হওয়ায় আমি যথাসময়ে বসুন্ধরার দিকে রওনা হলাম। মঙ্গলবার বসুন্ধরা মার্কেট বন্ধ। তাই তাঁর সামনের প্রবেশপথ ফাঁকা। দুটো গাড়ি একসঙ্গে ঢুকল। হুমায়ূন স্যার, শাওন, স্যারের মা আয়েশা ফয়েজ গাড়ি থেকে নামলেন। আমিও নামলাম। আমি স্যারকে সালাম দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিতেই স্যার হাতটা ধরলেন। এবং গোটা লন পেরিয়ে লিফট, লিফট বেয়ে ওপরের তলা আমরা পাশাপাশি দুজনে হাঁটতে লাগলাম এবং গল্প করতে লাগলাম। শাওনই বললেন, ‘আপনার সাক্ষাৎকারের বইটা দেখলাম।’ আমি বললাম, হ্যাঁ, মাসউদ নুহাশপল্লীতে নিয়ে গিয়ে স্যারের হাতে দিয়েছে। স্যার বললেন, ‘শোনো, তোমার কভারের ছবিটা ভালো হয় নাই, কৃত্রিম কৃত্রিম লাগে।’ আমরা একসঙ্গে হাঁটছি, আর দুনিয়ার যত ফটোগ্রাফার ছবি তুলছে।
সিনেমা হলে ঢুকে আমি সরে দাঁড়ালাম। স্যারের ঘনিষ্ঠজনেরা স্যারের কাছাকাছি আসুন। আর তা ছাড়া টেলিভিশন ক্যামেরা, স্টিল ক্যামেরা চলছে। সব ছবির ফ্রেমে নিজেকে রাখা ঠিক নয়।
আমি সরে গিয়ে অন্য টেবিলে বসলাম। সেখানে শাওন, খালাম্মা (স্যারের মা) বসেছেন। আমি বললাম, খালাম্মা, আমি আনিসুল হক, ওই যে সময় প্রকাশনীর অনুষ্ঠান করেছিলাম দুজনে, মনে আছে। তিনি বললেন, ‘বাবা, তোমাকে চিনি তো, তোমার লেখা পড়ি, টিভিতে দেখি, পরিচয় দিতে হবে না।’
সেদিন স্যার বক্তৃতা করেছেন। সব শিল্পী-কুশলীর সঙ্গে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। একদমই মনে হয়নি, তাঁর কোনো অসুখ আছে। অসম্ভব প্রাণশক্তির অধিকারী মানুষ। চতুর্থ পর্যায়ের ক্যানসার শরীরে নিয়েও যার রসিকতা মরে না।
ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে তিনি নিউইয়র্কে যাবেন। তার আগে ‘দখিন হাওয়া’য় তাঁর সঙ্গে আমি দেখা করি। আমি বললাম, স্যার, আমাদের বইমেলা আর প্রকাশনার আপনাকে আর ১০টা বছর লাগবে। অন্তত ১০টা বছর বেঁচে থাকেন।
তিনি বললেন, ‘এই, তুমি যখন চাচ্ছই, তখন এত কম চাচ্ছ কেন? ৫০ বছর চাও, ১০০ বছর চাও।’
আমি বললাম, আপনি আরও ১০০ বছর বাঁচেন। সেটা চাই। কিন্তু ১০ বছরের আগে আপনি যদি চলে যান, আমাদের প্রকাশনা জগতের ভয়াবহ ক্ষতি হবে। ১০টা বছর সময় দেন। এরপর আমরা পারব।
এই কথাটা আমি এখনো বলি। হুমায়ূন আহমেদের এই চলে যাওয়াটা বড় অসময়ে। আমাদের প্রকাশনা জগৎকে আরেকটু মজবুত না করে দিয়ে তাঁর চলে যাওয়াটা ঠিক হয়নি।
এই গদ্যকার্টুনটা যদি হুমায়ূন স্যার পড়তেন, যথারীতি বলতেন, ‘তোমার গদ্যকার্টুন পানসে হয়ে যাচ্ছে। ফরেন হেল্প নিচ্ছ না কেন?’
আচ্ছা, স্যারের পাঠানো বই থেকে একটা কৌতুক অনুবাদ করে দিই।
সক্রেটিস ছিলেন একজন বিশাল দার্শনিক। প্রাচীন গ্রিসে তিনি তাঁর প্রজ্ঞা ও সাধারণ জ্ঞান দুটোর জন্যই খ্যাতিমান ছিলেন।
একদিন এক লোক দৌড়ে এল সক্রেটিসের কাছে। বলল, সক্রেটিস, শোনো, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা খবর আছে, তোমার এক শিষ্যের সম্পর্কে।
সক্রেটিস ঠান্ডা গলায় বললেন, একটু দাঁড়াও। আমাকে কোনো কিছু বলার আগে আমি তোমাকে তিনটা পরীক্ষা করব। এই তিনটা পরীক্ষায় পাস করলেই কেবল আমি তোমার কথা শুনব।
আচ্ছা, লোকটা বলল।
সক্রেটিস জিজ্ঞেস করলেন, প্রথম পরীক্ষা হলো, সত্যতার পরীক্ষা। তুমি আমার শিষ্য সম্পর্কে যে কথাটা বলবে, তুমি কি নিশ্চিত যে কথাটা সত্য?
