somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাহিত্যের মায়েরা

০৭ ই মে, ২০১৪ বিকাল ৪:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১।
সাহিত্যে মা চরিত্রের কথা আসলেই সবার আগে মনে পড়ে যায় ম্যক্সিম গোর্কির সৃষ্ট ‘’মা’য়ের কথা। এ উপন্যাসে গোর্কি খুব সাধারণ একজন মায়ের দৃষ্টিতে সন্তানের বিপ্লব, সংগ্রাম ও আন্দোলনকে তুলে ধরেছেন। সমাজতন্ত্রের একজন বিপ্লবী পাভেল, তার মা গ্রামের সাধারণ এক নারী, রাজনীতির কিছুই বোঝেন না। আন্দোলনের বন্ধুদের নিয়ে পাভেল তার ঘরে বিভিন্ন আলোচনা করে, তারা তাদের স্বপ্নের কথা একে অপরের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়। পাভেলের মা তাদের সেসব কথা না বুঝলেও কান পেতে শুনতেন, সন্তানের সাথে সাথে তিনিও যেন স্বপ্ন দেখতেন একটি শোষণমুক্ত সমাজের। একসময় পাভেল গ্রেফতার হয়ে নির্বাসিত হয়ে যায়। মা সন্তানের অসমাপ্ত বিপ্লব শেষ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন।সন্তানের শেষ বার্তাগুলো মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে গিয়ে মা ধরা পড়েন। প্রচণ্ড অত্যাচারের মাঝেও, মৃত্যুর মুহুর্তেও তিনি সন্তানের স্বপ্ন সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবার সংগ্রাম থেকে নিবৃত্ত হন নি।

ম্যাক্সিম গোর্কির ‘’মা’’ পড়তে পড়তেই আপনার চোখে ভেসে উঠবে এমনি এক মায়ের বাস্তব চিত্র, যার দেখা আমরা পাই শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘’একাত্তরের দিনগুলি’’তে, যেখানে তিনি তুখোড়, চৌকষ, মেধাবী এক তরুণের ছবি এঁকেছেন একজন মায়ের তীব্র বেদনা দিয়ে।এক অনন্য সাহসী মায়ের সাথেও আমাদের পরিচয় হয়ে যায় এই বইটি পড়তে পড়তে। জাহানারা ইমামের প্রথম সন্তান শাফী ইমাম রুমী নিজের মেধার ও যোগ্যতায় আমেরিকার ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় ইলিনয় ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে সুযোগ পান।এদিকে উত্তাল একাত্তরে স্বাধীনতার নেশায় উন্মুক্ত রুমী সিদ্ধান্ত নেয় বিদেশে না গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবার। মা জাহানারা ইমাম সন্তানের এমন সিদ্ধান্তে বারবার নিজের সাথে বোঝাপড়া করতে থাকেন। সারাদেশের মানুষ যেখানে স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠছে, শান্তিপ্রিয় বাংগালিরা মরিয়া হয়ে যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে প্রতিপক্ষের উপরে, সেখানে এমন সময়ে তিনি কি নিজের ছেলেকে ঘরে আটকে রাখতে চাইতে পারেন? সন্তান শুধু ঘরের ভেতরে বন্ধুদের নিয়ে ঝঁকিয়ে বসে দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে থাকবে,তর্ক বিতর্কে মত্ত থাকবে, মা হিসেবে তিনি কি শুধু এটুকুই চান? কখনো জাহানারা ইমামের মনে পড়ে যায় খলিল জিবরানের পংক্তি ‘’তাদেরকে চেয়ো না তোমাদের মত করতে। কারণ, তাদের জীবন কখনই ফিরবে না পেছনের পানে।‘’

