somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটা কবিতার গোড়াপত্তন

১৯ শে জানুয়ারি, ২০২২ রাত ৯:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের ছোটোবেলায় পদ্মা নদী খুব উত্তাল, বিশাল ও ভয়াবহ ছিল। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে বাবাকে জিজ্ঞাসা করতাম, ‘বাবা, গাঙের কি ঐ-পার নাই?’ বাবা হেসে জবাব দিতেন, ‘আছে। অনেক দূরে। দেহা যায় না।’
আমি তখন গাঙের বুকে পালতোলা নাওয়ের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবতাম, আহা, একদিন যদি ঐ-পারে যাইবার পারতাম!
কলেজবেলায় গ্রামে গিয়ে মাঝে মাঝে পদ্মার পাড়ে যেতাম বন্ধুদের সাথে বেড়াতে। পদ্মা ডুবে গেছে চরের বালুতে। কলাপাতায় সবুজের ঢেউ দেখি, আর শুকনো তটে দাঁড়িয়ে দেখি পদ্মার বুকে সাদা বালু খাঁ-খাঁ করছে। চিকন খালের মতো মরা নদী বুড়ির মতো ধুঁকে ধুঁকে হেঁটে যাচ্ছে।

অনেকদিন পর।
গুলিস্তান থেকে শুরু। বাবুবাজার ব্রিজ কিংবা পোস্তগোলার চীনমৈত্রী সেতু পার হয়ে ঢাকা-মাওয়া সড়ক ধরে চলতে থাকুন।
শ্রীনগর।
সদর পার হয়ে কামারগাঁও ছাড়িয়ে শাইনপুকুর।
দোহার উপজেলা শুরু।
কিছুদূর গিয়ে নারিশা। ছোটোবেলায় এখানে অনেক এসেছি। ছোটো চোখে নদীর ঐ-পার ধু-ধু করতো। কলেজবেলায় এখানে ধু-ধু বালুচর।


আজ।
নারিশা গ্রাম ভেঙে ডুবে যাচ্ছে নদীগর্ভে। গ্রামবাসীর প্রাণান্ত চেষ্টা তা প্রতিরোধে।
গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ি। পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখি ও-পাড়ে সূর্য পাটের উপরে, স্রোতোময়ী পদ্মার শরীরে ঢেউয়ের ভাঁজে ভেঙে পড়া রোদ চিকচিক করছে।
এই পথে, একটু দূরে প্রমীলাদের বাড়ি। স্কুলজীবনে শুধু প্রমীলার সাথে কাকতালে দেখা হবার সম্ভাব্যতায় এখানে ঘোরাঘুরি করতাম। আর আছে সায়ন্তনীদের বাসা। ওর মতো সুন্দরী মেয়ে আমার চোখে আজও আর একটাও পড়ে নি। মিনাদের বাড়ি আর ইমরানদের বাড়ি পাশাপাশি। মিনার সাথে মাঝে মাঝে কথা হয়। ইমরান বাবা হয়েছে বছর দুই আগে, ও এ-খবর দিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে।

