
কেমন ছিলেন সকল সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা ) ? তিনি কি চঞ্চল ছিলেন না গুরুগম্ভীর, রাগী না প্রতিবাদহীন, ভয়ংকর না ভীতু , মজার না থমথমে, পাগলাটে না ধীরস্থির, ভাববাজ না বন্ধুত্বপূর্ণ ! চলুন তো দেখি কেমন ছিলেন তিনি
ঘটনা -১: পবিত্র নবী মুহাম্মদ (সা ) ও একজন দরিদ্র সাহাবীর আংগুর
এক দরিদ্র লোক মুহাম্মদ (সা ) এর জন্য একগুচ্ছ আঙ্গুর উপহার নিয়ে আসলেন । মুহাম্মদ (সা ) লোকটির সাথে গল্প করতে করতে প্রথমে একটি খেলেন, তারপর আরেকটি খেলেন , তারপর একটি একটি করে সবগুলো খেয়ে নিলেন । খাবার সময় তিনি হাসিখুশি ছিলেন । সবগুলো আংগুর মুহাম্মদ ( সা ) একাই খেয়েছেন দেখে লোকটি খুশিতে আত্মহারা হয়ে চলে গেলেন । একজন সাহাবা বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন "হে আল্লাহর নবী ! আপনি কিভাবে আমাদের কাওকে না দিয়ে সবগুলো আংগুর একাই খেয়ে ফেললেন ! " মুহাম্মদ (সা) মৃদু হাসলেন আর বললেন " আমি সবগুলো আংগুর একাই খেয়েছি কারণ আংগুরগুলো টক ছিল । যদি তোমাদের দিতাম তোমরা অদ্ভুদ মুখভংগী করতে আর তা দেখে লোকটি মর্মাহত হতো । আমি দরিদ্র ভাইটিকে দু:খ দিতে চাই নি ।
ঘটনা -২ : মেষশাবক উৎসর্গ ও মহানবী (সা) এর প্রতিক্রিয়া
ভ্রমনরত মুহাম্মদ (সা) ও তার সাহাবীরা ক্লান্ত হয়ে কিছুক্ষন বিশ্রামের জন্য একটি ভালো স্থান দেখে তাবু করলেন । তারপর জিনিসপত্র উট, মেষের পিঠ থেকে নামিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করতে উদ্যত হলেন । একজন সাহাবী বললেন তিনি একটি মেষশাবক উৎসর্গ করবেন । একজন সাহাবী বললেন "আমি চামড়া ছুলবো " একজন বললেন "আমি রান্না করব " এভাবে একেকজন একেক দায়িত্ব নিচ্ছেন । মুহাম্মদ (সা)ও বললেন " আমি জংগল থেকে আগুন জ্বালানোর জন্য কাঠ ব্যবস্থা করব " । শুনে সাহাবীরা বিচলিত হয়ে পড়লেন " হে আল্লাহর নবী ! এটা তেমন কোন কঠিন কাজই না । আপনাকে মোটেও কিছু করতে হবে না আপনি বিশ্রাম নিন । আমরা নিজেরা কাজটা করতে পারলে সম্মানিত বোধ করব " । তখন মুহাম্মদ (সা ) মৃদু হেসে বললেন "আমি জানি তোমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথেই কাজটি করবে । কিন্তু আল্লাহ তার দাসদের মধ্যে প্রভেদ অপছন্দ করেন । এবং কোন দাসের নিজেকে অন্যের দাসের চেয়ে উৎকৃষ্ট ভাবাকে অপছন্দ করেন ।" বলে তিনি কাঠ সংগ্রহ করতে জংগলে চলে গেলেন ।
ঘটনা -৩ : সাহায্যকারী
মুহাম্মদ (সা) দেখলেন একজন দাস শস্য ভানছে আর কাঁদছে । দেখে মুহাম্মদ (সা) বিচলিত হয়ে পড়লেন । কাছে গিয়ে দাসটিকে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলেন । দাসটি বলল " আমি অসুস্থ তাই পর্যাপ্ত গতিতে কাজ করতে পারছি না । মালিক অত্যন্ত নির্দয়, সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে আমাকে অনেক মারধর করবে ।" শুনে মুহাম্মদ (সা) দাসটির অবশিষ্ট শস্য নিজেই ভাংগিয়ে দিলেন । আর বললেন "শস্য ভানার সময় সবসময় আমাকে ডাকবে ( সুস্থ হওয়া অব্দি ), আমি তোমার শস্য করে দিব" ।