মায়ের সাথে রুমীর দারুন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটি স্পষ্ট বোঝা যায় বইটির পাতায় পাতায়।যা-ই করুক, মাকে না জানিয়ে, লুকিয়ে চুরিয়ে কখনো কিছু করা যাবে না, এমন কি সিগারেট খেতে হলেও মাকে জানিয়ে খেতে হবে, এমনভাবেই ছেলেকে গড়ে তুলেছেন মা জাহানারা ইমাম।রুমী ইচ্ছে করলে লুকিয়ে যুদ্ধে চলে যেতে পারতো, খুব সহজে। কিন্তু না, রুমী যুদ্ধে যাবে মায়ের অনুমতি নিয়েই।তাই মায়ের মত আদায় করে নেবার জন্য মাঝে মাঝে মা-ছেলের মাঝে যুক্তি-তর্কের ঝড়ও বয়ে যায়।তুখোড় বিতার্কিক রুমীর কাছে প্রায় সময়েই মা জাহানারা ইমামকে হার মানতে হয়। ডায়রীর পাতায় মা জাহানারা ইমামের লেখায় পাঠকও শুনতে পাবে রুমীর দৃপ্ত কণ্ঠস্বর, ‘’আমেরিকা থেকে বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হবো, কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনদিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো না, তুমি কি তাই চাও মা?’’ সন্তানের এমন কঠিন প্রশ্নের সামনে জাহানারা ইমাম জবাব দেন, ‘’দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে।‘’
গেরিলা যুদ্ধের ট্রেইনিং নিতে রুমী চলে গেলে মায়ের দিন কাটে ছেলের অপেক্ষায়। আবার কখনো রুমী তার কাজের ফাঁকে এসে দেখা করে যায় মায়ের সাথে।যুদ্ধের সংগীদের নিয়ে গল্প করতে করতেই আবার মাকে সাবধান করে দিত, সব কথা যেন তিনি জানতে না চান। কারণ, কখনো ধরা পরলে অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তিনি যদি রুমীদের গোপন তথ্য সব পাকিস্থানিদের কাছে বলে দেন! এই নিয়ে মা-ছেলের মাঝে ঠাট্টা হত, অভিমান হত। যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে মনকে প্রস্তুত করতে মাকে ২য় বিশ্ব যুদ্ধে নাৎসী বাহিনীর কর্মকাণ্ডের উপর লেখা বই পড়তে দিত রুমী।মাকে শোনাতো তার প্রিয় কবিতা,
‘’…তুমি আর ভবিষ্যত হাত ধরে যাচ্ছ পরস্পর…’’

২৫ আগস্টে রুমীদের গেরিলা অপারেশনে মা জাহানারা ইমামেরও অংশ রয়েছে। সেদিন তিনি নিজে গাড়ি চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেন।এ ঝুঁকিপূর্ণ ও সাহসী অপারেশনের পরেই নিজ বাড়ি থেকে রুমী আরো কয়েকজন গেরিলা যোদ্ধার সাথে ধরা পড়ে যায় পাকিস্থানিদের কাছে।
এ সময় মা জাহানারা ইমামকে একটি কঠিন সময় পাড়ি দিতে হয়।সন্তানের অপেক্ষায় দিনের পর দিন কেটে যায়, কিন্তু কোন খবর পাওয়া যায় না রুমীর।মাঝে মাঝে দূররবল মনে নিজেকে ভর্ৎসনা করেন। রুমীকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দিতে গিয়ে কেন তিনি ‘’কোরবানি’’ দেবার কথাটা উচচারণ করেছিলেন এই ভেবে।সন্তানের মুক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে গিয়েও তিনি দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে ফিরে আসেন। কারণ, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়ে রুমী ধরা পড়েছে, আজ তাদের কাছেই নত হয়ে ক্ষমা চাইতে গেলে মুক্তিকামী গেরিলা যোদ্ধা রুমীকেই অপমান করা হবে।এভাবেই ডায়রীর পাতায় ‘’একাত্তরের দিনগুলি’’কে ধারণ করতে গিয়ে জাহানারা ইমাম যেমন গেরিলা যোদ্ধা রুমীকে এঁকেছেন, তেমনি এঁকেছেন চিরন্তন মাতৃ্রূপকেও। এই মায়ের কথা বলতে গিয়েই যেন নন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, ‘’সেই গল্প তাঁর একার থাকে নি।কোন এক অলৌকিক উপায়ে হয়ে গেছে আমাদের সবার গল্প।‘’

