‘কাঙালের কথা বাসি হলে ফলে’ কথাটি বহুল প্রচলিত হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা’ মোটেই প্রযোজ্য নয় ।এখানে কাঙালের কথা বাসি হয়ে ফলাতো দুরে থাক বরং বাসি হয়ে তা’ উপেক্ষিতই হয় । শুধু কাঙালের কথাই নয় অতীতের শিক্ষিতজন যাঁরা বিদ্বান , গবেষক , জ্ঞানী সজ্জন অথচ ধান্দাবাজ এবং মতলববাজ নন তাঁদের কথাও এখানে নির্বিচারে উপেক্ষিত হয় ।ব্যাক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনের সকল ক্ষেত্রেই তা’ হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে তা’ হচ্ছে অত্যন্ত আতংকজনকভাবে ।অথচ শিক্ষা নিয়ে নির্মোহ ভাবনার-গবেষণার লোকদের নিয়ে , পথ প্রদর্শকদের নিয়ে আমরা রীতিমত গর্ব করতে পারতাম । অতীতের এসব পন্ডিতদের চিন্তায়, গবেষণায় এবং পথপ্রদর্শণে আমাদের শিক্ষাকে সমৃদ্ধ করতে পারতাম ।নিজেদের ধান্দাবাজি এবং মতলববাজি সিদ্ধ করতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বক্তৃতাবাজের অভাব নেই । অথচ রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা দর্শন , শিক্ষা ভাবনা , শিক্ষা নীতিকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে একটুখানি ষ্পর্শ করানোর মত লোক এখানে খুঁজে পাওয়া ভার । বিশেষ করে শিক্ষানীতি প্রণেতাদের আচরণ এবং কর্মকান্ড থেকে তাই মনে হয় । বর্তমান শিক্ষানীতি প্রণেতাদের মধ্যে অন্যক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাগাড়ম্বরে সিদ্ধহস্ত হতে দেখা গেলেও শিক্ষাক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের নামটিও তাঁরা উচ্চারণ করেন না । এ ক্ষেত্রে বরং তাঁরা রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার বিপরীত কর্মই করে থাকেন ।
কাঙালের কথায় ফিরে এসে শিরোনামের প্রসঙ্গে যাওয়া যেতে পারে । কাঙাল হরিনাথ ।ঊনিশ শতকের একজন স্বশিক্ষিত মানুষ । তিনি গ্রামবাংলার মহেনতী মানুষ, কৃষকদের বঞ্চনা আর দুঃখের সাথেই শুধু ছিলেন না, বঙ্গ সন্তানদের শিক্ষা নিয়েও তিনি ভাবতেন , কথা বলতেন ।তাঁর মত একজন স্বশিক্ষিত মানুষ পাঠ্যক্রম নিয়ে যেমন বিচলিত হতেন, শিক্ষার পাঠ্যক্রমের পরাক্রমশালি তেজে (আবর্জনায়?) বঙ্গ সন্তানের মস্তিষ্ক ভস্মিভূত করা হলেও শাসকশ্রেণিভুক্ত আজকের মহা মহা পন্ডিত এবং বুদ্ধিজীবীগণকে(!) বিচলিত হওয়াতো দুরে থাক মুখে রা কাড়তেও দেখা যায় না । সে সময়ে ছোটদের পাঠ্যক্রমে জ্যামিতি ঢুকানোতে কাঙাল হরিনাথ বিচলিত হয়ে বলেন, “ আট-নয় বৎসরের বালককে জ্যামিতি পড়ানো আর মাখনের উপর পাথর ভাঙ্গা একই কথা । ইহাতে তাহাদের মস্তিষ্ক ভবিষ্যতের জন্য অকর্মণ্য হইয়া যায়” । কাঙাল হরিনাথরে কোন প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী ছিল না । তাঁর মত একজন স্বশিক্ষিত মানুষ যা’ বুঝতে পেরেছিলেন অনেক আগেই, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত দেশি-বিদেশি বড় বড় ডিগ্রীধারি আজকের শিক্ষানীতি প্রণেতাগণ কি তা’ বুঝতে পারেন না ? বুঝতে পারেন কিনা তা’ বলা মুশকিল কিন্তু তাঁরা যে সে পথে না চলে উল্টোপথেই চলছেন তা’ বঙ্গ সন্তান আক্রান্ত হয়ে বুঝতে পারছে। অখাদ্য-কুখাদ্য ভক্ষণ করে শরীরের ইমিউন সিস্টেম দ্বারা তা’ প্রত্যাখ্যাত হলে যেমন বমি না করে শরীরকেই টেকানো ভার হয় এবং অনেক সময় তা’ শরীরের অ-স্থান দিয়ে নির্গমনে ফোঁড়া সৃষ্টি করে , আবর্জনাতুল্য পাঠ্যক্রমের প্রাচুর্য্যে আজ বঙ্গ সন্তানদের মস্তিষ্কেরও সেই দশা ।
