somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটা গান ও ফেলে আসা কিছু স্মৃতি

১৯ শে জুলাই, ২০১৭ রাত ৯:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




আমি কখনওই ভালো স্মৃতি রোমান্থন করতে পারি না। পারি না বলতে এইরকম লিখে লিখে করতে পারি না। আমার স্মৃতিগুলো বেশীরভাগ সময়ে ঠিক তখনই আসে, যখন মন মেজাজ খুব খারাপ করে এই দুনিয়ার সবাইকে তাদের অধিকার মত একটু একটু করে দোষ বন্টন করতে থাকি তখন।
আমি খুব গান শুনি। আর তাই আমার এই পিচ্চি জীবনে যতকিছু স্মরণীয় হয়ে আছে, তার সব কিছুই কিছু কিছু গানের কলিতে আটকা পড়ে গেছে। ওই গান গুলা যখনই শুনি, তখনই মেমোরি ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যায়- আরি, অমুক দিন তো ওই ঘটনাটা ঘটছিলো!!!
আমার খুব সোনালী ছেলেবেলা না থাকলেও যতটুকু পেয়েছি তার জন্য আমার পরিবার আর উপরওয়ালার কাছে হাজার শুকরিয়া। হয়ত এখনকার কোনো ছেলেমেয়েরা এমন একটা শৈশব কল্পনাও করতে পারে না। যাই হোক, যা করতে চাচ্ছিলাম তাই করি।
একটা গান নিয়ে কিছু কথা বলি।

আমি তখন খুব ছোট, স্কুলে ভর্তি হই নি। আমরা দাদা বাড়িতে থাকি। আমাদের একান্নবর্তী পরিবার। একগাদা বাচ্চা পুলাপানে পুরো বাড়িত ভর্তি। কোমরে কোনোরকমে হাফ প্যান্ট পরেই আমরা ঘর থেকে দৌড় দিয়ে বের হয়ে যেতাম। সারাদিন হইচই, আগান বাগানে ঘুরে; লাটিম, ছোঁয়াছুঁয়ি, (বিশেষ ক্ষেত্রে কানামাছি), গাছের ডাল দিয়ে এখানে ওখানে মাটি খোঁচাখুঁচি খেলে একরকম মাটিকাটা কিষেণ (আমাদের অঞ্চলে মজুরদের কিষেণ বলে ডাকা হয়) হয়ে দুপুরের দিকে বাড়ি ফিরতাম। এবং আম্মুর অমানবিক(!) নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচবার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে চলে যেতাম পুকুরে। মনে ক্ষীণ আশা যদি আম্মু এসে দেখে যে আগেই গোসল করে ফেলেছি, তাহলে ওইদিনের মত আর সাবান দিয়ে গোসল করা লাগবে না। কিন্তু বিধি বাম। বেশীরভাগ দিনই ধরা পড়ে যেতাম। আর সাবান দিয়ে পরিষ্কার করানোর নামে দেওয়া হতো অমানবিক নির্যাতন। আমি বুঝে উঠতে পারতাম না, প্রতিদিন সাবান নিয়ে কেন গোসল করতে হবে। প্রতিদিন সাবান দিয়ে আমাকে ডলা হতো, আর এই জগৎ সংসারের নিষ্ঠুরতায় চিল্লায় চিল্লায় কাঁদতাম।
যাইহোক, গান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেক বক বক করে ফেলেছি। আসল কথায় আসি। আমার দাদাজান খুবই ধর্মভীরু মানুষ ছিলেন। তাই আমাদের পারিবারিক অবস্থা সেই সময়ে অত্যন্ত ভালো থাকা সত্ত্বেও আমাদের পুরো বাড়িতে একটা টিভিসেট বা রেডিও ছিলো না। গান জিনিসটা আমার মাথায় পাকাপাকি ভাবে ঢুকলো ভাইয়ার স্কুলে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে গিয়ে। স্কুলে গিয়ে দেখলাম আমার বয়সী ছেলেমেয়েরা কুয়াশার মধ্যে শীতে কাঁপতে কাঁপতে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর মাইকে অল্প সাউন্ডে বাঁজতেছে,

