somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুই মেরু

২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ সকাল ১১:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভাবি নি তুমি এখানে। গাঢ় চোখে তাকিয়ে থাকলে। এরপর বললে, ‘আমি জানতাম, দেখা হবেই।’
‘এতদিন আসো নি কেন?’ ঘাড় দুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলে।
একটু সময় নিয়ে বললাম, ‘খুব ব্যস্ত থাকি। ঘর, সংসার। জানো তো।’
‘খুব ভালো লাগছে তোমাকে দেখে। মনেই হয় না আজই তোমায় প্রথম দেখছি।’ এ কথা বলতে বলতে পুনর্বার জিজ্ঞাসা করলে, ‘এতদিন আসো নি কেন? ইচ্ছে করে নি আমাকে দেখবে?’
‘তুমি খুব আন্তরিক।’ আমি বলতে থাকি, ‘সহজেই কাছে টানতে পারো।’
‘নাহ্‌! মিছে কথা। তোমাকে কাছে পেতে বড্ড দেরি হলো।’
‘তাই? কীভাবে সময় কাটে?’
প্রশ্ন শুনে তোমার মুখ ম্লান হয়ে গেলো। স্বগতোক্তি করলে, ‘সময়? বড়ো দীর্ঘ! একাকী! জীবন!’ একটু বিরতি নিয়ে বললে, ‘ভালো লাগে না। কষ্ট। তবু আনন্দে থাকি। অর্থাৎ থাকবার চেষ্টা করি।’
পূর্বাপর না ভেবেই বলে বসি, ‘আচ্ছা, তোমার বয়স কত হলো?’
‘এবারে ৫০। তুমি?’
‘ঢের কম। থাক, যত ভুলে থাকা যায় বয়স। বরং একটা গান ধরো। তুমি খুব গাইতে পারো, শুনেছি।’
‘ঠিক শুনেছো। তবে গলা আর নেই আগের মতো। তুমি নাকি কবিতা লেখো, শোনাবে?’
‘হ্যাঁ, লিখি। হয় না। তবু লিখি, কিচ্ছু হয় না, তবুও।’
‘কী খাবে লাঞ্চে? মাছ? নাকি মাংস?’
‘না না। আমি এক্ষুনি উঠবো। যেতে হবে।’
‘তা কি হয়? আমি রাঁধবো।’ স্বল্প বিরতির পর বললে, ‘আমাকে ভালো লাগে নি?’
আমি টেনে টেনে বলি, ‘হ্যাঁ---।’
তুমি কৌতুক করে হাসলে। বললে, ‘তুমি খুব লাজুক। একবারও ভালো করে আমাকে দেখো নি।’ কথা বলতে বলতেই হাত বাড়িয়ে গালে টুসকি দিলে।
আমার ভেতরে ঘুমন্ত লাভা। মুহূর্তে জ্বলে উঠলাম। খপ করে বাহু ধরে বুকের কাছে এনে বলি, ‘এখনই চাই।’
তুমি ‘ছিঃ ছিঃ’ করতে করতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলে। আমার শরীর তখন ঘামছিল। জ্বলছিল।
‘তুমি বসো। চা করি।’ উঠে ডাইনিং টেবিল মুছে সাজালে। পাশের ঘরে গিয়ে কী কী টুকিটাকি কথা বললে। বাজারসওদা কিচ্ছুটুকুন ঘরে নেই। একফাঁকে ছোট্ট একটা লিস্টি করে কাজের ছেলেটাকে বাজারে পাঠালে।
আমি ল্যাপটপ অন করে ফেইসবুক আর ব্লগে ঠোকাঠুকি করি। ভালো লাগে না।
তুমি কিচেনে ঢুকলে। টুংটাং শব্দ শুনি।
‘চা কি হলো?’ উঠে কিচেনের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
তুমি চমকে পেছনে তাকালে। হাসলে। সে-হাসিতে কত কিছু বোঝা যায়!
‘তুমি রাঁধতে পারো?’ হাঁড়িতে চা-পাতা ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞাসা করলে।