কাঙাল হরিনাথ আট-নয় বছরের বালকদের পাঠ্যক্রমে জ্যামিতি ঢুকানোতে মাখনের উপর পাথর ভাঙ্গার ভয়াবহতায় আতংকিত হয়েছিলেন ।তিনি পাঁচ-ছয় বছরের শিশুদের পাঠ্যক্রমে জ্যামিতি ঢুকাতে দেখেননি ,তিনি দেখেননি ‘বাণী চীরন্তনী’ মার্কা সাধারণ জ্ঞানের আবর্জনায় ছোট ছোট বাচ্চাদের মস্তিস্ক পূর্ণ করতে ।কাঙাল হরিনাথ ধার্মিক ছিলেন কিন্তু বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে ধর্মশিক্ষা ঢুকনো নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন
না ।তাঁর চিন্তা ছিল বঙ্গ সন্তানকে কিভাবে প্রকৃত শিক্ষায় গড়ে তোলা যায় তা’ নিয়ে ।এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন তা’ হলো আমাদের অতীত অনেক শিক্ষিত গুণিজন যাঁদের শিক্ষা চিন্তা অনেক সমৃদ্ধ ,তাঁদের কথা উল্লেখ না করে বার বার কাঙাল হরিনাথের কথা উল্লেখ করছি এ কারণে যে,এসব পথিকৃতদের মধ্যে তিনিই ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ এবং স্বশিক্ষিত ।তাঁর কথা বিশেষভাবে বার বার উল্লেখ করা এটা দেখানোর জন্য যে, তাঁর মত একজন সাধারণ স্বশিক্ষিত মানুষের শিক্ষা চিন্তা থেকে বর্তমানের বড় বড় ডিগ্রীধারিদের শিক্ষা চিন্তা কতটা পিছনে ।
এবার পাঠ্যক্রমে ধর্মশিক্ষার প্রসঙ্গে আসা যাক । শিক্ষানীতি প্রণেতাদের মধ্যে অনেকেই ধার্মিক নন বটে । কিন্তু তাঁরা এদেশের অনেক বামপন্থী(!!!)নেতাদের মতই ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের সুবিধাটুকু ষোলআনা নিয়ে থাকেন । এখানেই বহুকাল আগের আরেক মহান মানুষ জিওর্দানো ব্রুণোর সাথে তাঁদের পার্থক্য এবং বৈপরিত্য । জিওর্দানো ব্রুণো ছিলেন একজন যাজক ।কিন্তু সত্য যখন তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালো তখন তিনি যাজকের সুবিধা পরিত্যাগ করে কঠিন পথই বেছে নিয়েছিলেন । বৈজ্ঞানিক সত্যের প্রতি অবিচল এবং অটল থাকার কারণে যাজকতন্ত্র তাঁকে পুড়িয়ে মেরেছিল । শিক্ষানীতি প্রণেতাদের অন্ততঃ একজনের কথা জানি , তিনি একটি বাংলা দৈনিকে শিক্ষা বিষয়ে আলোচনায় লিখেছিলেন-“যখন এ রাষ্ট্রটির নাম ছিল ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান তখন পাঠ্যসূচীতে ধর্ম বাধ্যতামূলক ছিল না অথচ এখন এ রাষ্ট্রটির নাম পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ হওয়া সত্ত্বেও এখন পাঠ্যসূচীতে ধর্ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে”।তখন ক্ষমতায় ছিল চার দলীয় জোট সরকার ।বাংলাদেশে একই শ্রেণি’(লুটেরা শ্রেণি)র প্রতিনিধিত্বকারী দুটি মেরু আছে । এ দুটি মেরুতে সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-রাষ্ট্রিক নীতিতে কোন পার্থক্য নেই ।আছে শুধু ব্যক্তিগত-গোষ্ঠিগত স্বার্থ এবং পোষাক ও পোষাকের রঙ নির্বাচনের মত রুচিবিচারের পার্থক্য।এই দুই মেরুর কাছ দিয়ে ঘুরাঘুরি করেন কিছু পন্ডিত-বুদ্ধিজীবী(?)র দল ।এঁরা চরিত্রের দিক দিয়ে খুবই দুর্বল এবং কোন একটি মেরুর সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো ছাড়া মেরুদন্ড সোজা রাখতে অক্ষম ।