ইতিহাস আর স্মৃতিচারণ এক কথা নয় ।বাংলাদেশে যে কোন ঘটনা এবং পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ করে বড় বড় সংগ্রামের ঘটনাগুলো নিয়ে ইতিহাস পাঠ ও পর্যালোচনার চেয়ে স্মৃতিচারণ বেশি হয়ে থাকে ।এসব স্মৃতিচারণের অধিকাংশই স্মৃতিভ্রষ্টতার অন্ধকারে নিমজ্জতি। এ নিমজ্জনের কিছু অংশ নিতান্তই নির্দোষ স্মৃতিভ্রষ্টতার কারণে ঘটলেও ব্যাপক অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটে থাকে নীতিভ্রষ্টতার কারণে ।যে কোন বড় এবং মহান ঘটনা একদিন হঠাৎ করে ঘটে যায় না ।এসব ঘটনার পিছনে থাকে দীর্ঘদিনের দার্শনিক এবং রাজনৈতিক প্রস্তুতি । সমাজ জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত ,চড়াই-উৎরাই আর নানা অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে নির্দিষ্ট দার্শনিক এবং রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একটি সমাজের ব্যাপক অধিকাংশ মানুষ একটি বিরাট এককে পরিণত হয়ে ওঠে।এ বিরাট এককটি নির্দিষ্ট দার্শনিক এবং রাজনৈতিক লক্ষ্যকে ধারণ করে সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে চলে ।ব্যাক্তি মানুষের সেখানে ভুমিকা থাকে । তবে বৃহত্তম এককের সেই ব্যাক্তি মানুষ এবং সেই একক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ব্যাক্তি মানুষ এক কথা নয় । নেতৃত্বে থাকা ব্যাক্তি মানুষেরও কর্মনীতি, কর্মপন্থা সমাজের বিরাট এককের ধারণকৃত দর্শন এবং রাজনীতি দ্বারা নির্ধারণ এবং নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে ।এর বাইরে ব্যাক্তিগত মত, কর্মনীতি , কর্মপন্থা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নয় ।এ অঞ্চলে ঔতিহাসিক যে সকল ঘটনা ঘটেছে সেগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এসব ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি মানুষের ঘটনার সময়কালের দর্শন ,রাজনীতি , কর্মপন্থা , কর্মনীতি আর পরবর্তীতে সেই বিরাট সমাজ একক থেকে বিচ্যুৎ এবং বিচ্ছিন্ন ব্যাক্তি মানুষের দর্শন , রাজনীতি , কর্মপন্থা , কর্মনীতি এক নয় ।
ভাষা আন্দোলন এ দেশের মানুষের সমাজ জীবনের এক বিরাট ঔতিহাসিক ঘটনা ।এর দর্শন ছিল নিজের আত্ন পরিচয়ের দর্শন, মানুষ হিসেবে নিজেকে চেনার দর্শন , খুঁজে পাওয়ার দর্শন ।আর রাজনীতি ছিল নিজের মর্যাদা এবং সন্মান প্রতিষ্ঠা করার রাজনীতি ।বাঙালী মাত্রেই কি এ দর্শন এবং রাজনীতি ধারণ করেছিল ?শ্রমিক, কৃষকসহ সকল মেহনতী , নিপিড়ীত , বঞ্চিত মানুষ যাঁরা মানুষ হিসেবে নিজেদের পরিচয় খুঁজে ফিরছিলেন ভাষা আন্দোলনের দর্শনগত ভিত্তিভুমি তাঁদের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল ।স্বভাবতঃই ভাষা আন্দোলন ছিল লাঞ্ছিত-বঞ্চিতের নিজেকে মানুষ হিসেবে খুঁজে পাওয়ার দর্শন ।সংগত কারনেই বাঙালী মাত্রেই এ দর্শন ধারণ করেনি ।সংখ্যাগুরু এ দর্শন ধারণ করলেও সংখ্যালঘু ক্ষমতাবান সুবিধাপ্রাপ্ত অংশ এ দর্শন ধারণ করেনি ।তাই বাঙালী হলেও সুবিধাপ্রাপ্ত কিছু লোককে ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করতে দেখা গেছে ।সকল ঔতিহাসিক বড় ঘটনায় যেমন ঘটে তেমনই কিছু সংখ্যক বাঙালী আবার ভাষা আন্দোলনের দর্শন এবং রাজনীতি ধারণ না করলেও বিরাট সমাজ এককের গতিপ্রবাহের চাপে তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত হতে বাধ্য হয়েছে ।