ম্যাক্সিম গোর্কির ‘’মা’’ কিংবা ‘’একাত্তরের দিনগুলি’’তে শহীদ জননীর পাশাপাশি সাহিত্য জগতে আরেক সাহসী, ব্যতিক্রমী ও শক্তিশালী মা আমরা দেখতে পাই ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেনের ‘’হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’’ উপন্যাসের ‘বুড়ি’ চরিত্রে। হলদিগাঁয়ের একটি কিশোরী দস্যি মেয়ে বুড়ি, যার অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় বিপত্নীক গফুরের সাথে।গফুরের আগের ঘরের দুটি সন্তান সলীম ও কলীমের মুখে মা ডাক শুনেও মন ভরছিল না বুড়ির।নিজ গর্ভজাত সন্তানের মা হবার অনুভূতি পাবার জন্য বুড়ি গ্রাম্য পীরের শরণাপন্নও হয়। এরপরে একসময় বুড়ির গর্ভে সন্তান আছে। সন্তান গর্ভে ধারণ করেই যেন বুড়ির মাতৃত্বে পূর্ণতা আসে।সন্তান নিয়ে নানা রকম রকম স্বপ্ন জমতে থাকে বুড়ির চোখে।কিন্তু সন্তান জন্মের পরে বুড়ির স্বপ্নগুলো একটি জায়গায় গিয়ে হোঁচট খায়।কারণ তার গর্ভজাত সন্তান রইস আর দশটা ছেলের মত নয়। বুদ্ধিহীন হাবাগোবা, বোব-কালা ছেলে রইসকে নিয়েও তবু তার তেমন অভিযোগ ছিল না। মনের যত মান-অভিমান, গল্প-ছড়া সব ছেলের কাছেই বলত বুড়ি, যদিও ছেলে রইস এসবের কিছুই বুঝত না। এ এমনই ছেলে বুড়ির, যে তাকে কোনদিন মা বলে ডাকবে না।
দেখতে দেখতে শান্ত গ্রাম হলদিগাঁয়েও ছড়িয়ে গেল স্বাধীনতার জ্বলন্ত আগুন।একাত্তরে পাকিস্থানিদের অত্যাচারের প্রতিবাদে গ্রামের সহজ সরল সাধারণ মানুষগুলোও যুদ্ধে যোগ দিতে শুরু করল।এমনই একদিন, গ্রামের দুই মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নেয় বুড়ির ঘরে।ঘুমন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে বুড়ির মনে হয়, তার ছেলে রইস সুস্থ থাকলে সেও যুদ্ধে যেতে পারতো। দেশের এমন প্রয়োজনের সময়েও নিজের সন্তানটি কোন কাজে আসছে ভেবে এক গভীর বেদনায় বুড়ির মন ছেঁয়ে যায়।এদিকে পাকিস্থানিরা মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে বুড়ির বাড়িতে এসে হানা দেয়।তাৎক্ষণিক একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে বুড়ি।
‘’বুড়ি এখন ইচ্ছে করলেই শুধু রইসের মা হতে পারে না।বুড়ি এখন শুধু রইসের একলার মা নয়।‘’
আর তাই বুড়ি মুক্তিযোদ্ধা দুজনকে পালাতে সাহায্য করে এবং নিজের ঘুমন্ত হাবাগোবা ছেলে রইসকে তুলে দেয় পাকিস্থানিদের হাতে।



২।
‘’…মনে পড়ে সৈয়দ শামসুল হকের একটি সাক্ষাৎকারের কথা। সেখানে তিনি বলেছিলেন, শুধু সন্তান জন্মের অভিজ্ঞতা নিয়ে মহিলা লেখকরা লিখতে পারেন অন্য রকম উপন্যাস। এই বিষয় তো পুরুষদের করায়াত্ত নয়।‘’ –(সেলিনা হোসেন—লারা)
আত্নজৈবনিক গ্রন্থ ‘’লারা’’তে সেলিনা হোসেন তাঁর দক্ষ হাতে বর্ণনা করেছেন তাঁর তিন সন্তানের তিনটি ভিন্ন রকম জন্মের ঘটনা। এ বইতে পাঠক দেখতে পাবে কিছু জন্ম মুহুর্ত, কিছু মৃত্যু মুহুর্ত, মা-সন্তানের সম্পর্ক, ভাই-বোনের সম্পর্ক, নারীর জীবন, বিভিন্ন ধরনের সমাজ, জানতে পারবে এক মিরাকল বেবির জন্মকথা, দেখতে পাবে দারুন স্বপ্ন দেখা আকাশ ছোঁয়া উড়ন্ত লারাকে, লারার চোখে কিউমুলাস মেঘের মত জীবনকে, অনুভব করতে পারবে সন্তান হারানোর বিচ্ছেদ, মায়ের দুঃখ।এই লারাই তো তার লেখক মাকে বলতো, ‘’ 'দুঃখই লেখকের স্থায়ী সুখ।‘’ স্বল্প পরিপরে জীবনের এতগুলো দিক ও দর্শণ এত সুন্দর করে বর্ণনা করতে পারেন সেলিনা হোসেনই।

