একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যখন পরীক্ষার ফলাফলকেই শিক্ষার মান নির্ধারনের একমাত্র মাপকাঠি হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং নীতিনির্ধারকেরা সেঅনুযায়ী প্রচার করেন ,কার্যক্রম পরিচালনা করেন তখন তা’ যেমন হয় প্রতারণার তেমনই বিপজ্জনক । বাংলাদেশে এখন শিক্ষা নিয়ে এমনই প্রতারণা করা হচ্ছে । এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য ভয়ানক বিপদের পথই তৈরী করা হচ্ছে ।এ এমনই বিপজ্জনক কর্মকান্ড যা’ মূলে আঘাত করার মত কাজ ।গত কয়েকদিনে সেই বিপদের ঝলকানিই দেখা গেল ।ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভন্ডামি এবং প্রতারণার শীর্ষবিন্দু মনে হয় এখন দেখা যাচ্ছে ।সম্প্রতি দুইদিন ব্যবধানে প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট (পি.এস.সি) পরীক্ষা এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট ( জে.এস.সি) পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে । এ বছর পত্র পত্রিকাসহ সকল প্রচার মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের যেভাবে উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা গেল এই পরীক্ষার ফল নিয়ে এর আগে এমন উল্লাস দেখা যায়নি ।বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী এবং তাদের নীতিনির্ধারকেরা এখন বিভিন্ন বিষয়ে প্রতারণামূলকভাবে তাদের সাফল্যকীর্তন এবং তা নিয়ে উল্লাসের মধ্যদিয়েই গায়ের জোর না খাটানোর জায়গাগুলোতে টিকে আছে ।এ ছাড়া তাদের টিকে থাকতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণের ওপর গায়ের জোর খাটাতে হোত ।কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের এ উল্লাস ভবিষ্যতে গোটা সমাজকেই অথর্ব এবং অকার্যকর করার মত বিপজ্জনক উদ্যোগ ।শিক্ষা , যা’ একটি দেশের মানুষের উন্নতি এবং বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ , তাই নিয়ে এরা এখন এমন ছিনিমিনি খেলছে ।
সভ্য দুনিয়ায় এখন বলা হয়ে থাকে শিক্ষা মানুষের মেৌলিক অধিকার , প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ।‘প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক’- এর অর্থ এর বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রের ওপর বর্তায় ।এর অর্থ হলো একটি রাষ্ট্রর সীমানার মধ্যকার সকল শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র বাধ্য । এ ছাড়া ‘বাধ্যতামূলক’ কথাটির কোন অর্থ থাকতে পারে না । কিন্তু এখানে এই ‘বাধ্যতামূলক’ কথাটি এমনভাবে ব্যবহার করা হয় এবং এমনভাবে মানুষকে বুঝানো হয় যেন অনেকেই এ শিক্ষা গ্রহন করতে চাচ্ছেনা আর রাষ্ট্র তাদের তা গ্রহনে বাধ্য করার চেষ্টা করছে ।এখানেই শিক্ষা নিয়ে জনগণের সাথে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতারণার শুরু ।এর পরে প্রতারণা বিভিন্ন স্তরে বিকশিত হতে থাকে ।