অন্য একদিন মুহাম্মদ (সা) দেখলেন একজন বয়স্ক লোক পানির থলে বহন করার সময় বেশি ওজনে তার সমস্ত শরীর কাপছে । লোকটি কিছুদুর বহন করার পর থেমে যাচ্ছে, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার বহন করছে । এ অবস্থা দেখে মুহাম্মদ (সা) লোকটির পানির থলে তার গন্তব্যে পৌছে দেন ।
ঘটনা -৪ : উট বাঁধাতে ফিরে আসা
ঘন্টাখানেকের মত মরুযাত্রার পর সবার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠলো। মুহাম্মদ (সা) সুবিধামত স্থান দেখে সেখানে সবাইকে নিয়ে থামলেন এবং কয়েকজন সাহাবীকে সাথে নিয়ে অযু ও পানের পানি অন্বেষনের জন্য বেড়িয়ে পরলেন। কিন্তু অপ্ল কিছুক্ষনের মধ্যেই কাওকে কিছু না বলে তিনি (সা) উটের কাছে ফিরে আসলেন । সাহাবীরা বিস্মিত হলেন আল্লাহর নবী কি এখানে থাকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন ? সাহাবীরা চোখ কান খাড়া করে সতর্কভাবে মুহাম্মদ (সা) এর নির্দেশনার অপেক্ষায় তাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলেন । তাদের বিস্ময়কে দ্বিগুন করে দিয়ে মুহাম্মদ (সা) উটটিকে বেঁধে আবার পানির সন্ধানে যেতে উদ্যত হলেন , দেখে সাহাবীরা মুহাম্মদ (সা) কে প্রশ্ন করলেন " হে আল্লাহর নবী ! এ সামান্য কাজটির জন্য আপনি আবার কষ্ট করে ফিরে আসলেন কেন ? দূর থেকে আমাদের ইশারা করলেই আমরা আনন্দের সাথে কাজটি করে দিতাম "
মুহাম্মদ (সা) বললেন "কখনো নিজ কাজের জন্য অন্যের সাহায্য চাইবে না । কখনো অন্যের প্রতি হেলে থাকবে না , এক টুকরো মেসওয়াকের জন্যও না ।"

নবিজী(সা) ' র জীবনের কিছু আনন্দঘন মুহূর্ত :
ঘটনা-১ : এ আলী ! তুমি এতো বেশি খেজুর খেয়েছো !!
মুহাম্মদ (সা ) , আলী (রা ) আর কয়েকজন সাহাবী একটি বড় খেজুরের প্লেটের চারপাশে গোল হয়ে বসে খেজুর খাচ্ছিলেন আর গল্প করছিলেন । সবাই খেজুর খেয়ে বিচিগুলো পায়ের কাছে জমিয়ে রাখছিলেন । মুহাম্মদ (সা) তার খেজুরের বিচিগুলো নিজের কাছে না রেখে আলী (রা ) র পায়ের কাছে জমাতে থাকলেন । গল্পের গভীরতায় সাহাবীরা গভীর মগ্ন তাই ব্যপারটি কেও খেয়াল করেননি । যখন সবাই খাবার শেষ করলেন তখন মহানবী( সা) এর পায়ের কাছে কোন বিচি নেই অন্যদিকে আলী (রা) র পায়ের কাছে বিচির পাহাড় । মুহাম্মদ (সা) অবাক হবার ভান করে জিজ্ঞেস করলেন, "এ আলী ! তুমি এত খেজুর খেয়েছো !! " শুনে সাহাবীরা আলী (রা ) র দিকে তাকিয়ে হাসিতে ফেটে পড়লেন । প্রতুত্তরে আলী (রা ) নবিজীর পায়ের দিকে তাকিয়ে (যেখানে বিচি থাকার কথা ) বিনয়ের সাথে বললেন "হে আল্লাহর নবী ! আজ আমি বুঝতে পারলাম আপনি বিচিসহ খেজুর খান !!" শুনে মুহাম্মদ (সা) এর পায়ের দিকে তাকিয়ে দ্বিগুন বেগে হেসে ওঠেন সাহাবীরা ।
ঘটনা- ২ : কে কিনবে এ দাসটিকে ?