সন্তান জন্মের আরেক ধরনের অভিজ্ঞতার কথা আমরা জানবো ওরিয়ানা ফ্যাল্লাচির আত্নজৈবনিক উপন্যাস ‘’আ লেটার টু আ চাইল্ড নেভার বোর্ন‘’-এ। একজন মা কেন সন্তান জন্ম দেন, এই দুঃখ-কষ্ট, ক্ষুধা-দারিদ্র,বঞ্চণা,মিথ্যা, অপমানে ভরা পৃথিবীতে? একদিন এই সন্তানই হয়ত মাকে প্রশ্ন করে বসতে পারে, কেন আমাকে এ্মন একটা পৃথিবীতে নিয়ে এসেছো? এমন প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল সদ্য গর্ভ সঞ্চারের পর মায়ের মনে। আর তারপরেই গর্ভের সন্তানের কাছে তিনি লিখতে শুরু করেন এক দীর্ঘ চিঠি। অবিবাহিত অবস্থায়, ক্যারিয়ারের শুরুতে এভাবে হঠাৎ পরিকল্পণা ছাড়া গর্ভবতী হবার ইচ্ছে ফ্যাল্লাচির কখনোই ছিল না। কোন মানসিক প্রস্তুতি ছাড়াই হঠাৎ গর্ভে একটি সন্তান এসে যাবার সংবাদ ডাক্তারের কাছে শুনে ফ্যাল্লাচি প্রথমে হতবিহবল হয়ে গেলেও পরে সে অবস্থা কাটিয়ে উঠেন।এই সন্তান এভাবে না চাইলেও অনেকদিন থেকেই তো এরই অপেক্ষায় তিনি ছিলেন!এ অবস্থায় এই সন্তানকে পৃথিবীতে আনা ঠিক হবে কিনা, এ তার মনে কোন দ্বিধা কাজ করে না। কারণ, তিনি ভাল করেই জানেন, শুন্যগর্ভতার চেয়ে খারাপ কিছু নেই। গর্ভের সন্তানকে তাই বারবার তিনি সাহস যুগিয়েছেন এই বলে, পৃথিবীতে জন্মাবার এমন সুযোগ যেন সে কাজে লাগায়।
গর্ভের সন্তানের সাথে মায়ের কথোপকথনে আমরা দেখি, ফ্যাল্লাচি জীবনের রূঢ় দিকটি সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন।তার সন্তানটি যদি মেয়ে হয়ে জন্মায় তবে তাকে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে আর পুরুষ হয়ে জন্মালে তিনি তাকে কিভাবে দেখতে চান, সন্তানকে সব তিনি খোলা মনে শেয়ার করেছেন।মা হিসেবে তিনি নিজের সন্তানকে নারী-পুরুষে বিভক্ত না করে তাকে একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন।ডাক্তারের কাছ থেকে গর্ভস্থ ভ্রূণের ছবি খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তিনি লক্ষ্য করতেন।ভ্রুণের পরিবর্তন, বৃদ্ধি খুব কৌতুহলের সাথে পর্যবেক্ষণ করতেন।
এভাবে অবিবাহিত অবস্থায় হঠাৎ গর্ভবতী হয়ে যাবার ঘটনায় ফ্যাল্লাচিকে নানা রকম বিড়ম্বনাও পোহাতে হয়েছে।তিনি গর্ভবতী শুনে আশপাশের মানুষ তাকে আর সহজভাবে গ্রহণ করতে চাইত না।ডাক্তারেরা তাকে পরামর্শ দিচ্ছিল গর্ভপাত করে ফেলার, কারণ ওটা এখনও একটা ক্ষুদ্র ভ্রুণ মাত্র। চাকরি ক্ষেত্রেও তাকে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল।ক্যারিয়ারের এমন সুন্দর সময়ে গর্ভবতী হয়ে পড়ায় অনেক সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে, তাই বসের কাছে মিথ্যে কথা বলে ছুটি নিতে হয়েছিল তাকে।গর্ভকালীন অসুস্থতার সময়টাতেও তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কারণ এ সময়ে তার যত্ন নেবার কেউ ছিল না। যে প্রেমিকের সাথে তার বিচ্ছেদ হয়ে গেছে কিছুদিন আগে, ফ্যাল্লাচির গর্ভবতী হয়ে যাবার খবরটি তার কাছেও একসময় পৌঁছে গেল। দুজনের ভুলের ফলাফল ঐ সন্তানটিকে গর্ভপাতের মাধ্যমে নষ্ট করে ফেলার জন্য অর্ধেক খরচ দিতে রাজি আছে বলে ফ্যাল্লাচিকে জানায় সেই দায়িত্ববান (!) প্রেমিক।