তৎকালীন শাসকেরা বাঙালী-অবাঙালী নির্বিশেষে তামাশার মত করে বলেছে যে, তারা বাঙালীর পারিবারিক এবং পারষ্পরিক কথোপকথনে বাধার সৃষ্টি করবে না । এটা তাদের বলার অপেক্ষা রাখেনা কারণ,যত ক্ষমতাবানই হোকনা কেন প্রত্যক্ষভাবে কেউ কখনো এমন কাজ করতে পারে না ।তাহলে কোথায় তারা বাধা প্রদান করছিল?প্রধানতঃ শিক্ষার মাধ্যমে ।তারা বাংলাকে কখনোই শিক্ষার মাধ্যম হতে দিতে চায়নি ।একটি জাতিকে অযোগ্য করে রাখার এবং অযোগ্য প্রমাণ করার সবচেয়ে বড় উপায় হলো তার ভাষায় তাকে শিক্ষা গ্রহন করতে না দেওয়া ।নিজের ভাষায় শিক্ষা গ্রহন করলে নিজের পরিচয় জানা যায় , নিজেকে চেনা যায় ।শাসকেরা কখনোই শোষিতদের মানুষ হিসেবে নিজেদেরকে চিনতে দিতে চায় না ।শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে না রাখলে সে ভাষাকে অফিস, আদালতসহ রাষ্ট্রীয় কোন কাজেই রাখার প্রশ্ন আসে না ।রাষ্ট্রভাষারূপেও সে ভাষাকে রাখার প্রশ্ন শাসকশ্রণীর কাছে থাকতে পারে না । সে কারণেই সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাকে তারা রাষ্ট্রভাষা রূপে রাখতে চায়নি ।তাই ভাষা আন্দোলন দর্শন বর্জিত , রাজনীতি বর্জিত নিছক একটি ঘটনামাত্র নয় ।ভাষা আন্দোলন শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে শোষিতশ্র্রেণীর সাংস্কৃতিক এবং প্রধানতঃ রাজনৈতিক আন্দোলন ।ভাষা আন্দোলনের মর্ম, তার চেতনা , গতিপ্রকৃতি , ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা বুঝতে হলে ভাষা আন্দোলন যে দর্শন এবং যে রাজনীতিকে ধারণ করে সংগঠিত হয়েছিল তা বুঝতে হবে ।সে দর্শন এবং রাজনীতিকে ধারণ করে অগ্রসর হলে দেখা যাবে ভাষা আন্দোলন এখনও শেষ হয়নি ।বর্তমান শাসকশ্রেণী যতই নানা রঙের দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মোড়কে ভাষা আন্দোলনকে আবৃত করার চেষ্টা করুক না কেন ইতিহাস বার বার ভাষা আন্দোলনের দর্শন এবং রাজনীতিকে সামনে নিয়ে আসে ।সে কারনেই শাসক শ্রেণীর ইতিহাস চর্চায় ভয় ।ইতিহাসকে তারা নিছক একটি ঘটনার মধ্যদিয়ে দেখতে চায় ।
ভাষা আন্দোলনের ষাট বছর এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চল্লিশ বছর পার হয়ে গেলেও শিক্ষার মাধ্যমকে এখনও সম্পূর্ণরূপে বাংলা করা হয়নি ।কাগজে-কলমে বাংলার কথা বলা হলেও তার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসূচী গ্রহন বা গ্রহনের উদ্যোগ কখনোই নেওয়া হয়নি ।উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে পড়াশুনা এবং গবেষণার জন্য যে বইপুস্তক প্রয়োজন সেই লক্ষ্যে বইপুস্তক কখনোই বাংলায় অনুবাদ করা হয়নি ।দীর্ঘদিনের দাবি থাকা সত্ত্বেও একটি জাতীয় অনুবাদ সংস্থা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি ।উচ্চ শিক্ষায় , গবেষণায় ,জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় বাংলার কোন স্থান নেই ।প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে একদিকে আছে হতদরিদ্রদের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা । সেখানে ভিক্ষার সংস্কৃতি তৈরী করে শাসকশ্রেণী রাজনৈতিক ফায়দার ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে ।সেখানে যে শিক্ষার মাধ্যম কি বলা মুশকিল ।অপরদিকে ধনীদের জন্য আছে চটকদার ইংরেজী মাধ্যমের শিক্ষা । শাসক শ্রেণীর সরকারগুলো এ পর্যন্ত এসব বিষয় নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতি তৈরী করতে পারেনি ।
দার্শনিক এবং রাজনৈতিক দিক দিয়ে ভাষা আন্দোলন শুধুমাত্র বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন ছিল না ।ভাষা আন্দোলন ছিল শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরূদ্ধে ,মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার বিরূদ্ধে,নিজের আত্নপরিচয় থেকে বঞ্চিত করে আযোগ্য করে রেখে মানুষকে আনুগত দাসে পরিণত করে রাখার বিরূদ্ধে ।বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভৌগলিক সীমার মধ্যে আনেকগুলো ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার মানুষের বসবাস আছে ।স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভাবের পূর্বে তাদের ওপর তৎকালীন শাসকশ্রেণী সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক আগ্রাসন চালিয়েছে যেমনটি চালিয়েছে বাঙালীদের ওপর । কিন্তু তাদের ওপরের সে আগ্রাসন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বন্ধ হয়নি বরং বেড়েছে ।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যতগুলো সরকার এসেছে সবগুলোই ধারাবাহিকভাবে এসব ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার ভাষার ওপর , সংস্কৃতির ওপর এবং রাজনৈতিকভাবে আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে ।
ভাষা আন্দোলন এ অঞ্চলের মানুষকে মানুষ হিসেবে আত্নপরিচয়ে নিজেকে চিনে নেওয়ার দর্শনে যে রাজনীতির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল সে রাজনীতি ছিল সংখ্যালঘু শাসকশ্রেণীর আধিপত্যকে উচ্ছ্বেদ করে সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি ।এ রাজনীতিক দেশী-বিদেশী সকল শাসকশ্রেণীরই ভয় ।তাই স্বাধীনতার পূর্বে বিদেশী শাসকদের পক্ষ থেকে যেমন, তেমনই স্বাধীনতার পর দেশী শাসকদের পক্ষ থেকেও ভাষা আন্দোলনের দর্শন ও রাজনীতি মুছে ফেলার অপচেষ্টা বিরামহীনভাবে আছে ।পার্থক্য শুধু এই যে, দেশীয় শাসকদের পক্ষ থেকে যেভাবে ভাষা আন্দোলনকে নিছক একটি ঘটনার মধ্যে ফেলে দিয়ে ব্যাক্তি মানুষের মহিমাকীর্তনে মুখর হতে দেখা যায় ,বিদশী শাসকদের পক্ষে সেই বাস্তবতা এবং পরিস্থিতি ছিল না ।ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে এসব ব্যাক্তি বন্দনা এবং মহিমাকীর্তন এমনভাবে করা হয় যেন শুধুমাত্র এসব ব্যাক্তিদের এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বিশেষ একক ব্যাক্তির ইচ্ছায় এবং নির্দেশেই ভাষা আন্দোলন এবং এর সাথে সম্পর্কিত সকল ঘটনা ঘটেছে ।অধিকাংশ টক-শো , অধিকাংশ স্মৃতিচারণে নিজেদের কৃতীত্ব জাহির এবং ব্যাক্তি বন্দনার মধ্যে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ,দর্শন, রাজনীতি ,শিক্ষা , লক্ষ্য কোন কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না ।সে সময়ের সমাজচিত্রের , সে সময়ের রাজনীতির , শাসকশ্রেণীর নির্যাতন-নিপীড়নের, জনগণের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কোন কিছুই এসব স্মৃতিচারণে বা টক-শো’র অধিকাংশের মধ্যেই থাকে না ।টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে দেখা গেল একজন গবেষক ভাষা আন্দোলনের একজন সংগঠক আব্দুল মতিনের বাসায় উপস্থিত হয়ে তাঁকে প্রশ্ন করছেন,”মতিন ভাই, আপনার মনে পড়ে সেদিনের কথা, আপনি সেদিন হলুদ রং এর শার্ট পরেছিলেন?’’বলাই বাহুল্য আব্দুল মতিনের অনেক বয়স হয়েছে তিনি খুব ভালভাবে গুছিয়ে কথা বলতে পারেন না ।এই সুযোগ নিয়ে গবেষকটি সে সময়কার তাঁর বয়স এবং অবস্থান অনুযায়ী যা’ দেখার কথা নয় ,যা’ করার কথা নয় তারই জাহির করলেন ।এ এক ধরনের প্রকান্ড মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয় ।সে অনুষ্ঠানেই গবেষকটি ভাষা আন্দোলনের সেদিনের সেই ঘটনাবলীর সকল স্থান ঘুরে ঘুরে এমনভাবে দখাচ্ছিলেন যেন মনে হবে তিনি একই সময়ে সকল স্থানেই বিরাজ করছিলেন!শুধু তাই নয় তিনি অনেকবার করে খুবই অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলছিলেন ,” বঙ্গবন্ধু তখন জেলে” ! অপর এক টক-শোতে আরেক শিক্ষাবিদকে বলতে শোনা গেল ,” বঙ্গবন্ধু তখন ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ।তিনি হাসপাতালের টয়লেটের ঘুলঘুলি দিয়ে এক চিরকুট ফেলে দিয়েছিলেন ।সেই চিরকুটের মধ্যেই সমস্ত করনীয় এবং দিক নির্দশনা ছিল ।কোন এক ব্যাক্তি সেই চিরকুট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিকট পৌঁছে দিয়েছিল”!!
যে কোন বড় রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ঘটনার ক্ষেত্র্র্রে সমাজের মধ্যে তার ভিত্তিভুমি তৈরী হয় এবং সেই ভিত্তিভূমির ওপর দাঁড়িয়ে সংগঠক হিসেবে এবং নেতৃত্ব দানের জন্য ব্যাক্তির ভুমিকা থাকে ।পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে সে ভুমিকা হয় সমগ্রের প্রতিফলন ।ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে কোন্ ব্যাক্তির কতখানি ভুমিকা ছিল এখানে সে আলোচনা করা হচ্ছে না ।ইতিহাসের পাঠক মাত্রেই তাঁদের ভুমিকা সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের ভুমিকা কতটুকু ছিল তাও জানতে পারবেন।তাঁর অতি বন্দনাকারীরা তাঁকে কোনদিকে নিয়ে যেতে চান বলা মুশকিল ।বড় কোন আন্দোলনকে তার চূড়ান্ত কোন ঘটনার মধ্যদিয়ে সে আন্দোলনকে স্মরণ করা যেতে পারে সেখান থেকে সে আন্দোলন গড়ে ওঠার শর্ত , তার ক্রমবিকাশ , তার দর্শন-লক্ষ্য ও রাজনীতিকে দেখার জন্য এবং তা’ থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য ।