গ্রামীন পরিবেশে অবকাঠামো বিষয়ক ভাবনা আসলেই আমার মনের পর্দায় ভেসে উঠে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টের পাকা কাচা ভাঙা এবং অর্ধ ভাঙা কিছু ব্রিজ এর কথা, বাঁশের সাঁকো গুলোর কথা কিংবা আমাদের গ্রামের পাশ ঘেঁসে যাওয়া উঁচু রেল সড়কটির কথা, বন্যায় ডুবে যাওয়া গ্রামের ভিতরের রাস্তা গুলোর কিছু দূর পর পর যাতে বাঁশের অস্থায়ী সাঁকো ছিল, যেখানে কাদা মাখা পা পিছলে যেতে চাইতো। কিংবা আমাদের স্কুল ঘরটির কথা যার প্লাস্টার খয়ে গেসে, ছাদের আস্তর ভেঙ্গে গেছে কিছু জায়গায়।
ভেসে উঠে আমার গ্রামের বাড়ির সামনের একটা খুব ছোট একটা সেতু যার ঠিক মাঝ খানটায় একটা বড় ফুটা ছিল যেখান থেকে কয়েকটা জং ধরা সরু রড বেরিয়ে ছিল বহু বছর, যেখানে একটা ইটবাহী ট্রাক আটকে পড়েছিল কয়েকদিন, যার পাশের সাইড বেরিকেড আংশিক ভাঙা ছিল, ভিত্তি মূলের ফাটল ধরা ইটের গাইড ওয়াল যা ভারী যানবাহন সহ রাস্তার লোড নিতে না পেরে সরে গেসে কিছুটা দূর, মূল ব্রিজ থেকে যার উপর থেকে ভরা বর্ষায় ছেলেরা পানি ঝাঁপ দেয়ার প্রতিযোগিতা করতো, গ্রামের দুরন্ত ছেলেরা যেখান থেকে খুলে নিয়েছে কয়েকটা ইট! অথবা স্কুল ঘরের দেয়ালের খয়ে যাওয়া প্ল্যাসটারে খোদাই করে প্রেমিকার নামের পাশে প্লাস দিয়ে লিখা সুপ্ত ভালোবাসার কথা যার জন্য মার খেয়েছে আমাদের ভীষণ কড়া হেড মাষ্টার হুমায়ূন স্যারের, যিনি এসমব্লিতে দাঁড় করিয়ে ভরা কন্ঠের দরাজ গলায় শপথ পড়াতেন "আমরা স্কুলে আসবো, উত্তর থেকে আসব, দক্ষিণ থেকে আসবো, পুর্ব থেকে আসবো, পশ্চিম থেকে আসব, ভাই বোনকে নিয়ে"। আজ জীবনের এতটা পথ পাড়িয়ে দিয়ে ভাবছি, কেন আবকাঠামো গুলো সেই সময়ে খুব পুরানো না হলেও এত জীর্ন ছিল, যা প্রতিশ্রুত লাইফ সাইকেলের এক চতুর্থাংশ সময়ও পেরুতে পারেনি। এটা শুধু পচা ইট বসানো কিংবা সিমেন্ট চুরির গল্প নয় এতে নিহিত রয়েছে ডিজাইন সম্পর্কিত অনেক পেছনের কারণ যার সামান্য কিছু দিক আলোচনাই এই লিখার প্রেক্ষাপট।
গ্রাম ও মফস্বলের রাস্তা তৈরির ধরনঃ পলি পতন প্রতিবন্ধকতা, বর্ষা ও ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাড পরবর্তি সময়ে জলাবদ্ধতার উৎস
নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী এবং খালের পাড়ে শহর বন্দর এবং হাট বাজার বসে উঠেছে শতাব্দী প্রাচীন নৌপথ ভিত্তিক মাস ট্রাস্নপোর্টেশন এর কারনে যা সভ্যতার অত্যন্ত যৌক্তিক অধ্যায়। কিন্তু পরবর্তিতে সড়ক পথ করার সময় দেখা যায় ঠিক নদী বা খালের একটি কূল ব্লক করে রাস্তা বানানো হয়েছে (কথিত মাটি প্রাপ্তির সুবিধার জন্য) কিন্তু এতে চাষের জমিতে পলি পতনে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে, বিপরীতে পলি পতন জনিত উর্বরতা ত্বরান্বিত