somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রিনির চূড়া

২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ডাঃ রিনি ধর – তাঁকে নিয়ে আমার এই উপাখ্যান। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ “সাকাহাফং” জয় করে ঠিক তার ১৫ দিন পর, Cellulitis নামক এক ধরনের Bacterial skin infection এ আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলাম চট্টগ্রামের “প্রিমিয়ার হসপিটালে”। হঠাৎ গ্রিক পুরাণের স্বর্গীয় দেবী “আফ্রোদিতি” এর মত আমার জীবনে রিনির আবির্ভাব । আমার কাছে তিনি এসেছিলেন , একজন ডাক্তার হিসেবে routine follow up এবং আমার পায়ে দগদগে ঘা গুলোতে ড্রেসিং করার উদ্দেশ্যে ।

পাঠক , বলুন তো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর চোখ কার ছিল ? ক্লিওপেট্রার ? না ! পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর চোখ ছিল বুদ্ধদেব পুত্র কুনালের । আর রিনির চোখ তার চেয়েও সুন্দর , যেন জন্মকাজল পরানো । ঠোঁটগুলি যেন কালো গোলাপের পাপড়ি আর চুল দেখে মনে হয় এ যেন চুল নয় , শত শত রহস্য ঘন রাত্রির কাহিনী । পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বাগানের , সবচেয়ে সুন্দর ফুলগুলো , তাঁর কোমলতার কাছে লজ্জা পাবে । আজ পর্যন্ত পৃথিবী যতগুলো পূর্ণিমা দেখেছে , সবগুলো পূর্ণিমার সৌন্দর্য একসাথে ম্লান হয়ে যায় , যখন আমি রিনির হাসিমুখ দেখি । তাকে দেখলে মনে হয় , সে আমার প্রিয় অভিনেত্রী Penélope Cruz Sánchez । প্রথম যেদিন সে আমার ঘা গুলোতে ড্রেসিং করছিল , আমার মনে হচ্ছিল , Érase una vez en México (Once Upon a Time in Mexico) ছবির নায়িকা Salma Hayek , এক দুর্দান্ত অভিযানের পর আমার সেবা করতে এসছে। সেই অনেক পুরনো scenario , চোখের সামনে ভাসছিলো। সে দেখতে পুরো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “অমিতা সেন”।

হায় ! মানুষ কিভাবে এত সুন্দর হতে পারে ?

সে আমার গিরিনন্দিনী , সে আমার অন্নপূর্ণা , সে আমার ফেলে আসা উদ্যাম তারুণ্য - মেক্সিকোর ঢেউয়ের সাথে খেলা , রাশিয়ার রহস্যময় সব সন্ধ্যা , বার্লিনের শ্রেষ্ঠ ফিলারমনিকা থেকে ভেসে আসা , মেট্রোতে অপেক্ষমান তরুণতরুণীদের প্রিয় কোন সুর , ভালেন্সিয়ার রাস্তায় আচমকা বেজে ওঠা ফ্লামেঙ্ক ...... এই মিষ্টভাষী , আমার এই রাজকুমারীটাকে আমি ভালোবাসি , ভালোবাসি আর ভালোবাসি ............।

এই লেখাটা আমি লিখছি , যখন আমি Severe malaria (ম্যালেরিয়া) , P falciparum infection এ আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালের ১৪ নং এ ওয়ার্ডে শয্যাশায়ী , আর আমার রিনি এখন দ্বীপবাসিনী - মহেশখালী দ্বীপ।

পাঠক , যে সময়টা মানুষ বিকশিত হয় , মানে মানুষের বয়সকাল ১৮-২৫ , ঠিক সেই সময়গুলো আমার কেটে গেছে রাশিয়া , জার্মানি সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে । সেই ১৯৯৯ তে পড়াশুনার উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ ছেড়েছিলাম , দেশে ফিরলাম ১৮ বছর ৯ মাস একটানা দেশের বাইরে কাটিয়ে , তাও আসতাম না , এসেছি বাংলাদেশের Power sector নিয়ে কাজ করার জন্যে , জার্মানিতে আমাদের research lab এর প্রতিনিধি হয়ে। এই সুদীর্ঘ প্রবাস জীবনে , প্রায় ৩৯ টা দেশ ঘোরার পর , অগণিত বিভিন্ন জাতি ও মানুষের সাথে মেশার পর , আমি যে মানুষ যুক্তি ও লজিকের বাইরে এক পাও দি না , আমি সেই মানুষ সমস্ত যুক্তি , লজিকের তোয়াক্কা না করে , কিভাবে এক বঙ্গ ললনা রিনির কাছে ধরাশায়ী হয়ে গেলাম , তাঁর কাছে নিজেকে সঁপে দিলাম , তাকে এভাবে ভালোবেসে ফেললাম , আমার কাছে ভাবতেও অবাক অবাক লাগে। আমার বন্ধুরা বলে “ভাই, তুই যখন প্রথম বাংলাদেশে এলি , তখনকার জ্যোতি , আর এখনকার জ্যোতির মধ্যে আকাশ – পাতাল তফাৎ , তুই কেন এমন হয়ে গেলি রে ভাই ?”।

পাঠক , সামহোয়্যারইন ব্লগ এর সাথে আমার সম্পর্ক সেই ২০০৮ সাল থেকে , এটা আমার খুব আদর ও ভালোবাসার জায়গা। তাই আমি আমার অনুভূতিগুলো এখানেই প্রকাশ করি । আর আমি মনে করি , আমার পাঠকের সাথে আমার সম্পর্কটা আত্মিক । আমার জীবনের সময়ের , অসময়য়ের , সুখ , দুঃখের গল্প আমার পাঠকরা জানুক। তাই এই রিনিকে নিয়ে আমার এক সরল অনুভূতির গল্প আজ আপনাদের শোনাবো । এইরকম ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেনি কখনো আগে।


ভালোবাসার মানুষকে তো সবাই কতকিছুই না উপহার দেয়। সবাইতো জানে প্রেমের ইতিহাসে শাহাজাহান দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রীকে “তাজমহল”। আমি ওখানে দুবার গেছি , আমার ভালো লাগে নি । কিন্তু প্রেয়সীকে দেওয়া অনেক উপহারের ইতিহাস আমাদের অজানা । এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে Orlov Diamond ।


ছবি ১ - Orlov Diamond

189.62 ক্যারটের (37. 924 গ্রাম) এই ডায়মন্ড ভারতবর্ষের , তেলেঙ্গানার Golkonda তে পাওয়া গিয়েছিল। এক ফরাসী সৈনিক , হিন্দু সন্ন্যাসী সেজে ১৭৪৭ সালে , Srirangam এর কোন এক হিন্দু মন্দির থেকে চুরি করে ফ্রান্সে নিয়ে আসে । পরে এই ডায়মন্ড আমস্ট্রাডামে নিলামে ওঠে । রাশিয়ার তৎকালীন ধনকুবের Grigory Grigoryevich Orlov , 1,4 মিলিয়ন Dutch florins.(নেদারল্যান্ডের মুদ্রা , ইউরো চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত) দিয়ে এই মূল্যবান ডায়মন্ড কিনে নেন।


ছবি ২ - রাশিয়ার তৎকালীন ধনকুবের Grigory Grigoryevich Orlov

Orlov তাঁর প্রেমিকা , রুশ সম্রাজ্ঞী Catherine the Great (Catherine II ) কে এই ডায়মন্ড উপহার হিসেবে দেন । Catherine the Great , Orlov এর মৃত্যুর পর তাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এই ডায়মন্ডের নাম দেন Orlov Diamond এবং নিজে ডিজাইনার নিয়োগ করে এর কারুকাজ করান যা অনেকটা ভারতীয় গোলাপ ফুলের মত দেখতে লকেট , ডিজাইনের কাজ ১৯৭৪ সালে শেষ হয় ।


ছবি ৩- রুশ সম্রাজ্ঞী Catherine the Great (Catherine II )


ছবি ৪ - Orlov Diamond সম্পর্কিত রুশ সরকারের প্রকাশিত ডাকটিকিট

উল্লেখ্য Grigory Grigoryevich Orlov আজীবন , Catherine the Great এর সাথে প্রেমই করে গেছেন , তাঁকে বিয়ে করতে পারেন নি । বর্তমানে মস্কোর Kremlin Armoury তে এই ডায়মন্ড রাখা আছে , যে কেউ চাইলে টিকেট কেটে ঢুকে এই ডায়মন্ড দেখতে পারেন

আরেকটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে আমেরিকার বেসবল লিজেন্ড “Joe DiMaggio” এবং অভিনেত্রী “Marilyn Monroe” এর প্রেম ।


ছবি ৫ - বেসবল লিজেন্ড “Joe DiMaggio” এবং অভিনেত্রী “Marilyn Monroe”

তাদের বিয়েটা টিকেছিল মাত্র ন মাস এবং বিচ্ছেদ হয়েছিল “Marilyn Monroe” এর পক্ষ থেকে । কিন্তু বেসবল লিজেন্ড “Joe DiMaggio” , “Marilyn Monroe” কে এতই ভালোবাসতেন , “Marilyn Monroe” এর মৃত্যুর পর টানা ২০ বছর ধরে , প্রত্যেকদিন ৬ টা করে বিভিন্ন রঙের গোলাপ ফুল , উনি “Marilyn Monroe” এর সমাধিতে রেখে আসতেন ।


ছবি৬ - “Marilyn Monroe” এর সমাধিতে ফুল দিতে গিয়ে সাংবাদিকের ক্যামেরায় বন্দি বেসবল লিজেন্ড “Joe DiMaggio”।

“Joe DiMaggio” আমৃত্যু এই কাজটি করে গেছেন এবং এই গোলাপ গুলোর florist ছিলেন একজন ইরানি।

আজ থেকে ৬ মাস আগে সাকাহাফং অভিযান শেষ করে স্কুলবন্ধু , প্রকৃতি বিশারদ ডাঃ অরুনাভ চৌধুরীর কাছ থেকে একটা অদ্ভুত গল্প শুনেছিলাম । গল্পটা এরকম - George Mallory নামে একজন ব্রিটিশ পর্বত আরোহী , তাঁর ভালবাসার মানুষকে এতই ভালবাসতেন যে , তিনি শপথ করেছিলেন মাউন্ট এভারেস্ট সামিট করে তিনি এভারেস্টের চূড়ায় রেখে আসবেন তাঁর ভালোবাসার মানুষের ছবি – তিনি তাঁর প্রিয়তমার ছবি এভারেস্টে রেখে এসেছিলেন , কিন্তু এভারেস্ট সামিট শেষ করে এক দুর্ঘটনায় তিনি পথে নিখোঁজ হন এবং মারা যান।


ছবি ৭- ব্রিটিশ পর্বত আরোহী George Mallory ।


ছবি ৮ – শেষ এভারেস্ট অভিযান করার আগ মুহূর্তে George Mallory দের দল।

১৯৯৯ সালের ১লা মে , ৭৫ বছর পর তাঁর মৃতদেহ আবিস্কার হয়। George Mallory এর এই ঘটনা আমার মনে গভীর প্রভাব ফেলে । তাঁর কিছু কথা আমি ব্যক্তিগত ডায়রিতে নোট করি .........
“The first question which you will ask and which I must try to answer is this, ‘What is the use of climbing Mount Everest ?’ and my answer must at once be, ‘It is no use’. There is not the slightest prospect of any gain whatsoever. Oh, we may learn a little about the behavior of the human body at high altitudes, and possibly medical men may turn our observation to some account for the purposes of aviation. But otherwise nothing will come of it. We shall not bring back a single bit of gold or silver, not a gem, nor any coal or iron. We shall not find a single foot of earth that can be planted with crops to raise food. It’s no use. So, if you cannot understand that there is something in man which responds to the challenge of this mountain and goes out to meet it, that the struggle is the struggle of life itself upward and forever upward, then you won’t see why we go. What we get from this adventure is just sheer joy. And joy is, after all, the end of life. We do not live to eat and make money. We eat and make money to be able to enjoy life. That is what life means and what life is for.”

এর মধ্যেই বন্ধু ডাঃ অরুনাভ চৌধুরীর উৎসাহে জয় করতে থাকলাম একের পর এক শৃঙ্গ । যেতে থাকলাম বান্দরবনের গহীন থেকে গহীনে । জয় করলাম যথাক্রমে সবচেয়ে সহজ কেওকারাডং থেকে শুরু করে , ধীরে ধীরে একটু একটু করে কঠিন সাকা হাফং (৩৪৭১ ফুট) , জো-ত্লং (৩৩৪৫ ফুট) , দুম্লং (৩,৩১০ ফুট) এবং যোগী হাফং (৩২২২ ফুট)। ঘুরে বেড়াতে থাকলাম যতসব বাংলাদেশের তথাকথিত নিসিদ্ধ এলাকা যেমন তিনাপ সাইতার , তারপি সাইতার ইত্যাদি ঝরনা।


ছবি ৯- তিনাপ সাইতার ঝরনা

শুধুমাত্র সাকাহাফং এ অভিযান করতে গিয়ে রেমাক্রিতে ছিলাম প্রায় ১৪ দিন , ঘুরে বেড়িয়েছি থানচি , রেমাক্রি এলাকার প্রায় ১৯ টা আদিবাসী পাড়া। এমন এমন জায়গায় গিয়েছি , আদিবাসীদের মতে ওইসব এলাকায় আমি প্রথম বাংলাদেশী। এর মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ঝরনার সারি (প্রায় ৩৬ টা ঝরনা সাজানো বেদির মত) সোন্দা বহমা ।


ছবি ১০ - ঝরনার সারি (প্রায় ৩৬ টা ঝরনা সাজানো বেদির মত) সোন্দা বহমা

এর সামনে বর্ষাকালে নাফাকুম এবং আমিয়াকুম কিছুই না। এক পর্যায়ে আরকান লিবারেশন আর্মির শেলটার পাওয়ার জন্যে ধরেছি বৌদ্ধ ভিক্ষুর ছদ্মবেশ , যদিও এখন আমার সাথে ওদের ভাল সম্পর্ক , আমার আসল পরিচয় জানার পরও । প্রাই চলে যেতাম রেমক্রি , বগালেক , শুধুমাত্র বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের জন্যে ।