যাহোক কাছের মেরু যখন ক্ষমতায় গেল তখন তিনি শিক্ষানীতি প্রণেতাদের একজন হলেন । না , শিক্ষানীতিতে পাঠ্যক্রম থেকে ধর্মের বাধ্যবাধকতা তুলে নেননি ।এ শিক্ষানীতিতে ধর্মশিক্ষাকে আরো নীচের দিক থেকে আরো শক্তিশালী(!) করা হয়েছে ।শিক্ষা থেকে নীতি-নৈতিকতা সম্পূর্ণরূপে তুলে নিয়ে তাকে ধর্মশিক্ষার মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে ।অর্থাৎ বিজ্ঞান, কলা , বাণিজ্যসহ শিক্ষার কোন শাখায়ই নীতি-নৈতিকতা বলে কিছু নেই! শিক্ষানীতি পাঠ করলে অন্ততঃ তাই জানা যায় ।শিক্ষানীতিতে ধর্মশিক্ষা নিয়ে এমন বাড়াবাড়ির সাথে ধার্মিকতা এবং ধর্মব্যবহারে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের সম্পর্ক থাকলেও এর সাথে প্রকৃতপক্ষে ধর্মের প্রতি ভালবাসা বা ধর্মীয় মূল্যবোধ বা ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই । অথচ এর পেষণ শিশুদের নির্বোধ এবং অকেজো করে দিতে যথেষ্ট ।
সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ তাঁর বিখ্যাৎ উপন্যাস লাল সালুতে এক জায়গায় বলেছিলেন “এখানে শষ্যের চেয়ে টুপি বেশি” ।তেমনই আমাদের সন্তানদের পাঠ্যক্রমের ক্ষেত্রে একথা বলা যায় যে, সেখানে মানের চেয়ে পরিমাণ বেশি ।মান বিহীন পরিমাণ শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু যে যন্ত্রনারই কারণ হয় তাই নয় তা’ তাদের এমনই নির্বোধ করে তোলে যে, পরবর্তীতে যে কোন পর্যায়ে তা’ মান গ্রহনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ।শিশুদের মস্তিষ্ক আবর্জনাতুল্য নানা তথ্যে পূর্ণ করে তুলে তা’ মনে রাখতে পারল কিনা যাচাই করার ব্যবস্থা করার নাম তাদেরকে শিক্ষিত করে তোলা নয় । এতে বরং তাদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এমনভাবে তৈরী হয় যা’ সবসময়ের জন্য শিক্ষিত হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে বাধা দিতে থাকে। ব্রার্ট্রান্ড রাসেল আপেক্ষিক তত্ত্বকে মানুষের কাছে বোধগম্য করে তুলতে একখানা বই লিখেছিলেন । বাংলায় যার নাম হয় অপেক্ষবাদের অ আ ক খ । সেই বইয়ের শুরুতে অধিকাংশের কাছে এ তত্ত্বের দর্বোধ্যতার কারণ হিসেবে মানুষের দেখার এবং চিন্তার দৃষ্টিভঙ্গিকে দায়ি করেছিলেন ।সেখানে তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন অনেক ভুল চিন্তা এবং দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মাথার মধ্যে ডালপালা বিস্তার করে থাকে । এর মধ্যে ভিন্ন কোন সঠিক বিষয় সেখানে প্রবেশ করতে গেলে তার দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয় । এ নিয়ে তিনি সেখানে একটি চমৎকার গল্প উদাহরণ হিসেবে বলেছিলেন । গল্পটি এমন,ধরা যাক একজন মানুষকে ঔষধ প্রয়োগ করে অজ্ঞান করা হলো ।অজ্ঞান অবস্থায় তাকে একটি মহাকাশযানে তুলে দেওয়া হলো । অন্ধকার রাত । সে রাতে আবার কোন এক উৎসবে এদিক সেদিক চতুর্দিক থেকে প্রচুর বাজি ফোটানো হচ্ছে । মহাকাশযানটি ইতিমধ্যে স্পেসের মধ্যে চলে গিয়েছে ।লোকটির জ্ঞান ফিরে এসেছে ।ঔষধটির গুণ এমনই যে, তা’ লোকটির স্মৃতিশক্তি সব মুছে দিয়েছে কিন্তু তাঁর বিচার করার ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপেই আছে ।অন্ধকারের জন্য পৃথিবীর অন্য কোন কিছু তিনি দেখতে পাচ্ছেন না কিন্তু আতসবাজির আলোর ছুটোছুটি দেখতে পাচ্ছেন ।