somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার আমি..............(4)

১৮ ই জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ১১:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি ছোটবেলায় খুব অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ছিলাম। এর মূল কারণ ছিল আমার সবে ধন নীলমনি সাইকেল। প্রথেেম ছিল একটা বি এম এক্স, তারপর একটু বড় হয়ে যাবার পর পেলাম ভারতীয় হিরো কোম্পানির হিরো হ্যানসা। এখানে উল্লেখ্য যে হিরো কোম্পানির সাইকেলের তখন অনেক সমস্যা ছিল। তাই রানিং খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বছর তিনেকের মাথায় আরও একটা সাইকেল কিনতে বাধ্য হই। সেটা ছিল হিরো রেনজার। রেনজারটা ছিল আমার জীবনের সেরা বাহন। আজ গাড়ির মালিক হয়ে যতখানি গর্ববোধ করি, তারচেয়ে 50 গুন গর্ব ছিল আমার ঐ রেনজারটাকে নিয়ে। দীর্ঘ 6 বছর চালিয়েছিলাম সাইকেলটা। ইউনিভার্সিটিতে উঠার পর হলে চলে যাওয়ায় আর চালানো হয়নি। মিরপুর 10-11-12-1-2-6-13-কাফরুল-কচুক্ষেতের এমন কোন চিপা-কোণা নেই যেখানে আমার সাইকেলটার চাকা পড়েনি।

কলেজ লাইফে সাইকেলটাই আমার প্রধান বাহন ছিল।সাইকেলের চেয়ে আদর্শ বাহন ঢাকা শহরে নেই বলেই আমার ধারনা। যেমন রাস্তায় জ্যাম ফুটপাথ দিয়ে চালানো যায়, যানবাহনের পাশে থাকা স্বল্প ফাঁক দিয়ে এগিয়ে যাওয়া - এ জাতীয় কাজে সাইকেলের জুড়ি মেলা ভার।এরকম অনেক হয়েছে, বন্ধুরা বাসে করে 10 নম্বর থেকে 1 নম্বরে যাবে। কিন্তু আমার সাইকেল থাকায় যেতে হবে দ্্বিচক্রযানে। গন্তব্যে পৌঁছে দেখা গেল আমি আগে চলে এসেছি, আর বন্ধুরা লোকাল বাস বা ভটভটি টেম্পুতে (এই যানগুলোর মিরপুরের লোকাল একটা নাম ছিল। তা হলো কুত্তামারা। এরশাদ সরকারের আমলে নাকি এই যানগুলো ব্যবহার করে মিউনিসিপ্যালটির লোকজন নেড়ি কুকুর মেরে নিয়ে যেত) ট্রাফিক জ্যামে হারিয়ে গেছে।

সাইকেল নিয়ে বিপত্তিও কম হয়নি। একবার কলেজে যাচ্ছি সকালবেলা। বষর্াকালের ঘটনা। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। বৃষ্টি নামি নামি করছে। আমিও বৃষ্টির ভয়ে তুমুল জোরে প্যাডেল চালিয়ে যাচ্ছি। আমার সাইকেলের ব্রেকে বেশ বড়-সড় অসুবিধা ছিল আজীবন। তা হলো মোটামুটি ফুল স্পিডে থাকলে থামার জন্য 20-25 মিটার দূরে ব্রেক কষতে হত। আর যদি বৃষ্টি হয় তাহলে তো কথাই নেই থামতে মোটামুটি 35 মিটারের ওয়ার্নিং দরকার। অনেক বাঘা মেকানিকের কাছে গিয়েও আমি এর কোন প্রতিকার পাই নি। যাই হোক মিরপুর রোডে পুলিশ লাইন পার হওয়ার পর পরই ঝামেলা হলো। 2 গার্মেন্টস কমর্ী রাস্তার মাঝামাঝি থেকে দিল দৌড়। আমিও বেগতিক দেখে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে ব্রেক কষলাম। ওই সময় এম আই টু রিলিজ পায় নি। তা নাহলে নিঘর্াত টম ক্রুজের মত একটা স্লাইডিং এ্যাকশন দেয়া যেত। যাই হোক পাশে কুত্তামারা থাকায় রাস্তার বাঁয়ে বেশি চাপতে পারি নি। তাই প্রথমজনকে আঘাত না করলেও দ্্বিতীয়জনকে এড়াতে পারলাম না।