এর মধ্যে ডাঃ রিনিকে দেওয়া আমার সামান্য কিছু উপহার , উনি আমাকে ফেরত দেন , তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে , শুধুমাত্র তাঁর পারিবারিক চাপে । সবচেয়ে মেজাজ খারাপ হয়েছিল , উনার পরিবার আমাকে ফেরত দেয় , আমার পড়া , তাঁকে দেওয়া শ্রেষ্ঠ কিছু বাংলা ভাষায় লেখা বই । তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আব্দুল জব্বার স্যার এর লেখা “তারা পরিচিতি” , আমার পড়া বাংলায় শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ। এদের পরিবারের মন মানসিকতা একবার চিন্তা করে দেখুন। এদের কাছে তারা পরিচিতির চেয়ে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত টাইপ বইের মূল্য বেসি। তখনই আমি সিধান্ত নি, রিনিকে এমন একটা কিছু দেব , যেটা ইতিহাস হয়ে যাবে এবং তাঁর পরিবার চাইলেও আমার দেওয়া এই উপহার ফেরত দিতে পারবে না। George Mallory এর কাহিনী আমি তখনও ভুলিনি । কিন্তু এই মুহূর্তে এভারেস্ট যাওয়া , আমার পক্ষে সম্ভব না । তাই মনে মনে স্বপ্ন দেখতাম , আমি বাংলাদেশের অজানা এক চূড়া আমি জয় করব , যেখানে এখনো কেউ যায় নি , যেটা এখনো অনাবিষ্কৃত , যেটার কথা এখনো কেউ জানে না , এইরকম একটা পাহাড় চূড়া , সন্ধান করে , সামিট করে , জয় করে , পুরো অভিযান আমার ভালোবাসার মানুষ রিনিকে উৎসর্গ করব এবং বাংলায় ওই পাহাড়ের নাম রাখব “রিনির চূড়া”। তাকে ভালোবাসার নিদর্শন আমি রেখে যাব , এবং এগুলো লিখব বিভিন্ন দেশের সংবাদ পত্রে। আপনাদের আশীর্বাদে আমি রুশ , জার্মান এবং স্প্যানিশ ভাষা , আমি বাংলার চেয়েও ভাল জানি। এই উপহার রিনির পরিবার কোনদিন ফেরত দিতে পারবে না। আমি কোনদিন ভাবিনি , আমার স্বপ্ন একদিন সত্যি হবে।

পেছনের ঘটনাঃ গত ২৬এ অক্টোবর , যখন আমি তখনকার ৪র্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ যোগী হাফংয়ের ৪র্থ চূড়ায় আরোহণ করি , প্রায় ৪ ঘণ্টার মতো আমি সেখানে অবস্থান করেছি ।


ছবি ১১ - যোগী হাফংয়ের ৪র্থ চূড়ায় আমি

ঠিক ওই সময় আমার পথপ্রদর্শক রা আমাকে একটার পর একটা পাহাড় আমাকে দেখাচ্ছিল। ওই দূরে সাকাহাফং ( যেটা আমি ৬ মাস আগে জয় করেছি) , ওইটা জো-ত্লং এবং জো-ত্লং ও যোগী হাফংয়ের ২য় চূড়ার মাঝে অস্পষ্টভাবে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটা চূড়া । আমি আমার পথপ্রদর্শকদের ওই চূড়া সম্পর্কে প্রশ্ন করলে , ওরা আমায় বলল “আমরা ওই চূড়া কিংবা পাহাড়টা সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না , পথ দুর্গম হওয়ার কারনে ওই চূড়ায় কেউই ওঠে না। শুধুমাত্র আমাদের পাড়া (দালিয়ান পাড়া এবং মুরং পাড়া) থেকে শিকারিরা আসে ওই পাহাড়ের অর্ধেক পথটায় , বাঁদর , সজারু আর ধনেশ পাখি শিকার করার জন্য। মনে প্রচণ্ড সন্দেহ হচ্ছিল এবং যোগী হাফংয়ের ৪র্থ শৃঙ্গ থেকে আমাকে অই অজানা পাহারটিকে দেখে আমার কেন যেন উঁচু মনে হচ্ছিল। সামিট শেষ করে দালিয়ান পাড়ায় ফিরে এসে পাড়ার হেডম্যান (চেয়ারম্যান) কে জিজ্ঞেস করতে উনি বললেন “দেখুন ওদিকটায় শুধু শিকারিরা যায় , পথ খুবই দুর্গম , বম ভাষায় ওই পাহাড়ের নাম “আইয়াং ত্লং “ , আমি এখানে প্রায় ২৫ বছর হেডম্যানের দায়িত্ব পালন করছি , আমার জানামতে আমাদের পাড়ার কেউই ওই পাহাড়ের চূড়ায় কেউ কোনদিন যায় নি , আর বাঙ্গালিতো প্রশ্নই আসে না। আমরা কেউ ওই রাস্তা পুরোটা চিনি না , তবুও আমাকে কিছুদিন সময় দেন আমি পাড়ার বয়স্ক লোকদের (মুরুব্বি) সাথে কথা বলে দেখি।


ছবি ১২ - জো-ত্লং চূড়ায় আমি

তার দুদিন পর জো-ত্লং সামিট শেষ করে দালিয়ান পাড়ার নিচে মাঠে বসে দেখতে থাকলাম এক অদ্ভুত সুন্দর স্বপ্ন। কত স্বপ্নই তো দেখেছি জীবনে – এত সুস্পষ্ট ছবি আমি দেখিনি কখনো , এমন গভীর রেখাপাত করেনি কোন স্বপ্ন আমার মনে। দালিয়ান পাড়ার হেডম্যান লাল রাম বম দার কাছ থেকে শোনা এই অনাবিষ্কৃত পাহাড় এবং চূড়া আবিষ্কার এবং জয় করে নিজের ভালবাসার মানুষের নামে তার নাম দেব “রিনির পাহাড় – রিনির চূড়া” , সেই মড় মড় করে বাঁশঝাড় ভেঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে অভিযাত্রীর দল , পাহাড়ের অধিত্যকার নিবিড় বনে পাতা-লতার ফাঁকে ফাঁকে , অনেক উঁচুতে , ভরা জোৎস্নায়, রিনির পাহাড়ের শিখরদেশটা যেন কোন স্বপ্নরাজ্যের সীমা নির্দেশ করছে।

চলে যাওয়ার দিন দালিয়ান পাড়ার হেডম্যান বিদায় বেলায় বলল “একজন বৃদ্ধ আছেন যিনি “আইয়াং ত্লং“ এর রাস্তা চেনেন কিন্তু তিনি এখন এখানে নেই । রেমাক্রি গেছেন কোন এক কাজে।

অতঃপর অভিযানঃ এবার ঘর থেক বেরিয়েছিলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি এলাকায় অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যে, রাং-ত্লং রেঞ্জের পাহাড়গুলোতে , সেই উদ্দেশ্যে বগালেক হয়ে রাইক্ষান ভ্যলিতে যাত্রা। কিন্তু শনিবার ৯/১১/২০১৯ চট্টগ্রাম থেকে পেলাম অসম্ভব মন খারাপ করা খবর।


ছবি ১৩ – বগালেক থেকে একটু দূরে খারাপ খবরটা পাওয়ার আগ মুহূর্তে

রিনির সাথে আমার বিয়ে হোক এটা আমার বাবা- মা কোনদিনই চান নি , কিন্তু আমার চাপচাপিতে , আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে নতুন ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠব এই হুমকির কারনে , নিজেদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে উনারা গিয়েছিলেন রিনিদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। এবং বাংলাদেশের সাধারন সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবার এর মত , রিনিদের পরিবার থেকে এল প্রত্যাখান। অন্যতম কারন , আমি ডিভোর্সি , আমার আগে রুশ স্ত্রী ছিল। এটা আমি কোনদিন অস্বীকার করি নি , রিনিও এটা জানে। আজ প্রায় ৪ বছর হয়ে গেল আমার প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ। এটা হওয়ার অন্যতম কারন , আমি তাকে সময় দিতে পারতাম না । আমার অতিরিক্ত পরিমান ভ্রমনের নেশা । সুযোগ পেলেই আমি আমি উড়ে যেতাম ইউরোপ থেকে লাতিন আমেরিকা – মেক্সিকো , কিউবা , ডোমিনিকান রিপাবলিক , কলম্বিয়া ইত্যাদি , তাছাড়া আমি একটু বন্ধু প্রিয়। ল্যাবের পরে , আজ এই বইয়ের দোকান , তো কাল কোন ফিলারমনিকা ইত্যাদিতে মেতে থাকতাম , আর সপ্তাহ শেষে বন্ধু , বান্ধব নিয়ে বার , ডিস্কো তো আছেই। তাই ছাড়াছাড়ি । কিন্তু রিনির পরিবারকে বোঝানো হয়েছে সম্পূর্ণ অন্যভাবে । এগুলি এক ধরনের গ্রাম্যতা – লিখতে চাই না এগুলি। এগুলি বাংলাদেশের , চট্টগ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলির , বিশেষ করে যেগুলি গ্রাম থেকে শহরে এসেছে , এগুলির জাতের সমস্যা , উল্লেখ্য আমাদের পুরো “ধর পরিবার” এসেছে গ্রাম থেকে , শুধুমাত্র আমার বেড়ে ওঠা আমার প্রিয় চট্টগ্রাম শহরে। প্রচণ্ড ঘিরিঙ্গিবাজ , ফালতু টাইপের হয় চট্টগ্রামের , এই গ্রাম থেকে শহরে আসা হিন্দু লোকগুলি ।

আমি মনে করি যৌবনে একবার অন্তত আঘাত খাওয়ার প্রয়োজন আছে। প্রেমের জন্য একবার আঘাত না পেলে যৌবনের সোনা পবিত্র হয়ে ওঠে না। যেমন সম্পূর্ণ কাহিনীর জন্য একটি নামের প্রয়োজন হয় , তেমনি যৌবনের সম্পূর্ণতার জন্য প্রয়োজন হয় একটি আঘাতের

দুঃখজনক হলেও সত্যি , আমি আমার প্রিয়তমা রিনির কাছ থেকে পাই নি কোন প্রত্যাখ্যান , আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে আমার বাবা-মা এবং ওদের পরিবার।

যাইহোক ওদের পরিবার থেকে প্রত্যাখ্যানের খবর পেয়ে মনে চেপে গেল অসম্ভব জেদ। আমি এইরকম সেই ছোট বেলা থেকেই। ওই দিন আসন্ন ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারনে , পাহাড়ে বইছে প্রচণ্ড বাতাস এবং টিপ টিপ বৃষ্টি। সিধান্ত নিলাম , না আর রাং-ত্লং রেঞ্জ নয় , আমার এমন একটা কাজ করতে হবে যেটা ইতিহাস হয়ে যায়। জয় করব “আইয়াং ত্লং“ এবং ওটাকে নাম দেব রিনির চূড়া। সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে , প্রচণ্ড বাতাসের মধ্যে বগালেক থেকে বাইকে রওয়ানা হয়ে গেলাম থানচির উদ্দেস্যে । তখন রাত সাড়ে বারোটা । ভোর ৬ টায় থানচি এবং ওখান থেকে যখন দালিয়ান পাড়া বেস ক্যাম্প ছুঁলাম , তখন বেলা ১২ টা।


ছবি ১৪ – থানচি থেকে ভোর ৬-৩০ এ রেমাক্রির উদ্দেশ্যে যাত্রা


ছবি ১৫- ঢুকছি দালিয়ান পাড়ায়

দালিয়ান পাড়ার হেডম্যান “লালরাম বম” দা বলল “একজন ৭২ বছরের বৃদ্ধ আছেন , যিনি প্রায় ৩০ বছর আগে “আইয়াং ত্লং“ এর চূড়ায় উঠেছিলেন , তিনি অস্পষ্ট ভাবে রাস্তা চেনেন। তিনি যারা শিকার করতে যায় , যারা অন্তত অর্ধেক রাস্তা চেনে , উনি তাদের পুরো রাস্তাটা চিনিয়ে দিতে পারেন। আপনাকে সাথে দুজন শিকারি পথ প্রদর্শক আমি দেব। কিন্ত বিজিবি ক্যম্পের অনুমতি ছাড়া আমি আপনাকে এই রকম ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান করতে দিতে পারি না। অগত্যা আমাকে বাধ্য হয়ে যেতে হল নিকটস্থ বিজিবি ক্যাম্পে।

বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডার সরাসরি আমাকে বললেন “ না , আপনি এসব দুর্গম জায়গায় যাওয়ার অনুমতি পাবেন না”। আমি বললাম “আমি যদি এই নতুন পাহাড় আবিষ্কার করে জয় করতে পারি , আমি এই নতুন পাহাড়ের নাম রাখব আমার ভালোবাসার মানুষের নামে এবং এটা হবে বাংলায় “রিনির চূড়া – রিনির পাহাড়”। বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডার অনেকখন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন এবং আমি বুজতে পারছিলাম এই জাতীয় কথা উনি প্রথম শুনেছেন। উনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন “আপনি যান , আমি জানি আমি অনুমতি না দিলেও আপনি যাবেন । আপনাকে আমরা কি ধরনের সহযোগিতা করতে পারি , শুধু সেনা চাইবেন না” । আমি বললাম “আমার প্রয়োজন খুব মোটা দড়ি এবং ২টা টর্চ” । সমস্ত সরঞ্জাম নিয়ে ফিরে এলাম দালিয়ান পাড়া । কাল অভিযান।

ভোরের আলো ফুটে নি তখনো । ভোর চারটা। আমার দুই শিকারি পথপ্রদর্শক লাল্লিয়ান বম , লাল ঠাকুম বম এবং আমাদের সাথে শিকারি কুকুর হেরমিন , যাবতিয় সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত। দালিয়ান পারা থেকে প্রায় ১২ কিঃমিঃ সজযেই অতিক্রম করে ১ ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম Y জংশনে ।