সামগ্রিকভাবে এর ভিত্তিভূমি, প্রেক্ষাপট এবং সমস্ত শর্তের মধ্যদিয়ে দেখলে স্থান-কাল-অবস্থান অনুযায়ী কোন চূড়ান্ত ঘটনায় ব্যাক্তির অংশগ্রহন অনিবার্য হয়ে ওঠার প্রসঙ্গ এসে যায় ।নির্দিষ্ট দর্শন এবং রাজনীতির ভিত্তিভূমির ওপর দাঁড়িয়ে যে বৃহৎ সমাজ একক গড়ে ওঠে তার টানে কখনো অস্ত্র হাতে যুদ্ধে , কখনো মিছিলে, কখনো গণ অভ্যুল্থানে ব্যাক্তির অংশ গ্রহন অনিবার্য হয়ে পড়ে ।এই অনিবার্যতাকে বিবেচনায় না নিয়ে পরবর্তীতে যখন কোন আন্দোলনে অংশগ্রহনকারী নিজে এবং অন্যরা শুধুমাত্র অংশগ্রহনের মহিমাকীর্তনে মুখরিত হন তখন তাঁরা আন্দোলনের দর্শন-রাজনীতি থেকে শুধু নিজেরা বিযুক্ত হন তাই নয় তার শিক্ষা ও লক্ষ্যের প্রতবিন্ধকও হয়ে দাঁড়ান ।
ভাষা আন্দোলনের শুধু ঘটনার বর্ণনা এবং ব্যাক্তি বন্দনা এখন এমনভাবে করা হচ্ছে যে,যারা ভাষা আন্দোলনের দর্শন-রাজনীতি-শিক্ষার ঘোর বিরোধী তারাও এখন সে বন্দনায় অংশ গ্রহন করছে ।কেউবা বন্দনা করছে ‘বন্দনা’কে ব্যবসার পুঁজির উপকরণ বানানোর জন্য ।পণ্যের বিজ্ঞাপনের ভাষা হিসেবে ভাষা আন্দোলনের মহান কথাগুলো জাতীয় শহীদ মিনারসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত আঙ্গিনায় , রাজপথে শোভা পাচ্ছে !শহীদদের প্রতি ‘শ্রদ্ধা’কে বিজ্ঞাপনের উপকরণের দামে বিক্রি করা হচ্ছে ।দর্শন-রাজনীতি থেকে বিচ্যুৎ হলে যা’ হয় ।একজন বিখ্যাত গুণী কবি,একজন সাংবাদিক টাকা রোজগারের জন্য শহীদদের প্রতি ‘শ্রদ্ধা’কে পণ্যের বিজ্ঞাপণে বিক্রি করে দিতে পারেন ।একজন কবি পৃথিবীর সকল দেশের মানুষের কাছে পরিচিত একজন বিপ্লবীর মৃত্যুতে কবিতা লিখেছিলেন ।লিখেছিলেন বিপ্লবীর মৃত্যু তাঁকে অপরাধী করে দেয় । সে কবিতা আছে , আছেন সেই কবিও ।কিন্তু এখন তিনি বিপ্লবী যাদের বিরূদ্ধে লড়াই করেছিলেন, যারা বিপ্লবীকে হত্যা করেছিল তাদের পক্ষে । পরে সেই কবি লিখেছিলেন ‘ইতিহাসের স্বপ্ন ভঙ্গ’।ইতিহাস কখনো স্বপ্ন দেখেনা । তাই ইতিহাসের স্বপ্নও ভঙ্গ হয় না । স্বপ্ন দেখেন মানুষ ।তবে কেউ দেখেন মানুষের সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন , মানুষের মুক্তির স্বপ্ন, আর কেউবা দেখেন পুঁজির স্বপ্ন, মুনাফার স্বপ্ন ।পণ্য-পুঁজি-মুনাফা টানে । একদিন যে কবি মানুষের মুক্তির জন্য কবিতা লিখতেন, পণ্য-পুঁজি-মুনাফার টানে সেই কবি মুক্তিকামী মানুষের বিপক্ষে দাঁড়ান কৌশলে ।যে বিপ্লবী একসময় লাঞ্ছিত-বঞ্চিত মানুষের কথা বলতেন, নির্যাতকের বিরূদ্ধে লড়াইয়ে শামিল হতেন, সেই বিপ্লবী মুনাফার টানে আজ নিজেই নির্যাতক ।নির্যাতকের বিরূদ্ধে যিনি অস্ত্র ধরেছিলেন আজ তিনিই মুক্তিকামী মানুষের বিরূদ্ধে অস্ত্র ধরেন মুনাফার টানে ।
