যাত্রীদের ডেকে বাসে ওঠানোর জন্য চিল্লাতে চিল্লাতে হেল্পারদের গলা ফেটে যাচ্ছে, যাত্রীরাও দৌড়ে ছুটছেন বাসে ওঠার জন্য। আপনি বাসে উঠে হ্যান্ডল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, বা অনেক কষ্টে পাওয়া একটা সিটে বসে আছেন তো আছেনই, বাস সামনে নড়ছে না। হঠাৎ ঘুড়ড়ৎ আওয়াজ করে সমগ্র বাস ঝাঁকি দিয়ে সামনে এক ইঞ্চি গিয়ে অমনি শক্ত করে ব্রেক চাপলো ড্রাইভার। আপনারাও হুড়মুড় করে সামনে পড়ে গিয়ে সামনের সিটে মাথা ফাটালেন, কিংবা একজন আরেকজনের গায়ের উপর জোরসে পড়ে গেলেন। সহসাই বাস দৌড়ে ছুটলো। ঝাঁকে ঝাঁকে বাস ছুটছে। কে, কার আগে গিয়ে পরের স্টপেজে পৌঁছবে- এর জন্য শক্ত কম্পিটিশন। ছুটন্ত অবস্থায়ই পথে যেখানে যাকে পাওয়া গেলো, তাকেও টেনে ওঠানো হলো। ঝুলতে ঝুলতে চলতে থাকলেন।
আমাদের প্রতিদিনের বাস চলাচলের চিত্র এটাই। প্রধান শহরগুলো, বিশেষ করে ঢাকায় এ প্রবণতা হলো অত্যন্ত প্রকট। দূরপাল্লার বাসেও এটা অহরহ হয়ে থাকে। ঢাকা-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে আমি প্রচুর যাতায়াত করেছি। বাসে যতক্ষণ থেকেছি, সবচেয়ে বেশি আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় সময় কাটিয়েছি। এই দুই সড়কে আমি তিনটি দুর্ঘটনায় পড়েছিলাম। একবার বাস খাদে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলে মারা যায় ৭জন; আমি বাসের ভেতরে পানির মধ্যে আটকে ছিলাম; আমি ছিলাম মৃত্যু থেকে বেঁচে যাওয়া শেষ যাত্রী। আরেক ঘটনায় বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। আমার কয়েকজন কলিগ ও কয়েকজন যাত্রী আহত হোন। একবার বাস লাইন চ্যুত হয়ে খাদে গিয়ে পড়ে; আমরা যাত্রীরা প্রাণে রক্ষা পেলেও রাস্তার পাশে বসে থাকা পথচারীর উপর দিয়ে বাস চলে গেলে দুজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। আরেকবার টাঙ্গাইল যাওয়ার পথে পাল্লা দিয়ে একটি বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে ধাক্কা লেগে যায় এবং অল্পের জন্য ছিটকে গিয়ে পাশের খাদে পড়া থেকে বাস রক্ষা পায়।
ঢাকা শহরে হাত, পা, মাথা থেতলে যাওয়া, শরীর থেকে হাত আলাদা হয়ে যাওয়া, দুই বাসের মাঝখানে পড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া, নিকট অতীতের ঘটনা। চট্টগ্রামের সীটাকুণ্ডে ৪৫ জন স্কুল ছাত্রের সলীল সমাধি, টাঙ্গাইলেও যদ্দূর মনে পড়ে ৩০-এর অধিক সংখ্যক যাত্রী নিয়ে বাস খাদে পড়ে যাওয়া- ভয়াবহতম ঘটনা।
এতসব দুর্ঘটনাকে আর দুর্ঘটনা বলে হাল্কা করে দেখার উপায় নেই। এসব স্রেফ দুর্ঘটনা না। পরিকল্পিতভাবে মানুষ মারা ছাড়া আর কিছুই না এগুলো - বলুন 'মার্ডার'। এর জন্য দায়ী কি শুধুই ড্রাইভার? প্রাথমিকভাবে হয়ত ড্রাইভাররাই এর জন্য দায়ী। কিন্তু এইদেশে ড্রাইভারদের কজনের নিজের বাস-ট্রাক আছে? এরা সবাই বাস-ট্রাক মালিকদের নিয়োগ দেয়া কর্মচারি মাত্র। এই মালিকরা কী ধরণের ড্রাইভারদের 'ড্রাইভার' হিসাবে নিয়োগ দিচ্ছেন? যারা 'ড্রাইভিং' লাইসেন্স পাচ্ছেন, তারা কি সত্যিকারেই 'ড্রাইভ' করার যোগ্যতা দেখিয়ে লাইসেন্স পাচ্ছেন? নাকি গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি চেনার 'দক্ষতা' দেখিয়ে লাইসেন্স পাচ্ছেন? এই প্রশ্নের উত্তর কার জানা আছে?
