কলেজ লাইফে সাইকেলটাই আমার প্রধান বাহন ছিল।সাইকেলের চেয়ে আদর্শ বাহন ঢাকা শহরে নেই বলেই আমার ধারনা। যেমন রাস্তায় জ্যাম ফুটপাথ দিয়ে চালানো যায়, যানবাহনের পাশে থাকা স্বল্প ফাঁক দিয়ে এগিয়ে যাওয়া - এ জাতীয় কাজে সাইকেলের জুড়ি মেলা ভার।এরকম অনেক হয়েছে, বন্ধুরা বাসে করে 10 নম্বর থেকে 1 নম্বরে যাবে। কিন্তু আমার সাইকেল থাকায় যেতে হবে দ্্বিচক্রযানে। গন্তব্যে পৌঁছে দেখা গেল আমি আগে চলে এসেছি, আর বন্ধুরা লোকাল বাস বা ভটভটি টেম্পুতে (এই যানগুলোর মিরপুরের লোকাল একটা নাম ছিল। তা হলো কুত্তামারা। এরশাদ সরকারের আমলে নাকি এই যানগুলো ব্যবহার করে মিউনিসিপ্যালটির লোকজন নেড়ি কুকুর মেরে নিয়ে যেত) ট্রাফিক জ্যামে হারিয়ে গেছে।
সাইকেল নিয়ে বিপত্তিও কম হয়নি। একবার কলেজে যাচ্ছি সকালবেলা। বষর্াকালের ঘটনা। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। বৃষ্টি নামি নামি করছে। আমিও বৃষ্টির ভয়ে তুমুল জোরে প্যাডেল চালিয়ে যাচ্ছি। আমার সাইকেলের ব্রেকে বেশ বড়-সড় অসুবিধা ছিল আজীবন। তা হলো মোটামুটি ফুল স্পিডে থাকলে থামার জন্য 20-25 মিটার দূরে ব্রেক কষতে হত। আর যদি বৃষ্টি হয় তাহলে তো কথাই নেই থামতে মোটামুটি 35 মিটারের ওয়ার্নিং দরকার। অনেক বাঘা মেকানিকের কাছে গিয়েও আমি এর কোন প্রতিকার পাই নি। যাই হোক মিরপুর রোডে পুলিশ লাইন পার হওয়ার পর পরই ঝামেলা হলো। 2 গার্মেন্টস কমর্ী রাস্তার মাঝামাঝি থেকে দিল দৌড়। আমিও বেগতিক দেখে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে ব্রেক কষলাম। ওই সময় এম আই টু রিলিজ পায় নি। তা নাহলে নিঘর্াত টম ক্রুজের মত একটা স্লাইডিং এ্যাকশন দেয়া যেত। যাই হোক পাশে কুত্তামারা থাকায় রাস্তার বাঁয়ে বেশি চাপতে পারি নি। তাই প্রথমজনকে আঘাত না করলেও দ্্বিতীয়জনকে এড়াতে পারলাম না।
একে ঘটনার আকস্মিকতার শক ওয়েভ, তারপর ওই মেয়েটির গগণবিদারী আর্তনাদে আমার মোটামুটি জান উড়ে গেল। কাঁপাকাঁপি যে করিনি একথা বললে মিথ্যা বলা হবে। কারন ঘটনার পরপরই আমি মোটামুটি গণধোলাইয়ের আশংকা করছিলাম । আমাদের দেশের মানুষ এ ধরনের সুযোগ হাতে পেলে ছেড়ে কথা বলে না। একবার আমি নিউমার্কেটে এক ভদ্্রলোককে তার স্ত্রীর হাত ধরার জন্য গণধোলাই খেতে দেখেছিলাম। ভদ্্রমহিলা চিৎকার করেও মানুষকে নিবৃত্ত করতে পারেন নি। এজন্য আমিও মনে মনে "ইন্নালিল্লাহ .." পড়ে নিলাম, ধোলাই শুরু হলে সুযোগ পাওয়া নাও যেতে পারে ভেবে। কপাল মনে হয় খুব ভালো ছিল বা ওইদিন খুবই পূণ্যের কাজ করেছিলাম। পাশের রিকশায় বসা এক ভদ্্রলোক বলে উঠলেন "...জাদীরা, রাস্তা দেইখা পার হইতে পারস না? আল্লায় কি চোখ দেয় নাই? মর'স না কেন তোরা? আপনে ভাই বেরেক করলেন কেন? একেবারে পিষ্যা দিতেন। এইডি বাঁইচা থাকলে আবার রাস্তা দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করব।"
এই কথা শুনে বাকি বোধহয় বাকি যাদের হাত নিশপিশ করছিল, তারা একটু দমে গিয়েছিল। বাংগালী যে হুজুগে জাতি, তার প্রমাণ আবার পেলাম। আশেপাশের সবাই ওই ভদ্্রলোকের কথার সাথে একমত হলো। প্রথম গার্মেন্টস কমর্ী হালকা প্রতিবাদ জানাতে গেলে ভদ্্রলোক আবার বলে উঠলেন "আবার চিল্লায়, গেলি এইখান থেকে?" এরপর কি হয়েছিল মনে নেই, তবে আমি কথা না বাড়িয়ে পালিয়ে এসেছিলাম তা স্পষ্ট মনে আছে। আমি এখনও মনে করি বেশিক্ষন ওখানে থাকলে পাবলিকের মতামত বদলে যেতে সময় লাগত না।
তবে এই ঘটনার জন্য আজও আমি নিজেকেই দায়ী মনে করি। আমার অসাবধানতার জন্যই ঘটনাটি ঘটেছিল। আর জীবনে এরচেয়ে অনেক ছোট অপরাধ করে আমি মানুষের কাছে মাফ চেয়েছি। আমি মনে করি মাফ চাইলে নিজেকে কখনও ছোট করা হয় না। বরং বিশাল মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। তাই আজও এই ঘটনাটি আমার মনে ক্ষতের মত হয়ে আছে। কতটুকু আহত মেয়েটি হয়েছিল এটুকু জিজ্ঞাসা করা বা নিদেনপক্ষে স্যরি বলার মত সান্তনা বাণী আমি তাকে শোনাতে পারি নি। নিজে আজও তাই ভুগি অপরাধবোধে। আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে অপরাধের বোঝাটা যেন বেড়ে চলছে।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ১১:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



