somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার লেখা জীবনের প্রথম চিঠি, অতঃপর অন্যান্য

১০ ই ডিসেম্বর, ২০২৩ রাত ১:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার লেখা জীবনের প্রথম চিঠিটির কথা আসলে মনে নেই, তবে, প্রথম চিঠি লেখার করুণ ও হৃদয়বিদারক বিব্রতকর অবস্থার কথা কখনো ভুলতে পারি না। সেটি আজ আপনাদের বলি।

এ ঘটনার আগে ক্লাসের বিভিন্ন পরীক্ষায় হয়ত চিঠিপত্র বা দরখাস্ত লিখে থাকবো, তবে মা-বাবা-চাচা-খালা, বন্ধু-প্রেমিকাকে কোনো পারিবারিক চিঠি লেখার সুযোগ হয় নি।

তখন 'কৃতিত্বের' সাথে ক্লাস ফাইভ পাশ করে হাইস্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়েছি। আমার স্কুল থেকে প্রথম বারের মতো প্রাইমারি বৃত্তি পাওয়ায় আমার 'ভালো ছাত্র' হওয়ার ঘটনাও অনেক ছড়িয়ে পড়েছিল :) আবার হাইস্কুলের ১ম সাময়িক পরীক্ষায়ও আমার হাইয়েস্ট নাম্বারের ছড়াছড়ি থাকায় আমার এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহই ছিল না যে আমি ব্যাপক ভালো ছাত্র বটে :) আমার এমন সাফল্যের সময়ে একদিন আমার নানা এলেন আমার মায়ের কাছে। নানার এক ভাগ্নে, যিনি আমার মামা, চাকরি করেন সউদি আরবে। সে-আমলে সউদি আরবে (মানে বিদেশে) চাকরি করার দাম আজকের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। নানার সেই ভাগ্নের কাছে একটা চিঠি লিখতে হবে। এদ্দিন চিঠি লেখার জন্য নানাকে অনেক বেগ পেতে হতো, কারণ, চিঠি লেখার মতো শিক্ষত লোকের সংখ্যা তখন অপ্রতুল ছিল। তো, নানার নাতি, অর্থাৎ আমি যখন এতবড়ো শিক্ষিত হয়ে উঠেছি, এখন তো নানার পোয়াবাড়ো, যখন ইচ্ছে তখনই নাতিকে দিয়ে চিঠি লেখানো যাবে :)

নানার চিঠির উদ্দেশ্য, ভাগ্নেকে কুশলাদি জানানো আর নানার ছেলে (অর্থাৎ আমার একমাত্র সুরুজ মামা) আর আমার জন্য 'সিকো' ঘড়ি পাঠানোর কথা বলা। এর দাম অবশ্য নানাই বহন করবেন। আমি প্রাইমারি বৃত্তি পাওয়ায় নানার পক্ষ থেকে এটা হবে আমার জন্য একটা উপহার। মা যখন আমাকে এ চিঠি লেখার কথা বললো, তখন আমার মাথায় অল্পের জন্য আকাশ ভেঙে পড়লো না। আমি বিষম চিন্তায় পড়ে গেলাম শুধু একটা বিষয় নিয়ে - চিঠির শুরুতে সম্বোধনটা কীভাবে লিখতে হবে! আপনারা হয়ত ভাবছেন, এত সাধারণ একটা বিষয়ে চিন্তার কী হলো, প্রিয় কফিল, হ্যালো কফিল, ইত্যাদি যে-কোনো একটা কিছু লিখে দিলেই তো হতো! হ্যাঁ, ও-বয়সে চিঠি লেখার কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় এই সাধারণ বিষয়টিই মাথায় আসে নি। চিন্তায় চিন্তায় আমি প্রথমে ঘাস, পরে কাঠ হতে শুরু করলাম। ক্লাসমেট কাউকে যে জিজ্ঞাসা করবো, এ কথাটাও মাথায় আসে নি।

পরের দিন মা জিজ্ঞাসা করলো, চিঠি লেখা হয়েছে কিনা। আমি হয়ত কিছু একটা জবাব দিয়েই চিন্তায় আরো কঠিন কাঠ হতে হতে নিজ ভুবনে চলে গেলাম।