একে ঘটনার আকস্মিকতার শক ওয়েভ, তারপর ওই মেয়েটির গগণবিদারী আর্তনাদে আমার মোটামুটি জান উড়ে গেল। কাঁপাকাঁপি যে করিনি একথা বললে মিথ্যা বলা হবে। কারন ঘটনার পরপরই আমি মোটামুটি গণধোলাইয়ের আশংকা করছিলাম । আমাদের দেশের মানুষ এ ধরনের সুযোগ হাতে পেলে ছেড়ে কথা বলে না। একবার আমি নিউমার্কেটে এক ভদ্্রলোককে তার স্ত্রীর হাত ধরার জন্য গণধোলাই খেতে দেখেছিলাম। ভদ্্রমহিলা চিৎকার করেও মানুষকে নিবৃত্ত করতে পারেন নি। এজন্য আমিও মনে মনে "ইন্নালিল্লাহ .." পড়ে নিলাম, ধোলাই শুরু হলে সুযোগ পাওয়া নাও যেতে পারে ভেবে। কপাল মনে হয় খুব ভালো ছিল বা ওইদিন খুবই পূণ্যের কাজ করেছিলাম। পাশের রিকশায় বসা এক ভদ্্রলোক বলে উঠলেন "...জাদীরা, রাস্তা দেইখা পার হইতে পারস না? আল্লায় কি চোখ দেয় নাই? মর'স না কেন তোরা? আপনে ভাই বেরেক করলেন কেন? একেবারে পিষ্যা দিতেন। এইডি বাঁইচা থাকলে আবার রাস্তা দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করব।"

এই কথা শুনে বাকি বোধহয় বাকি যাদের হাত নিশপিশ করছিল, তারা একটু দমে গিয়েছিল। বাংগালী যে হুজুগে জাতি, তার প্রমাণ আবার পেলাম। আশেপাশের সবাই ওই ভদ্্রলোকের কথার সাথে একমত হলো। প্রথম গার্মেন্টস কমর্ী হালকা প্রতিবাদ জানাতে গেলে ভদ্্রলোক আবার বলে উঠলেন "আবার চিল্লায়, গেলি এইখান থেকে?" এরপর কি হয়েছিল মনে নেই, তবে আমি কথা না বাড়িয়ে পালিয়ে এসেছিলাম তা স্পষ্ট মনে আছে। আমি এখনও মনে করি বেশিক্ষন ওখানে থাকলে পাবলিকের মতামত বদলে যেতে সময় লাগত না।

তবে এই ঘটনার জন্য আজও আমি নিজেকেই দায়ী মনে করি। আমার অসাবধানতার জন্যই ঘটনাটি ঘটেছিল। আর জীবনে এরচেয়ে অনেক ছোট অপরাধ করে আমি মানুষের কাছে মাফ চেয়েছি। আমি মনে করি মাফ চাইলে নিজেকে কখনও ছোট করা হয় না। বরং বিশাল মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। তাই আজও এই ঘটনাটি আমার মনে ক্ষতের মত হয়ে আছে। কতটুকু আহত মেয়েটি হয়েছিল এটুকু জিজ্ঞাসা করা বা নিদেনপক্ষে স্যরি বলার মত সান্তনা বাণী আমি তাকে শোনাতে পারি নি। নিজে আজও তাই ভুগি অপরাধবোধে। আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে অপরাধের বোঝাটা যেন বেড়ে চলছে।

(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ১১:৫৭
১২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জলে স্থলে শূন্যে আমি যত দূরে চাই

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৫৩



আমি ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে ভুলেই গেছো!
লম্বা সময় ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। আমিও নানান ব্যস্ততায় যোগাযোগ করতে পারিনি। তুমিও যোগাযোগ করনি! অবশ্য তুমি যোগাযোগ অব্যহত না রাখাতে আমি বেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অদৃশ্য ছায়া: সমুদ্রের সাক্ষী

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬



ঢাকার বনানীর সেই ক্যাফেতে বৃষ্টির শব্দ এখন আরও তীব্র। আরিয়ান তার কফির মগে আঙুল বোলাচ্ছিল, তার চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ। সাঈদের দিকে তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলতে শুরু করল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মানবাধিকার' (অণু গল্প)

লিখেছেন আবু সিদ, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪

'মানবাধিকার' একটা এনজিও। তারা বিদেশী সহায়তা নিয়ে মানুষ, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করে। আজ তারা একটা বড় সমাবেশ করছে প্রেসক্লাবে। সমাবেশে সাংবাদিকসহ নানান পেশার মানুষ অংশ নিয়েছে। টিভি সাংবাদিকেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

নদী তীরের ইমাম থেকে গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সার: একটি অনুপ্রেরণার গল্প

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:০৬




নদী তীরের ইমাম থেকে গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সার: একটি অনুপ্রেরণার গল্প

একটি বিশাল নদীর কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা শান্ত এক জনপদ, আর ঠিক নদীর ঘাট ঘেঁষেই ছিল একটি সুন্দর মসজিদ। সেই মসজিদের ইমাম সাহেব... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুধু দ্বিতীয় রিফাইনারি (ERL-2) টা করে দেখান , সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গতকাল নাটকীয়তায় ভরা একটা দিন আমরা পার করলাম । রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন ঝড় বয়ে গেল। পুরো সোশ্যাল মিডিয়া যেন দুই ভাগে ভাগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×