করতে সঠিক সময়ে ওয়াটার পাসের জন্য পর্যাপ্ত কাল্ভার্ট, ব্রিজ কিংবা স্লুইস গেইটের বন্দবস্ত করা হয়নি। অথবা বর্ষা পরবর্তি জলাবদ্ধতা কিংবা ফসল কাটা নতুন ফসলের জন্য জমি প্রস্তুতে দ্রুত পানি সরানোর বিবেচনা ব্রিজ কাল্ভার্ট ডিজাইন এবং ডাইমেনশনে আনা হয়নি। কাচা পাকা রাস্তা করা হয়েছে কিন্তু সেই এলাকার কয়েক যুগে হওয়া বন্যা গুলোর পানির উচ্চতা কেমন ছিল তার গড় মেজারমেন্ট নেয়া হয়নি, ফলে এই ২০১৫ সালের বন্যাতেও গ্রামের ভিতরের সব রাস্তা এবং গ্রামের মূল রাস্তাটির কিছু অংশের উপর পানি উঠতে দেখেছি, অথচ পাশেরই শত বছরের পুরানো রেলসড়ক বন্যা মুক্ত।
মাটি ভরেটের রাস্তার বেইজে সাপোর্ট না রাখায় প্রতি বছর বর্ষা এবং বন্যা পরবর্তি সময়ে ভেঙ্গে যাওয়া অংশে মাটি ফেলে মেরামত করা লাগে। গ্রামীণ আবোকাঠামো সামাজিক বনায়নের বাস্তব আওতায় না থাকায় এই ভাঙ্গন পরিস্থিতি আরো ত্বরান্বিত হচ্ছে।
পলি পতনের জন্য নদীর বা খালের দুই কূল উন্মুক্ত রেখে দুই স্রোত ধারার মাঝের ভুমিতে নতুন খাল খনন করে রাস্তা বানানোর ডিজাইন কোথাও চখে পড়ে না যা বাড়তি পানি প্রবাহের এবং শুকনা মৌসুমে পানি ধারনের বন্দবস্ত করতে পারতো। রাস্তা নির্মানে এগুলো এক একটি ডিজাইন গ্যাপ নির্দেশক যা আমরা হয় ধরতে পারিনি অথবা দুর্নিতি পরায়নতার কারনে বাস্তবায়ন করিনি।
গ্রাম ও মফস্বল শহরের ব্রিজ নির্মাণঃ অবহেলা এবং খামখেয়ালীপনার চরম চিত্র
গ্রামের ব্রিজ তৈরিতে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা ফাঁকি দেয়া হয় এতে করে নানা বিধ সমস্যা তৈরি হয়। সয়েল টেস্ট করা হয় না ঠিক মত, ঠিক কোথা থেকে বাইজমেন্ট পাইলিং উঠবে তা আনুমান সাপেক্ষে কনট্রাক্টর এবং রাজ মিস্ত্রি ঠিক করেন। নিন্ম উচ্চতার কারনে নৌ চলাচল বিঘ্নিত হয় এতে ব্রিজের পাশেই আরেকটি যায়গায় ভরা মৌসুমে নালা করে ছোট ছোট কাঠের নৌকা গুলো ঠেলে পার করতে হয়। দৈর্ঘ্য ছোট করায় একদিকে নদী এবং খাল গুলোকে গলা টিপে হত্যা করার উপক্রম করা হয় যা স্রোতের বিপরীত মূখী বলের (ডি সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্স) কারনে ব্রিজের ঠিক পাশের রাস্তার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় এতে গাইড ওয়াল ভেঙ্গে পড়ে, ব্রিজে উঠার রাস্তা ভেঙ্গে যায়, প্রায়ই দেখা যায় সেখানে বাঁশের তৈরি সাপোর্ট সংযোগ তৈরি করতে হয়, এটা ভুক্তভোগীরা সকলের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে করেন যা আবার কিছু দিন পর ভেঙ্গে পড়ে। মূল কারণ অনির্ণিতই থেকে যায়।