আমরা সাধারণ মানুষরা এক বিরাট ফাঁদ-এর মধ্যে আটকা পড়ে আছি। এই ফাঁদ যারা রচনা করেছেন, তারা হলেন গাড়ির মালিক, গাড়ির চালক, এবং যারা চালকদের গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেন (বলুন, যারা চালকদের মানুষ মারার লাইসেন্স দেন), তারা। আমরা এই ফাঁদ থেকে বের হতে পারি- তার কোনো সম্ভাবনা দেখি না।
যে বিষয়গুলো খুব ভেবে দেখা দরকার এবং বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, তা হলোঃ
ক। গাড়ির লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষকে সঠিক নিয়ম মেনে কেবল উপযুক্ত ব্যক্তিদেরই লাইসেন্স দিতে হবে।
খ। গাড়ির মালিকগণ চালক নিয়োগের সময় শুধু চালকের লাইসেন্স দেখেই ক্ষান্ত হবেন না, তারা চালকদের গাড়ি চালানোর পরীক্ষা নেবেন; ডাক্তারি পরীক্ষা করাবেন; তারা শুধুই যে গরু-ছাগল চিনতে পারে তা না, মানুষও চিনতে পারে, এটাও নিশ্চিত হতে হবে।
গ। চালকদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখতে হবে। জানা যায়, চালকরা ঘুমের জন্য পর্যাপ্ত সময় পান না। অধিক সংখ্যক ট্রিপ দিতে হবে বলে তারা ইয়াবা গ্রহণ করে ঘুম নিবারণ করেন। একজন মাদকসেবী, ক্লান্ত গাড়ি চালকের মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে না- এটা সাধারণ বুদ্ধিতেই সহজে অনুমান করা যায়। গাড়ির মালিকদের মধ্যে এ ব্যাপারে মানবীয় গুণের প্রতিফলন দেখাতে হবে। বেশি টাকার লোভে বেশি ট্রিপ দিতে গিয়ে যাত্রীদের জীবন নিয়ে খেলতে থাকে চালকগণ। আর এজন্যই, প্রতিদিন আমরা কোনো না কোনো সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাচ্ছি। এত 'হত্যা' কি সহ্য করা যায়? যার যায়, একমাত্র সেই জানে এই হত্যার ঘা কতখানি মর্মান্তিক আর বেদনাময়।
ঘ। আইনের সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে কঠোরতর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
ঙ। যত্রতত্র গাড়ি থামানো এবং এক স্টপেজে দীর্ঘ সময় ধরে যাত্রী বাড়ানোর উদ্দেশ্যে গাড়ি থামিয়ে রাখা বন্ধ করতে হবে। এগুলোর বাস্তবায়ন করতে হবে ট্রাফিক পুলিশের দ্বারা। আমার মনে পড়ে, একবার তিন মাসের জন্য ঢাকা শহরে আর্মি নামানো হয়েছিল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য। ঢাকা শহরে আমি সেই সময়ে সবচেয়ে সুশৃঙ্খল গাড়ি চলাচল দেখেছি। মহাখালি, বনানী, ফার্মগেইট, কাউরান বাজারের মোড়ের মতো প্রচণ্ড জ্যামের জায়গাগুলোতেও সেই সময়ে কোনো জ্যাম ছিল না। যাত্রীদের লাইন ধরিয়ে বাসে উঠানো শিখিয়েছিল আর্মি, যেই শৃঙ্খলা এখনো কোনো কোনো বাস স্টপেজে বিদ্যমান রয়েছে। ঠিক একই ভাবে আমাদের ট্রাফিক পুলিশ এই কাজগুলো করতে পারেন।
চ। গাড়ি চালানোর সময় ড্রাইভারের মোবাইলে কথা বলা, বা অন্যদের সাথে কথা বলা, গল্প করা বন্ধ রাখতে হবে। এতে ড্রাইভারের অন্যমনস্ক হয়ে পড়ার সম্ভাবনা হয়, আর তাতেই দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
ছ। অনেক স্থানেই মেইন রোডের উপর হকার, রিকশা, সিএনজি, ইত্যাদির জন্য রাস্তা সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে গাড়ি চলাচলের জায়গাও সংকুচিত হয়ে আসে। সেখানে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। কর্তৃপক্ষকে এ ব্যবস্থাকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে, যাতে গাড়ি চলাচলের রাস্তা কোনোভাবেই সংকুচিত হতে না পারে।
