somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফেলে আসা গোধূলি !

১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ১০:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জাঁকালো কোন ঘর - বাড়ি বা কোন স্থাপত্য কিছুই নেই এর আশেপাশে । বেশ ফাকা ফাকা, নিকটের প্রতিবেশী বলতে সামনের হালকা সবুজাভ প্রশস্ত আর সর্পিল রেলপথটুকু , দু' পাশে উজার করে দেয়া শস্য ক্ষেতের বুক । স্টেশনের বারান্দায় জনসমাগম নেই বললেই চলে । তবুও প্লাটফর্মের একেবারেই সামনে মধ্যবয়স্ক মানুষটি কেমন সতেজ সতেজ ভাব নিয়ে সিগারেট টানছে । পরনে ব্লু জিন্স, খয়েরী আর বাদামী রঙের মিশ্রণে সুতি কাপড়ের একটা টি- শার্ট । পায়ের স্যান্ডেলটা বয়স্ক লোকদের জন্য 'বাটা' কোম্পানীর যে ডিজাইনগুলো থাকে তার একটি হতে পারে । হাতে চামড়ার ফিতার একটি দামী ঘড়ি তার সাথে বেশ মানিয়ে গেছে । ভাবুক প্রকৃতির মানুষ হতে পারে, সিগারেট অর্ধেকটা বাকী তখনও ।কী মনে করে পায়চারী শুরু করলেন মাথাটা মাটির দিকে করে বাকিয়ে । পদক্ষেপ গুলো খুব ছোট ছোট, কিন্তু চাহনির পর্ব বেশ বেশ প্রলম্বিত । পকেটে হাত দিয়ে একসময় একটা কাগজের টুকরো বের করলেন, সাদা কাগজ কিন্তু নীল কালির একটা আবছা লেখা তাতে ভ্যাপসাঁ হয়ে আছে । বোঝা যায় যে লেখক এবং লেখা দুটোরই বয়স এখন মাঝ বয়সের । কিছুক্ষণ পড়লেন লোকটি ওই কাগজটি, ফের পায়চারী শুরু করলেন । হতে পারে, অনেক সাংঘাতিক কিছু একটা, হতে পারে চাপা কোন অভিমান । কোন বিষাক্ত দীর্ঘশ্বাস । এটা চিঠির যুগ নয়, ভিডিও চ্যাটিংয়ের । লোকটার চশমার কাচে দিগন্তে এসে আছড়ে পড়েছে । পায়চারী বন্ধ করে বসে পরে কাঠের বেঞ্চিটাতে ।

কাগজটা মেলে ধরে । মেয়েলি একটা হাতের বুননে কিছু আবছা স্মৃতির লাইন । লোকটি পড়তে থাকে । চিঠিতে কোন সম্বোধন নেই । সরাসরি শুরু এভাবে -

আমি জানি, এই চিঠি, এই কাগজ কিছুক্ষণ পরে তোমাকে পাথর করে দিবে । আমি জানি তোমার চোখের পানি কোন বাধ মানতে চাইবেনা, যেমন আমারও চাচ্ছেনা ঠিক এই মূহুর্তে । আমি জানি, আমি একটা অপরাধ করছি, কিন্তু সেটা অনেক বড় কোন অপরাধ থেকে তোমাকে, আমাকে বাচাতে । তোমার মা প্যারালাইজ্‌ড রোগী, বাবাও প্রেশারের । কার যে কখন দূর্ঘটনা ঘটবে – তা একদম অনিশ্চিত । তুমি শহরে হন্যে হয়ে চাকুরি খুঁজছ । পরিবারের বড় ছেলে তুমি, তোমার কাঁধে এখনও তোমার ছোট্ট বোনটি আছে । তুমিই বল এতগুলো মানুষের স্বপ্ন, বেঁচে থাকার তাগিদের কাছে আমাদের চাওয়া পাওয়া কি শুধুই স্বার্থপরতা নয় ? জানি, চাঁদনী রাতে তোমার পাশে নিশ্চিন্তে বসে থাকার সময় হয়তো আমার আসবে না, কিন্তু তুমি তো তোমার অসুস্থ মায়ের পাশে দুদণ্ড বসে সান্ত্বনার পরশ দিতে পারবে । বাবাটা তোমায় দেখে হয়তো সাহস পাবে ! বোনটার একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যত হবে ।

আমি জানি , তুমি আমাকে সন্দেহ করতে পার । আমার অন্য কোন মতলব হয়তো আছে –এমনটি ভাবতে পার । জোর গলায় আমাকে বলতেই পারো, প্রতারক ! তুমি ভাবতেই পার, এখন সেরকম ভাবার যৌক্তিক কারণ তোমার কাছে আছে । আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে ! এটা শুনে তুমি শহর থেকে ছুটে এসেছ, আমায় নিয়ে পালিয়ে যেতে চেয়েছ ! প্রেমিক হিসেবে তুমি সাহসী; আগুনে ঝাপ দিতে চাইছ । আমিও চেয়েছিলাম । কিন্তু শহরে গিয়ে কত কষ্ট তোমাকে করতে হতে পারে ! যদি তড়িঘড়ি কোন চাকুরি না পাও ? বাড়িতে টাকা পাঠানো তো অনেক দূরের কথা, একটা গ্রাম্য অসহায় মেয়েকে নিয়ে তোমার জীবনে তখন অমাবস্যার আঁধার নেমে আসবে রাক্ষস হয়ে । সব হারাবে তুমি !