এভাবে প্রায় ৫/৭দিন চলে গেছে। ইতিমধ্যে আমার নানাও চিঠি নেয়ার জন্য বার দুয়েক আমাদের বাড়িতে এসে ফিরে গেছেন।


পরের ঘটনাটা ছিল খুব মধুর এবং স্বস্তিদায়ক, বলতে পারেন relieving :) দেখি, মা আমার প্রতিবেশী খোর্শ্বেদ কাকা, যার কাছে আমি প্রথম পড়া শিখেছি, যিনি অনেক দরদ দিয়ে, আপন সন্তানের মতো আমার পড়ালেখার গোড়াপত্তন করে দিয়েছিলেন এবং যার কাছে আমি চিরঋণী, যিনি ছিলেন আমার সর্বৈব একজন অবৈতনিক মহান ও মেধাবী প্রাইভেট টিউটর, তাকে দিয়ে চিঠিটি লিখিয়ে এনেছেন। আমি চিঠিটি হাতে নিয়ে পড়ে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম। আমার কাছে যে-বিষয়টা এত কঠিন মনে হচ্ছিল, আমার খোর্শ্বেদ কাকা সেটি কত সহজেই না লিখে ফেলেছেন। চিঠির ভাষা হুবহু তো আর মনে নেই - সেই ৭৯ সালের কথা, তবে, সারাংশটা, যা আমার চোখ খুলে দিয়েছিল, তা মোটামুটি এরকম ছিল :

বাবা কফিল,
আশা করি ভালো আছো। আমরাও খোদার ফজলে ভালো আছি। পর সমাচার এই যে, -----------। নিয়মিত খাওয়া দাওয়া করিবে। আল্লাহর নাম স্মরণ রাখিবে, ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়িবে। কারো সাথে ঝগড়া বিবাদ করিবে না ------- খোদা হাফেজ।
ইতি-
তোমার মামা কালু মোল্লা

'বাবা কফিল' সম্বোধনটাই আমার চিঠির সম্বোধনের সব কাঠিন্য দূর করে দিল। অথচ, তার আগে আমার মাথায়ই ঢোকে নি এভাবে ভাগ্নেকে একটা সম্বোধন করা যেতে পারে।

এরপর ঐ বয়স থেকেই আমাকে অনেক চিঠি লিখে দিতে হয়েছে। বেশির ভাগই ছিল 'ভাবী' সম্পর্কের আর একজন ছিলেন 'খালা' সম্পর্কের। তবে, এদের সবার চিঠিই থাকতো তাদের হাজব্যান্ডদের প্রতি। কয়েকজনকে চিঠি লিখে দিতে হতো মিডল ইস্টে চাকরিরত তাদের ছেলেদের কাছে।

হাজব্যান্ডদের কাছে চিঠি লেখাটাও বেশ কঠিনই মনে হয়েছিল প্রথম দিকে। এ সমস্যাটাও মোটামুটি 'সম্বোধন' নিয়েই। তবে, চিঠি লেখার পর পড়ে শোনানো হলে তারা খুশিতে ডগমগ হয়ে যেতেন, আর তা থেকেই বুঝে নিতাম বেশ সরস একটা চিঠিই লিখে দিয়েছি।

হাজব্যান্ডদের কাছে লেখা চিঠির সম্বোধন ও ভাষা ছিল মোটামুটি এরকম :