এ অবস্থায় তাঁর বিচারবোধ পৃথিবী সম্পর্কে যে মানসচিত্র গঠন করবে তা’ আমাদের স্মৃতিতে থাকা মানসচিত্র থেকে ভিন্ন হবে । এ অবস্থায় যদি তাঁর কাছে আপেক্ষিক তত্ত্ব বিবৃত করা হয় তবে তিনি তা দর্বোধ্য মনে করবেন না ।এখানে একথা বলার কারণ এই যে, আমাদের শিশুশ্রেণী থেকে নিয়ে উচ্চ শিক্ষার স্তর পর্যন্ত পাঠ্যক্রমের বিশাল অংশ আবর্জনায় পরিপূর্ণ ।আমি উচ্চ শিক্ষার বিষয়ে বলব না ।প্রয়োজনবোধে সে বিষয়ে উচ্চজনেরা কথা বলবেন এবং বলা উচিৎ ।আমার এ আলোচনা প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব।
প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরে , বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে পাঠ্যসূচীতে আবর্জনা দুই পথে প্রবেশ করানো হয় । একটি হলো বৈধ পথ । এ পথটি হলো শিক্ষানীতি অনুযায়ী পাঠ্যক্রমের অনুমোদিত পথ । অর্থাৎ অনুমোদিত পাঠ্যক্রম অনুসারেই তার মধ্যে আবর্জনাতুল্য বিষয় প্রবেশ করানো হয় । এই আবর্জনাতুল্য বিষয়কে দুইভাগে ভাগ করা যায় । যার একভাগে থাকে এমন জ্ঞান যা’ শিক্ষার্থীদের শিখিয়ে মাথা ভারি করা হয় অথচ তাদের জীবনের কোন পর্যায়েই এ জ্ঞান কাজে আসবে না । এ রকম বহুকিছু তাদের গোগ্রাসে গেলানো হয় । এর মধ্যে আবার কিছু বিষয় থাকে শিক্ষার সাথে এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের সাথে সাংঘর্ষিক । অন্যভাগে এমন কিছু বিষয় পাঠ্যক্রমের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয় যা’ শিক্ষার্থীদের বয়স এবং মানস স্তরের সাথে কোন মতেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় । যখন যে বিষয় শেখানোর নয় তখন তা’ শেখানোর চেষ্টা করা মানে তা’ হয় সেই বিড়াল ছানার গল্পের মত । বিড়াল ছানা একটি নির্দিষ্ট বয়সে গিয়েই কেবল ইঁদুর শিকারে আগ্রহী হয় ।যখন সে আগ্রহের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে মা বিড়াল তখনই তাকে শিকার ধরার কৌশল শিখিয়ে দেয় ।একটি বিড়াল ছানার ওপর এমন একটি পরীক্ষা করা হলো যে, আগ্রহ প্রকাশের আগেই তার সামনে ইঁদুর ছেড়ে তাকে তা’ ধরতে প্ররোচিত করা হলো ।তার কোন আগ্রহ না দেখে তার পিঠে বাড়ি দেওয়া হলো । কিন্তু তার মধ্যে কোন আগ্রহই লক্ষ্য করা গেল না । এ প্রক্রিয়ার এবং আয়োজনের মধ্যদিয়ে সে একসময় শারিরীক দিক দিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি বিড়ালে পরিণত হলো কিন্তু তার মস্তিস্কে শিকার ধরার কোন বোধ সৃষ্টি হলো না । এরই মধ্যে সে কিন্তু অন্য একটি বুঝ বুঝে ফেলেছে । তা’ হলো সামনে ইঁদুর রাখা মানেই পিঠে বাড়ি পড়া । এই বুঝ থেকে সে ইঁদুর সামনে দেখলেই উল্টোদিকে পালাতে চেষ্টা করে । শিশুদের অকালেই পন্ডিত বা ব্যাতিক্রম ধরণের জ্ঞানী বানিয়ে ফেলা যায় না । তাই মুখস্ত করবে কিন্তু কোনভাবেই তাদের বোধকে স্পর্শ করবে না , এমন কোন বিষয়ই শিশুদের পাঠ্যক্রমের মধ্যে ঢুকানো উচিৎ নয় ।