আন্দোলনের দর্শন এবং রাজনীতিকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ঘটনায় অংশগ্রহন করলেই সেই আন্দোলনকে ধারণ করা যায় না , তার শিক্ষাকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায় না ।আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামের মহান দিনগুলোর মত একুশে ফেব্রুয়ারীকেও বিশেষ পোষাকে মুড়িয়ে নিছক একটি স্মৃতিচারণের দিনে পরিণত করার সব ধরনের আয়োজনই এখন চলছে ।অন্য সকল মহান দিনের মত এই দিনটিকেও ব্যবসায় অধিক মুনাফা করার জন্য পণ্যের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হচ্ছে । ভাষা আন্দোলনের দর্শন-রাজনীতি-লক্ষ্যের সাথে সম্পর্কবিহীনভাবে কিছু লোকের নিজেদেরকে নায়ক বানানোর স্মৃতিভ্রষ্ট উদ্দেশ্যমূলক স্মৃতিচারণ এ কাজে সুবিধা করে দিচ্ছে ।
যে দর্শন এবং রাজনীতিকে ধারণ করে ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল , একুশে ফেব্রুয়ারী সৃষ্টি হয়েছিল পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী এবং তাদের এ অঞ্চলের দোষররা সব সময়ই তাকে দমন করতে চেয়েছে । মুক্তিকামী মানুষকে মর্যাদা , আত্নপরিচয় আর অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য লাগাতার সংগ্রাম করতে হয়েছে ।লাগাতার সংগ্রামের পথ ধরে এ অঞ্চলের মানুষ পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর কাছ থেকে ভৌগলিক স্বাধীনতা অর্জন করেছে।এ স্বাধীনতা হঠাৎ করেই আসেনি । একক কোন নায়কের দ্বারাও সংগঠিত হয়নি বা কারো একদিনের ঘোষনার মধ্যদিয়েও আসেনি ।পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পরদিন থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ বুঝেছিলেন এ তাঁদের পরিচয় নয় ।আত্নপরিচয়বঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা দিন দিন বাড়তে থাকে ।শ্রমীক, কৃষক , ছাত্রসহ নানা পেশার মানুষ শাসক গোষ্ঠির বঞ্চনার শিকারে পরিণত হতে থাকেন ।এ বঞ্চনা ছিল ভিন্ন ভিন্ন ধরণের এবং বৈচিত্রের । এসব বঞ্চিত মানুষদের একসূত্রে গেঁথে দেয় যখন শাসকেরা তাঁদের সাধারণ জমিন ভাষার ওপর আক্রমন করে বসে । বঞ্চিত সকল মানুষ ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে লড়াইয়ের এক মঞ্চে এসে দাঁড়ায় । কষ্ট ,বঞ্চনা,অপমান,অমর্যাদা আর লাঞ্ছনার বিরূদ্ধে এই মঞ্চ লাগাতার লড়াই করেছে। লাগাতার লড়াইয়ে অসংখ্য আত্নত্যাগ আর জীবনের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। ভৌগলিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বঞ্চনা থেকে মুক্তি পায়নি । বঞ্চনাকারীর হাত বদল হয়েছে মাত্র ।স্বাধীনতার আগে মানুষ বঞ্চনার শিকার হয়েছেন বিদেশী শাসকদের হাতে আর এখন হচ্ছেন দেশীয় শাসকদের হাতে । যে দর্শন ও রাজনীতি দ্বারা ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় দেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পার হলেও তার লক্ষ্য অর্জিত হয়নি । স্বাধীনতার পর যারা ক্ষমতাসীন হয়েছে তাদের কেউ সে দর্শন-রাজনীতির সাথে প্রতারণা করেছে আবার কেউ তার প্রকাশ্য বিরোধীতা করে আসছে ।চল্লিশ বছরে মানুষের বঞ্চনা কমেনি ।বরং বঞ্চনার ধরণ এবং বৈচিত্র দিন দিন বেড়ে চলেছে ।