আমার রাগ হয়। বলি, ‘শোনো, এসব রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়ার যথেষ্ট সময় পাবে।’
‘ইলিশ আনতে পাঠিয়েছি। ইলিশ তোমার খুব প্রিয়, শুনেছি।’
আমি তোমার ঘাড়ের পেছনে গিয়ে দাঁড়াই। তুমি মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে কথা বলছো। ঘাড়ের উপর চুলের নীচে কালো ব্লাউজ ভেদ করে মাখনের মতো যে জায়গাটা ফুটে আছে, উবু হয়ে ওখানে একটা চুমু খেতেই তুমি শিউরে উঠলে, যুগপৎ রেগেও গেলে। বললে, ‘এসব আমি চাই না। ১৫ বছর ধরে কি বেঁচে নেই?’
‘আমি তোমাকে অমৃতের স্বাদ দেব। তোমার সমগ্র যৌবন ফিরিয়ে দেব।’
‘না, এসব চেয়ো না তুমি। বুঝতে চেষ্টা করো।’
আমি কিছুই বুঝতে চেষ্টা না করে পেছন থেকে জড়িয়ে তোমার বুক পিষ্ট করি, ঘাড়ে কামড় বসিয়ে দিই যত্রতত্র। তুমি এক ঝটকায় আমাকে সরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলে।
তোমার আয়োজন ও ইঙ্গিত বুঝতে আমি ভুল করেছিলাম। কাজের ছেলেকে ছুতো করে বাজারে পাঠালে। ঘর ফাঁকা করে একটা নিরুপদ্রব সংগমের ইঙ্গিত দিলে। অথচ কী নিষ্ঠুর আর বিপরীত আচরণই না তুমি এখন করলে!
আমি ল্যাপটপে বসি। ভালো লাগে না।
তুমি কোথায় যেন হারিয়ে গেলে। আমার অস্থির লাগে। পিসি অফ করে ব্যাগ গোছালাম। চলে যাব। তোমার সাথে দেখা হবার কথা ছিল না, কেন বা কীভাবে আজ দেখা হলো কে জানে? তোমার উপর হাত বাড়াবার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু তুমিই প্রথম লোভ দেখালে। আমার ভেতরেও একটা অন্য আমি আছে, অথচ সে ‘আমি’টা কেউ চেনে না। তোমাকে চিনিয়ে নিজেকে খুব খাটো মনে হচ্ছে। তোমাকে যদি সত্যিকারে পাওয়া যেতো, নিজের কাছে নিজেকে আরো অনেক বড়ো মনে হতো। আমি লজ্জাবোধ করছিলাম।
তুমি কোথায় যেন হারিয়ে গেলে। চোরের মতো পালিয়ে আসতে পারি। না, বীরের মতোই তোমার সাথে শেষ দেখাটা করে যাই।
তোমাকে খুঁজতে বেডরুমের দিকে পা বাড়াই। নিথর শরীরে চোখ বুজে শুয়ে আছো তুমি। আমি ধীর পায়ে তোমার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। তুমি চোখ বুজে ছিলে। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে কাত হয়ে অন্যদিকে শরীর ফিরিয়ে নিলে। কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম জানি না। আমার ভেতরে তোলপাড়। তুমি এমন কেন?
