somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধর্ম বনাম বিজ্ঞান

২০ শে মে, ২০১৩ সন্ধ্যা ৭:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রাচীন কালে ধর্ম ও বিজ্ঞান একে অন্যের পরিপূরক হিসাবে পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে , তবে বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে এদের মাঝে দ্বন্দ্ব বাড়তে বাড়তে চরম ধর্ম বিরোধে রূপ নেয় অষ্টাদশ উণবিংশ শতাব্দিতে এসে। এই সময়ে বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের ফলে অনেকেই অনুভব করতে থাকেন যে অতিপ্রাকৃত কোন শক্তিতে বিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে। এর অন্যতম কারন হলো , এতদিন বিশ্বাস করা হতো অতিপ্রাকৃত কোন শক্তির অস্তিত্ব ছাড়া এই মহাবিশ্বের কোন ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়। এখন ধর্ম বিরোধীরা বলতে লাগলেন , যেহেতু বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের ফলে এখন অতিপ্রাকৃত কোন শক্তি বা 'গড' হাইপোথেসিস ছাড়াই এই মহাবিশ্বের সকল দিকের পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব , সেকারনে অতিপ্রাকৃত কোন শক্তিতে বিশ্বাস বাহুল্য হয়ে পড়েছে। যেহেতু এই মহাবিশ্বের সকল প্রকৃয়া কিছু প্রাকৃতিক আইন মেনে পরিচালিত হয় , সেহেতু অতিপ্রাকৃত কোন শক্তি এই মহাবিশ্বকে পরিচালিত করছে এমনটি ভাবা একমাত্র বদ্ধমনা সাধারন জ্ঞাণ বিবর্জিত মূর্খ আস্তিকদের পক্ষেই সম্ভব। তাই কী?

এই মহাবিশ্বে যা কিছুই ঘটে , তা ঘটে অতিপ্রাকৃত কোন শক্তির ইচ্ছা বা কারনে , এমনটাই প্রাচীন কাল থেকে আস্তিক মানুষ বিশ্বাস করে এসেছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান দাবী করে , প্রতিটি ঘটনার পিছনে একটি কারন আছে। কারন ছাড়া কিছুই ঘটে না এবং এই কারন পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে জানা সম্ভব। এই যেমন নিউটন পর্যবেক্ষন করলেন , বিশাল এই মহাবিশ্বের সকল গ্রহ নক্ষত্র গ্যালাক্সি নির্দিষ্ট এক আইন মেনে বিশ্ব পরিক্রমন করে চলেছে , যা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হওয়ার উপায় নেই। এই আইনের নাম - মহাকর্ষ আইন। ডারউইনের পর্যবেক্ষন বা গবেষনা থেকে জানা গেল - অতিপ্রাকৃত কোন শক্তি 'হও' বল্লেন আর মানুষ সৃষ্টি হয়ে গেল এমনটা নয় , বরং ধাপে ধাপে জৈবিক আইন মেনে বিবর্তনের ভিতর দিয়ে নিম্ন প্রজাতি থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স বা মানুষের সৃষ্টি হয়েছে। এভাবেই পর্যবেক্ষনের ও গবেষনার তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা অনুমান (inference)করে থাকেন যে , এই মহাবিশ্বের সকল ঘটনা এক কঠিন আইনে আবদ্ধ , যার অপর নাম - প্রাকৃতিক আইন ‘Law of Nature'।

জার্মান দার্শনিক কান্ট (Kant) তো ঘোষনাই দিলেন , " আমাকে কিছু পদার্থ (matter) দাও , আমি দেখিয়ে দেব কিভাবে পদার্থ থেকে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে।" হেকেল (Haeckel) আরো এক ধাপ এগিয়ে বল্লেন - পানি , রাসায়নিক উপাদান ও সময় দেয়া হলে , তিনি মানুষ সৃষ্টি করতে পারবেন। নিৎসে (Nietsche) বিজয় ঘোষনা দিলেন , আল্লাহ মৃত।

মজার ব্যাপার হলো প্রাকৃতিক আইনের আবিষ্কর্তা এই নায়কেরা প্রায় সকলেই ছিলেন আস্তিক। নাস্তিকদের ধারনা অজ্ঞতা থেকেই মানুষ ধর্ম বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। অতীতের মানুষ ঘটনার কারনগুলো জানতনা বলেই বিশ্বাস করত অতিপ্রাকৃত কোন শক্তিই সকল কিছুই ঘটিয়ে থাকে। বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে মানুষ যখন প্রকৃত কারন জানবে , তখন ধর্ম বিশ্বাস এমনিতেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যেমনটি জুলিয়ান হাক্সলি তার বইয়ে লিখেছেন-

"রংধনু আকাশে 'গডের' কোন নিদর্শন নয় , কারন পড়ন্ত বৃষ্টির কণায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত হলেই আকাশে রংধনূ দেখা যায়। প্লেগকে আল্লাহর গজব হিসাবে দেখার কোন উপায় নেই , কারন প্লেগের কারন হলো Bacillus pestis নামের এক জীবাণু , যা ইদুরের মাধ্যমে ছড়ায়। সকল প্রাণী ও উদ্ভিদ যেহেতু লক্ষ কোটি বছর ধরে বিবর্তনের মাধ্যমে আজকের অবস্থায় পৌছেছে , সেহেতু প্রাণী ও উদ্ভিদের সৃষ্টিতে আল্লাহর হাত আছে বলাটা বাতুলতা মাত্র। হিস্টেরিয়া ও পাগলামি যদি মনের বৈকল্যের কারনে ঘটে থাকে , তাহলে কোনভাবেই একে ভুত বা শয়তানের আছর লেগেছে বলা যায় না।" মোদ্দা কথা হলো - ঘটনা যদি প্রাকৃতিক কারনে ঘটে থাকে , তাহলে এগুলো অতিপ্রাকৃত কোন শক্তির কারনে যে ঘটেনি তা নির্দ্বীধায় বলা যায়।