ক্ষুধা-দারিদ্র-বেকারত্ব-অশিক্ষা -অমর্যাদা-লাঞ্ছনা-প্রতারণা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী ।স্বাধীনতার পর শাসকশ্রেণীর লোকেরা বেপরোয়া স্বাধীনতা লাভ করেছে ।তারা জনগণের সাথে প্রতারণায় স্বাধীন ।জনগণের সম্পদ লুটপাটে স্বাধীন। জনগণের দারিদ্র্য নিয়ে ব্যবসা করায় স্বাধীন । নদী-নালা, খাল-বিল , সমুদ্র-পাহাড় বেপরোয়াভাবে দখল করায় স্বাধীন । এসব স্বাধীনতার মধ্যদিয়ে স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে জনগণকে নিঃস্ব করে শাসকশ্রেণীর সকল অংশ বিরাট সংখ্যায় ফুলে ফেঁপে উঠেছে ।
শাসক শ্রেণীর লোকদের বেপরোয়া লুটপাটের মধ্যদিয়ে এমন ফুলে ফেঁপে ওঠার কারণ তারা নানা প্রকার মিথ্যা প্রতিশ্রুতির মধ্যদিয়ে ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠা জনগণের সংগঠিত আন্দোলনের মঞ্চকে দখল করে নিষ্ক্রিয় করেছে ।স্বাধীনতার পর থেকেই সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী এদেশীয় শাসকশ্রেণীর সকল অংশই ধারাবাহিকভাবে আমাদের মর্যাদার , আমাদের গর্বের , আমাদের টিকে থাকার সবকিছুই একের পর এক ধ্বংস করে চলেছে । নদী-নালা-খাল-বিল দখল করে মাটি-পানি দুষিত করেছে। আমাদের খনিজ সম্পদকে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দিয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া জারি রেখেছে ।এরা একটি গণতান্ত্র্রিক একমূখী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাতো চালু করেইনি বরং যা’কিছু ছিল সেগুলোসহ শিক্ষার সকল মহান দিকগুলো ধ্বংস করে চলেছে ।বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পড়াশোনার পরিবর্তে টেন্ডারবাজী আর চাঁদাবাজির আখড়ায় পরিণত করেছে ।জনগণের সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে ধ্বংস করে চলেছে।এশিয়ার সবচেয়ে বড় পাটকল তারা সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশে ধ্বংস করে দিয়েছে ।কৃষি ধ্বংস করেছে ।পাটের আবাদ ধ্বংস করার সব আয়োজন সম্পন্ন করে পাটের জেনম আবিষ্কারের গল্প শোনাচ্ছে । সীমাহীন লুটপাটের মাধ্যমে জনগণের বিশাল অংশকে নিঃস্ব ভিখেরী করে তাঁদের পাঁজরের ওপর গড়ে তুলেছে বিরাট বিরাট শপিং মল ।ভাষা আন্দোলন থেকে তার দর্শন ও রাজনীতি বাদ দিয়ে তাকে নিছক স্মৃতিচারণ আর ব্যবসার মাস এবং দিনে পরিণত করা হয়েছে ।
আমরা, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বঞ্চিত-নিগৃহীত-লাঞ্ছিত ।লুটেরা শাসকশ্রেণীর মত আমাদের জীবনে ভাষা আন্দোলনের দর্শন এবং রাজনীতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি । আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আজ অসংগঠিত হলেও আমরাই আমাদের অন্তরে ভাষা আন্দোলনের দর্শন এবং রাজনীতিকে ধারণ করি ।ভাষা আন্দোলনের দর্শন এবং রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের সংগঠিত হয়ে সেই দর্শন এবং রাজনীতিকে এগিয়ে নেওয়া ছাড়া মহান ভাষা আন্দোলন এবং ভাষা শহীদদের সন্মানিত করা যাবে না ।
১৭.০২.১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