কিন্তু এ ধরণের বিষয় প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের পাঠ্যক্রমে ব্যপকভাবে আছে । সব উদাহরণ দেওয়া এখানে সম্ভব নয় তবে ধরণটা বুঝতে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে । পঞ্চম শ্রেণিতে পরিবেশ পরিচিতি বিজ্ঞান নামে একটি বিষয় আছে । এর মধ্যে অন্য অনেক অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কিছু কিছু ভুল তথ্য দেওয়ার সাথে সাথে এইডস রোগ, এ রোগের কারণ প্রতিকার সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে । এ স্তরের একজন বাচ্চাকে এ বিষয়ে শিখতে হবে কেন ? পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য এসব বিষয় নির্বিচারে মূখস্ত করলে তাদের চিন্তাশক্তি এবং বোধের স্তর কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? ভুল তথ্য বাচ্চাদেরকে বিভ্রান্ত করে । যেমন এ বইটিতেই সাদা ভালুক সম্পর্কে বলা হয়েছে-“ এদের দেহ সাদা লোমে আবৃত থাকায় সাদা বরফের মধ্যে এরা সহজে চোখে পড়ে না । এভাবে শত্রুর হাত থেকে এরা রক্ষা পায়”।এখন কথা হচ্ছে যে তার এলাকায় সাদা ভালুক হচ্ছে টপ পিডেটর । মানুষ ছাড়া সেখানে তার কোন শত্রু থাকার কথা নয় । সেখানে তাহলে সাদা ভালুক উল্লেখিত কারণে কোন্ শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পায় ? বাচ্চারা প্রশ্ন করলে শিক্ষক কি জবাব দেবেন ? এভাবে ভুলে ভরা এবং অসামঞ্জস্য বিষয়ে পূর্ণ অনেক মোটা পাঠ্যক্রম আমাদের শিশুদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ? এ তো গেল বৈধ পাঠ্যক্রমের ব্যাপার । এছাড়াও আছে সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের মৌন অনুমোদনে প্রতিটি বিদ্যালয় কর্তৃক বাচ্চাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক গাদা পাঠ্যক্রম ? সেগুলোর মান সম্পর্কে কিছু না বলাই ভাল । কারণ সেগুলোকে ধরাও যায় না ছোঁয়াও যায় না ।
বাচ্চাদের বইয়ের শারিরীক অবস্থাও খুবই করুণ । মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় নিজের বাজনা বাজাতে জনগণের টাকায় যে বই বের করেছেন সেই অফসেট কাগজে ছাপা বইয়ের রঙের জৌলুস দেখে শিশুরা হাঁসলেও শিশুদের দেওয়া বইয়ের রং শিশুদের দিকে দাঁত বের করে হাঁসে নাকি কাঁদে তা শিশুরা বুঝতে পারে না । বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো স্বস্থানে থাকবে কিনা এ চিন্তায় শিশুদের রাতের ঘুম হারাম হয় ।
আবর্জনাতুল্য বিপুল পাঠ্যক্রমের সাথে সাথে পরীক্ষার বাড়াবাড়ি শুধু ‘ মাখনের উপর পাথর ভাঙ্গা’ নয় শিশুদের শরীরটাকেও যেন চটকে দেয় ।এর সাথে যুক্ত হয়েছে পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা । বাংলাদেশে মতলববাজি এবং সুবিধাবাদিতার দৌরাত্ন্যে সরল এবং সহজ বুদ্ধির খরা যে কি পরিমাণে ঘটেছে তার কিছুটা পরিমাপ হয় এ দুটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পরার মধ্য দিয়ে । অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন এখানে কোন বুদ্ধিজীবীই নেই ! থাকলে বঙ্গ সন্তানদের এতবড় ক্ষতি তাঁরা বুক দিয়ে আটকাতেন ।
বিপুল পরিমাণ আবর্জনাতুল্য ক্ষেত্রবিশেষে দুর্বোধ্য পাঠ্যক্রম এবং পরীক্ষার অতি বাড়াবাড়ির মধ্যে দিশেহারা শিশুরা এবং তাদের অভিভাবকেরা শর্টকাট পথ খুঁজে । এ পথ শেখা বা জানার পথ নয় । এ পথ শুধুই পরীক্ষায় ভাল করার পথ । সে পথ খুঁজতে গিয়ে তাদের যে কোন আবর্জনাই গিলতে হয় । তা সে নোটবই , গাইডবই বা আর যাই হোক না কেন ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



