চাকরীর সুবাদে আমার আফগানিস্থানে থাকা হয়েছে প্রায় তিন বছর। তবে আফগানিদের অন্দরের বৈচিত্রপূর্ণ জীবনযাপন কখনো দেখার বা বোঝার সুযোগ হয়নি ! আফগানের নানা জাতিগোত্রের মাঝে পাশতুন (পাঠান), তাজিক কিংবা হাজারাদের দেখে চিহ্নিত করতে পারলেও কে তুর্কম্যান, কে বালুচ, কে নুরিস্থানি তা বোঝার সক্ষমতাও আমার কখনও হয়নি। তেমনি আফগানিস্তানের জাতীয় খেলা ‘বোজখাশি’ (Goat Pulling বা ঘোড়সওয়ার কতৃক ছাগল/ভেড়া টেনে তোলা) নিজ চোখে দেখা হয়নি। তবে এ নিয়ে আফগান প্রবাদ আমার বেশ মনে আছে। আমাদের গেস্টরুমের বিশাল পাগমানি পাঠান চৌকিদার ক’কা মারুফ চোখ ছোট করে তার স্মৃতি মনে করতে গিয়ে পাশতু, দারী আর উর্দু এই তিন ভাষা মিলিয়ে বলছিলো ‘বোজখাশি’তে ভাল ঘোড়ার উপর খারাপ খেলোয়াড় এর চাইতে, দূর্বল ঘোড়ার উপর ভাল খেলোয়াড় অনেক বেহেতর! বলে রাখা ভালো আফগানিরা কথায় কথায় প্রবাদ বলতে পছন্দ করে।
২০০৯ সালে প্রথমবারের মত ঘর এবং দেশের বাহিরে ঈদ করতে হল কাবুলে। ঈদের নামাজ পড়ার পর ‘সিফাত’ আর ‘রাজ্জাক’ (আমাদের আফগান বাবুর্চি) এর তৈরী করা সেমাই আর মোস্তফা ভাইয়ের রান্না করা ‘অধৃষ্ঠপূর্ব’ পোলাও (এখানে আগে এত কম জেনে পোলাও রান্না করার ধৃষ্ঠতা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে) খেলাম। ঈদের ছুটি যখন শেষ আমাদের আফগান সহকর্মী ‘লাইলুমা জান আফগানি ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘মান্তু’ (মাংসের তৈরী) নিয়ে আসলেন। আমি আর মোস্তফা ভাই ‘ডমেস্টিক’ খাবারের আগমনে কিঞ্চিত উত্তেজিত কারণ আমরা এর আগে এই খাবার খাইনি। কিন্তু সাদেক ভাই, হুমায়ুন ভাইয়ের নিরুত্তাপ চোখ দেখে দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে যাই। তবে কি উনাদের ডাক্তারী নিষেধ আছে ‘মান্তু’ খাওয়ায়! একটু পরে আমাদের আরেক কলিগ ‘হাফিজ ভাই’ খাবার টেবিলে এসেই টেবিলে অন্য খাবারের দিকে চোখ দিলেন। একটি দেশের সেরা খাবারের প্রতি সবার একি অবহেলা ! !
ইত্যবসরে মোস্তফা ভাইয়ের চোখের রঙ বদল ঘটেছে; দেখে মনে হলো উনি যে বস্তু মুখে পুরেছেন তা ভেতরে নেবেন না বাইরে ঠেলবেন এই নিয়ে প্রবল দোটানায় পড়েছেন। বলা বাহুল্য ইতোমধ্যে ‘মাস্তু’র প্রতি আমার অদম্য আগ্রহও পুরোপুরি দুরীভূত । মসল্লা বিহনে ‘মান্তু’র এই ধরণীপাত! আমাদের 'স্পাইসি' মাংসের স্বাদে অভ্যস্ত যেকোন লোকের কাছে মসল্লা বিহীন মাংস অনেকটা কাঁচা মাংসের মতো (সত্যিই অমন গন্ধ আসে)। আফগানি অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী খাবারের মাঝে আছে ‘আউশাক’ (গান্দানার এবং অলিভ অয়েলের তৈরী ‘ভেজিটেবল’) আর ‘বুলানী’। ‘বুলানী’ অনেকটা আলু পরোটার আদলে তৈরী হয়। এই বুলানী একমাত্র আফগানী খাবার যা আমরা বাংলাদেশীরা আয়েশ করে খেতাম।
আফগানিস্তানে আঙ্গুর, আপেল বেশ সাধারণ ফল। আতিথেয়তায় বরং মানানসই বেশী ‘কেলা’ (কলা), আম এগুলো! একবার এক চেরাগ (৭ কেজি) আঙ্গুর কিনে ভাবলাম রাতদিন আঙ্গুর খাব। আঙ্গুরের প্রতি এমন টান দেখে সিফাত উপহাস করে। মুখে আঙ্গুর পুরে আমি ভাবী আহারে আমাদের দেশে কত বাহারী ফল। কলা, আম, আমড়া, পেয়ারা, লিচু, কাঠাল, আনারস, জাম, জামরুল, বড়ই, কামরাঙ্গা, তাল, তরমুজ, কদবেল, বেল আরো কত কি! আমরা রোগী দেখতে বা কোন অনুষ্ঠানে গেলে এগুলো নিলে ‘ইমেজ’ সংকটে পড়ি যেমনটা কেউ আফগানে আঙ্গুর আর আপেল নিয়ে পড়ে! সিফাত হয়তো কখনো জানবেইনা মাত্র একটা কাঁঠাল দিয়ে বিশটা মানুষ নাস্তা করতে পারে কিংবা বাংলাদেশে শুধু আম যত প্রকারের আছে পুরো আফগানিস্থানে তত রকমের ফল নাই। বোম্বাই ফজলি, সুরমা ফজলি, আশ্বিন, লেংড়া, লেদা, কলা আম, খিরসাপাত, গোপালভোগ, গোবিন্দ ভোগ, হিমসাগর, আম্রপালি, কাঁচামিঠা, গুটি আরো কত কি!
'হাতের কাছে আরশি নগর
কি দেখতে যাও দিল্লি লাহোর'
সিফাত আমাকে যে শিক্ষাটা দিলো তা হলো আমরা অনেকটা আত্মবিস্মৃত মানুষ যারা নিজেদের সৌন্দর্যগুলোকে অবহেলা করি। আমরা শ্রমিকের ঘামে অর্জিত টাকা দিয়ে lays কিনে খাই। আমরা আপেল আংগুরকে উন্নত ফল মনে করি আর দেশের গুলোকে করি অব-হেলা। আমরা পরশ্রিকাতর হয়ে পড়ছি।
আলোচিত ব্লগ
জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন
আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন
[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]
“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"
২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন
পিনাকী ভট্টাচার্য কেন দেশে আসে না, জানেন?

Pinaki Bhattacharya - পিনাকী ভট্টাচার্য তিনিঞ্চি কেন দেশে আসে না জানেন? তার পাসপোর্টই তাকে সে অনুমতি দেয় না। Meghna Alam থেকে প্রাপ্ত এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে তার পাসপোর্টে স্পষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের সেই এন্টিনিয়ার।
কিছু স্বপ্ন, কিছু স্মৃতি এবং নানীর বাড়ি

আমি বেশ কিছুদিন ধরে একটি বিশেষ ধরনের স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্নের কথায় যাওয়ার আগে কিছু পেছনের গল্প বলা প্রয়োজন।
ক্লাস নাইনে পড়ার সময় থেকে অনার্স... ...বাকিটুকু পড়ুন
ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।