দেখ, জীবন থেমে থাকেনা, থাকবেও না । জীবনে সবকিছু একসাথে পাওয়া যায়না । কাছের মানুষগুলোকে দুদণ্ড শান্তি দিতে চাইলে নিজের জীবনে কিছু অপ্রাপ্তিকে ঠাই দিতে হয় । তুমি যদি আমাকে ক্ষমা নাও কর, তবুও আমার দুঃখ নেই ! তোমাকে দুঃখ দিলাম, কারণ সে অধিকার আমার আছে । আর যাদেরকে দুঃখ পাওয়া থেকে বাচালাম, তাদেরকে দুঃখ দেওয়ার কোন অধিকার আমার ছিলই না ! আমার এই অনুরোধগুলো রেখ, জীবনে অগোছালো হয়ো না, কোন পাগলামি করো না । আমি জানি, আমি বললে তুমি আমার কথা রাখবে । এ পর্যন্ত যত কথা দিয়েছ আমায়, সবই তো রেখেছিলে । কত ভালবাসতে তুমি আমায় ! শোন, অপূর্ণতার ভালোবাসায় নাকি ভালোবাসাটাকে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করা যায় ! আমি আজীবন সেটা নাহয় উপলব্ধি করলাম । আমি তোমাকে বলব না, ভুলে যাও আমাকে । হয়তো দিনে দিনে আবছা হয়ে যাব তোমার কাছে , মাঝে মাঝে ঝকঝকে তারার মত ভেসে উঠবো তোমার আকাশে, তবে সেটা অনেক অনেক সহস্র কোটি মাইল দূরে থেকেই । ব্যাগ যেহেতু সাথে আছেই, শহরেই যাও । যাওয়ার আগে মায়ের সাথে দেখা করে যেও । মায়ের কাছে, বাবার কাছে দুয়া নিও । পৃথিবীর যতবড় আবেগীয় বা বাস্তবমুখী ভালোবাসাই হোকনা কেন , মা বাবার ভালোবাসার কাছে তা অতি তুচ্ছ । আমি সেরকম অসহায় কয়েকটি মানুষের নির্ভেজাল ও দুর্মূল্যের ভালোবাসার কাছে আমাদের নিষ্পাপ ভালবাসাকে কুরবানী করলাম । ভালো থেকো । - তোমারই
গোধূলি !

লোকটি উঠে পড়ে । ব্যাগটি হাতে নেয় । আজো তাকে শহরেই যেতে হবে । প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটটি ফেলে দেয় দূরে । একটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে ট্রেনে উঠে পরে । সে ভঙ্গি চেপে রাখা কোন দুর্বিষহ ঘোলাটে বিষবাষ্পের মত !
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ১০:০৭
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শান্তির ঠিকানা—পরিবার

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০০




শান্তির ঠিকানা—পরিবার

ভালো থাকার জন্য অনেক কিছুই প্রয়োজন—অর্থ, সফলতা, সম্মান, স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু এসবের মাঝেও যদি ঘরে শান্তি না থাকে, তবে মনের ভেতর কোথাও যেন একটা শূন্যতা থেকেই যায়।

বাইরের পৃথিবী যতই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাকে দিয়ে সেলস হবে না

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৫৫

আমাকে বাংলাদেশের এক ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি তাদের সেলসে সহায়তা করার অনুরোধ করেছে। কোম্পানি ভালো, বাজে কোন রেকর্ড নেই। আমার কাজ হচ্ছে, আমার পরিচিত মানুষদের সাথে তাদের মার্কেটিং টিমের যোগাযোগ করায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৭



ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি কেনা ও নির্মাণের টাকা কোথা থেকে এসেছিল-এই প্রশ্নটা মাঝেমধ্যেই অনলাইনে ঘুরেফিরে আসে। উত্তরটা আসলে লুকিয়ে নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয় - দরকার বিকল্প সরকার

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪



জামাতকে সংগঠন হিসেবে নিখুঁত বলা যায়, আলেম হতে হলে দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় - মানে নেতা হবার আগে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে, বিএনপি-লীগের এমন কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলাশেষে

লিখেছেন নীল-দর্পণ, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৪

বাসায় আত্নীয় আসলে চলে যাবার সময় কিংবা তাদের বাড়ী থেকে ফেরার সময় ঘরের ছোট সদস্যের হাতে টাকা গুঁজে দেবার যে চল ছিল নিশ্চই আমরা কম বেশি সবাই সেটা সাথে পরিচিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×