ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, (ষ্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের এমডি) যিনি আজ বিজিএমইএ এর আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার ব্যাংক লোনে করা বিশাল ফ্যাক্টরী এবং ১৮০০০ শ্রমিকের সরাসরি রুজি রোজগারের ব্যাবস্থাকারী এই ব্যাক্তি, অথচ আজ তিনি কপর্দকহীন নিঃস্ব। কার্যত এই মুহুর্তে তিনি অসহায় পথের ফকির। যাবতীয় খবর সূত্র এবং পরিচিত মাধ্যমে জেনেছি দেশের অন্যতম সেরা কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরী ছিল এই ষ্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ। আমি মনোযোগ সহকারে এই ফ্যাক্টরীর শ্রমিকদের সাক্ষাতকারের বিভিন্ন ভিডিও দেখেছি এবং খবর পড়েছি। শ্রমিকগন তাঁকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন কেননা এই মালিক কখনোই তাদের শ্রমের টাকা বকেয়া রাখতেন না। তাছাড়া এখানের পরিবেশ ছিল অসাধারনের চাইতেও বেশী কিছু। দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ জ্যাকেট উৎপাদনের দিকে ছিল বাংলাদেশের প্রথম। জনৈক ব্যাক্তির ভাষ্যমতে : একসময় আমি ঐ ফ্যাক্টরিতে ইন্টার্নী করেছিলাম। স্থাপত্যের দিক দিয়ে ঐ বিল্ডিংটি ছিল বসুন্ধরা সিটি ক্যাটগরির। প্রতি ফ্লোরের আয়তন ৬৫ হাজার স্কয়ার ফুট। তার মানে একসাথে এক ফ্লোরে দু’টি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা যায়! এই ফ্যাক্টরির দু’জন মালিক-একজন ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন, বাড়ী সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে (সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের বাড়ীর পাশে) আরেকজন হলেন ইঞ্জিনিয়ার আতিক, বাড়ী কুমিল্লার বরুড়া থানার ছোট তুলাগাঁও গ্রামে। এই গ্রুপের মালিক তাবলীগ করেন, দানশীল এবং মুক্তমনা হিসেবে সুপরিচিত। শ্রমিকদের তিনি নিজ সন্তান হিসেবে বিবেচনা করতেন। একটা ফ্যাক্টরীর হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নামাজের জামাত হত ওনাদের কোনাবাড়ী ফ্যাক্টরিতে। একসাথে আঠারো হাজার লোক জামাতে জোহর, আসর, মাগরিব এবং এশার নামাজ পড়ত। ওদের সেলাই ও অন্যান্য মেশিন এমনভাবে সেটিং করা আছে যাতে মেশিনের সাথে দাঁড়ালেই কাতারবদ্ধ হয়ে যায়। ছেলেরা ছেলেদের লাইনে ও পর্দার ভেতর মেয়েরা মেয়েদের লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। আযান দেয়ার সাথে সাথে সবাই ওযুখানায় চলে যায়। ওযু করার জন্য দশ মিনিট সময় দেয়া হয়, এই দশ মিনিট মাইকে কোরান হাদিসের বাণী প্রচার করা হয়। জোহর নামাজের পরে কোরান শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। শ্রমিক লেভেলে ছেলেদের একটা বড় অংশের দাঁড়ি আছে। মেয়েদের স্কার্ফ পরা অর্থাৎ হিজাব পরা বাধ্যতামূলক। এই প্রতিষ্ঠানে যারা চাকুরি করেন তাদের বেশিরভাগই নদী ভাঙ্গা ভূমিহীন এলাকার লোক। এখন একসাথে এত লোক বেকার হয়ে গেল তাদের কী হবে?”......ইত্যাদি আরো অনেক লেখা আছে কিন্তু কি লাভ এতশত লিখে, যদি না আমাদের মানবতাবোধ জাগ্রত হয়? কারা এত নৃশংস হতে পারে, কোন শ্রমিক এভাবে নিজের রিযিক নিজে ধ্বংস করে? মালিকের কাছে সন্তানতুল্য ব্যাবহারের পরও কোন শ্রমিক নামধারী নরপশু স্রেফ গুজবের উপর নির্ভর করে সুন্দর এই ফ্যাক্টরীতে আগুন দিল? তদুপরি অগ্নিকান্ডের শুরুতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকেও তারা ঢুকতে দেয়নি। বেশ কয়েকদিন অবরোধের কারনে উৎপাদিত রপ্তানীযোগ্য পণ্যগুলোও ফ্যাক্টরী প্রাঙ্গনে এবং ফ্লোরে ষ্টক করা ছিল যার সব এখন পুড়ে ছাই।