গর্ভের সন্তানকে তার গর্ভকালের প্রতিটি মুহুর্তের কথা চিঠিতে লিখে জানিয়ে যাচ্ছিল ফ্যাল্লাচি।এক সময় এই সন্তানটিকে তার কাছে যন্ত্রণা বলে মনে হতে লাগলো।স্বাধীনতা হরণের জন্য সন্তানের কাছে অভিযোগও করল।নিজের ইচ্ছে মত মদ ও সিগারেটও খেয়ে ফেলল।কিন্তু তারপরেই আবার অনুশোচনা ও দুশ্চিন্তা শুরু হল ফ্যাল্লাচির, বিশেষ করে বিছানায় যখন রক্তের দাগ দেখা গেল। এর মধ্যে একদিন খারাপ রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে যাবার ফলে ফ্যাল্লাচি অসুস্থ হয়ে পড়েন।ডাক্তারি পরীক্ষায় দেখা যায় সন্তানটি গর্ভেই বৃদ্ধি বন্ধ করে ন্নিঃসাড় হয়ে গেছে। আদালতের জুরী বোর্ডের সামনে পরিবারের সবাই, ডাক্তার এমন কি সেই সাবেক প্রেমিকও (যে কি না একদিন ঐ সন্তানটি নষ্ট করে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিল) ফ্যাল্লাচির বেপোয়ারা চলাফেরার কারণে গর্ভপাতের জন্য তাকে খুনি হিসেবে সাব্যস্ত করল।
ফ্যাল্লাচির জীবন বাঁচাতে গর্ভের মৃত সন্তানটিকে অস্ত্রপচার করে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন হয়।যে সন্তানটি কখনো এ পৃথিবীতে জন্ম আর নেবে না, তার কাছে তখনো ফ্যাল্লাচি চিঠি লিখতে থাকেন। জীবনের কঠিন রূপের খানিকটা দেখে এত জলদি হার মেনে ফেলায় সন্তানকে ভীতু বলে সম্মোধন করেন।মা ও সন্তানের চির বিচ্ছেদের সময়টাতেও সন্তানের সাথে তার কথা ফুরাতে চায় না। দুজনের আত্নিক আলিংগন ছিন্ন হবার পরে যখন একটি টেস্টটিউবের রাসায়নিক দ্রবণে ডুবন্ত অবস্থায় সন্তানকে দেখলেন, তখনও তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন ম্যাগনোলিয়া গাছ থেকে সাদা সাদা ফুল পেড়ে সন্তান তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক সময় ওষুধের প্রভাব কেটে জ্ঞান ফিরে এলে তিনি অনুভব করেন, পৃথিবীতে এখনো লক্ষ লক্ষ শিশু জন্মাচ্ছে, তার সাথে লক্ষ লক্ষ মা-ও জন্মাচ্ছে।বাস্তবতা দিয়ে উপলব্ধি করতে পারেন, তার সন্তানটি এখন মৃত।নিজেকেও তাঁর মৃত মনে হতে থাকে। তবুও জীবন কখনো মরে না।

(লেখাটি সংক্ষিপ্তরূপে সাপ্তাহিক ২০০০, ৯ মে, ২০১৪ তে প্রকাশিত হয়েছে)
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×