প্রথম বিদেশে এসেছি। গুছিয়ে উঠতে পারি নি। কিন্তু মাথায় একটা টেনশন কাজ করে সারাক্ষন। একটা কাজ ম্যানেজ করতে হবে। তা নাহলে বিপদ। এই বিদেশ বিভঁূইয়ে খাওয়াবে-পরাবে কে? আমরা যখন বাংলাদেশ থেকে নতুন আসলাম, তখন ছোট-খাট কাজকে বলতাম "অড জব"। এখানে আসার কিছুদিন পর সহানীয় নামের সাথে পরিচিতি ঘটে। সহানীয় বাংলাদেশিরা ছোট-খাট কাজকে বলেন "কামলা"।
এই "কামলা" খুঁজতে বের হতাম প্রতিদিন সকাল বেলা। প্রথমে লোকাল পত্রিকা, তারপর এক সময় জুটছে না দেখে ডোর টু ডোর নক করা শুরু করলাম। সে এক ইতিহাস। দোকানে দোকানে গিয়ে ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করি , "ভাই আপনাদের কি কামলা লাগবে?" কিন্তু কামলা আর জুটে না। এর মধ্যে এক বড় ভাই জানালেন একটা এলাকার কথা। শুনলাম ঐ এলাকায় অনেক ফ্যাক্টরি আছে। ওখানে ডোর টু ডোর নক করলে ফায়দা হতে পারে। তাছাড়া ফ্যাক্টরি জবে পয়সাও মন্দ নয়।
আমি আর আমার ফ্ল্যাটমেট একদিন সকালে রওয়ানা দিলাম। কয়েকটা ফ্যাক্টরি ঘুরে লাভ হলো না। যেই শুনে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, সেই বলে কাজ নেই। আরে ঝামেলা!! আমি দেশে কোন ফ্যাক্টরিতে কামলা দিব? না দেশে থাকতে সে সুযোগ আমার ছিল? শেষে বিরক্ত হয়ে আমি ও আমার বন্ধু ঠিক করলাম সোজা রাস্তায় হবে না, বাঁকা রাস্তায় কাজ হাসিল করতে হবে। ঢুকলাম এক ব্যাটারি ফ্যাক্টরিতে। রিসেপশনিস্টকে জানাতেই সে বলল, তার জানামতে কোন কাজ নেই, তবে আমরা চাইলে ম্যানেজারের সাথে দেখা করতে পারি। আমরা তো রাজি। বুড়ি গেল ম্যানেজারকে ডাকতে আর এই ফাঁকে আমি আমরা ঠিক করলাম যে আমাদের রয়েছে অনেক বছর ব্যাটারি ফ্যাক্টরিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা.........ব্যাটারি তৈরি করা জানি,এই জাতীয় চাপা মারতে হবে। তা নাহলে গতি নাই।
এরই মধ্যে ম্যানেজার আসলেন। তিনি আমাদের ব্যাপার শুনে দু'জনকে ভেতরে ডাকলেন। ভিতরে বসতেই শুরু হয়ে গেল চাপাবাজি। কিন্তু ব্যাটারি ফ্যাক্টরিতে কি হয় তাই তো জানি না। তাই যা মুখে আসে বলে গেলাম যখন জিজ্ঞাসা করা হলো কি কি করেছি আগে। শুরু করলাম ব্যাটারিতে এসিড ঢালা - জাতীয় অসম্ভব সব চাপা। আর কোন থামাথামি নেই। আমি আটকে গেলে আমার বন্ধু শুরু করে আবার আমার বন্ধু আটকে গেলে আমি। হঠাৎ ভদ্্রলোক বলে বসলেন বাংলাদেশে যে কোম্পানিতে কাজ করেছি তার নাম কি? ওয়েব এ্যাড্রেস কি? দেখি সে কম্পিউটারে গুগল খুলে বসেছে। আরে যন্ত্রনা!!! বলে বসলাম হক ব্যাটারি। ভদ্্রলোক বলেন বানান কি? মহা মুসিবত। আমি সবে তোতলানো শুরু করেছি, তখন আমার বন্ধু বলল "খুব বড় কোম্পানি না তো, এজন্য ওয়েব সাইট নাই"। হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলাম।
বলাইবাহুল্য ঐ কামলা আমরা পেয়েছিলাম। আর ভদ্্রলোকের নাম ছিল ফিলিপ ডান। খুবই অমায়িক ও ভদ্্রগোছের মানুষ। তার কাছে আমার অনেক ঋণ। ঐ কামলাটা ছাড়া আমার প্রবাসজীবনে টিকে থাকা খুবই কঠিন হত। টানা 2 বছর কামলা দিয়েছিলাম ওখানে। একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম, "ফিলিপ তুমি ভালো মতই জানতে আমরা চাপা মেরেছিলাম। তাহলে কেন তুমি আমাদের রিক্রুট করেছিলে?" সে উত্তরে বলেছিল "আমার ঐ মুহুর্তে চিন্তায় ছিল কতখানি ডেসপারেট হলে দু'জন ইউনিভার্সিটি গ্রাজুয়েট এতদূর মিথ্যাচার করে। আমি তোমাদের সাহায্য করার জন্য ঐ দিন কামলা অফার করেছিলাম। কিন্তু আজ মনে হয় আমার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল না। কারন ইউ গায়েজ আর সিম্পলি বেস্ট।"
ধন্য ফিলিপ ডান। আপনি সত্যিই মহৎ। আপনার মত মানুষদের কারনেই আমার মত অভাগারা এদেশে টিকে আছে। আজও আমার সিভির প্রথম রেফারির নামটা থাকে "ফিলিপ ডান"।
(লেখাটি ফিলিপকে উৎসর্গ করলাম। একজন মানুষ যাকে নিয়ে তার বাবা-মা গর্ব করতে পারেন। এমন একজন বস যার সাথে কাজ করে কর্মচারীরা নিজেদের ধন্য মনে করে ও যিনি অকপটে মানুষের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারেন। পৃথিবীতে এমন মানুষ আজও আছে দেখেই মাঝে মাঝে এতো মধুর লাগে বেঁচে থাকা।)
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