ছবি ১৬ - এটাই Y জংশনের অনুসড়ক চিহ্ন সেই গাছ

এখানে Y জংশন সম্পর্কে একটু বলে রাখা ভাল। এই জায়গাটার মাঝে একটা বিশাল Y আকৃতির গাছ দাঁড়িয়ে । এই গাছের বাম দিকের রাস্তাটা চলে গেছে পূর্বের ৪র্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ যোগী হাফংয়ের দিকে আর ডান দিকের টা বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জো-ত্লং এর দিকে। অভিযাত্রীরা এই গাছটিকে অনুসরক চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করে। আমরা কোন দিকেই না গিয়ে সোজা সামনের দিকে এগিয়ে চললাম। প্রায় ১২০০ ফুটের মত একটা পাহাড় অতিক্রম করে শুরু ঝিরিপথ। গতকাল বৃষ্টি হওয়ার কারনে ঝিরির পাথরগুলো অসম্ভব পিচ্ছিল। প্রায় পার করে দিলাম ৬৭ কিঃমিঃ ঝিরিপথ। এই পথে দেখলাম প্রায় ১২ টার মত সব নাম না জানা ঝরনা। এই ঝিরিপথ পাড়ি দিতে গিয়ে আমাকে পার হতে হয়েছে ৮০০-৯০০ ফুট উঁচু প্রায় ৭ টা পিচ্ছিল খাঁড়াই - মানে এই পিচ্ছিল জায়গাগুলো দিয়ে অনেক উঁচু থেকে ঝরনার জল , ঝিরিতে এসে পড়ে , যেখানে শুধু বাঁশ এবং দড়ির উপর ভর দিয়ে উপরে উঠতে হয়। খারাইতে পা রাখলেই , স্লিপ কেটে নিচে পরে হাত , পা ভাঙ্গার সম্ভাবনা কিংবা জায়গামত পড়লে নিশ্চিত মৃত্যু। ঝিরিপথ যখন শেষ তখন সূর্য প্রায় ডুবো ডুবো । এর মধ্যে ঝিরিতে স্লিপ কেটে পড়ে গিয়ে আমার পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে প্রচণ্ড ব্যাথা। আমার দুই পথপ্রদর্শক পাহাড়ি কায়দায় আমার বুড় আঙ্গুলটিকে লতা দিয়ে বেঁধে হ্যাঁচকা তান দিতেই , মট করে একটা শব্দ করে আঙ্গুল্টা আবার কেন জানি সোজা হয়ে গেল এবং কমে আসলো ব্যাথা।


ছবি ১৭- পিচ্ছিল ঝিরি পথ


ছবি ১৮ – পিচ্ছিল ঝিরপথ


ছবি ১৯- একটি পিচ্ছিল খাড়াই , এগুলো বেয়ে উঠতে হয়


ছবি ২০ – একটি খাড়াই থেকে নামার পথে


ছবি ২১ - পিচ্ছিল ঝিরপথ


ছবি ২২ – যাওয়ার পথে সুন্দর ঝরনাগুলোর একটা


ছবি ২৩ – যাওয়ার পথ সুন্দর ঝরনাগুলোর একটা


ছবি ২৪ – পিচ্ছিল ঝিরপথ


ছবি ২৫ - পিচ্ছিল ঝিরপথ


ছবি ২৬ – আরও একটা পিচ্ছিল খাড়াই , তবে এটা একটু সোজা


ছবি ২৭- বনপথ


ছবি ২৮ - পিচ্ছিল ঝিরপথ


ছবি ২৯ - পিচ্ছিল ঝিরপথ


ছবি ৩০ - পিচ্ছিল ঝিরপথ


ছবি ৩১ – আমার মচকা খাওয়া আঙ্গুলের পাহাড়ি চিকিৎসা

সূর্য অস্ত গেলে , পথপ্রদর্শকরা জানিয়ে দিল তারা এই পর্যন্তই রাস্তা চেনে এবং পাড়ার মুরুব্বির কথা অনুজায়ী , ঝিরিপথ যেখানে শেষ হবে , তার কিছুদুর হাতের বামে গেলেই “আইয়াং ত্লং” পাহাড় শুরু। ওটা প্রচণ্ড দুর্গম , তাই সকাল ছাড়া হবে না , রাতটা এই ঝিরির শেষে এই বড় পাথরটার উপরে কাটাতে হবে। কাটা হল কলাপাতা , জ্বালানো হল আগুন। হল সঙ্গে নিয়ে আসা বিনি চালের ভাত আর আলু ভর্তা , এটা আমাদের দুপুরের খাবার ছিল , খাওয়া হল সন্ধ্যায়।

বাজলো রাত আটটা। আমার শিকারিরা যাবে শিকারের সন্ধানে। সাথে সঙ্গী শিকারি কুকুর হেরমিন আর আমি। মনে , মেক্সিকো , রাশিয়ার শিকারের স্মৃতি । প্রায় ঘণ্টা খানেক ছোট একটা পাহাড় ট্র্যাকিং করার পর শিকারিরা নিভিয়ে দিল আমাদের টর্চ । একজন শিকারি আগে গিয়ে খবর আনল , সামনে প্রচুর বাঁদরের আনাগোনা । পজিশন নিল আমাদের শিকারি লাল ঠাকুম বম । গুলি! ঝুপ করে কি একটা যেন পড়ল । আমাদের শিকারি কুকুর হেরমিন ল্যাজ নাড়তে নাড়তে চলে গেল শিকারের সন্ধানে। বড় সাইজের একটা বাঁদর । সামনে এগিয়ে যেতে থাকলাম। থমকে দাঁড়ালাম আবার। খবর সামনে সজারু কিংবা কাঠবিড়ালি থাকতে পারে। হাঁটলাম আরও আধঘণ্টা । লাল ঠাকুম বম এর পজিসন , এবং গুলি । এবার ঝুপ শব্দ । হেরমিন নিয়ে এল লাল ঠাকুম বম এর শিকার করা সজারু। সবই হল চাঁদের আলোয়।

পাঠক , শিকারে উৎসাহ দিয়েছি এই ভেবে আমাকে ভুল বুজবেন না প্লিজ , আমার লেখাটা পুরোটা পড়ুন শেষ পর্যন্ত । আমি explain করেছি সবকিছু নিচে।

আমাদের ঘুমানোর জায়গায় ফিরে এশে , টানলাম পাহাড়ি মদ দোচোয়ানি যেটা এখানে যু নামে পরিচিত । শুরু হল আগুনের সামনে জলসা। সাথে ঝিরি থেকে সংগ্রহ করা কাঁকরা ভাজি এবং বাইন মাছ পোড়া । মাতাল হয়ে গাইতে থাকলাম “কাল সারারাত তোমারই কাঁকন যেন , কানে কানে রিনিঝিনি বেজেছে ...... (অ্যালাবামঃ ময়না – আইয়ুব বাচ্চু) মাতাল হয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তার খেয়াল নেই।

সকালে শিকারিদের চীৎকারে ঘুম ভাঙ্গল। দাদা , ওঠেন । এগতে হবে। পাড়ার মুরুব্বির নির্দেশনা অনুযায়ী এগোতে থাকলাম। পাহাড়ের গায়ে প্রচণ্ড জংলী সব গাছ গাছালি, আমাদের দুই সিকারির হাত যেন থামছেই না । দা দিয়ে জঙ্গল পরিস্কার করতে করতে , প্রায় অর্ধেক ওঠার পর , শুরু বাঁশ বাগান। আর এগোনও সম্ভব না। আমাদের দুই শিকারি পথপ্রদর্শক তখন ক্লান্ত , বলল চলেন ফিরে যাই , আমরা আর পারছি না। পারব না শব্দটা আমার অভিধানে কক্ষনোই ছিল না , আমার শ্লোগান “কর এবং মর”, অথবা নয় - পৃথিবীতে এসছি , কিছু করব এবং মরব। আমি বললাম তোমরা ফিরে যাও। আমি একাই উঠবো। যাই হোক বাঁশ বন পরিস্কার করতে করতে উঠতে থাকলাম। এক পর্যায়ে আমার পথপ্রদর্শক লাল ঠাকুম বম এর চিৎকার “দাদা , আমরা পৌঁছে গেছি চূড়ায়” – মানে , এটা যে “আইয়াং ত্লং“ এর চূড়া বুজবো কিভাবে ? পাড়ার সেই মুরুব্বির কথা অনুযায়ী এর পশ্চিমে দেখা যাবে যোগী হাফং এর ২য় চূড়া এবং পূর্বে দেখা যাবে জো-ত্লং এর চূড়া। আমি নির্দেশ দেওয়ার আগেই , আমার শিকারিরা জঙ্গল সাফ করে দেখাল, পূর্ব আর পশ্চিমে তাকিয়ে দেখেন। আরে সবই মিলে যাচ্ছে। আমার চোখে তখন গড়িয়ে পড়ছে আনন্দের অশ্রু । চীৎকার করে বললাম “রিনি , আমি তোমাকে ভালোবাসি”। আমি এখন আমার গিরিনন্দিনীকে দেখছি। এবার কাজের পালা। G.P.S দিয়ে দুবার করে উচ্চতা পরিমাপ করলাম – ৩২৯৮ ফুট – আমার রিনির পাহাড় , আমার রিনির চূড়া , যা যোগী হাফং থেকে ৭২ ফুট বেশি উঁচু , মানে “আইয়াং ত্লং” , রিনির চূড়া , বর্তমানে ৪র্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ । Coordinates: 21°40′23.78″N 92°36′16.01″E , Data recorded by Garmin eTrex 30X GPS by trekker. উড়িয়ে দিলাম লাল সবুজের পতাকা। আমি প্রথম বাঙালি , পা রাখলাম একটি সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত , অপরিচিত একটি চূড়ায় , যা কিনা বাংলাদেশর ৪র্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ । লিখলাম সামিট নোট । টাঙিয়ে দিলাম প্লস্টিকে মোড়ানো ব্যনার। সামিট নোট প্লাস্টিকের বোতলে ভরে রেখে দিলাম স্মৃতি চিহ্ন।


ছবি ৩২ – আমি ও আমার দুই পথপ্রদর্শক - লাল্লিয়ান বম , লাল ঠাকুম বম


ছবি ৩৩ – এই বাঁশ বাগান কেটে সাফ করতে করতে আমাদের আগাতে হয়েছে।


ছবি ৩৪ – আমার নেওয়া GPS পরিমাপ


ছবি ৩৫ - আমি জিপিএস পরিমাপের রিডিং লিখছি


ছবি ৩৬ - সামিট নোট বাংলায়


ছবি ৩৭ - সামিট নোট ইংরেজিতে


ছবি ৩৮ - সামিট নোট বোতলে ভরা হচ্ছে


ছবি ৩৯- বোতলে ভরে সামিট নোট রাখা হচ্ছে


ছবি ৪০ – ব্যানার টাঙ্গিয়ে রাখা হচ্ছে


ছবি ৪১ – উড়িয়ে দিলাম লাল সবুজের পতাকা


ছবি ৪২ – রিনির চূড়ায় আমরা


ছবি ৪৩ - রিনির চূড়ায় আমরা


ছবি ৪৪ - রিনির চূড়ায় আমরা


ছবি ৪৫ - রিনির চূড়ায় আমরা


ছবি ৪৬ – আমি ও শিকারি কুকুর হেরমিন , ও উঠেছে আমাদের সাথে।


ছবি ৪৭ - রিনির চূড়া থেকে যোগী হাফংয়ের দৃশ্য


ছবি ৪৮ - রিনির চূড়া থেকে জো-ত্লং এর দৃশ্য

এবার ফেরার পালা। ফিরে আসার পথে উল্লেখযোগ্য ঘটনা , আরেকটু হলে আমার পা পড়ত একটা পাহাড়ি ঝিরির দাঁড়াস সাপের গায়ে। আমার শিকারিরা দা এর এক কোপে সাপটাকে করল ধরাশায়ী। দালিয়ান পাড়া এসে যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় রাত দুটো । সাপের কাবাব বানিয়ে হল পাহাড়ি মদ দোচোয়ানির পার্টি । পরদিন হেডম্যান দাদা আমার নামে প্রত্যায়ন পত্র দিলেন যে “প্রথম বাঙালি হিসেবে আমিই “আইয়াং ত্লং“ জয় করেছি এবং এটার নাম রিনির চূড়া । নিকটস্থ বিজিবি ক্যাম্পে রিপোর্ট করা হল। তারাও আমার এই সামিট রেকর্ড বুকে লিখে রাখল।
এই অভিযান সফল করতে যার কাছে আমি কৃতজ্ঞ , দালিয়ান পাড়ার সেই বৃদ্ধ বম , যিনি প্রথম বম হিশেবে “আইয়াং ত্লং” এর সন্ধান পান , তার নামঃ ভান রউসাং বম।


ছবি ৪৯ - হেডম্যান দাদা লাল রাম বম এর দেওয়া প্রত্যায়ন পত্র ।


ছবি ৫০ – জোঁক আমায় খুব ভালোবাসে

আমার প্রিয় পাঠক , আমার রিনিকে তাজমহল আমি বানিয়ে দিতে পারব না , দিতে পারব না তাকে এই মুহূর্তে Orlov Diamond , আমি আমার ভালোবাসার মানুষকে উৎসর্গ করলাম আমার সন্ধান করা পাহাড় “আইয়াং ত্লং “ , নামকরন করলাম তার নামে বাংলায় রিনির পাহাড় – রিনির চূড়া। পাহাড় চূড়ায় রেখে এলাম তাঁর প্রতি আমার অফুরন্ত ভালোবাসার নিদর্শন।

পাঠক , আমি এই মুহূর্তে Severe malaria ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত । কাল কি হবে আমি জানি না। আমি মোটেও ভীত নই । আমার কথাগুলো অন্যভাবে নেবেন না প্লিজ। জীবনে আমি বহুবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি । আমার উপর প্রথম শিবিরের আক্রমন ৯৫ তে , যখন আমি ৯ম শ্রেণীর ছাত্র , ঠিক এক বছরের মধ্যে হয়েছিল পাল্টা আক্রমন , পাল্টা হামলা , এরপর চট্টগ্রাম কলেজে শিবিরের সাথে আমাদের প্রচুর হামলা , পাল্টা হামলা হয়েছে । তখন আমি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল করতাম , শিবির ঠেকানোর জন্য ওই সময় অন্য কোন পথ আমাদের সামনে খোলা ছিল না , তাছাড়া ওই সময়কার ছাত্রদল কে দেখে এখনো গর্ব করি । ৯৯ তে দেশ ছেড়ে চলে গেলাম। রাশিয়াতে খেলতাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে Ice hockey। শিক্ষানবিশ হিসেবে আমি বহুবার Injury তে ভুগেছি । অভিযান করতে গিয়ে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম রাশিয়ার সাইবেরিয়ার আরখাঙ্গালস্ক শহরে। মেক্সিকোতে ভুগেছি e-bola ভাইরাস । লাতিন আমেরিকায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারনত মানুষ বাঁচে না। আমাকে সুস্থ করে তুলেছিল আমারি মেক্সিকান ডাক্তার বন্ধু । এই ভাইরাস আমি কলম্বিয়া থেকে মেক্সিকোতে বয়ে নিয়ে এসেছিলাম। বাংলাদেশে এসে গতবার সাকাহাফং জয় করে Cellulitis এবং এবার রিনির চূড়া সন্ধান করে ম্যালেরিয়া। আমি sportsman , অভিযাত্রী এবং explorer. সুতরাং Injury , Infection , এগুলো আমার জন্য কোন ব্যাপার না । রিনির জন্য পৃথিবীতে আমাকে আরও অনেক অনেক দিন বেঁচে থাকতে হবে । কাল আমার হাসপাতাল থেকে রিলিজ হওয়ার দিন। বাকি অংশটা বাসায় বসে লিখব।

আমার প্রিয় পাঠক , আমি বাসায় এখন বিশ্রামে । রিনিকে লেখা আমার খোলা চিঠি !