নরম করে শিথানের কাছে বসলাম। আর কালবিলম্ব নয়। তোমার বাহুর উপর দিয়ে ঝুঁকে পড়ে তোমার ঠোঁটদুটো মুখের ভেতর পুরে নিলাম। এত মধু! এত অমৃত! যখন দু’হাতে আমার পিঠ জড়িয়ে ধরলে, তখন মনে হলো, এতক্ষণ মিছেমিছি তোমাকে ভুল বুঝে নিজেকে কষ্ট দিয়েছি। আর মনে হলো, এমন একটা ঝড়ো তাণ্ডবের জন্য তুমি অপেক্ষা করছিলে অনেক বছর। তোমার ১৫ বছরের ক্ষুধার্ত শরীর কোনো বাঁধ মানে না। খাবলে খুঁটে খেতে থাকে আমাকে, যেমন আমি তোমার সর্বাঙ্গ নিয়ে শুধু উন্মত্ত ভাঙচুরের খেলা খেলতে থাকি। হায়, শরীর যে মনের বারন মানে না, মুনিঋষিরা কি তা জানতেন না? কিছুক্ষণ আগের তুমি, আর এখনকার তুমি! আগামীকালের ‘তুমি’তে কোন রূপ দেখবে তা কি তুমি নিজেই জানো?
তোমার চুড়ির শব্দে আমার ধ্যান ভঙ্গ হয়। তোমার পাশে স্থির হয়ে বসে আছি। আমার ভেতরে তোলপাড়। তোমার উপর আমার জোর খাটে না, কিন্তু আমার অধিকার রয়েছে। আমি কি ফিরেই যাব? দেবে না?
আমার দ্বিধান্বিত হাত তোমার দিকে বাড়িয়ে দিই। তুমি ছিঃ ছিঃ করে উঠলে না, খুব স্বাভাবিকভাবে আমার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলে। তারপর উঠে খাটের কিনারে পা নামিয়ে বসলে। দূরে জানালার দিকে তাকালে। আকাশে চিল-ওড়া রোদের উপর সাদা মেঘ ভাসছিল। তুমি উদাসীনভাবে ওদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলে। আমি তোমার হাত ধরে নিজের দিকে টানি। তুমি বাধা দিলে না; আলগোছে আমার হাঁটুর উপর শুয়ে পড়লে। ডান হাতটা বাড়িয়ে আমার চিবুক, চোখের উপর আঙুল বোলাতে থাকলে।
তুমি চুখ বুজে আছো। কিছুক্ষণ বসে থাকি, নির্জীব। আমার ভেতরে তোলপাড়। নীরবতার ভেতর থেকে মুখ খুললে— ‘এসব আমি চাই না। ১৫ বছর ধরে জ্বলছি। আমি বেঁচে নেই, কিন্তু তবু বেঁচে আছি। আমি এসব চাই না।’
‘কেন মিছেমিছি নিজেকে কষ্ট দাও? জীবনকে ফাঁকি দিচ্ছ। উপভোগ করতে শেখো।’
উঠে বসলে। আবারো জানালার দিকে তাকালে। কিছুক্ষণ পর মুখ ফিরিয়ে আনলে। আমার চোখের উপর তোমার দৃষ্টি। সহজ, সরল, অথচ স্থির, ভয়ঙ্কর।
‘তোমাকে নিয়ে আমি খুব বড়াই করি। তুমি কি জানো, কী মহান এক সম্পদের অধিকারী তুমি?’
‘ওসব রাখো। সব ফাঁপা। জীবনে কারো কাছে নস্যি হতে হয়। মূল্যহীন হয়ে অমূল্য হতে হয়।’
‘দর্শন আমিও যে বুঝি না তা না। কিন্তু আমার চোখের সামনে তোমার স্খলন আমাকে পরাজিত করবে। তোমার কথা আমি কত শুনেছি! ওসব শুনেই আমি তোমার প্রেমে পড়েছি। কিন্তু প্রেম মানেই সম্ভোগ নয়, বুঝতে শেখো। তোমাকে নিয়ে আমার এতদিনের যে গর্ব, তা মিথ্যে হয়ে যাক আমি চাই না। তোমার পরিবার রয়েছে; সুন্দরী স্ত্রী, সন্তান রয়েছে। অনেক সুখের একটা জীবন তোমার। তোমার সততা, মেধা, বুদ্ধিমত্তা, সর্বোপরি তোমার ব্যক্তিত্বই হলো তোমার অমূল্য সম্পদ। তোমার আর কিছু আমাকে কোনোদিন আকৃষ্ট করে নি— আকৃষ্ট করেছে তোমার ব্যক্তিত্ব। তোমার সম্পদ অটুট থাকবে— আমি আমৃত্যু এ সুখ নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।’

