যে কোন কিছুর ওপর ‘গণতান্ত্রিক’ পরিচয়টি পরিয়ে দিতে পারলে তার দায় এড়িয়ে শুধু সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা যেভাবে হয়, অন্য কোনভাবে সেই সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয় ।কাজেই কোন কাজে প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের কোন ব্যাপারই না থাকলেও তার ওপর ‘গণতান্ত্রিক’ পরিচয়টা দিয়ে মুনাফা করা থেকে দুর্নীতি পর্যন্ত সবকিছু করেও তার দায়পার খুব সহজে এড়ানোতো যায়ই এমনকি জনপ্রিয়তাও আর্জন করা যায় ।বাংলাদেশের মত দেশে এখন এ প্রক্রিয়া সর্বত্র বিরাজমান । টেলিভিশনে বিভিন্ন রকমের প্রতিযোগিতা হয় । সে সব প্রতিযোগিতায় বিচারকদের ভুমিকা থাকে সামান্যই বরং ‘গণতান্ত্রিক(!)’ ব্যবস্থাই সেখানে মুখ্য ভুমিকায় থাকে । এ প্রক্রিয়ায় এস.এম.এস এর নামে কোটি-কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েও উপহার হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়া যায় ।‘গণতন্ত্র’ এখন মুনাফা করা এবং সরাসরি লুটপাটের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় ।‘এ কাজে আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই’ মার্কা কথা বলে কাজটি যাদের ওপর ‘ফরজ’ তারা যে কত সহজে জনগণকে ধোঁকা দিয়ে ‘গণতান্ত্রিক’ উপায়ে দায় এড়িয়ে গিয়েছে তার সংখ্যাগত হিসাব দেওয়া কঠিন । ‘গণতান্ত্রিক’ প্রক্রিয়ায় এভাবে দায় এড়িয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ।এ প্রক্রিয়া এখন সরকারি-বেসরকারি সহ শাসক শ্রেণীর সকল অংশের মধ্যে লাগসই প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যাচ্ছে । বিভিন্ন অনুষ্ঠানে , উপলক্ষ্যে যেমন,ঈদ-পূজা-পার্বণ-বিশেষ দিবস ইত্যাদিতে বিভিন্ন ‘ভাই’,’জনদরদী’,’নেতা’র পক্ষ থেকে জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়ে দেওয়া পোষ্টার,চিকা, ব্যানার,ফেষ্টুন ,তোরণে চারদিকে ডুবে যায় । এসব কিন্তু আবার যাদের নামে দেওয়া হয় তারা দেন না! তাঁদের পক্ষ থেকে ‘এলাকাবাসী’ টাকা খরচ করে এসব করে থাকেন! এত ভালবাসা , এত গণতন্ত্র আর কোন দেশে খুঁজে পাওয়া ভার!!নেতা-নেত্রীদের ভালবাসার টানে জনগণই টাকা খরচ করে বড় বড় তোরণ নির্মাণ করেন !!! সে সবে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে যানজটের অসহনীয় দুর্ভোগকেও জনগণ হাসিমুখে মেনে নেন!! “ এমন দেশটি কোথাও ... ...” !!
সরকারি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে নিজেদের আত্ন প্রচারণা , জনগণকে সচেতন করার নামে টাকা বরাদ্দ করে তা’ থেকে কিছু এদিক-সেদিক করার উদাহরণ সরকারী মন্ত্রী এবং কর্তাব্যাক্তিদের ক্ষেত্রে কম নয় ।জনগণকে ‘আলু খাওয়ায়’ সচেতন করতে হবে জনগণের টাকা থেকে কোটি টাকা পোস্টার করার জন্য বরাদ্দ হয়ে গেল ।জনগণকে এমন ‘সচেতন’ করার অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে । এসব ‘সচেতনমূলক’ কর্মসূচীর সাফল্য বর্ণনার জন্যও জনগণের টাকা থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়!
জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণ এবং নিজের মহিমাকীর্তনের নামে সরকারি টাকার এমনই এক যথেচ্ছ বরাদ্দ দেখা গেল শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে প্রকাশিত একটি পুস্তিকার ক্ষেত্রে ।মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রায়ই দুর্নীতি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলে থাকেন ।সম্প্রতি তিনি ‘শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে মান বৃদ্ধির প্রক্রিয়া জোরদার হচ্ছে’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন ।পুস্তিকাটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধিনে টিচিং কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন(টিকিউআই) প্রকল্প মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশ করা হয়েছে ।
সুন্দর মলাটে রঙিন ছবি সংবলিত অফসেট কাগজে ছাপা এ পুস্তিকাটিতে কি আছে?মলাটে আছে অনেকগুলো স্কুল ছাত্র- ছাত্রি , শিক্ষক-শিক্ষিকা পরিবেষ্টিত মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর দিকে ছাত্রীরা হাত বাড়িয়ে আছে । তারা তাঁর কাছে কি যেন চাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে । সম্ভবত অশির্বাদ ।শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় গতানুগতিক এবং গড়পড়তা মানের কিছু কথা বলে ‘প্রাক-কথন’ নামের ভুমিকা টেনেছেন ।সে ভুমিকায় তিনি যথার্থভাবেই মন্ত্রীমহোদয়ের গুণকীর্তন করেছেন এবং এ পুস্তিকাটিকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ দলিল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন । তারপরই শুরু হয়েছে মন্ত্রী মহোদয়ের রচনা ।প্রথম পৃষ্ঠাতে বহুল উচ্চারিত এবং শ্রুত গতানুগতিক বক্তৃতা ছাড়া জনগণের অবগতির জন্য কিছুই পাওয়া গেল না ।তার পর তিনি শিক্ষার সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন ।২০০৯ সালে ১৯ কোটি এবং পরের বছর ২৩ কোটি ২২ লক্ষ পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর কাজকে অনেকে(?) ‘ পাগলামী’,’অসম্ভব’,’অবাস্তব’ বলেছেন এবং বাধার সৃষ্টি(!) করার পরও তিনি চ্যালেঞ্জ গ্রহন করে এগিয়ে গেছেন ধরণের কথাবার্তার বিস্তার ঘটিয়েছেন ।পূর্ববর্তী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির কথা বলেছেন কিন্তু তারা নির্দিষ্টভাবে কি কি দুর্নীতি করেছে , সে সব দুর্নীতির জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরূদ্ধে কোন মামলা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে কোন তথ্য তাঁর লেখায় নাই । টিআইবির রিপোর্ট ছাড়া আর কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য নাই ।নিজেদের বা নিজের কাজের কিছু ফিরিস্তি এবং কোন গবেষককে কত বরাদ্দ করেছেন এসব তথ্য ছাড়া জনগণের জানার মত কোন কিছুই এ পুস্তিকাটিতে নেই ।
পুস্তিকাটিতে যা’ বর্ণনা করা হয়েছে তা সম্পূর্ণরূপে শিক্ষামন্ত্রীর সাফল্যের বর্ণনা ছাড়া আর কিছু নয় । এমনকি তিনি তাঁর সাফল্য এবং গুণকীর্তনে এমনই আত্নহারা যে , পুস্তিকাটিতে এমন কতকগুলো ছবি সংযোজন করেছেন যার সাথে এর বিষয়বস্তুর কোন মিলই নেই ।যেমন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর একটি ছবি এ পুস্তিকাটিতে ছাপা হয়েছে যার ক্যাপশনে লেখা আছে “ একটি অনুষ্ঠানের ফাঁকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষা সম্পর্কিত বিষয়ে পরামর্শ করছেন” ।যে কোন সচেতন মানুষ বিষয়টিকে হস্যকর মনে করলে তাকে কি খুব দোষ দেওয়া যাবে ?আর একটি ছবি সংযোজন করা হয়েছে যার ক্যাপশনে আছে-“জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল ছাত্রসমাবেশে তৎকালীন ছাত্রনেতা নুরুল ইসলাম নাহিদ” ।
সরকারি কোন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক জনগণের টাকায় সেইসব প্রচারপত্র বা পুস্তিকাই প্রকাশ হতে পারে যেগুলোতে জনগণের প্রতি সুনির্দিষ্ট আহ্বান এবং করণীয় সংবলিত বিষয় থাকবে । তাছাড়া কোন সরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রাত্যহিক কাজ তা’ যদি প্রশ্নাতীতভাবেও সফল হয় তার প্রচারের জন্য সেই প্রতিষ্ঠান জনগণের টাকা খরচ করে জনগণকে জানানোর জন্য পুস্তিকা প্রকাশ করতে পারে কিনা এ প্রশ্ন দেশের কোন নাগরিক যদি করে তাহলে সেটা কি অন্যায় হবে ? প্রাসঙ্গিক পুস্তিকাটির মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় বিগত সরকারের দুর্নীতি বিষয়ে অনেক কথা বলেছেন । দায়ীত্বপ্রাপ্ত একজন মন্ত্রী হিসাবে প্রাত্যহিক কাজের সাফল্য বর্ণনার জন্য তাঁর ব্যাক্তিগত প্রচারে জনগণের টাকায় পুস্তিকা প্রকাশ করাকে তিনি কিভাবে দেখবেন? ধরে নেওয়া যাক তিনি যে সাফল্য বর্ণনা করেছেন তা’ শতভাগ ঠিক । সেটাতো তিনি একজন দায়ীত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসাবে করবেনই । এটাইতো স্বাভাবিক। কিন্তু তা’ প্রচারের জন্য জনগণের একটি টাকাও কেন খরচ করবেন ?
