অনেক আশা নিয়ে গিয়েছিলাম। রেস্টুরেন্টে ঢুকেই সমস্ত আশা এক বিশাল ধাককা খেল। আমার কাজের জায়গা রেস্টুরেন্টের কোনার এক অন্ধকার কুঠুরিতে। কোন রকমে একজন মানুষ দাঁড়াতে পারে সেখানে, আর পাশে রয়েছে বিশাল ফ্রিজ।সেখানে থেকে ভেসে আসছিল কনকনে ঠান্ডা বাতাস। বলার অপেক্ষা রাখে না যে কামলা দিতে আসার সময় কোন গরম কাপড় সঙ্গে আনার প্রয়োজনবোধ করিনি।
যাই হোক কাজ শুরু করলাম। আমার বন্ধু আগেই সতর্ক করে দিয়েছিল যে 8 ঘন্টার টাকা পেলেও কাজ করতে হবে মোটামুটি 12 ঘন্টার মত। তাতেও আপত্তি নেই। আমি সবকিছুতে রাজি। অনেকদিন আগের একটা দ্্বিতীয় যুদ্ধের ছবি দেখেছিলাম, নাম ছিল "দ্য লংগেস্ট ডে"। ডি-ডে ল্যান্ডিং নিয়ে কাহিনী। খোলা বীচে গুটি কয়েক আমেরিকান সৈন্যের জামর্ান মেশিনগানের হাত থেকে সারাদিন বেঁচে থাকার রোমহর্ষক কাহিনী। আমার জীবনের "দ্য লংগেস্ট ডে" ছিল ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের কাজ করার দিন। এখনও মনে মনে ভাবি কিভাবে টিকে ছিলাম সে 12 ঘন্টা। সিনেমার নায়কের মতো খোলা বীচ ছিল না, ছিল ছোট্ট একটা পানি ভেজা স্যাঁতসেঁতে রুম। আমার আশেপাশে রক্তাক্ত মৃতদেহ ছিল না, ছিল খাবারের উচ্ছিষ্ট পরিপূর্ণ দুর্গন্ধযুক্ত এক পরিবেশ। আমার হাতে বেয়োনেট সংযুক্ত রাইফেল ছিল না, ছিল বাসন মাজার ডিটারজেন্ট আর ছোবা (দুঃখিত আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহারের জন্য। ভালো বাংলা মনে আসছে না)। রাইফেল দিয়ে আমি জামর্ান সৈন্য মারিনি, ছোবা দিয়ে পরিষ্কার করেছি উচ্ছিষ্টপূর্ণ প্লেট। এক দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা। উপায় ছিল না, তাই চুপচাপ কাজ করে গিয়েছিলাম।
রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেলে যখন ঝাড়ু ধরিয়ে দিয়ে বলা হলো পুরা রেস্টুরেন্ট পরিষ্কার করার জন্য, চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নি। কিছু করার ছিল না। ডারউইন সাহেব শ'কয়েক বছর আগে বলে দিয়েছেন, "সাভর্াইভাল ইজ ফর দ্য ফিটেস্ট।" বাপের হোটেলে কাজ-কর্ম ছাড়া ফ্রি লাইফ এনজয় করার মজাটা তখন হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলাম।
আমি পেরেছি, আরও দশজন পেরেছে, ভবিষ্যতে যারা আসবেন তারাও পারবেন। আমরা যারা স্কলারশিপ ছাড়া বিদেশে আসি মিনিমাম ফিনান্সিয়াল সাপো র্ট নিয়ে তাদের হাতে খুব কম অপশন-ই থাকে। তবে স্বীকার করতে দ্্বিধা নেই, এই তথাকথিত অডজব আমাকে কিছু মূল্যবান শিক্ষা দিয়েছিল। তাহলো- আত্নবিশ্বাস, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার, আত্ন উপলব্ধি ও জীবনের কঠিন বাস্তবতার স্বরূপ।
যারা মনে করেন তারা অডজব করেন, দয়া করে এ নিয়ে নিজেকে ছোট মনে করবেন না। নিজের অজান্তে এ থেকে যে শিক্ষা আপনি লাভ করছেন তা একসময় অবশ্যই উপলব্ধি করবেন ও সেদিন এর মর্ম বুঝতে পারবেন। আমি কোন জবকেই অডজব বলি না বা দাবি করি না আমি "ইভেনজব" করি। প্রতিদিন গুনে গুনে নয় ঘন্টা কাজ করা লাগে, যার জন্য মাস শেষে বেতন পাই। এজন্যই দিন শেষে বাসায় এসে মাকে ফোন দিয়ে বলি "আম্মা কামলা দিয়ে আসলাম।"
পুনশ্চ: ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে কাজ করে ওখানে খাওয়ার মানসিকতাটা হারিয়েছি। এত নোংরা থাকে ওদের রান্নাঘর বলার মত না। কেউ আমাকে ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে খাওয়ার কথা বললেই আমার চোখে ভাসে স্যাঁতসেঁতে রান্নাঘর, চারিদিকে উচ্ছিষ্ট ও আবর্জনা , ময়লা প্লেটে খাবার পরিবেশন করার মত দৃশ্য। ভদ্্রতার সাথে প্রত্যাখান করি আমন্ত্রন।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ রাত ৯:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