বের হচ্ছি। তখন বাসাভর্তি অনেক মানুষ। আমি বাইরের দরজায়; সবার সাথে বিদায়ী শুভেচ্ছা বিনিময় হচ্ছে। আমার চোখ তোমাকে খুঁজছিল। তুমি দূরে ভেতরের এক অন্ধকার দরজায়। আড়চোখে চোখাচোখি হতেই মাথা নামিয়ে নিলে। কী লাজুক তোমার মুখ! তোমাকে না পেয়ে আমি হারি নি। তোমাকে না পেয়েই আমি পুরোটা পেয়েছি। তোমাকে সর্বৈব জয় করবার তুমুল উল্লাস আমার ভেতরে টগবগ করে ফুটছিল।
তুমি বলো নি, ‘আবার এসো।’ মনে হলো, তুমি দূর থেকে অস্ফুট শব্দে বললে, ‘কীভাবে বেঁচে থাকবো, তোমাকে ছাড়া?’

তোমাকে সাথে করে আমি বেরিয়ে পড়লাম।

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২


** কালের চিহ্ন, একুশে বইমেলা ২০১৬

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ সকাল ১১:২৭
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বরাজনীতি চলে স্বার্থের হিসেবে, আমরা চলি অন্ধ আবেগে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:২২


বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে সহজলভ্য জিনিস হলো বিশ্লেষণ। চাল, ডাল কিংবা তেলের দাম নিয়ে যতই হাহাকার থাকুক, ভূরাজনীতি নিয়ে জ্ঞানের কোনো অভাব নেই। চায়ের দোকানে বসে যিনি নিজের বাসার গ্যাস... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিছুই ভাল্লাগে না আজ তবু সময় বয়ে যায়

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:০৮


কিছুই ভাল্লাগে না আজ
মানুষের মুখে মানুষেরই রক্তের গন্ধ লেগে আছে
শিশুর কান্না আকাশ ছুঁয়েও
কোনো ক্ষমতার প্রাসাদের জানালা কাঁপে না।

বাংলাদেশ জেগে থাকে
গ্যাসের অপ্রতুলতা, দ্রব্যমূল্যের দীর্ঘশ্বাস,
বেকার যুবকের অনিদ্রা,
আর প্রতিদিনের অগণিত অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির পাশে।
সংবাদপত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

"জাগো বাহে কোনঠে সবাই"....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৩৬



ফেসবুক মেমোরিঃ
৩২ জুলাই এই পোস্ট লিখেছিলাম.....

"জাগো বাহে কোনঠে সবাই"....

ভালো থাকার চেষ্টা সবসময় করি, বেঁচে থাকার উপাদান খুঁজে নিতে চেষ্টা করি- পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আর কিছু করতে না পারার আফসোস... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিনেমা সীমানা পেরিয়ে - বালির দাগে রাজনীতি

লিখেছেন রাজসোহান, ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:০২



১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর রাতে পৃথিবীর ইতিহাসে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। ভোলা সাইক্লোন। দশ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস উঠে আসে ব-দ্বীপের নিচু চরে। মৃতের সংখ্যা তিন থেকে পাঁচ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশ ভ্রমনঃ মেহেন্দীগঞ্জ উলানিয়া_জমিদার বাড়ি

লিখেছেন মৌন পাঠক, ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৭

আপনি যদি ঢাকায় থাকেন, তবে কোনো এক বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় চলে যান সদরঘাটে। সেখান থেকে উলানিয়াগামী কোনো একটি লঞ্চে উঠে পড়ুন। লঞ্চের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে এক পাশের একটি কেবিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×