ধর্মবিরোধীদের এই যুক্তির স্বাভাবিক কিছু দুর্বলতা আছে। ধরুন রেল লাইনের উপর দিয়ে একটি রেল গাড়ি ছুটে চলেছে। গাড়ির চাকা কেন ঘুরছে? গাড়ির ইন্জিন ও এর যন্ত্রাংশ পর্যবেক্ষন ও পরীক্ষার পরে এই স্বীদ্ধান্তে উপনীত হব গাড়ির ইন্জিন ও এর যন্ত্রাংশের কারনেই গাড়ির চাকা ঘুরছে। এই উত্তর কি যথেষ্ঠ? অবশ্যই না। ইন্জিনিয়ার , যিনি রেল ইন্জিনের ডিজাইন করেছেন এবং রেলের চালকের ভূমিকা সম্পর্কে না জানলে উত্তর সম্পুর্ন হবে না। কারন রেল ইন্জিন নিজে নিজেই তো আর তৈরি হতে পারে না বা নিজে নিজেই চলা শুরু করতে পারেনা। রেল গাড়ির ইন্জিন ও এর যন্ত্রাংশ সর্বশেষ বাস্তবতা নয়। সর্বশেষ বাস্তবতা হলো মন , যা এই রেল গাড়ির ইন্জিন ও এর যন্ত্রাংশকে অস্তিত্বে এনেছে এবং একে ইচ্ছামত পরিচালনা করছে। আসলে প্রকৃতি ব্যাখ্যা দেয় না , বরং প্রকৃতিকেই ব্যাখ্যা করার দরকার।

ডিমের শক্ত খোলশ ভেঙ্গে কিভাবে নরম মাংসের মুরগির ছানা বের হয়? অজ্ঞ মানুষ এর পিছনে আল্লাহর হাত আছে বলে বিশ্বাস করে। আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যানে ধর্ম বিরোধীদের যুক্তি হলো আল্লাহর হাত নয় বরং ২১ দিনের মাথায় মুরগির ছানার ঠোটে একটি সাময়িক শক্ত শিং গজায় , যেটা দিয়ে ডিমের শক্ত খোলশ ভেঙ্গে মুরগির ছানা বের হয়। এই যুক্তি একটি ফ্যালাসী। কারন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে , ঠিক ঠিক ২১ দিনের মাথায় মুরগির ছানার ঠোটে একটি সাময়িক শক্ত শিং গজানোর পিছনে যে আল্লাহর হাত নেই , তা কিভাবে তারা নিশ্চিত হলেন? আসলে বিজ্ঞানীরা ঘটনার কার্যকারনের শৃঙ্খলে একটি নুতন লিঙ্ক যোগ করেছেন মাত্র। একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তারা আরো বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন। যেমনটি এর পরেই প্রশ্ন আসবে - শক্ত শিং গজায় কেন? ২১ দিনের বদলে ৩১ দিন পরেই বা না কেন? ইত্যাদি।

জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে আমার প্রকৃতিকে আরো ভাল ভাবে বুঝতে পারছি ঠিকই , তবে এই জ্ঞান অতিপ্রাকৃত কোন শক্তির অনস্তিত্বের প্রমান নয়। আদিম মানুষ অজ্ঞানতার ফলে বিশ্বাস করত রংধনু আল্লাহর নিদর্শন , আজ ও আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক আস্তিক বিশ্বাস করে রংধনু আল্লাহর নিদর্শন এবং পড়ন্ত বৃষ্টির কণায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে সেটা তিনি করে থাকেন। আদিম মানুষ অজ্ঞানতার ফলে বিশ্বাস করত প্লেগ আল্লাহর গজব , আজ ও আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক আস্তিক বিশ্বাস করে প্লেগ আল্লাহর গজব এবং সেটা তিনি Bacillus pestis ও ইদুর দিয়ে ঘটিয়ে থাকেন। তেমনিভাবে বিবর্তনের মাধ্যমেই মানুষ সহ সকল প্রাণী ও উদ্ভিদ সৃষ্টি করতেই পারেন। এখানে বিজ্ঞানের সাথে তো ধর্মের কোন বিরোধ দেখি না।

ফলে আমরা দেখি- বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষের সময়েও ধর্ম বিলীন হয়ে যায় নি , যেমনটি নিৎসে (Nietsche) বিজয় ঘোষনা দিয়েছিলেন বা কান্টের ঘোষনা মতো পদার্থ থেকে আরেকটি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করে কেউ এখনো দেখাতে পারেনি বা হেকেলের দাবী মতো পানি , রাসায়নিক উপাদান ও পর্যাপ্ত সময় দেয়া হলেও কেউ এখনো মানুষ সৃষ্টি করতে পারেনি।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৯

ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×