ও আমার ভাল ডাক্তার ম্যাডাম ,
কেমন আছেন আপনি ? গত ২৯ এ নভেম্বর থেকে আমি প্রচণ্ড জ্বরে ভুগছিলাম । টেস্ট করে দেখা গেল এটা Severe malaria (ম্যালেরিয়া P falciparum infection) এবং আমার বড় দাদারা তৎক্ষণাৎ সিধান্ত নিল , আমাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে । আমি জ্বরের ঘোরে বার বার বলছিলাম , আমি রিনির কাছে যাবো , আমি প্রিমিয়ারে যাবো , আমাকে বাসায় দেখতে আসা বন্ধুদের কর্কশ চীৎকার “খবর্দার ! ওই প্রিমিয়ার আর ওই রিনির নাম আর মুখে আনবি না “ । আমি জানি না আমাদের CGHS (Chittagong Govt. High School) 97 ব্যাচের বন্ধুরা এবং আমাদের ৯৯ ব্যাচের চট্টগ্রাম কলেজের আমার কাছের বন্ধুরা , আপনাকে সহ্য করতে পারে না । যদিও ওরা কোনোদিন আপনাকে দেখে নি , শুধু গল্প শুনেছে আমার মুখে । হ্যাঁ ৬ /৭ জন দেখেছে , তখন , যখন আমি আপনাদের ওখানে চিকিৎসাধীন ছিলাম। ব্যতিক্রম হচ্ছে আমার ছোট ভাই গুলো , মানে Junior batch CGHS and others , আর অভিযাত্রী ছোটভাইগুলো । ওদের মুখে শুধু একটাই কথা “জ্যোতি ভাইয়ার মুখে , রিনি আপুর কথা না শুনলে , আমাদের ভালই লাগে না।“ যাই হোক , আমার বাবা আর মামনি বললেন তুমি প্রত্যেকবার , বান্দরবন গিয়ে একটা করে অসুখ নিয়ে আস , কিসের প্রিমিয়ার ? তোমার দাদারা (ডাঃ রাজিব কুমার ধর , ডাঃ অশোক দত্ত ) যেখানে বলবে , তুমি সেখানেই যাবে। ওরা আমাকে নিয়ে গেল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালের ১৪ নং এ ওয়ার্ডে । ওরা আমাকে আপনার কাছে যেতে দেয় নি মিস রিনি ।

মিস রিনি , ও আমার খুকুমনি , আমি নিশ্চিত , আমি যদি আপনার কাছে যেতাম , আপনাকে শুধু একটা বার দেখতে পেতাম , আপনার পবিত্র হাত যদি একটা বার আমার কপালে হাত রাখত , আমার অসুখ ওখানেই অর্ধেক সেরে যেত । আপনি প্রশ্ন করতে পারেন “আপনি যুক্তিবাদী মানুষ , আপনার PLT নেমে গিয়েছিল 55,00 / Cmm , আপনি কি এগুলো আবোল তাবোল বকছেন আমার সাথে ? মিস রিনি , আমি যখন আপনার সামনে গিয়ে দাঁড়াই কিংবা আপনার কথা ভাবি , আমার সামনে কোন যুক্তি , লজিক ,আমার মগজ কাজ করে না , কোন অঙ্গ , প্রত্যঙ্গই কাজ করতে চায় না , কাজ করে শুধু চোখ , যা দিয়ে আমি আপনাকে দেখি , আর কাজ করে হৃদয়, যেটার পুরটা শুধু আপনাকেই ধারন করে আছে । খুব জানতে ইচ্ছে করে , আমি যদি এই প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে, আপনার কাছে আসতাম , আপনি কি আমায় বলতে পারতেন “বেরিয়ে যান”। না , পারতেন না। এমনিও ওগুলো আপনার ভেতরের কথা নয় , আপনাকে দিয়ে ওগুলো বলানো হচ্ছে। আপনি যতবার আমায় বলেছেন “আমি এখন ব্যস্ত , আপনি কেন এখানে আবার এসছেন কিংবা আমি আপনার সাথে কোন কথা বোলব না “ কি প্রচণ্ড কষ্ট যে আপনি ভেতরে ভেতরে তখন পেয়েছেন , আমি সেটা বুঝতে পারি মিস রিনি , আপনার কাজল কালো চোখদুটো আমাকে সে বার্তাই বার বার দিয়েছে , ঠিক একই ভাবে আপনার প্রচণ্ড কষ্ট হয়েছে , যখন আপনি আমার উপহার গুলো ফেরত দিয়েছেন। আমি এগুলো জানি এবং বুঝতে পারি। যে ঠুনকো শৃঙ্খলে আপনাকে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে , সে শৃঙ্খল ভেঙ্গে আমি আপনাকে বের করে নিয়ে আসবোই।

আপনার পোস্টিং এর খবর আমি পাই হাসপাতালে থাকা অবস্থায় , ঢাকার এক ছোট ভাই এর কাছ থেকে। যখন শুনলাম আপনি খুব শীঘ্রই দ্বীপবাসিনী হতে চলেছেন , আমি মুচকি হেসেছি । মনে পড়ে , বলেছিলাম, চলেন আমার সাথে মেক্সিকো ...... আপনি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন , পাগল বলে কি ? আমায় নেবে নাকি মেক্সিকো? আর জায়গা খুঁজে পায়নি । মিস রিনি , আপনি যদি আমার সাথে মেক্সিকো বেড়াতে যেতেন , আমি আপনাকে কতোগুলো দ্বীপেই নিয়ে যেতাম , তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কানকুন , তারপর আমরা যেতাম পুন্টা কানা , সান হুয়ান , কুবা লিব্রে আর লা আবানা (কিউবা) । এগুলো সবই দ্বীপ । ভবিষ্যতে অবশ্যই যাব। আমি আপনাকে লাতিন আমেরিকা ঘোরাবই এবং আপনার হাত ধরে গাইবো আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনে......। তবে আমাদের দ্বীপগুলো , সেন্ট মারটিন , মহেশখালী , কুতুবদিয়া , সোনাদিয়া , বাইসদিয়া , হাতিয়া , সন্দীপ , ভোলা এগুলো লাতিন আমেরিকার কোন দ্বীপের থেকে কম সুন্দর নয় , যদি Natural view বিচার করেন , কিন্তু দুঃখ টা কোথায় জানেন ? আমরা এগুলোকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে পারিনি । আপনি খুব ভাল জায়গায় আছেন । এত সুন্দর দ্বীপে থাকার এবং ওখানে কাজ করার সৌভাগ্য কটা লোকের হয় , বলুন ? আপনার কর্মস্থল থেকে বেরিয়েই আপনি পাচ্ছেন সমুদ্রের Natural air । কাছেই ছোট ছোট পাহাড় । ইচ্ছে হলেই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে চলে আসতে পারেন কক্সবাজার। বোকামি করে আবার এদিকে চলে আসার চিন্তাও করবেন না । ভুল করবেন । এত সুন্দর দ্বীপের পরিবেশ , চট্টগ্রাম আপনাকে দিতে পারবে না। কি করেছি আমরা ? পতেঙ্গা , নেভাল দুটোকেই নষ্ট করে ফেলেছি । ওখানে আছে এখন fresh air ? বলুন ? আমরা তো প্রায় লং ড্রাইভে ওখানে গিয়ে আড্ডা মারি বন্ধু বান্ধব নিয়ে । কারন আমাদের যাওয়ার আর কোন জায়গা নেই চট্টগ্রাম শহরে। আর আপনি আছেন কত সুন্দর একটা দ্বীপে । কি সৌভাগ্য আপনার । অতএব ওখানেই থাকুন । খুব শীঘ্রই অতিথি পাখি নামবে । মানে আগে , মানে ৯৮ এ নামত। এখন জানি না। আমরা ৯৮ এ , চট্টগ্রাম বিজ্ঞান পরিসদের পক্ষ থেকে একটা জরিপ চালিয়েছিলাম “অতিথি পাখি জরিপ “ , তখন বাংলাদেশের প্রায় সব দ্বীপেই গিয়েছিলাম।

এবার আপনার পরিবার , আপনার দারোয়ান (Body Guard) কে বলুন আমার উপহার ফেরত দিতে । ভাবছেন কি উপহার ? আপনি এগুলো সবই জানেন , আপনাকে দেখানো হয়েছে , পড়ানো হয়েছে পত্রিকার নিউজ । বাংলাদেশের একটা অজানা শৃঙ্গ “আইয়াং ত্লং “ জয় করে , পুরো সামিট আমি আপনাকে উৎসর্গ করেছি এবং ওই নতুন সন্ধান পাওয়া শৃঙ্গের নামকরণ করা হয়েছে “ রিনির চূড়া “। এ নিয়ে অনলাইনে অনেক ঝড় গেছে , অনেক আলোচনা , সমালোচনা হয়েছে , কিন্তু আমি কাউকেই তেমন একটা পাত্তা দিনি , যেটা আমি সহজে কাউকে দি না , আপনি নিজেও সেটা জানেন। এটা আপনাকে দেওয়া আমার এখনো পর্যন্ত সেরা উপহার । আপনি ভেতর থেকে খুসি হলেও , বলছেন ও একটা পাগল , কি সব কাণ্ড করে ? তাই না মিস রিনি ? আপনাকে লেখা শেষ চিঠিতে , আমি আপনাকে একটু করে ধারনা দিয়েছিলাম , যে আমি এই ধরনের একটা ঘটনা ঘটাতে যাচ্ছি । এবং করলাম। ফেরত দিন আমার উপহার । পারবেন ? বাংলাদেশের অনেক পত্রিকায় এটা নিউজ হয়েছে যে “আইয়াং ত্লং “ , রিনির নামে উৎসর্গ করেছে প্রকৌশলী জ্যোতির্ময় ধর , এবং বাংলায় এটার নাম রিনির চূড়া । আরও হবে । আপনার পরিবারকে বলুন , ওই পত্রিকা গুলোর বিরুদ্ধে মামলা করতে । এই ঘটনা শীঘ্রই প্রকাশিত হবে , জার্মানির BUILD পত্রিকায় , জার্মান ভাষায় , স্পেনের EL Paso পত্রিকায় , স্প্যানিশ ভাষায় , রাশিয়ার এসভেস্তিয়া পত্রিকায় রুশ ভাষায় , তাও আবার আপনার ছবি সহ। আপনার পরিবারকে বলুন ওই পত্রিকা গুলোর সাথে যোগাযোগ করে , ওই আমার লেখা আর্টিকেল সরিয়ে ফেলতে। তার উপর এটার উপর খুব উইকিপিডিয়া পেজ হবে , যেখানে লেখা থাকবে এই পাহাড় চূড়া আমি আপনার নামে বাংলায় নামকরন করেছি । Country wise peak database , International organization of jungle tracking সহ আরও কিছু বিশ্ব নন্দিত সংস্থার পত্রিকায় এবং ওয়েবসাইট গুলোতে , আপনার নামে ওই পাহাড়ের নামকরন করা হয়েছে , এই Information দেওয়া থাকবে। National Geographic , spanish version ও এই নিয়ে লেখা থাকবে । একটু সুস্থ হলেই আমি বাংলাদেশের সব বড় বড় Online activist দের সাথে কথা বলব , এদের বেশিরভাগই আমার নিকট জন । ওরা “আইয়াং ত্লং “ এবং রিনির চূড়া দুটোকেই নামকেই promote করবে এবং বাংলাদেশের সাকাহাফং , কেওকারাডং এর মত “আইয়াং ত্লং - রিনির চূড়া হবে তরুন অভিযাত্রীদের নতুন destination. আমি এটাও স্বপ্ন দেখি , ঢাকার রমনা পার্ক কিংবা চট্টগ্রামের বিপ্লব উদ্যানে , কোন তরুণী , তার প্রেমিকের কাছে বায়না করবে “আমাকে রিনির চূড়ায় নিয়ে যাও , আমি ভালোবাসার পাহাড় দেখতে চাই”। আপনার পরিবার কে বলুন এই সব Information , remove করতে । শুধু আপনার পরিবার কেন , আপনাদের তেত্রিশ কোটি দেবতারও ওই সাধ্যি নেই।

মিস রিনি , ইতিহাস সবাই গড়তে পারে না । আমার এই অভিযান খুবই সামান্য হলেও , বর্তমানে এটা একটা record , যতদিন “আইয়াং ত্লং “ থাকবে , ঠিক ততদিনই আপনার নাম ওই পাহাড়ের সাথে জড়ানো থাকবে। George Mallory , নিজের প্রেমিকার জন্য ইতিহাস গড়তে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন হিমালয়ের বুকে , আর আমি আপনার জন্য বাংলাদেশে এই প্রথম , এই ধরনের একটা কাজ করে দিলাম। দেখিয়ে দিলাম , এভাবেই প্রিয়তমাকে ভালবাসতে হয়।

যাই হোক , গতকাল অশোক দার , consultancy অনুযায়ী আবারো Malaria parasite count (MPC) করালাম। Result Negative. অতএব আমি এখন Malaria মুক্ত। এখন শুধুমাত্র BED rest এ থাকতে বলেছেন আরও ১০ দিন। আর কোন সমস্যা নেই। আর আমার ভাই ডাঃ রাজিব কুমার ধরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবারো আমি বেঁচে গেলাম। এছাড়াও ১৪ নং ওয়ার্ডের প্রত্যেকটা duty doctor , সবসময় আমার special care নিয়েছেন , যেটা আপনারা গতবার করেছেন। একটা সত্যি কথা বলবো , আপনার মত অমায়িক ওখানে কেউ ছিল না। যাই হোক , ১০ দিন পরই আমার Physical fitness , আবার ঠিক হয়ে যাবে। ঢাকায় কিছু কাজ আছে , আমাদের operations শুরু হয়ে যাচ্ছে , মাঝখানে একবার জার্মানি যেতে হতে পারে দিন ১০ দশেকের জন্যে। ওগুলো কোনও ব্যাপার না , ট্রাভেল করতে করতে , আমার জন্য বার্লিন যাওয়া আর বরিশাল যাওয়া একই কথা । ঠিক মাস দেড়েকের মধ্যেই , আবারো বেরিয়ে পড়বো অভিযানে , শুরু হবে explore.