প্রিয় স্বামী, বা, ওগো আমার স্বামী, বা, হে আমার প্রিয় স্বামী, বা, প্রিয়তম, ওগো প্রিয়তম,
আপনি আমার শতকোটি সালাম নিবেন। আশা করি আল্লাহর অসীম রহমতে আপনি ভালো আছেন। পর সমাচার এই যে, আপনার জন্য সর্বদাই আমার মন ছটফট করে। অনেকদিন গত হইল আপনার সাথে আমার দেখা নাই। তাই আপনার জন্য আমার মন কাঁদিতেছে। জানি না, আবার কবে আপনার সাথে সাক্ষাৎ হইবে। ----- এ পর্যন্ত লেখা কথাগুলো ছিল আমার নিজের কথা :) এগুলো পত্রপ্রেরিকারা কেউ বলে দিতেন না। তাদের বেশিরভাগ চিঠিই থাকতো টাকা চাহিয়া স্বামীর কাছে পত্র লেখা :) খালি টাকার কথা কীভাবে লেখে, আগা-মাথায় কিছু না লিখে? তাই খোর্শ্বেদ কাকার আদলে (আমার নানার চিঠির কথা বলছি) আমি স্বামীর কাছে লেখা চিঠিতে কিছু উপক্রমণিকা লিখতাম নিজে থেকেই :) রোলটানা খাতার (এ খাতাও আবার আমার নিজেরই :) ) এক পাতা ভরে প্রেমের কথা লেখার পর চিঠি শেষ করার আগে লিখে দিতাম - বাড়িতে বাজার করার জন্য টাকার দরকার। চিঠি পাওয়ামাত্র অতিসত্বর টাকা পাঠাইবেন :) নিয়মিত খাওয়া দাওয়া করিবেন। আল্লাহর নাম স্মরণ রাখিবেন, ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়িবেন। কারো সাথে ঝগড়া বিবাদ করিবেন না। আজকের মতো এখানেই শেষ করিলাম। ইতি- আপনার প্রিয়তমা মালেকা বেগম।

এরপর জীবনে অনেক চিঠি লেখা হয়েছে। সে-সব চিঠির কথা মাঝেমাঝে এক-আধটু লিখেছি বিভিন্ন কমেন্টে। সেগুলোর অনেক চিঠিই শুধু চিঠিই ছিল না, ছিল তার চাইতেও অধিক কিছু। চিঠি লেখার সে-সব দিনের কথা মনে পড়লে যুগপৎ আনন্দ ও বেদনারা এসে ভিড় করে আমার সমস্তটা জুড়ে।

সবার জন্য শুভ কামনা রইল।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ডিসেম্বর, ২০২৩ রাত ১:০৩
১৪টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ খোকার অভিমান

লিখেছেন ইসিয়াক, ২০ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৬:৪৬


খোকা খাবে মুড়ি মুড়কি, মা দিলো খই
এই নিয়ে অশান্তি, ব্যাপক হই চই।

বাবা যাচ্ছে হাটে, খোকা পিছু ছোটে
বকা খেয়ে ঘরে ফিরে কাঁদছে মাথা খুঁটে। 

কত কাজই... ...বাকিটুকু পড়ুন

অপারেশন ইকারুস: বালির নীল গোলকধাঁধা

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:১২



কুয়ালালামপুর অপারেশনের ঠিক সাতদিন পর। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের ‘নগুরা রাই’ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন একটি প্রাইভেট চার্টার্ড বিমান ল্যান্ড করল, তখন বালির আকাশ জুড়ে গোধূলির রক্তিম আলো।

বিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

যদি কামের কাম না হয়, সংখ্যা দেখলে বিগাড় ওঠে

লিখেছেন অপলক , ২০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:২২



বগুড়া জিয়াউর রহমান মেডিকেল বর্তমানে ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট। এতেই রুগিরা সেবা পায়না, অপরিচ্ছন্ন, লোকবল নেই, যন্ত্রাংশ নষ্ট, ওষূধ নেই, ১৫০০ শষ্যাবিশিষ্ট করে লাভ কি? সেবা নিশ্চিত হবে না...

এখন ডাক্তাররা... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি কার জন্য বাঁচো? কীভাবে এ-আই দিয়ে কভার সং তৈরি করি?

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৩৩

প্রথমত, এ-আই দিয়ে গান তৈরি করা অনেক সহজ। আপনি নিজে কোনো লিরিক না লিখে, কোনো সুর তৈরি না করেও এ-আই-তে প্রম্পট দিয়েই গান তৈরি করে ফেলতে পারেন। তবে সেটা আপনার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পলাশবাড়ীর মূর্তি বিতর্ক, ধর্মীয় স্থাপনার আড়ালে কি অন্য কোনো নীলনকশা?

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ২০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:১৪

সাম্প্রতিক ভূরাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সমীকরণে হাইব্রিড ওয়ারফেয়ারবা অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যার প্রধান লক্ষ্যবস্তু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ফাটল ও অননুমোদিত কাঠামোর মাধ্যমে মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×