শুধু বাগাড়ম্বর করে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যায় না । এর জন্য সারাদেশে নির্ধারিত আদর্শমানের শিক্ষা অবকাঠামো নির্মান করা প্রয়োজন ।শিক্ষা দানের জন্য উপযুক্ত জনশক্তি তৈরী এবং তাঁদের উপযুক্ত বেতন নিশ্চিত করা প্রয়োজন ।কারণ বঞ্চিত এবং অভুক্ত মানুষের পক্ষে কাউকে আর যাই হোক শিক্ষা দান সম্ভব নয় । এরপর যেটা প্রয়োজন তা হলো একটি আদর্শমানের পাঠ্যক্রম ।এ পাঠ্যক্রম আবর্জনা দ্বারা পূরণ করা জনগণের সাথে শিক্ষা নিয়ে এক চরম ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছু নয় ।এ পাঠ্যক্রমের অন্তর্গত যেসব বিষয় থাকা প্রয়োজন তা হলো –মাতৃ ভাষা শিক্ষা,একটি আন্তর্জাতিক ভাষা( ইংরেজী)শিক্ষা,ভূগোল শিক্ষা , গণিত শিক্ষা এবং ইতিহাস শিক্ষা ।এর বাইরে প্রাথমিক পর্যায়ে আর কোন বিষয় থাকা উচিৎ নয় । এসবের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্র একটি আদর্শ মান নির্ধারণ করবে যে মানের শিক্ষা কোন পরীক্ষা দ্বারা পরিমাপ ছাড়াই তা রাষ্ট্রকে সকল শিশুর জন্য নিশ্চিত করতে হবে । শিক্ষাক্ষেত্রে এই অবস্থা তৈরী করা ছাড়া রাষ্ট্র কর্তৃক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কিছুই নয় ।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪০ বছরের মধ্যে নানা পরিচয়ের সরকার তথাকথিত উন্নয়নমূলক কাজের চাতুরী ধারার অংশ হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে কিছু অবকাঠামো(যা’ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল) তৈরী করলেও শিক্ষাদানের জন্য উপযুক্ত জনশক্তি গড়ার ,তাঁদের উপযুক্ত বেতন নিশ্চিত করার এবং একটি আদর্শমানের পাঠ্যক্রম নির্ধারণের কাজ করেনি ।ফলে ‘প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক’ তো দুরে থাক গ্রামাঞ্চলসহ শহরের ব্যাপক অধিকাংশ গরীব মানুষের সন্তানেরা শিক্ষার অধিকার থেকেই বঞ্চিত । গ্রামাঞ্চলে বিদ্যালয় এবং শিক্ষকদের অবস্থা যেমন বেহাল ঠিক তেমনই বেহাল সেখানকার শিক্ষার অবস্থা ।এ অবস্থায় গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী ,শিক্ষামন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ বড়লোকদের স্কুলের ভাল ফল করা মেধাবি(!)শিক্ষার্থীদের নিয়ে যখন উল্লাস প্রকাশ করছেন তখন শিক্ষা বঞ্চিত ,পরীক্ষা বঞ্চিত ,ফল বঞ্চিত অসংখ্য শিশু নির্বাক দীর্ঘশ্বাস ফেলার মুক্ত জায়গাটুকুও পাচ্ছে না , তা পেলে হয়তো সেই দীর্ঘশ্বাসেরই প্রচন্ড ঝড় উঠতে পারতো ।মেধাবিদের(!) উল্লসিত ভি চিহ্ণ যেন এসব অসংখ্য শিশুর অপ্রাপ্তির বঞ্চনাকেই শতগুনে বাড়িয়ে গুমরে গুমরে তুলছে অব্যক্ত যন্ত্রনায় ।এ বিজয় চিহ্ণ যেন বঞ্চিতদের বিরূদ্ধে মেধাবি(!)দের বিজয়ই ঘোষনা করছে ।
বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে শিক্ষার মান বৃদ্ধির(!) জন্য প্রাথমিক স্তরে জাতীয় পর্যায়ে এই পরীক্ষা নেওয়া শুরু করে ।বাধ্যতামূলক শিক্ষার ক্ষেত্রে যখন সকল শিশুর জন্য একটি আদর্শ মানের শিক্ষা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা সরকারের ওপরই বর্তায় এবং তা এ ধরনের কোন পরীক্ষার মাপকাঠিতে নয় শিক্ষাদান পদ্ধতির মধ্যদিয়েই নিশ্চিত করার কথা তখন এ ধরনের পরীক্ষার আয়োজন কেন তার কোন ব্যাখ্যা শিক্ষানীতির মধ্যে নেই ।পৃথিবীর কোন দেশে এই স্তরে এমন সাড়ম্বরে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় কিনা তার সন্ধান মেলা ভার ।বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবেই শিক্ষার দশা খুবই বেহাল । সরকারের বাগাড়ম্বর বাড়ছে কিন্তু কার্যক্রম দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে । একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মান সরকারের হিসাবেই দিন দিন হ্রাস পেতে পেতে এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে ।এখানে একটি কথা বলাই প্রয়োজন তা হলো সরকারের মান নির্ণয়ের পদ্ধতি কোচিং সেন্টারের স্ট্যান্ডার্ডের ।এই পদ্ধতিতেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন স্থান নেই ।