আপনি আপনার নামে দেওয়া সেই পাহাড়ে যাবেন ? আপনি পারবেন না । আপনার দৌড় ম্যাক্সিমাম আমাদের ডি সি হিল পর্যন্ত। তবে একদিন আমি আপনাকে কোলে করে সাকাহাফং নিয়ে যাব।

আরও অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে । থাক , আজ এই পর্যন্তই । রিনি , আমি তোমাকে ভালোবাসি।
ইতি ,
আপনার অসভ্য , বদমাইশ , নন সেন্স , ফালতু , মাথামোটা আর দুষ্টুটা ......... জ্যোতি।

ও আমিতো ভুলেই গেলাম , আমার প্রত্যেকটা চিঠির শেষের দিকে , আমি আপনাকে রাগিয়ে দি , এবারো ......... আমি তোমাকে ভালোবাসি “কাইল্লোনি” , প্লিজ গাল ফুলাবেন না পিংকি ...............

আমার প্রিয় পাঠক , এবার আমি আপনাদের সামনে কিছু ব্যাপার খোলসা করব ।

১) বন্যপ্রাণী শিকার এবং আমার বক্তব্যঃ পৃথিবীর সব বড় বড় অভিযান গুলোর অপরিহার্য অংশ হচ্ছে শিকার। আমি ইউরোপে শিকারের সাথে জড়িত ছিলাম , নিজে করিনি কিন্তু বন্ধু বান্ধবদের কোম্পানি দিয়েছি। ইউরোপে শিকারের লাইসেন্স পেতে হলে তিন ধরনের পরীক্ষা দিতে হয় , সবগুলোই চোখ এবং physical fitness সম্পর্কিত। শুধুমাত্র লাইসেন্স ধারিরাই শিকার করতে পারে । In fact , রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট , ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী , ইনারা সবাই শিকারে যান। অন্যদিকে , লাতিন আমেরিকার অবস্থা একটু ভিন্ন। ওখানে যার হাতে বন্দুক , সেই রাজা। কারন এতবড় অ্যামাজন ফরেস্ট কেউ পাহাড়া দিয়ে রাখে না। মেক্সিকোতে খুব রিমোটে , আদিবাসীদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনই হচ্ছে শিকার ।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে পাহাড়ের বেসিরভাগ প্রাণীই বিলুপ্ত ও লুপ্ত প্রায়। গতবার জো-ত্লং এবং যোগী হাফং সামিট করার সময় , দালিয়ান পাড়ার শিকারিরা আমাকে বানরের মাংস উপহার হিসেবে খেতে দেয়।


ছবি ৫১ – শিকারিদের উপহার দেওয়া বানরের মাংস ।

তখন ওদের সাথে আমার প্রায় দু ঘণ্টা বাক বিতণ্ডা হয়। ওরা আমাকে বানরের মাংসের পাশাপাশি অফার করেছিল তক্ষক এবং ধনেশ পাখির মাথা। আমি ওদের বললাম , ভাই ! এগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে কদিন পরে। তোমরা অন্য কিছু কর , জুম করছ ভাল কথা , হাঁসমুরগি পালো , গরুছাগল পালো।

ওদের বক্তব্য “দাদা , আপনারা শহরের লোক , এসে বড় বড় কথা বলেন । কদিন থাকবেন আমাদের পাড়ায় ? বড়জোর এক সপ্তাহ । আমরা জন্মগত শিকারি । বাপ , দাদাদের করতে দেখেছি । শহরের হাঁস , মুরগি , গরু , ছাগল , পালার চেষ্টা করেছি , ওগুলোকে কেরানি হাট কিংবা থানচি থেকে আনার পর , কিছুদিন পর কি একটা রোগে মারা যায়। আমাদের তো খেয়ে , পড়ে বাঁচতে হবে। আপনি আমাদের পুরো পারাটাকে চালাতে পারবেন ? হ্যাঁ ওষুধ নিয়ে এসছেন , শীতের কাপড় নিয়ে এসছেন , আপনাকে ধন্যবাদ । আমাদের তো কিছু করে খেতে হবে , তাই না ? আমি তখন নির্বাক । পাঠক , উল্লেখ্য জো-ত্লং, যোগী হাফং এবং রিনির চূড়ার আশেপাশে যে আদিবাসী পাড়া গুলো আছে , সেগুলোর সবগুলোই শিকারি পাড়া যথাক্রমে দালিয়ান পাড়া , মুরং পাড়া , অতিরাম পাড়া ইত্যাদি । এই পাড়ার পুরুষেরা সন্ধার আগে করে , সবাই শিকারে বের হয়ে যায়।

এবারের situation ছিল একটু ভিন্ন। আমার দুই শিকারি পথ প্রদর্শক , খুব অল্প টাকার বিনিময়ে , “আইয়াং ত্লং“ এর দুর্গম পথে যেতে রাজি হয়েছিল । তবে ওদের condition ছিল , যাওয়ার পথে আমরা ঝিরি থেকে মাছ ধরব এবং প্রয়োজনে শিকার করব , কিন্তু আপনি গতবারের মত কোন চিল্লাচিল্লি করতে পারবেন না । আমি ওদের কথা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম । আর আমার প্রয়োজন ছিল GUN Men , কারন ওই সব রাস্তায় ভাল্লুকের আক্রমনের কথা সর্বজন বিদিত। ওরা শিকার করেছে বাঁদর , সজারু , মেরেছে পানির দাঁড়াস সাপ , ধরেছে তক্ষক। সবকিছু বাড়ি নিয়ে এসে রান্না করেছে। উৎসাহ নিয়ে আমাকে খেতে দিয়েছে ।


ছবি ৫২ – শিকারিদের মারা দাঁড়াস সাপ


ছবি ৫৩- দাঁড়াস সাপ ফ্রাই করার আগ মুহূর্তে আমার হাতে


ছবি ৫৪ – ফ্রাই করা দাঁড়াস সাপ


ছবি ৫৫ – শিকারিদের শিকার করা বানর


ছবি ৫৬ – শিকারিদের শিকার করা সজারু

পাঠক , পৃথিবীর ৩৯ টা দেশ , আমি ভ্রমন করেছি , আমি এমনিতেও একটু ভোজন রসিক। নতুন খাবার দেখলে , আমি লোভ সামলাতে পারি না । যেমন আদারবাইজানের একটি গ্রামে , আমার পরিচিত এক ট্রাক ড্রাইভারের আমন্ত্রনে গিয়েছিলাম। তখন আমি রাশিয়ায়। ওর বৃদ্ধা মা , আমাকে বানিয়ে দিয়েছিল , যেটাকে আমরা তন্দুরি রুটি বলি এবং বাংলাদেশে যেটাকে আমরা বলি নানরুটি। কিন্তু সাইজে আমাদের নান রুটি থেকে ১০ গুন বড়। রুটি বানানোর মেসিন টা আমি দেখেছি , ওটাকে বলে তন্দুর। এই তন্দুরের উদ্ভব মধ্য এসিয়ায় , পরে মোগল দের মাধ্যমে ওটা ভারতবর্ষে আসে। ঠিক তদ্রুপ , আমি লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে , বিভিন্ন প্রাণীর মাংস খেয়ে দেখেছি , যেমন মেক্সিকোতে খেয়েছি Iguana র মাংস। এই রকম বহু ঘটনা আমার জীবনে অনেকবার ঘটেছে আমার প্রিয় পাঠক ।

এছাড়াও আমি প্রচণ্ড ঝাল খাই , এটা আমার মেক্সিকান বন্ধুদের সাথে বেশি ঘোরাফেরা করার অভ্যাস । পাহাড়িরা একটা সবজির তরকারি রান্না করে , যেটাকে “নাপি” বলা হয় । এটার সাথে ওরা দেয় পাহাড়ি কাঁচা মরিচের ভর্তা । এটা খুবি সুস্বাদু এবং শরীরে দেয় প্রচণ্ড energy.

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। গত দু সপ্তাহ ধরে , আমার হাতে দাঁড়াস সাপ , ফ্রাই করার আগ মুহূর্তের ছবি আমার ফেসবুক পেজ থেকে চুরি করে , বাংলাদেশের কিছু অতি প্রকৃতি প্রেমী , আমাকে যেভাবে অশ্রাব্য ভাষায় , গালাগালি করেছে তা দেখে আমি খুব মজা পেয়েছি। অনলাইনে গালাগালি , এগুলোতে আমি অভ্যস্ত , সেই ২০০৯ থেকেই , যখন অনলাইনে ছাগু বিরোধী অভিযান চলছিল , তখন থেকেই।


ছবি ৫৭ – এই অতি প্রকৃতি প্রেমিদের মুখের ভাষা একটু খেয়াল করুন।


ছবি ৫৮- এই অতি প্রকৃতি প্রেমিদের মুখের ভাষা একটু খেয়াল করুন।

এই অতি প্রকৃতি প্রেমী দের কাছে আমার প্রশ্নঃ
১) জীবনে কয়টা পাখি সরাসরি দেখেছেন , মাঝে মাঝে দু একটা কাক এবং চড়ুই ছাড়া ?
২) পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ এখনও বাংলাদেশের বহু গাছ এবং প্রাণী এখনো enlisted নয় , ওদের Binomial nomenclature তৈরি করার ক্ষেত্রে আপনাদের আজ পর্যন্ত কি ভুমিকা আছে ?
৩) বান্দরবন ভালোবাসেন ভাল কথা , বান্দরবন সহ আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের কটা দুর্গম এলাকা আপনি ঘুরেছেন – শুধুমাত্র নাফাকুম , আমিয়াকুম সহ কমার্শিয়াল ইভেন্টগুলো বাদ দিয়ে।

আমি যখন বাইরে ছিলাম , তখন শুনেছি , বাংলাদেশে নাকি হাইব্রিড পাঁঠাতে ভর্তি হয়ে গেছে , কিন্তু এই পরিমান হাইব্রিড পাঁঠা production হয়েছে , আমি এটা কল্পনাও করতে পারিনি । আপনারা গালাগালির পাশাপাশি আমাকে বলেছেন , আমার নামে মামলা করবেন , আমাকে পেলে হামলা করবেন , তো প্রায় এক মাস তো হয়ে গেল , তার মানে সমস্ত লম্ফ , জম্ফ শুধু ফেসবুকেই । শুনুন ! অতি প্রকৃতি প্রেমীরা , আমি কি করব , দাঁড়কাক পুষব না বন্যপ্রাণী খাব , সেই কৈফিয়ত আমি আপনাদের দেব না , কারন আপনারা হাইব্রিড পাঁঠা , আপনাদের বহু আগে থেকে আমি চিনি , আপনারা পারবেন টোস্ট বিস্কুট চাবাতে চাবাতে একজন সম্পর্কে না জেনে গালাগালি করা – আপনাদের দৌড় অদ্দুর পর্যন্তই । কৈফিয়ত যদি দিতেই হয় , আমি আমার নিকটজনদের দেব , আমার ভালোবাসা আর আদরের প্লাটফর্ম সামহোয়্যারইন ব্লগ এর পাঠকদের দেব , কিন্তু আপনারা কে ? আমি কেন আপনাদের জবাবদিহি করব ? আপনাদের অতি প্রকৃতি প্রেম , আপনাদের ল্যাপটপেই সীমাবদ্ধ । অতএব খোদাহাফেজ ।

আমার প্রিয় পাঠক , বন্ধু এবং নিকটজনরা , বিভিন্ন দেশের খাবার টেস্ট করার অভ্যাসের কারনে যদি আমি আমার অভিযান চলাকালীন সময়ে দালিয়ান পাড়ার শিকারিদের দেওয়া বন্যপ্রাণীর মাংস খেয়ে কোন ভুল করে থাকি , অপরাধ করে থাকি , আমি আমার পাঠকদের , বন্ধুদের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাচ্ছি। আপনারা যদি মনে করেন এটা ভুল ছিল , আমি এই ভুল আর কোন অভিযানে করব না। একটা বার ভেবে দেখুন , আমি আমার লেখায় , শিকার এবং সুরা পানের বিষয়টা সম্পূর্ণ ভাবে বাদ দিতে পারতাম , কিন্তু দিলাম না , কারন আমি আসল ঘটনাটা বলতে চাই ।

এবার আমি আপনাদের জানাবো বেশ কিছু রোমহর্ষক তথ্য । বান্দরবন এলাকায় তক্ষক ধরা এবং বিক্রয় করার জন্য একটা বিসাল মাফিয়া কাজ করে । তক্ষকের বেসিরভাগ ক্রেতা ভারতীয় । তক্ষকের একটা special size এর পর ওগুলো ধরা হয়। আদিবাসীরা ৫০০০- ৬০০০ টাকার বিনিময়ে , ওগুলো বিক্রি করে বাঙ্গালী দালাল দের কাছে ।


ছবি ৫৯ – এক তক্ষক কারবারি , এর গায়ের টিশার্ট টা একবার খেয়াল করুন , কোন এক পরিচিত ট্রাভেল গ্রুপের না? কেন জানি রহস্যজনক।