সেতুর প্রস্থে ভয়াবহ চুরি হয়, এটা দুর্নিতির আরেকটি খাত যা সচরাচর আমাদের নজরে আসে না। এধরনের ব্রিজের রেলিং এ রড সিমেন্ট দেয়া হয় অপর্যাপ্ত যা সামান্য আঘাতে ভেঙ্গে যায় এবং কম্পন মাত্রা বাড়িয়ে মূল সেতুর আয়ু কমিয়ে দেয়। অথচ সেতুর দৈর্ঘ, প্রস্থ উচ্চতা, ভার নিবার সক্ষমতা ক্যাল্কুলেশন সাপেক্ষেই রেলিং এর ডিজাইন করার কথা। আয়তাকার বা বর্গাকার বক্স কাল্ভার্ট না করে সাধারণ গাইড ওয়াল দিয়ে এখনও কিছু কিছু ব্রিজ করতে দেখা যায় যা বন্যার স্রোতে সরে যায়। এগুলো এক একটি ডিজাইন ত্রুটি যা প্রকৌশলী মাত্রই অবগত কিন্তু ডিজাইন ইনপুট হিসেবে নিতে কিংবা প্রকল্প পরিচালকের দুর্নিতি প্রবনাতার কারনে বাস্তবায়ন থেকে পলায়নপর।
গ্রাম ও মফস্বল শহরের রাস্তার প্রস্থঃ মাল্টি লেভেল ট্রাস্নপোরটেশনের বেবেচনা ডিজাইনে নেই
এমনিতেই গ্রামীণ কাঁচা সড়ক গুলো সংকীর্ন করে তৈরি করা হয়, উপরন্তু ভাঙ্গন জনিত কারনে সেগুলো আরো জীর্ন হয়। কিন্তু কাঁচা সড়ক পাকা করার সময় স্টান্ডার্ড লেইন বাস্তবায়নের কথা থাকলেও গ্রামের কাঁচা রাস্তা পাকা করার সময় রাস্তা পর্জাপ্ত বর্ধিত না করে কোন মতে পুরো রাস্তা কভার করে শুধু হাফ লেইন পিচ করা হয়। উপরন্তু এইসব রাস্তার কিছু সেতুতে লেইন আরো সংকীর্ন করে ফেলা হয় যাতে উভয় মুখি যানচলাচল ব্যাহত হয়। এইসব পাকা রাস্তার পাকা প্রস্থের বাইরে পায়ে হেঁটে চলার রাস্তা থাকে না, যা জুতা সেন্ডেল না পড়া লোকের চলাচলে, গবাদি পশু চলাচলে কিংবা মালামাল টানা বা ঠেলার প্রতিবন্ধক। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে মালামাল এবং কৃষি পন্য যে পায়ে হাঁটা পথে টানা বা ঠেলা হয়, কৃষকের নিজের কাঁধে বা কাঁধের উপর ভারে বহন করা হয় এইসব ডিজাইনার কিংবা পরিকল্পনাকারীদের বেবেচনায় নেই। ফলে এই পাকা রাস্তা গ্রামীণ সমাজের উচ্চ বিত্তের কম্ফোর্ট বয়ে আনলেও কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি করে।
গ্রাম ও মফস্বল শহরের স্কুল বাসা মসজিদ নির্মানঃ রাজ মিস্ত্রিই ডিজাইনার
গ্রামীণ এলাকার বিল্ডিং কন্সট্রাকশনে সয়েল টেস্ট, ফাউন্ডেশন ডিজাইন, আরসিসি লোড মেজার করার সিভিল এবং ম্যাকানিক্যাল ব্যাপার গুলো রাজ মিস্ত্রি দিয়েই করান হয় মূলত খরচ বাঁচাতে। এর উপরে আদ্রতার ব্যাপার, বন্যা সহনীয় উচ্চতার হিসেব আমলে নিয়ে ফাউন্ডেশন এবং রড-সিমেন্ট ইত্যাদির আনুপাতিক ব্যবহারের ব্যাপার সমূহ অবহেলিত। ফলে কন্সট্রাকশনের স্থায়ীত্ব নাতিদীর্ঘ একই স্থাপনা রিমেইক করতে সরকার এবং নাগরিকের উপর্যুপরি ব্যয় হচ্ছে যা পরিহার করার সুযোগ রয়েছে ।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনিতির পূর্ণ বিকাশের প্রতিবন্ধক গুলো সনাক্ত হোক,
গ্রামীণ অবকাঠামো টেকসই উন্নয়নে ইন্ট্রিগ্রেটেড হোক,
বাংলাদেশ এগিয়ে যাক!
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ৮:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