শিক্ষার উন্নয়ন হয়েছে বলে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় পুস্তিকাটিতে যে দাবি করেছেন তার বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন ।কিন্তু এখানে সে বিশ্লষণে না গিয়েও একটি কথা বলা যায় বাংলাদেশের শিক্ষাচিত্রের ভয়াবহতার ধারা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও তাঁর আত্নতুষ্টির মধ্যে বিপদজনক দিক আছে জনগণের জন্য ।অবশ্য তাঁর আগের পরিচয় যাই হোক এখন তিনি শাসক শ্রেণীর লোক হাওয়ায় মূল কাঠামোর কোন উন্নতি না হলেও একটু এদিক সেদিকের মধ্যদিয়ে সাফল্যের আত্নতুষ্টির গল্প জনগণেরই টাকা খরচ করে জনগণকে শোনাবেন এটাইতো স্বাভাবিক ।
যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর কতকগুলো খুবই ক্ষুদ্র বিবেচনায় ‘ভালো’র সীল মেরে তাদের দ্বারা টেলিভিশনে অনুষ্ঠান প্রচার করে সারা দেশের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকগণকে শিক্ষিত করতে চাইছেন, সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিভাবে নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে তা ভুক্তভোগীরা জানেন ।নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি এবং নতুন শ্রেণীতে ভর্তির ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান যে বেপরোয়াভাবে বাড়তি টাকা আদায় করেছে তা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে । এ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় অনেক কঠোর হওয়ার কথা বলেছেন এবং অনেক কঠিন কঠিন শব্দ উচ্চারণ করেছেন ভর্তি শেষ হওয়ার পর ।তারপরও তিনি বলেছিলেন বাড়তি টাকা যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়েছে তাদের সেসব টাকা ফেরৎ দিতে হবে । এখানেই শেষ। ভুক্তভোগীদের সেসব টাকা ফেরৎ পাওয়ার খবর আর জানা যায়নি । মন্ত্রী মহোদয়ের কথা দিয়ে দুর্নীতি ঢাকা যাবে না ।
একশ্রেণীর মানুষ যেমন দুর্নীতিকে গণতান্ত্রিকীকরণ করছে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভুক্তভোগী শ্রেণীকে গণতান্ত্রিকভাবেই তার মুকাবেলা করতে হবে , তার বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে ।শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় পুস্তিকাটিতে লিখেছেন তিনি যখন শিক্ষার্থীদের আবশ্যক ১৯ কোটি বই ছাপার কাজ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখন নাকি কেউ কেউ সে কাজকে ‘পাগলামি’ বলেছিল ।সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণীর পক্ষ থেকে আমাদের প্রশ্ন আবশ্যক নয় , শুধুমাত্র নিজের রুটিন কাজের সাফল্য কীর্তনের জন্য এমন একটি অপ্রয়োজনীয় বই কতগুলো ছাপা হয়েছে ? এ কাজে জনগণের কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ?
পূনশ্চ: শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের পুস্তিকাটি থেকে জানা যায় পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণী শেষে জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত সমাপনী পরীক্ষার সার্টিফিকেটের লোভে ঝরে পড়ার হার কমে যাচ্ছে । দেশের একজন শিক্ষামন্ত্রীর মুখের এমন কথাকে কি তামাশার মত শোনায় না ?তিনি নিজেই একদিন ঝরে পড়ার কারণ সম্পর্কে বলতেন, আজ তিনি সে পরিচয় ভুলেছেন । তাঁর লেখা থেকে আরো জানা যায় এ পরীক্ষা নেওয়ার ফলে অল্প বয়সেই শিক্ষার্থীরা আত্নবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠছে । পৃথিবীর কোন্ পন্ডিত এমন কথা বলেছেন ?নাকি তিনি কোন পন্ডিতকেই তোয়াক্কা পর্যন্ত করেন না ?পন্ডিতদের কাছ থেকে আমরা বরং জানতে পারি শিশুদের বিস্মিত হওয়ার,অণুসন্ধিৎসু হওয়ার ক্ষমতা জাগিয়ে তুলতে হবে ।লাভ-ক্ষতি এবং স্বার্থপরতার মধ্যে ফেলে দিলে শিশুদের সে ক্ষমতা নষ্ট হয়ে ধ্বংস হবে ।এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