বাঙ্গালী দালালরা মিনিমাম ৩০- ৪০ টা সংগ্রহ করার পর ভারতীয়দের কাছে ২০, ০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকায় বিক্রি করে , ওগুলো একসাথে তিন মুখ পিলার নামে , ভারতের সাথে আমাদের যে খোলা সীমান্ত আছে , ওদিক দিয়ে ভারতে পাচার করে । আগে চট্টগ্রাম শহর দিয়ে হত, কিন্ত কড়াকড়ির কারনে এই রুট পরিবর্তন হয়েছে । আমকে অফার করেছিল কিনতে , আমি প্রত্যাখ্যান করেছি। আহারে , বাংলাদেশে কত প্রকৃতি প্রেমী সংগঠন রয়েছে , কই , কাউকে কোনদিন এটা নিয়ে উচ্চ বাচ্য করতে দেখলাম না। এরা পারবে টিশার্ট এর ব্যবসা করতে। কেন , কেউ , কিছু বলে না জানেন , বান্দরবন গিয়ে এগুলো নিয়ে কথা বললে , ওরা যদি টের পায় , আপনি তথ্য সংগ্রহ করতে এসছেন , তাহলে ওখান থেকে আর ফিরতে হবে না। তবে এটার উপর একটা combing investigation আমি চালাবো । আমি চট্টগ্রামের স্থানীয় ছেলে ,সেই ক্ষমতা আমার রয়েছে, আমার প্রিয় পাঠক। [/sb

২) ধাপ্পাবাজ কিছু ফেসবুকের ইভেন্ট ব্যবসায়ী এবং আমি ? “আইয়াং ত্লং “ অভিযান শেষ করে আমি পুরো অভিযানের রিপোর্টটা আমার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে শেয়ার করি , কোন গ্রুপে আমি দি নি । ঘণ্টা দু এক পর আমার পেজে ঢুকে কিছু অপরিচিত লোক আমাকে নিয়ে ট্রল করা শুরু করল। আমিতো অবাক ! অনেকটা কই মাছ যেরকম ঝাঁকে ঝাঁকে গু খেতে যায় , অনেকটা সেইরকম। এরা কারা ? বিভিন্ন প্রশ্ন , আরে ভাই আপনার আগে বহুলোক বান্দরবন গেছে , আপনি কি প্রথম ? আপনি কেন দাবি করছেন , আপনি প্রথম এই চূড়ায় গেছেন ? আপনার GPS রিডিং এর ছবি কই ? কেন একা একা ঘোরেন ? আপনি পুরো একটা মানসিক রোগী ( এটা বললে আমি খুব খুসি হই , কারন জার্মানিতে সাধারন লোকজন আমাদের ল্যাবের অফিসারদের এই নামে ডাকে) , আপনার coordinate বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে । মাল খেয়ে পাহাড়ে গেছেন , আরও অনেক পবিত্র বাক্য এবং আমার ফেসবুক স্ট্যাটাস টা , এডিট , রিএডিট করে , বিভিন্ন পবিত্র বাক্য ব্যাবহার উনারা শেয়ার করতে শুরু করলেন যেগুলো লেখা এখানে সম্ভব না। এমন একটা এদের ভাব যেন এক এক জন এভারেস্ট – কারাকোরাম বিজয়ী । পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম এনারা কিনে ফেলেছেন , উনাদের নক না করে যেন শৃঙ্গ বিজয় বা কোন চূড়ায় যাওয়াটা অপরাধ ।


ছবি ৬০ – এক পাহাড় বিশারদের সাথে কথোপকথন

পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম এরা ইভেন্ট ব্যবসায়ী । এদের সম্পর্কে আমি খুব ভালোভাবে জানি । পাহাড়, বাংলাদেশের ঝরনা গুলো , পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে যাদের কোন ধারনা নাই , বিশেষ করে আমাদের চট্টগ্রামের বাইরের লোক যারা , তাদের কাছ থেকে কিভাবে পকেট কাটা যায় , ওই ধান্দাই উনারা করেন । পাঠক ! ঢাকা থেকে নাফাকুম , কিনবা আমিয়াকুম অথবা কেওকারাডং যেতে ৬০০০ টাকা per head প্রয়োজন পড়ে না। প্রয়োজন পরে না মিরেসরাই তে ঝর্না গুল দেখতে per head ২০০০ টাকার। এরা এক এক টা ইভেন্টে ভাল টাকা কোপায় । পাঠক , ৬০০০ টাকা , মানে বোঝেন ? ৭০ ডলার । এই টাকা দিয়ে ইউরোপের যেকোনো শহরে দুদিন ভাল মত ঘোরা যায়। যাই হোক এই নিয়ে পরে লিখছি। পরে দেখলাম এদের একটা ফেসবুক গ্রুপ আছে , যার নাম Adventure forum । ওখানে ঢুকে দেখলাম , একজন , একজনের প্রতি গু মারামারি ছাড়া , ওর মধ্যে কারও কোন কাজ নেই। এরা নাকি বাংলাদেশে আবার Adventure , represent করে। চোখ বুলিয়ে যা দেখলাম , নিজের কাছেই লজ্জা লাগলো , এদের quality দেখে ।


ছবি ৬১ – এই গ্রুপের মেম্বারদের কিছু মতামত


ছবি ৬২ - এই গ্রুপের মেম্বারদের কিছু মতামত

এক ইভেন্ট ব্যবসায়ীর সাথে কথা হয়েছিল , টাকাও দিয়েছিলাম সাজেক যাবো বলে , যেতে পারিনি , আচমকা আমাদের এমব্যাসি থেকে কলের কারনে ঢাকা আসার কারনে। আমি যেতে পারবো না , এটা বলে দেওয়ার পরেও , ৮ মাস হয়ে গেল , টাকার কোন খবর নাই , যদিও বলেছিল অর্ধেক টাকা ফেরত দেবে। পাঠক , This is indicating a character .
আমার প্রিয় পাঠক , আমি বাংলাদেশে এসেছি আমাদের German Institute of substitute energy এর প্রতিনিধি হয়ে কিছু survey করার জন্য এবং ভবিষ্যতে আমরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করব। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি শৃঙ্গ গুলো ঘুড়ে বেড়াই , নতুন কিছু খোঁজার চেষ্টা করি । এ অভ্যাস আমার স্কুল জীবন থেকেই , যখন মানুষ জানতোই না , চট্টগ্রাম থেকে কর্ণফুলী নদী ধরে , হালদার উপর দিয়ে সরাসরি রাঙ্গামাটি পৌঁছানো যায় , তখন আমরা এগুলো করেছি , কোথায় সেই ১৯৯৬ , আজ থকে ২৩ বছর আগের কথা। পাঠক , কলম্বিয়া থেকে মেক্সিকো গেছি ট্র্যাকিং করে , একা , স্থানীয় অধিবাসীদের সহায়তায় এবং ম্যাপের সাহায্য নিয়ে , রাশিয়ার তুন্দ্রায় গেছি রুশ বন্ধুর বাবাকে সাথে নিয়ে , গতবার ভুটানের SnowMan trek এ গেলাম আমার জার্মান কলিগদের সাথে , এতগুলো দেশ ঘুরেছি একা একা , কোন ট্র্যাভেল এজেন্সির সাহায্য ছাড়াই । এবং বাংলাদেশের সাকাহাফং , জো-ত্লং, যোগী হাফং , কেওকারাডং , দুম্লং শৃঙ্গ গুলি জয় করেছি , স্থানীয় আদিবাসী মানুষদের সাহায্য নিয়ে । পাঠক , আমাকে বলুন , আমি যদি নিজে সব কিছু একা একা করতে পারি , আমি কেন এইসব ধাপ্পাবাজ , ফোরাম বাজ , চিটিং ইভেন্ট ব্যবসায়ী এবং কথিত পাহাড় বিশারদ দের সাহায্য নেব , তাছাড়া এরা কিছু কমার্শিয়াল জায়গা ছাড়া , অন্যকিছু মানে রিমোট কোন জায়গা চেনে না। আমার প্রতি তাদের রাগের মুল কারন , আমি কোন ফোরামকে তোয়াক্কা না করে , কাউকে কোন পাত্তা না দিয়ে , একা একা ঘুরে বেড়াই , কতটুকু নিচু মন মানসিকতার হলে আমার সাথে এই ব্যবহার করতে পারে ?


ছবি ৬৩ - শৃঙ্গ গুলি যেন তাদের বাপের দিনের , সব ওদের জানিয়ে করতে হবে ?


ছবি ৬৪ – একা একা ঘোরা অপরাধ , তাই আমাকে জনপ্রিয় ট্রেকার হতে হবে ?


ছবি ৬৫ - একা একা ঘোরা অপরাধ , তাই আমাকে জনপ্রিয় ট্রেকার হতে হবে ?

একটাই উত্তর হিংসা । কারন এরা নিজেরা পাহাড় নিয়ে কোন কাজ করার চেষ্টা করে না এবং অন্য কেউ কিছু করতে গেলে এদের আঁতে ঘা লাগে । এটাই বাস্তব সত্য। তার উপর আমার এই ঘটনা গুল National geographic এর স্পানিশ ব্লগে আসে , এটাও আমার প্রতি ক্ষ্যাপার অন্যতম কারন।

এই সব পাহারপ্রেমি ধাপ্পাবাজদের কাছে আমার প্রশ্ন , বাংলাদেশের কয়টা undiscovered চূড়া , আপনারা গত ৫ বছরে আবিস্কার করেছেন ? পাঠক , এখানে বলে রাখা ভাল , সাকা হাফং , discover করে , জয় করেছিলেন একজন ব্রিটিশ পর্বত আরোহী । কোন বাঙ্গালি নয়। এদের তো প্রশ্নই আসে না । জিপিএস রিডিং আমি আপনাদের কেন দেখাব ? আপনারা কে ? বাংলাদেশ সরকারের statically survey করার সংস্থার কেউ ? এমন একটা ভাব দেখান , বিশ্বের সমস্ত চূড়া আপনারাই জয় করেছেন , আর আমরা বাকিরা এখানে আহাম্মক বসে আছি। হাস্যকর , ইডিয়ট কতগুলি। অন্যকে challenge দেওয়ার আগে , নিজেরা পারলে কিছু করে দেখান । খুব ভাল কথা “আইয়াং ত্লং “ আমার আগে আপনারা গেছেন , আপনার দেশ আপনি ঘুরবেন না তো কারা ঘুরবে , আমরা বাইরে থেকে এসে ঘুরবো ? এতদিন তন্ন তন্ন করে খুঁজে এটার নাম গন্ধ আমি কোথাও পাই নি , পেয়েছি এক জায়গায় আইয়াং ক্লাং লেখা , বম কিংবা ত্রিপুরা ভাষায় ওই নামে কোন শব্দ নাই , পরে লাল্ রাম দা বলল ২০১৪ সালে একটা গ্রুপ চেষ্টা করেছিল। পারার যে গাইডকে ২০১৪ তে উনারা নিয়ে গিয়েছিলেন তার নাম লাল্লিন বম , ও আমকে বলেছে উনারা পিকে উঠতে পারে নি , প্রায় কাছাকাছি গিয়ে তার কাছের অন্য একটা পাহারে পথ হারিয়ে ফেলেছিল এবং ভুল , ভাল রিডিং নিয়ে ফিরে গিয়েছিল , রাতে ফিরতে না পাড়ার কারনে পাহাড়ি গাইডটাকে মদ খেয়ে করেছিল প্রচণ্ড মারধর।


ছবি ৬৬ – হাস্যকর


ছবি ৬৭ – নিজেদের মধ্যে কামরা কামড়ি


ছবি ৬৮ – হাস্যকর

ধরলাম উনারা সফল , আর এখন যদি আমি “আইয়াং ত্লং কিংবা রিনির চূড়াকে নিয়ে যদি লেখালেখি করে জনপ্রিয় করে তুলি , বেসি করে মানুষ যদি ওখানে অভিযান করে , তাহলে আপনাদের মত ধাপ্পাবাজ পাহাড় প্রেমিদের সমস্যা কোথায় ? উত্তরটা আমি দিয়ে দি । ধাপ্পাবাজি , ধান্দাবাজি করে লোকের পকেট কাটতে পারবেন না , এই তো ঘটনা ?


ছবি ৬৯ – কি বিচিত্র ?

