পারলে একবার সোহাগী ঘুরে যেও।
আজ সারাদিন কোনো কাজ করিনি,,কারো কথা শুনিনি, যা যা কাজের কথা বলা হয়েছিল তার সব উত্তর হয়েছিল ‘পারবো না, পারবো না’। আজ সারাদিন সূর্যের দেখা নেই, একটানা বৃষ্টি, কখনো কম কখনো বেশি । আবহাওয়া হালকা ঠাণ্ডা ও হালকা গরম দুরকমই শোনা যাচ্ছে । এবিষয়ে আমার কোনো অনুভূতি নেই। আমার মাথায় সকাল থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে সোহাগী । তাঁর সঙ্গে আমার কথাবার্তা চলছে। এই প্রথম সোহাগী আমার মাথায় ঢুকেছে, শুধু ঢোকা নয় পুরো মাথাটি দখল করে নিয়েছে। তাঁর সঙ্গে কথা বার্তা চলছে। সোহাগীর কথা বেশ মিষ্টি। আবার অভিমান অনুযোগ ভরা তার কথা বেশ সংক্রামকও। তাঁর সঙ্গে আমার সব কথা সবার জানার খুব প্রয়োজন নেই। তবে একটি কথা উল্লেখ করছি। বিখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর ‘ফেরা’ উপন্যাসটিতে একটি গ্রামের পটভূমি রয়েছে যার নাম সোহাগী। বাস্তবেও এই গ্রামটি আছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার একটি ইউনিয়নের নাম যেমন সোহাগী ইউনিয়ন তেমনি সোহাগী নামে উচ্চ বিদ্যালয় ও সোহাগী একটি রেল ইস্টিশনও আছে। কিন্তু আমার সোহাগী কি ওই গ্রামেরই কেউ ! জানি না ।
সোহাগী নামের অর্থ বলে দেওয়ার দরকার আছে কি? মন হয় না। বৃহত্তর বাঙালি সমাজের পরিবারের ফুল গাছে যে ফুল বারবার ফোটে সে-ই সোহাগী। ফলে সংসারে এই শব্দটির ব্যবহারও যথেষ্ট। ভাবতে ইচ্ছে করে এত কোমল একটি শব্দ বাংলার একটি জনপদের নাম কে বা কারা রাখলো? কেনইবা রাখলো? মাথার মধ্যে তখনই সোহাগী একটি পাখির সুরে শিস দিয়ে উঠলো,বললো থামো থামো, এর কি আর একটা মাত্র উত্তর আছে! কমছে কম দশ দশটা উত্তর একেকজন একেকরকম করে দেবে। এই রীতি বহুকাল ধরে চলে আসছে। সবাই যার যার পছন্দের উত্তরটা বলে। কাউকে জিজ্ঞেস করতে গেলে তুমি বোকা বনে যাবে । তার চে তুমি যে কারণে নামটা নিয়ে ভাবছো সেইটা নিয়ে তুমি এগোও।
—সেটা কী? এত কথার পর এখন কি আর মনে আছে?
—উফ্ তোমাদের মত ভুলো মনের মানুষদের নিয়ে মুশকিল—কেন, ওই যে ‘সোহাগী’ নামটা শুনেই তোমার কত কথা মনে এসে গেল—মনে পড়ছে না?
এভাবে কথা বলতে বলতে সোহাগী একটা নির্জন পথে আমাকে রেখে চলে গেল। এই পথটি যে গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছে তার নাম বিরামপুর। কী সুন্দর নাম না? দুপুর রোদে এ গ্রামের পাশ দিয়ে গেলে চোখে পড়বে ছোট বড় গৃহস্থ বাড়ি। ধানের গোলা, খড়ের গাদা, হয়তো বা সময় বিশেষে কোন ঋতুতে দেখা যাবে পাট শুকোনোর সমারোহ। যেমন এখন দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ির বাইরের প্রশস্ত উঠোনে পাটখড়ি বা পাটকাঠির গোছা তার গোড়া ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গায়ে রোদ লাগাচ্ছে। সেই চড়া রোদেও কিন্তু সেখানে বাচ্চাদের লুকোচুরি খেলার অন্ত নেই। এখানে ক্লান্ত পথিকের যাত্রা বিরতি ঘটতে পারে। তার জন্যই হয়তো তার নাম বিরামপুর।
বিরামপুর পার হতে হতে আপনি একটা ট্রেনের শব্দ শুনতে পাবেন। তখন হয়তো প্রাক সন্ধ্যার বিকেল। এটাই এদিক থেকে যাওয়ার শেষ ট্রেন। সূর্যাস্তের আয়োজন তখন পশ্চিম দিগন্তে। আপনি হয়তো সোহাগীকে নিয়ে তখন পুনরায় ভাবছেন; নাম, নামকরণ; হয়তো এই সূত্র ধরে এগোলে নামের সঙ্গে একটা বিস্তৃত ইতিহাস পাওয়া যাবে। কিন্তু সোহাগী আপনাকে এতটা ভাবার সুযোগ না দিয়ে শিস দিয়ে উঠলো, বললো কি এখনো ভেবেই যাচ্ছো? সোহাগীর কোনো কূল কিনারা পাচ্ছো না তাই না? তো শোনো একটু আগে যে ট্রেনের শব্দটা শুনলে আমি ওটায় চড়ে চলে যাচ্ছি । ওই ট্রেনটার নাম কি জানো? ওটার নাম ‘মহুয়া এক্সপ্রেস’। আমি বলি মহুয়া সুন্দরী এক্সপ্রেস। তুমি তো এখন মহুয়া মলুয়া কাব্যের দেশেই আছো। কী সুন্দর না নামটা? কাব্যের দেশে মজে যেওনা আবার। পারলে একবার সোহাগী ঘুরে যেও।
@রাজা সরকার।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