জ। রোড অ্যাক্সিডেন্টের জন্য ড্রাইভারের সাথে গাড়ির মালিককেও বিচারের আওতায় আনতে হবে। এফ-আই-আর-এর সময়ে পুলিসকে এ বিষয়টা মনে রেখে মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে (আমি নিশ্চিত নই, এটা বর্তমানে হয় কিনা। হয়ে থাকলে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে)। এর জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রাখতে হবে।
ঝ। ড্রাইভার যেন হাই-স্পিডে গাড়ি না চালায়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য ট্রাফিক পুলিশ/হাই-ওয়ে পুলিশকে আরো কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে।
এ ছাড়া, আমাদের যাত্রী ও পথচারীদেরও কিছু দায়িত্ব আছেঃ
ক। গাড়িতে ওঠার জন্য যেখানে-সেখানে বাস থামানোর জন্য ইশারা দেবেন না, বাসে উঠবেনও না, দয়া করে স্টপেজে যান। অনেক সময় বাসের হেল্পাররা আপনাকে বাসে উঠানোর জন্য আপনার সামনে বাস থামাবে এবং আপনার ডেনা/কলার ধরে আপনাকে বাসে টেনে তুলেব (ডেনা- আপনার বাহু। আমাদের দোহারের ভাষায় এটাকে 'ডেনা' বলি)। এটা পরিত্যাগ করুন।
খ। আপনার আগের ব্যক্তিকে আগে গাড়িতে উঠতে দিন; বাসে জায়গা না থাকলে সেই বাসে ওঠা বাদ দিন। দরজার হ্যান্ডেলে ঝুলে থেকে জীবনের রিস্ক নেবেন না। গাড়ির ভেতরে একসময় লেখা থাকতো- সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। এখন এরকম লেখা আমার চোখে পড়ে না (আমি অন্ধ, এজন্য হয়ত দেখি না)। কিন্তু আমরা জীবনের চেয়ে সময়ের মূল্য বেশি দিতে গিয়ে অধৈর্য হয়ে পড়ি, আর জীবনের রিস্ক নিয়ে গাড়িতে ওঠার জন্য যেখানে-সেখানে ছুটতে থাকি, ফলে আমরা পরিকল্পিত ফাঁদ থেকে আর রেহাই পাই না।
গ। রাস্তা পারাপারের জন্য সুনির্দিষ্ট জায়গা ব্যবহার করুন। যেখানে ফুট-ওভার ব্রিজ আছে, সেখানে রাস্তায় নামা থেকে বিরত থাকুন এবং ফুট ওভার ব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হোন।
ঘ। রাস্তা পারাপারের সময় সতর্কভাবে ডানে-বামে তাকান, চলাচলরত গাড়ির গতিবিধি লক্ষ করে রাস্তা পার হোন। একইভাবে সতর্ক থাকুন যখন আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন।
ঙ। ড্রাইভারকে অতিমাত্রায় বেশি গতিতে গাড়ি চালানোয় উৎসাহিত না করা। আমি নিজেই সাক্ষী, ড্রাইভারগণ একটু কম স্পিডে গাড়ি চালালে যাত্রীরা খুব বিরক্ত হোন, এবং হাই স্পিডে গাড়ি চালানোর উদ্দেশ্যে ধমকাতে থাকেন ও বকাবিক করতে থাকেন। এতে যাত্রীদের উপরই রিস্ক বাড়তে থাকে। বরং, ড্রাইভার যদি খুব বেশি স্পিডে গাড়ি চালান, তাকে নরম কথায় নিরুৎসাহিত করতে হবে (অনেক সময় ধমক খেয়ে ড্রাইভার আরো বিগড়ে যান, কিংবা ঘাবড়েও যেতে পারেন, ফলে দুর্ঘটনা ঘটানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়)।
নীতিনির্ধারক মহল এবং আমাদের বুদ্ধিজীবিরা এই ব্যাপারে আরো অধিক বাস্তবসম্মত পন্থা বের করতে পারেন।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৪:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