জাহের বিন হারাম (রা) নামের একজন গ্রামী সাহাবী গ্রাম থেকে পন্য এনে মদিনায় বিক্রি করতেন । আসার সময় মুহাম্মদ (সা ) এর জন্য বিভিন্ন গ্রামীণ উপহার নিয়ে আসতেন । বিনিময়ে মুহাম্মদ (সা) মদিনার তৈরী বিভিন্ন জিনিস সাহাবীকে উপহার দিতেন ।
জাহের (রা ) একজন আরব ও জ্ঞানী সাহাবী ছিলেন কিন্তু ব্যক্তিত্বে আফ্রিকানদের মতো ছিলেন। মুহাম্মদ (সা) তাকে অনেক শ্রদ্ধা করতেন ও ভালোবাসতেন । সবসময় বলতেন " ও আমার গ্রামী বন্ধু আমি তাঁর শহুরে" । একদিন মুহাম্মাদ (সা ) জাহের (রা ) কে মার্কেটে বিক্রিরত অবস্থায় দেখলেন | বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে চুপি চুপি পেছন দিক দিয়ে তাঁর কাছে গেলেন এবং আচমকা পেছন থেকে জাপ্টে ধরলেন । জাহের (রা ) বিরক্ত হয়ে বললেন " এই এটা কে ? ছাড় আমাকে ! " আশেপাশের সাহাবীরা দেখে হেসে ওঠলেন, যখন তিনি বুঝতে পারলেন ব্যক্তিটি মুহাম্মদ (সা ) তখন তিনি মুহাম্মদ (সা) হাতদুটো শক্ত করে ধরলেন যাতে এভাবেই আরো কিছু সময় থাকতে পারেন ।মুহাম্মদ (সা ) জাহের (রা) সেভাবেই ধরে সাহাবীদের দিকে তাকিয়ে মজার ছলে হাঁকলেন "কে কিনবে এ দাসকে ?" মুহাম্মদ (সা ) এর হাতের ভেতর আবদ্ধরত অবস্থাতেই জাহের (রা ) হাসিতে ফেটে পড়লেন "এ আল্লাহর নবী ! আমাকে বিক্রি করে আপনি ঠকবেন ! (আমার বাজে ব্যক্তিত্বের জন্য কেও আপনাকে ভালো মূল্য দিবে না ) " মুহাম্মদ (সা ) বললেন " না জাহের ! যদি পৃথিবীর একজন ব্যক্তিও তোমাকে যথাযথ সম্মান না দেয়, তারপরও তুমি আল্লাহর কাছে অমূল্য " ।
সোর্স : 12. Stories from the life of Prophet Muhammad (peace be upon Him)
( ব্লগার ভাইদের কাছে আমার আশা - পোস্টে ভুল ভ্রান্তি চোখে পরলে আগের পোস্টের মত ধরিয়ে দিয়ে সাহায্য করবেন, এতে আমাদের মত নতুন লেখকদের লেখার মান আরও বাড়বে । পাশাপাশি কোন্ ঘটনাটি আপনাদের বেশি আলোড়িত করেছে তা জানাতেও ভুলবেন না )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