লোকটা বলল, না, আমি নিশ্চিত নই। আসলে একজন আমাকে বলেছে। আমি জানি না সে সত্য বলেছে না মিথ্যা বলেছে।
এবার দুই নম্বর পরীক্ষা। সক্রেটিস বললেন, এটা হলো, ভালো-মন্দ পরীক্ষা। তুমি যে কথাটা বলবে, সেটা কি আমার শিষ্যের সম্পর্কে কোনো ভালো কথা?
লোকটা বলল, আমার মনে হয়, এই কথাটা ভালো কথা নয়।
আচ্ছা, তুমি জানো না, কথাটা সত্য কি না, এবং তুমি জানো যে এটা তার সম্পর্কে কোনো ভালো কথা নয়। আচ্ছা তবু তিন নম্বর পরীক্ষাটা হয়ে যাক। পাস করলেই তুমি কথাটা বলতে পারবে। কথাটা শোনার পর সেটা কি আমার কোনো কাজে লাগবে?
লোকটা বলল, না, আমার মনে হয়, কথাটা তোমার কোনো কাজে লাগবে না।
তাহলে কথাটা সত্য কি না, তুমি জানো না, কথাটা আমার শিষ্য সম্পর্কে কোনো ভালো কথাও নয়, এবং সেই কথা শোনার ফলে আমার কোনো উপকারও হবে না। তাহলে আর কথাটা বোলো না।
লোকটা তাই আর কিছু না বলে চলে গেল।
এই কারণেই সক্রেটিস ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিকদের একজন।
এবং এই কারণেই তিনি কোনো দিন জানতে পারেননি, তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে শিষ্য প্লেটো...
আমি গদ্যকার্টুনে কোনো কৌতুক পরিবেশন করলে সাধারণত সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সেটা মিলিয়ে দিই। এই কৌতুকের সঙ্গেও দেব। জ্ঞানী হওয়া ভালো। দেশের সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি হওয়া আরও ভালো। তবে শুধু সেসব কথা শুনলে হবে না, যার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে ১০০ ভাগ, যা আমারও উপকারে আসবে, তাঁরও উপকারে আসবে। ধরা যাক, সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে আমরা যা শুনি, তার সত্যতা সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই। এই কথাগুলো সরকারের ভালো লাগার মতো নয়, আবুল হোসেন সাহেবের ভালো লাগে না। ভালো যে লাগে না, সেটা তিনি পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানিয়েছেন। আর ওই বিজ্ঞাপনেই তিনি বলেছেন, তাঁর সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় যা লেখা হয়েছে, সবই মিথ্যা।
তবু সেই মিথ্যা কথাগুলোও হয়তো যথাযথ কর্তৃপক্ষের শোনাটা জরুরি ছিল।
এবার আসি ফরেন হেল্প সম্পর্কে। আমার লেখার রসিকতাগুলো পানসে হয়ে যাচ্ছে। কাজেই হুমায়ূন স্যার আমাকে বিদেশি সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আমাদের পদ্মা সেতু নিজেদের টাকায় হবে, নাকি বিদেশি সাহায্য লাগবে, এই নিয়ে অর্থনীতিবিদেরা নানা কথা বলছেন। আমি এই বিষয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখব। শুধু হুমায়ূন স্যারের দেওয়া বই থেকে মারফির যুদ্ধবিষয়ক সূত্র থেকে দুটো তুলে ধরব।
১. যদি দেখো শত্রু তোমার নাগালের মধ্যে, তাহলে এটাও মনে রেখো, তুমিও তার নাগালের মধ্যে।
২. কখনো ভুলে যেয়ো না, তুমি যে অস্ত্র হাতে দর্প দেখাচ্ছ, সেটা কিনতে হয়েছে সর্বনিম্ন দরদাতার কাছ থেকে, আর সেই কেনাকাটার কমিশন কীভাবে ভাগাভাগি হয়েছিল।
স্যারকে বলেছিলাম, এত সিগারেট খান কেন? আপনার না হার্টে অপারেশন হয়েছে?
সেটা ছিল ফরিদুর রেজা সাগরের বাসায়। আমাকে হুমায়ূন আহমেদ কাছে ডেকে নিলেন। আমরা ভিড়ের বাইরে বারান্দায় দুজন মুখোমুখি বসে আছি। তিনি একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছেন।
বললেন, ‘আনিস, আমার জীবনে কত দুঃখ তুমি জানো? আমার জীবনের দাম কী? এই শহরে আমার মেয়েরা আছে। আজ কতগুলো বছর আমি তাদের দেখি না।’
আমি জানি না, আমাকে লেখক ভেবেই কিনা তিনি নিজেকে সেদিন উন্মোচন করেছিলেন। আমি বললাম, আপনার সিগারেট খাওয়ার কারণ এটা নয়। কারণ, আপনি আগেও সিগারেট খেতেন।
আজ তাঁর শ্রাবণ মেঘের দিন ছবির গানটা বারবার মনে হচ্ছে: ‘শুয়াচান পাখি, আমার শুয়াচান পাখি। আমি ডাকিতাছি, তুমি ঘুমাইছ নাকি!’
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