আর সোহানা?
রাতুলের চাচাত বোন সোহানা। স্কুলজীবনের পর ওর সাথে আর দেখাই হলো না। প্রমীলা বলে, ‘সোহানার দিনে দিনে বয়স কমে।’ শামীম ওর সাথে প্রেম করতো। ওদের দু পরিবারে অহি-নকুল পরিস্থিতি সারাজীবন। ও-বাড়ির মেয়ে এ-বাড়িতে? এ-বাড়ির ছেলে ও-বাড়িতে? পৃথিবী উলটে গেলেও না।
এসএসসির পর পর ওর বিয়ে হলো এক গণিতজ্ঞের সাথে। রাতুলের সাথে দেখা করতে গেছি; এগিয়ে এলো ভুবনমোহিনী সোহানা ওর হৃদয়হরা হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে।
‘তুই না খুব চিকন আছিলি? মাত্র কয় মাসেই এত মোটা হইয়া গেছস?’ আমার কথা শেষ হবার আগেই ‘স্টুপিড!’ বলে এক ঝামটায় আমার গাল টেনে দিয়ে পৃথিবীকাঁপানো একটা হাসি হেসে ঘাড় বাঁকিয়ে বেণি দুলিয়ে চলে গেলো সোহানা। ওর সেই হাসি চোখের সামনে ভাসে, ওর কথা মনে হলে, বা না হলেও। আমাকে ভর্ৎসনা করে রাতুল বলেছিল, ‘তুমি এত বোকা কেন? ও প্রেগন্যান্ট হইছে বোঝো না?’
আরো অনেকে। শাপলা। ঝিনুক।
একেকটা মেয়ে একেকটা অনবদ্য কবিতা, ভিন্ন ভিন্ন রস ও স্বাদের। এই দেখুন, কোনো ছেলের নামই আমার মাথায় আসছে না এখন। আমরা মেয়েদের কথা বেশি মনে রাখি; ওরা আমাদের নিয়ে কী ভাবে তা জানতে খুউব খুউব সাধ হয়। আমার মতো সবগুলো ছেলেই হয়ত এমন করেই সবগুলো মেয়ের কথা ভাবে। আর মেয়েগুলো? ওরা মনে হয় আমাদের আর মনে রাখে না। আমরা যেমন বউয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে আর তার বুকের উপর শুয়ে একবার হলেও ওদের প্রত্যেকের কথা ভাবি, ওরা কি স্বামীর বুকে মাথা রেখে একটি মুহূর্তের জন্যও মনে করেছে আমাদের কথা? আমার কথা? ওরা খুব স্বার্থপর। ওরা স্বামীদের সাথে বেইমানি করে না, আমরা যেমন বউদের সাথে করি। ওরা নয় প্রেমিকা, নয় বান্ধবী। ওরা আমাদের কেউ না।
একদিন আমাকে অবাক করে দিয়ে প্রমীলা বলেছিল, ‘তোরা এত নিষ্ঠুর কেন রে? তোদের কথা ভেবে ভেবে মরি... ।’ তারপর ওর কণ্ঠ গলে যেতে থাকে, করুণ ফিসফিসে স্বরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘তোর কথা কত ভাবতাম... খুব নিষ্ঠুর রে তুই!’
আমি যখন পদ্মার গভীর থেকে স্কুলবান্ধবীদের ছিনিয়ে নিয়ে আসছিলাম, দেখি আমার সরলা বউ আর সন্তানেরা উজ্জ্বল ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে আনন্দে ঝলমল করছে।
এখানে একটা কবিতার ভাব জাগে। সর্বপ্রথম যে শব্দটা মাথায় টোকা বা উঁকি দিল, সেটা হলো— ‘দিধিষু’। কবে কোথায় এই শব্দটা পড়েছিলাম মনে নেই। অর্থটাও তত পরিষ্কার নয়। কিন্তু ‘দিধিষু’ দিয়েই কবিতা শুরু করি।

দিধিষু শরীর নদীর বিভায় ঘুমিয়ে পড়ে পাখিদের অগোচরে। জলের জোনাকিরা কোমল বাতাসে ভেঙে ভেঙে মাছের সারিতে মিশে যায়।

এই হলো কবিতা। এর কী অর্থ দাঁড়ায় তা জানি না। আদতে এর কোনো অর্থ নেইও। সব কবিতার অর্থ থাকে না।

অহনার সাথে যদি আবার আরেকদিন, কালের স্রোতে ভাসতে ভাসতে কোনো এক চরের কন্দলীবনের হরিৎ ছায়ায় অলৌকিকভাবে দেখা হয়ে যায়, এ দু চরণ কবিতা ওকে শোনাবো। এ কবিতা শুনে সে যারপরনাই খুশি হবে; খুশির ঘোরে বহুক্ষণ কেটে যাবে, তারপর যথাস্বভাবে বলবে, ‘এবার এর অর্থটা আমাকে বুঝিয়ে বল, সোনাপাখি।’
আমি অহনাকে অতি চমৎকারভাবে কবিতাটার অর্থ বুঝিয়ে দেব। সে বিস্ময়ে ডগমগ হয়ে শুধু এ কথাটাই বলবে, ‘তোর মতো কবি হয় না রে পাগল; তুই একদিন অনেক বড়ো কবি হবি!’

২৩ এপ্রিল ২০০৯
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০২২ রাত ৯:৫৭
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' আন্দোলন কেন ব্যর্থ হলো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



মাও সে তুং-এর গৃহীত "গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড" (১৯৫৮-১৯৬০) আন্দোলনটি মূলত অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা, চরম অব্যবস্থাপনা এবং ভুল কৃষি নীতির কারণে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ ফিরতে পারে, তবে…

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২০




১। ২০১২ থেকে সংঘটিত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১২ বছরের গু/ম, খু/ন, অ*পশাসন, গণতন্ত্র হ*ত্যা, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বং*স, দুর্নী*তি, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণের মাত্রা এমন চরমই ছিল যে, শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিনেমা-গান-খেলাধুলা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ২:১৭

আইন সমাজ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়। আইন দৃশ্যমান, প্রতিরোধযোগ্য। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মানুষকে নিজেই নিজের আনন্দ নিষিদ্ধ করতে শেখানো। জীবন থেকে আনন্দের উচ্ছেদ ঘটানো। এই কাজটি বাংলাদেশে গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×