রিনির চূড়া আমি নাম দিয়েছি , আসল “আইয়াং ত্লং “ এর নাম ঠিক রেখে । একটা মানুষ , তার প্রিয়তমাকে কতটুকু ভালবাসলে কষ্ট করে এক পাহাড় চূড়া জয় করে , অভিযান তাঁকে উৎসর্গ করতে পারে , সেই অনুভূতি বোঝার এবং ধারন করার মন মানসিকতা , আপনাদের মত বাটপারদের এখনও তৈরি হয় নি , আপনারা পারবেন ঢাকা সহ অন্যান্য জেলার মানুষের পকেট কিভাবে ক্যাট ক্যাট করে কাটা যায় সেই ধান্দা করতে।

এর মধ্যে আবার কিছু ম্যাপ বিসারদের আবির্ভাব , যারা আমার coordinate পেয়েছে বঙ্গোপসাগরে । পাঠক ! দেখবেন , এরা একদিন সমগ্র বাংলাদেশের অবস্থান নির্ণয় করবে আটলান্টিকের ওপারে। Mountain survey , map making এবং land statistics এর উপর ইউরোপে চার বছরের diploma দেওয়া হয় , আর এখানে উনারা এখানে এসছেন পাহাড় মাপতে , আর নাফাকুম , আমিয়াকুম ঘুরে আর কেওকারাডং জীপে উঠে , ইনারা এখন বিসাল বড় অভিযাত্রী হয়েছেন , তাও আবার নিজেদের গ্রুপে কাদা মারামারি করার জন্যে। পাঠক ! সত্যই হাস্যকর ।

হ্যাঁ , ব্যাতিক্রম কিছু লোক আছেন , যারা আসলেই dedicated , যেমন আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ সাইদুর রহমান সাহেব। পাহাড় নিয়ে উনি অনেক কাজ করেছেন । আর হ্যাঁ অভিযাত্রী একজন ছিলেন , যাকে থানচি এবং রুমা এলাকার এমন কোন আদিবাসী পাড়া নেই যে চেনে না , যিনি পেয়েছিলেন পাহাড়ি গরিব লোকগুলোর অফুরন্ত ভালোবাসা , তাঁর নাম তাসদিদ রেজয়ান মুগ্ধ Tashdid Rezwan Mugdho ,


ছবি ৭০ - তাসদিদ রেজয়ান মুগ্ধ Tashdid Rezwan Mugdho

উনি বাংলাদেশের ২য় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জো-ত্লং এর সন্ধান করে সামিট করেছিলেন। আমি উনাকে দেখিনি , শুধু উনার গল্প শুনেছি আদিবাসীদের থেকে । শুনেছি এবং শ্রদ্ধায় মাথা নুয়েছি যে আমাদের দেশেও এইরকম আধুনিক মন মানসিকতার লোক আছে। উনি পেশায় ছিলেন ডাক্তার। পাঠক , আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি , আমি যদি এর পর বাংলাদেশে কোন Undiscovered চূড়ার বা পাহাড়ের সন্ধান পাই , তাহলে সেটা আমি মুগ্ধকে উৎসর্গ করব এবং স্থানীয় নামের পাশে ওই চূড়ার নাম রাখব মুগ্ধর চূড়া । জো-ত্লং এর সন্ধান করে সামিট করে ফেরার পথে এই অভিযাত্রী থানচিতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। আমাদের মত অভিযাত্রীদের কাছ থেকে অনেক অনেক শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা তাঁর প্রাপ্য। বাংলাদেশ আপনার কাছ থেকে আরও অনেক কিছু পেতে পারত , একটু আগে চলে গেলেন ভাই ।

আমার প্রিয় পাঠক , আপনাদের প্রতি আমাদের অনুরোধঃ
আপনারা যখন আপনাদের প্রিয়জন , পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাবেন , তখন অবশ্যই টাকা খরচ করবেন , বছরে একবার কি দুবারই তো আমরা পুরো পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাই , তাই না ? তখন পকেটের দিকে তাকাতে নেই । এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যাক্তিগত অভিমত। কিন্তু অভিযান , হোক সেটা পাহাড় কিংবা সমুদ্র অথবা কোন দ্বীপাঞ্চল , তখন সেটা যত কম খরচে হয় , সেটাই আরও বেশি Interesting. ধরুন , আপনারা চার বন্ধু মিলে , নাফাকুম কিংবা আমিয়াকুম ট্র্যাকিং এ আসবেন । আপনারা নিজেরা সব খোঁজ খবর নিন । একটা ছোট ঘটনা বলি , আমরা যখন স্কাউট ছিলাম , আজ থেকে ২৩ বছর আগে , আমাদের হাইকিং এ যাওয়ার সময় দেওয়া হত একটা ম্যাপ এবং একটা উপদলের জন্য একটা কম্পাস। আমরা সেই ম্যাপ ধরে ধরে , কম্পাস ব্যাবহার করে , আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে যেতাম । পাঠক , এ কথা বলার কারন হচ্ছে , তখন কিন্তু আমাদের কাছে স্মার্ট ফোন ছিল না , ছিল না ইন্টারনেট। আর এখন তো সবই আছে । যেকোনো অভিযানে যাওয়ার আগে , কিংবা ঘুরতে যাওয়ার আগে , বন্ধুরা মিলে সব জেনে নিন , প্রয়োজনে ম্যাপ তৈরি করুন , প্ল্যান বানান , বাজেট তৈরি করুন । হ্যাঁ , আপনাদের একটু কষ্ট হবে , যেহেতু নতুন জায়গা , প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হবে , কিন্তু নিজেদের চেষ্টায় যখন অভিযান সফল করে , আপনার গন্তব্যে পৌছবেন , শত প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে , তখন দেখবেন , মনে কি আনন্দ হচ্ছে , কি শান্তি পাচ্ছেন । আমি নিশ্চিত , ওইসব ধাপ্পাবাজ ইভেন্ট ব্যবসায়ী দের মোটা টাকা দেওয়ার থেকে , আপনাদের খরচ অনেক কম পড়বে । আর পথপ্রদর্শক কিংবা গাইড যদি নিতেই হয় , সেটা যদি স্থানীয় আদিবাসী , পাহাড়ি পাড়া থেকে হয় , তাহলে আপনারও লাভ এবং গরিব পাহাড়ি গুলো কিছু টাকা ইনকাম করতে পারবে। ধান্দাবাজ , বাঙ্গালী সিন্ডিকেট কে পয়সা দেওয়ার থেকে গরিব পাহাড়িদের সাহায্য করা ঢের ভালো এবং ওরা সস্তা , ওদের মন ভাল। এইসব ধান্দাবাজ ইভেন্ট ব্যবসায়ীদের কারনে , চট্টগ্রামে আমাদের বন্ধুদের কাছ থেকে শুনতে হয় , আরে বেটা , রাখ তোর আমিয়াকুম , আমি ৫ হাজার দিয়ে ওই দেখার থকে আরও ১০ হাজার খরচ করে দুজন মিলে দার্জিলিং ঘুরে আসবো । আমার ৫ দিয়ে , পাহাড় বাওয়ার কোন দরকার আছে । এগুলি আমাদের শুনতে হয় । আমিয়াকুমের সৌন্দর্য যে একবার দেখেছে , সে বার বার সেখানে ফিরে যাবে । অথচ আমিয়াকুম ট্রেক করতে , চট্টগ্রাম থেকে per head ১৫০০ টাকাও খরচ হয় না যদি চার-পাঁচ জন একসাথে যায়।

আমার প্রিয় পাঠক , মনে রাখবেন , দেশটা আপনার , এই দেশের প্রত্যেকটা জায়গা ঘুরে দেখার পূর্ণ অধিকার এবং স্বাধীনতা আপনার রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম - কোন ধাপ্পাবাজ , ধান্দাবাজদের , বাপের দিনের সম্পত্তি নয়। এদেশের প্রত্যেকটা পাহাড় চূড়া জয় করার অধিকার আপনার রয়েছে।


ছবি ৭১ – রেমাক্রি খাল


ছবি ৭২- নাফাকুম


ছবি ৭৩- রেমাক্রি তিন মুখ


ছবি ৭৩- রেমাক্রি তিন মুখ

ব্যতিক্রম দের মধ্যে আমি দেখেছি শুধু মাত্র একজনকে । যিনি অনেক ক্ষেত্রে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ইভেন্ট করেন , কোন লাভ , লসের তোয়াক্কা করেন না , চট্টগ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান , তাঁর নাম মোঃ ইউসুফ রানা , তিনি বাংলাদেশের প্রথম কায়াকিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং একটা ক্লাব চট্টগ্রামে পরিচালনা করেন অভিযান সম্পর্কিত । তিনি যখন ইভেন্ট করেন , তাঁর পুরো লাভ , লসের হিসাব , তাঁর ক্লায়েন্টকে বুঝিয়ে দেন । অত্যন্ত অমায়িক এই ছোট ভাইটার আমি কল্যাণ কামনা করি।

জুমারিং , ক্লাইম্বিং , রেপলিং টেকনিকের মুলা : আমার প্রিয় পাঠক , খুব মজার একটা গল্প শোনাবো আপনাদের । আজ থেকে ৪ মাস আগে ফেসবুকে জনৈক , নিজেকে দাবি করা বিশাল পাহাড় বিশারদ , বাংলাদেশে একমাত্র পর্বতারোহী , যিনি পর্বত আরোহণের সমস্ত টেকনিক শুধু নিজেই জানেন আয়োজন করেছিলেন এক প্রশিক্ষণের , আমাকে ওই ইভেন্টে করা হয়েছিল আমন্ত্রন । ওগুলি দেখে , আমিও প্রচণ্ড Interested হলাম , মনে মনে খুসি হলাম , যাক বাবা , বাংলাদেশেও এগুলো শেখানোর লোক আছে । শেখানো হবে , আমাদের চট্টগ্রাম থেকে বেশি দূরে নয় , মিরেসরাইতে । এন্ট্রি ফি ২০০০ টাকা , যেটা আগেই বিকাসের মাধ্যমে পে করতে হবে। ঠিক আছে এমন কোন ব্যপার না। জায়গাটা আমাদের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের কাছের একটা জায়গা । প্রচুর আমন্ত্রিত , বুজলাম ইভেন্ট উনি জমিয়ে ফেলেছেন , বেশিরভাগেরই বয়েস ১৮- ২১ বছরের মধ্যে । ট্রেইনার ভদ্রলোককে দেখলাম , প্রচণ্ড মুডি , যেন বিশ্বের সমস্ত পর্বত জয় করতে করতে উনি এখন বিরক্ত , উনার পেছনে ভাইয়া , ভাইয়া শব্দে বেশ কিছু চামচা টাইপের লোক ঘোরাফেরা করছেন । যাই হোক দুটো ছেলে দেখলাম , নিজেদের চেষ্টায় দড়ি ধরে কোনমতে পার হোল । ঝামেলা বাধল তৃতীয় জনের বেলায় , সে ঝুলতে গিয়ে , দড়ি ছিঁড়ে ধপাস! ভাইয়া , পরে গেলাম তো । ট্রেইনার এর কর্কশ চীৎকার “ আরে গাধা , mountaineering শিখতে গিয়ে , যদি একটু পরে , টরে , না যাস , তাহলে কিভাবে এগুলো শিখবি”। আমি দাড়িয়ে দাড়িয়ে , তামাসা দেখছিলাম। ছেলেটা মনে হয় পায়ে এবং কোমরে আঘাত পেয়েছে। ট্রেইনার এর চামচা গুলি , ছেলেটাকে ধরে , যা মুখে আসে তাই বলছিল “আরে ভাই এত ভীতু হলে এ সমস্ত জায়গায় আসেন কেন ?” , আমি যা বোঝার তা বুঝে নিয়েছিলাম। আর দড়ির যে quality দেখলাম , আমাদের চট্টগ্রামে বিবির হাটে , কোরবানি ঈদের গরুগুলি বাধার দড়িগুলির quality , ওর থেকে better. এর মধ্যে trainer এর চামচা গুলি দেখি , সবার কাছ থেকে গিয়ার ফি নামে আর অতিরিক্ত ২০০ টাকা তুলছে ( আমি জানিনা গিয়ার ফি টা কি জিনিস)। ওই ইভেন্ট বাদ দিয়ে ড্রাইভারকে বললাম , চল অন্য কোথাও যাই , আসার পথে ভাটিয়ারী একটু হল্ট করে , সমুদ্র দেখে , বাড়ি ফিরে এলাম। দেখলাম , এরা কত বড় বাটপার !

পাঠক , ইউরোপে sports trainer রা হয় শিক্ষানবিস দের বন্ধু , বাবা , ভাই , যাই বলুন না কেন , ওরা আপনাকে বুজতেই দেবে না , আপনি ওর পরিবারের বাইরের কেউ , মিশে যাবে আপনার সাথে , যেন আপনি ওর অনেকদিনের চেনা , মুড ধরার কোন প্রশ্নই আসে না। তাই আমরা সহজে উনাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি।

আর এখানে যে trainer কে দেখলাম , আমি মনে করি , আমাদের Boy , Rover , বাদ দিলাম , আমাদের Cub Scout এর শিশুরা যে সাহস রাখে , এর তাও নেই , আর আমাদের Bangladesh National Cadet Corps (BNCC) এর ছেলেদের সামনে , যদি এই সব fraud trainer পরে , তাহলে মাড় খাওয়ার সম্ভাবনা আছে । কারন বাংলাদেশে BNCC এর ক্যারিকুলাম যথেস্ট ভাল। বাইরের সাথে compete করার মত এবং আমাদের scouts এর ক্যারিকুলাম , তখন থেকেই নাম কুড়িয়েছে সর্বত্র ।

বাংলাদেশে Mountaineering technique শেখানোর কোন professional trainer নেই। যারা আছেন দু একজন , তারা কোন ইভেন্ট পরিচালনা করেন না , আর Ice Climbing এর ত প্রশ্নই আসে না । একজন পর্বতারোহী হওয়া এবং অন্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া , দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিষ ।

আমার প্রিয় পাঠক , Mountaineering একটা sports , Mountaineering , adventure , hiking এগুলো করলে , মন ও দেহ দুটোই ভাল থাকে , অনেক দেশ ঘোরা যায় , অনেক কিছু দেখা যায় , অনেক কিছু জানা যায় । কিন্তু দরকার পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ । আপনি বলতে পারেন , আরে ভাই বাংলাদেশের ৩০০০ ফুট , পাহাড় গুলোর জন্য আবার প্রশিক্ষণ কেন ? পাঠক , আমাদের চিন্তা , বাংলাদেশ সহ, যদি সমগ্র বিশ্ব টাকে নিয়ে হয় , তাহলে সমস্যা কোথায় ? বাংলাদেশে নেই , তাতে তো আর বসে থাকা যায় না। আমি কিছু Mountaineering Institute কে চিনি , যারা খুব অল্প টাকার বিনিময়ে Mountaineering এর Basic course গুলো করায়।
১। https://www.alpenverein.de – এটা জার্মানির একটি প্রতিষ্ঠান ।
২। All-Russian Voluntary organization - Russian Mountaineering Federation (RMF) - http://www.russianclimb.com/rmf.html
৩। https://www.alexclimb.com/
৪। https://www.alpin-ism.com/
আর আমাদের উপমহাদেশেঃ HIMALAYAN MOUNTAINEERING INSTITUTE
https://hmidarjeeling.com

আমার প্রিয় পাঠক , আমি যখন লেখাটা শেষ করছি , আমার শারীরিক অবস্থা ক্রমশ উন্নতির দিকে । পুরনো ছবিগুলো দেখছিলাম । মনে পড়ছিল কেওকারাডং এর নিচে বগালেকের কথা । ওটা এখন শহর হয়ে গেছে , কিছদুর পর পর পাওয়া যায় এখন ময়লার ডিপো , প্লাস্টিকের বোতলের স্তূপ , চিপসের প্যাকেট , সিগারেটের বাড , শুনেছি যে বম সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো এখনো অবশিষ্ট আছে , ওদের নাকি ওখান থেকে তুলে দেবে , উন্নয়নের চরম শিখরে আমরা চলে যাচ্ছি আমরা , তাই ওইসব আদিবাসী জাতীয় লোকজন ওখানে থাকলে কি চলে ? ওটা কে বানাতে হবে আমাদের চট্টগ্রাম , ঢাকার মত সুন্দর , পরে থাকবে এদিক , ওদিক ময়লা , আবর্জনা ফেলার জন্য ডাস্টবিন , কিছুদিন পর ওই ডাস্টবিন গুলো চুরি হয়ে যাবে । বগালেক হয়ে যাবে আমাদের আস্কার দিঘী , লালদিঘির চেয়েও মায়াময় ডোবা।