তবে সুখের বিষয় হচ্ছে এই লোকের সততাই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এই মুহুর্তে পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে বেঁচে থাকা একমাত্র “সততা”ই তাঁর বড় সম্পদ। ব্যাংকগুলোর কাছে এখন পর্যন্ত উনি ঋন খেলাপী কোন উদ্যেক্তা নন। তাঁদের তথা ষ্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের অতীত ইতিহাস তাই বলে। স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের এ বিষয়ে কোনো দুর্নাম নেই, তাঁরা শ্রমিকদের সর্বোচ্চ মজুরি এবং অন্যান্য সুবিধা চলতি বাজারের তুলনায় অনেক বেশি দিতেন। স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের মালিক কান্নভেজা কন্ঠে এই সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে অনুরোধ করেছেন তাঁর ব্যাংকলোনগুলোকে যেন ব্লকড লোনে পরিণত করা হয়, তাহলে তিনি সেই ব্যাংক ঋণ শোধ করে দিতে পারবেন। অন্যথায় চক্রবৃদ্ধি ঋণের বেড়াজালে পড়ে তাঁর পক্ষে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।
আমার এই পোস্টের মুল উদ্দেশ্য এটাই .......... দেশের সাধারন একজন নাগরিক হিসেবে আমি বলতে চাই সরকারের উচিত হবে বিষয়টিকে দ্রুততার সঙ্গে বিবেচনা করা। কত টাউট বাটপার হলমার্ক আর বিসমিল্লাহ গ্রুপ বানিয়ে একেবারে হাজার হাজার কোটি টাকা সরকারি ব্যাংক থেকে শুষে নিয়ে গেল, কত রথি-মহারথির ব্যাংক লোন বারবার পুনঃতফশিলের নামে ডিপ ফ্রিজে ঢুকে গেল, কেউ সে টাকা ফেরত দিবে বলে মনে হয় না। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের অতীত ইতিহাস বলে তাঁরা ঠিকই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এবং ঋণ শোধ করবে। আমি এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর সক্রিয় ভুমিকা দেখতে চাই। আমি দেখতে চাই সরকার এই দেশের সৎ ও পরিশ্রমী উদ্যোক্তাদের বিপদে পাশে দাঁড়ায়। অর্থমন্ত্রী তথা সরকারকে এসব মালিকের পক্ষ নিয়ে মাঠে নামতে হবে সক্রিয়ভাবে। একজন ভাল উদ্যেক্তা সবসময়ই দেশের জন্য সম্পদ, এসব সম্পদকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয়ার জন্য সর্বোতভাবে সাহায্য প্রয়োজন। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা এই প্রতিষ্ঠান আবার যেন ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ১৮০০০ শ্রমিক সহ তাদের পরিবার এবং সহযোগী সাপ্লাইয়ার যারা এই প্রতিষ্ঠানকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকতো তাদের জন্য, দেশের জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে এবং মালিকদের বেঁচে থাকতে হবে, জেগে উঠতে হবে....এখন সরকারের উচিত এর মালিককে বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের জোগান দেয়ার পাশাপাশি কুচক্রী মহলদের ধরা এবং তাদের বিষদাঁত তুলে ফেলা।

সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০১৫ রাত ৯:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