শিক্ষা এখানে কিনতে হয় । সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে শিক্ষা কেনার মাত্রাও ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে ।আগে এই কেনার কাজটা শুরু হতো মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় থেকে ।প্রাথমিক স্তরে জাতীয় পর্যায়ে এই পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন ব্যাপক আকারে তা প্রাথমিক স্তর থেকেই শুরু হয়ে গেছে এবং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ।সরকার বিদ্যালয়গুলোকে শ্রেষ্ঠত্বের ক্রমানুসারে ভাগ করে প্রচার করছে । এ কাজ করার জন্য যে মানদন্ড প্রয়োজন সরকার তার ধারেকাছেও যাচ্ছে না । শুধুমাত্র পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তা করা হচ্ছে । এ কারণে বিদ্যালয়গুলো শুধুমাত্র পরীক্ষার ফলাফলমুখী হতে গিয়ে কোচিং সেন্টারের সকল বৈশিষ্ট্যই রপ্ত করছে ।সনামধন্য বিদ্যালয়সহ শহরাঞ্চলের সকল বিদ্যালয়েই এখন আর বিদ্যালয়ের কোন সংষ্কৃতি অবশিষ্ট নেই সব জায়গাতেই কোচিং সেন্টারের সংষ্কৃতি ।আগে কখনো বিদ্যালয়ভিত্তিক সাজেশনের কথা কল্পনা করা যেত না । সাজেশন ভিত্তিক পড়ালেখার সংষ্কৃতি ছিল নিন্দনীয় ।এখন সাজেশন তো কম বিদ্যালয় পারলে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে এনে তার শিক্ষার্থীদের দিত ।এ কাজ তারা করতো তার কারণ ভাল ফল করতে পারলে সরকার তাদের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনী কাজটি করে দেবে ।সরকারের এ ধরনের কাজ অন্যায় এবং অনৈতিক।
শুধু ফলাফলমুখী এ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যদিয়ে শিক্ষার সকল মহান অর্জনগুলো অন্তর্হিত হতে হতে শূন্যে নেমে এসে শিক্ষা এখন দাঁড়িয়েছে চুড়ান্তভাবে অনৈতিক এক প্রতিযোগিতায় ।এই প্রতিযোগিতার মধ্যদিয়ে যেতে গিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা , সৃজনশীলতা , বাক্যগঠনের সাহস সবকিছু হারিয়ে ফেলছে ।এর কারন এতবড় পাবলিক পরীক্ষায় ভালকিছু(!) করার জন্য ওইসব শিশুরা নিজের বাক্যের ওপর নির্ভর করার ঝুঁকি নেওয়ার সাহস নিজেরাও পায় না অভিভাবকদের নিকট থেকেও অনুমোতি পায় না ।ফলে তাদেরকে সবকিছুই অন্যের আরোপিত বিষয় বিনা বিচারে তোতা পাখির মত মুখস্ত করতে হয় । এ এক বাস্তব সত্য । এর মাধ্যমে যারা ভালকিছুও(!) করছে তারাও আসলে আন্তঃসারশূন্যই থেকে যাচ্ছে । সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা , প্রশ্ন করার ক্ষমতা কোন কিছুই তারা অর্জন করতে পারছে না । এর মধ্যদিয়ে গোটা সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে প্রশ্নহীন , সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাহীন,অথর্ব , বোধ-বুদ্ধিহীন , স্বার্থপর এক ভাল ছাত্রের ভয়াবহতার দিকে! একটি দেশের জন্য এ এক ভয়ানক ব্যাপার ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