আবার নাকি রাস্তা হয়ে যাবে থানচি থেকে সরাসরি দালিয়ান পাড়া , জিনা পাড়া পর্যন্ত। আর রাস্তাগুলো হবে পাহাড়ি ঝিরিগুলো থেকে নেওয়া পাথর গুলো সংগ্রহ করে , ওগুলোকে ভেঙ্গে। ঝিরি , ফিরি , রাখার দরকার কি ? যতসব ফাউল টাইপ পোলাপাইন ওগুলি পছন্দ করে। হ্যাঁ , রেমাক্রি হবে বাংলাদেশের বিসাল ট্যুরিস্ট কটেজ স্পট। আদিবাসী দের জন্য তো পাশে ভারত আছে , মিয়ানমার আছে , ওরা ওখানে চলে যাক , শালা ওদের জন্য কি আমরা বাঙ্গালীরা ব্যবসা করতে পারবো না। দেশটাতো আমাদের সকলের তাই না ? তাজিংডং এ ইটের ভাঁটা হচ্ছে , শুনেছি বান্দরবনের আরও গহীনে আমাদের ইট ব্যবসায়ীদের নজর পড়েছে , গাছ চুরি তো অনেক পুরনো জিনিস। আর ওদের টার্গেট , ইটের ভাঁটাগুলো হবে পাহাড়ি পাড়াগুলোর আসে পাসে। কারন আমরা অতিথি পরায়ণ জাতি , জার্মানরা যদি সিরিয় শরণার্থীদের কাজ কাম দিয়ে পুনর্বাসন করতে পারে , আমরাও আমাদের ভাই রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করতে বাধ্য। কিন্ত জায়গা কই? আরে আমাদের ওই পাহাড়ি পাড়া গুলো আছে না । এক রাতে গিয়া , পাহাড়ি মাইয়াগুলার লগে ফুর্তি কইরা , পরের দিন লাথি দিয়া সবডিরে ইন্ডিয়া খেদামু । আমাগো রোহিঙ্গা ভাইরা যাইব কই ? পাহাড়েই ওদের রাখুম। পাহাড়ে থাকব আর ইটের ভাঁটায় কাম করব। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে পাঠক , চট্টগ্রাম থেকে রাউজানের দিকে যেতে সমস্ত ইট ভাঁটি গুলতে এখন রোহিঙ্গা লেবার কাজ করে । কারন ওরা লোকালদের চেয়ে সস্তা। ইটের ভাটিতেই জুপ্রি টাইপ ঘর তৈরি করে থাকে। ঠিকই আছে , দেশে বিল্ডিং বানানোর দরকার নাই ? ঘরবাড়ি দরকার নাই ? কি সব আলতু , ফালতু পাহাড়ি , আদিবাসী কতগুলো নিয়ে সময় নষ্ট । আমাদের উন্নয়ন দরকার।

আমরা বিসাল বড় বড় ব্যানার নিয়ে রেমাক্রির , বিলাসবহুল কটেজ গুলতে যাব , থাকবে চট্টগ্রামের হাজির বিরিয়ানির রেস্টুরেন্টের শাখা , আর আমাদের বিসাল বড় ব্যানারে লেখা থাকবে “ Living with forest , Save the forest , save the wildlife”. দু-তিন দিন থাকব ওখানে , এর মধ্যে প্রেমিকারা আবদার করবে , আমি পাহাড়িদের সাথে সেলফি তুলবো , তখন ওদের খুঁজে আনতে হবে , অনেক দুরের হাজরাই পাড়া , সালকিয়া কিনবা নেপিউ পাড়া থেকে। কিছু অভিযাত্রী ব্লগে, ফেসবুকে আলোচনার ঝড় তুলবে কিছুদিন , তারপর সেই আলোচনা পেঁয়াজের দামের নিচে চাপা পরে যাবে। আরে অভিযান , ট্রেকিং , এগুলি কি ভাল ছেলেরা করে ? ওগুলো করে ওই জ্যোতির মত ফালতু , ননসেন্স , বাউন্ডুলে টাইপ ছেলেপেলে । ওরে কে বলেছিল , জার্মানি থেকে বাংলাদেশে এসে এগুলো করতে।

আর আমাদের পাহাড় বিশারদ , ইভেন্ট ব্যবসায়ীদের তো তখন ব্যবসা হবে রমরমা । আরে উনারাই তো পাহাড়ের উন্নয়ন করবেন , আকিজ গ্রুপ , মফিজ গ্রুপ , হাফিজ গ্রুপ থেকে investment নিয়ে এসে উনারা বানবেন রেমাক্রিতে বিশাল বড় conference hall. দালিয়ান পাড়ায় হবে Bangladesh institute of Repelling , Jumaring and climbing. ব্যবসা ছাড়া এমনি এমনি পাহাড় , পর্বত ঘুরে লাভ কি ? উনারা তো আর আমার মত মানসিক রোগী নন। একদিন কেওকারাডং এর মত জো-ত্লং , যোগী হাফং , রিনির চূড়া তে হবে বিশাল বিশাল কটেজ। ওগুলোতে যাওয়ার পথে , খাড়ি , ঝিরিগুলো গায়েব হয়ে গিয়ে , হয়ে যাবে পিচ ঢালা রাস্তা। সরাসরি থানচি থেকে সরাসরি জীপ চলে যাবে , জো-ত্লং এর চূড়ায় । থাকবে ব্যানার পাহাড়ের উন্নয়নে মফিজ গ্রুপ – পাহাড় প্রেমি RAYHANBD ভাইয়ের এর সালাম নিন , ঘোড়ার আণ্ডায় ভোট দিন, জয় বাংলা।

আর আমরা বাইরে বসে বসে পুরনো ছবিগুলো দেখতে থাকব , বন্ধুরা ভিডিও কল দিয়ে বলবে , আরে শালা দেখ দেখ , এক সময় কত কষ্ট করে এই পাহাড়গুলো চরেছিস, আর আমরা দেখলি সরাসরি জিপ নিয়ে চলে আসলাম। আমি বলব , দোস্তরা ক্যামেরাটা একটু বাঁ দিকে ঘোরাতো , কিরে রেমাক্রি তিন মুখের পাসে লাল পিয়ান বম দার বাড়ি ছিল না ? আর রাখ তোর লালু বাবু না কে ? দেখ বেটা এখানে এখন মফিজ গ্রুপ করেছে তিন তারা হোটেলের মত বিশাল কটেজ – “রাতুল কটেজ” । আর কাছেই আকিজ গ্রুপ করছে এর চেয়েও বিশাল বড় হোটেল।

আমাদের রয়েছে প্রশিক্ষিত সব চৌকস বাহিনী , দু একটা ফাটা বন্ধুক নিয়ে কি ওদের সাথে পারবে আদিবাসীরা । সব বাহিনী মিলে ঝেটিয়ে বিদায় করবে , যারা এই উন্নয়নের প্রতিবাদ করবে তাদের। আকাশ থেকে বাংলাদেশের পাহাড়ি সন্ত্রাসী নেতা “এম এন লারমা” মুচকি হাসবেন আর হাত তুলে আশ্বাস দেবেন – আহরে! আমার পাহাড়ে সর্বত্র আজ শান্তি , শান্তি আর শান্তি , এই দুষ্ট ছেলেরা , আর গোল করে না , তোরা পাহাড়িরা সব বাঙালি হয়ে যা , না হলে তিন মুখ পিলার দিয়ে ভারতে সাইড নে।

সব কটেজের নিচে থাকবে একটা করে souvenir এবং T-shirt shop । Beautiful Bangladesh , save the forest , I love hiking , ইত্যাদি T-shirt এর পাশাপাশি থাকবে চারুকলার বামপন্থী ছাত্রদের ডিজাইন করা T-shirt , যেটাতে তাদের বিপ্লবী নেতাদের অন্যতম এম এন লারমার ছবি আর তাতে লেখা “বিপ্লবের এই দিনে লারমা তোমায় মনে পড়ে “ , বাংলাদেশে এখন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব যারা করতে চান , তারা যদি চে গুয়েভারা , এম এন লারমা , চারু মজুমদারের ছবি সম্বলিত T-shirt না পরেন , ফেবুর ব্যানারে যদি চে গুয়েভারা , কাস্ত্রো , নিকলাস মাদুরোর ছবি না থাকে , এরা প্রতি বিপ্লবী , পার্টির মধ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীর দালাল। এদের বিশ্বাস করতে নেই।

আমি প্রায় ১০ বছর পর আবার দেশে এলাম। পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করার জন্য আবার এলাম রেমাক্রিতে , বাঃ কি সুন্দর , যেন দার্জিলিং – গেলাম দালিয়ান পাড়ায় , উঠলাম বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় সবচেয়ে দামী কটেজ চেন “রাতুল কটেজ” এর তিন তালায় , সাথে বারান্দা । সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। সাথে আমার প্রিয় বন্ধুরা সাইদুর , আহাদ , অলক । সাথে করে আনা jack daniels এর বোতল খুলে দু পেগ Raw মারলাম। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম একা। আমার ভাগ্যটা ভাল। সেদিন ছিল ভরা পূর্ণিমা । সাথে করে আনা আমাদের বাঙ্গালী tour operator , আমাকে দেখাচ্ছিল , ভাইয়া দেখেন , ওই দূরে পাহাড়টা জো-ত্লং আর তার পাসেরটা যোগী হাফং । এই যে ভাই , আমাকে একটু একা থাকতে দিন প্লিজ। ওই পাহাড়গুলো আমি বহুদিন ধরে চিনি ।

ওমা , ওই দুই পাহাড়ের মাঝখানে ওটা কি দাঁড়িয়ে ? ওই যে , ওই ......... ওটা যে রিনির চূড়া , হ্যাঁ , হ্যাঁ আমি নিশ্চিত ওটাই রিনির চূড়া , যেটাতে কাউকে ভালোবেসে আজ থেকে ১০ বছর আগে , প্রথম আমার পা পড়েছিল , হ্যাঁ , হ্যাঁ ওটাই তো , ওটাই তো ............ ওটাই , ওটাই ওটাই , রিনির চূড়া ......... ওই যে দেখা যাচ্ছে ......... ওই যে , ওই যে ........................। অ্যাঁই জ্যোতি , একা একা কি বিড় বিড় করছিস , দু পেগ পেটে পরতে পারলো না , তাতেই শুরু করেছিস , বন্ধু অলকের ধমক , কখন যে ও চুপি চুপি বারান্দায় চলে এসেছে টেরিই পাই নি । রিনির চূড়া , ওই যে , ওই যে ...... ওকে দেখালাম । কি বললি , কার চূড়া ? মানে আগের মতই আছিস দেখছি । ওটার নাম “আইয়াং ত্লং “ , এখান থেকে সরাসরি জিপ যায়। কাল তোকে নিয়ে যাব জিপে করে। দাঁরা , তোকে ধরে একটু ধাক্কা দি , মাতলামি ছুটে যাবে ......

এই দাদাভাই ওঠ ! ওঠ ! উফ ! কতক্ষন ঘুমাবি আর ! বেলা বাজে একটা , ভাত খাবি না , তোর ওসুধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে যে ! মাসতুতো বোন লিরার ধাক্কায় , শীতের দুপুরের এই সুন্দর ঘুমটা মাটি হয়ে গেল। কেওকারাডং এর পুরনো ছবি গুলো দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিলাম , খেয়াল করতে পারিনি । মাঝখানে দেখে ফেললাম খণ্ড খণ্ড কিছু স্বপ্ন। পাঠক , ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর স্বপ্নগুলো বোধ হয় এইরকম এলোমেলোই হয় ।

আমার লেখাটা কষ্ট করে পড়ার জন্য ধন্যবাদ ! সবাইকে ১১ তম বাংলা ব্লগ দিবসের শুভেচ্ছা !

সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৩২
১২টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জরাথ্রুষ্টবাদঃ পারস্যর বা মধ্য এশিয়ার প্রথম একেশ্বররবাদী ধর্ম

লিখেছেন শের শায়রী, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৫:৩০



রহস্যময় জরাথ্রুষ্ট। গ্রীক উপাখ্যানেও তার নাম আছে, জরাথ্রুষ্ট নামের অনেক অর্থ আছে, প্রাচীন পার্সিয়াবাসী তারা নামের অর্থ করেছিল “উটের পিঠে আরোহী বার্তা বাহক”। পার্সিয়ার এই ধর্ম প্রচারককে নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাপান কেন বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু?

লিখেছেন রায়হানুল এফ রাজ, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:৫০



জাপানী সম্রাট হিরোহিতো বাঙ্গলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘যতদিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবেনা। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু’! এটি শুধু কথার কথা ছিলো না, তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার লেখা প্রথম বই

লিখেছেন ফারহানা শারমিন, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৯:১৩



ছোটবেলা থেকেই প্রচন্ড রকম কল্পনাপ্রবণ আমি। একটুতেই কল্পনাই হারিয়ে যাই। গল্প লেখার সময় অন্য লেখকদের মত আমিও কল্পনায় গল্প আঁকি।আমার বহু আকাংখিত বই হাতে পেয়ে প্রথমে খুবই আশাহত হয়েছি। আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির আয়নায়

লিখেছেন নিভৃতা , ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ১১:০৪





কিছুদিন আগে নস্টালজিতে আক্রান্ত হই আমার বাসার বুয়ার জীবনের একটি গল্প শুনে। স্মৃতিকাতর হয়ে সেই বিটিভি যুগে ফিরে গিয়েছিলাম।

এই বুয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন জীবন- নয়

লিখেছেন করুণাধারা, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ দুপুর ১২:০২



আগের পর্ব: নতুন জীবন- আট

অবশেষে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমার বোন পেট্রার জন্মকে স্বীকৃতি দেয়া হল। আমাকে জানানো হল আমার একটা বোন হয়েছে। আমি বোন দেখতে গেলাম, দেখি মায়ের পাশে ছোট একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×