“সেই রেললাইনের ধারে মেঠো পথটার পাড়ে দাঁড়িয়ে,
এক মধ্যবয়সী নারী এখনও রয়েছে হাত বাড়িয়ে..
খোকা ফিরবে, ঘরে ফিরবে, ঘরে ফিরবে… নাকি ফিরবে না ”

আমি গানের মাথামুন্ডু কিছুই না বুঝে ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, খোকা কই গেছে ভাইয়া? ভাইয়াও আমার মত খানিকক্ষণ মাথা চুলকে বিজ্ঞেরমত উত্তর দিলো, আরে বুঝলি না? ওই মহিলার একটা ছোট ছেলে আছে তোর মত। সে কই যেন খেলতে গেছে। তারপর ছেলেধরা এসে নিয়ে গেছে। তাই ঘরে নাই। একা একা খেলতে বের হলে এইরকম ধরে নিয়ে যায়।
ছেলেধরার জিনিসটা এম্নিতেই তখন আমাদের পুলাপান সমাজে অত্যন্ত ভীতিকর জিনিস। তাদের নিয়ে নানা ধরনের ভয়ংকর তথ্য আমরা জেনেছি পাড়ার বড় ভাইদের কাছ থেকে। ছেলেধরারা সুন্দর করে ডাকে, তাদের হাতে থাকে একটা বস্তা। যদি কোনো বাচ্চা তাদের সাথে কথা বলে, অম্নি তারা এসে সেই বাচ্চাটাকে বস্তায় পুরে নিয়ে যায়। আর পরে ক্লিনিকে বিক্রি করে দেয়। এম্নিতেই ছেলেধরার ভয়, এখন গান আর ভাইয়ার ব্যাখ্যা শুনে আমার মাথার মধ্যে দৃশ্যটা পুরোপুরিভাবে ঢুকে গেলো। ‘কুয়াশা ঘেরা একটা রেললাইন, সেখানে একজন মহিলা ময়লা একটা শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। তার খোকা কোথাও খেলতে গিয়ে হারিয়ে গেছে এখনও ফিরে আসে নি। তাকে একজন ছেলেধরা একটা বস্তায় করে নিয়ে চলে গেছে। তারপর ক্লিনিকে বেঁচে দিয়েছে।’

আমার কি একটা হলো এরপর থেকে। আমি আর একা একা খেলতে যাই না। ভয় করে যদি হারিয়ে যাই, আমার আম্মুও যদি ওই মহিলার মত পাগল হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। আম্মু ব্যপারটা খেয়াল করলো। আমাকে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে। আমি তাকে আমার ভয়ের কথা খুলে বললাম। আম্মু হাসতে হাসতে বললো, ‘আরে বোকা ছেলে। ওই মহিলার খোকা খেলতে গিয়ে হারিয়ে যায় নি। মুক্তিযুদ্ধে গেছিলো, সেখান থেকে হারিয়ে গেছে। তাই আর ফিরে আসে নি। তবে সাবধান অপরিচিত কারো দেওয়া কিছু খাবি না। কারো সাথে কথাও বলবি না। তাহলে কিন্তু সত্যি সত্যি হারিয়ে যাবি। আর আমি পাগলী হয়ে রাস্তায় দাঁড়ায় থাকব।’ মুক্তিযুদ্ধ কি জিনিস আমি বুঝলাম না। তবে ধরে নিলাম সেটা করার জন্য বড় হওয়া লাগে। আর খোকারা যদি মুক্তিযুদ্ধে যায় তাহলে আর ফিরে আসে না। আমি আম্মুকে বললাম, আম্মু আমি কখনও মুক্তিযুদ্ধে যাব না। যেখানেই যাব সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে আসব। তোমাকে কখনও পাগল হয়ে রাস্তায় দাড়াতে হবে না। আম্মু কি বুঝেছিলো কে জানে। খানিকটা হেসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলো, ‘আমার ছোট ছেলেটা এত বোকা হলো কিভাবে!!’

যতদূর মনে পড়ে আমি কখনও অপরিচিত কারো সাথে কথা বলি নি তারপর থেকে। আর যদি বস্তা হাতে অপরিচিত কেউ ডাকতো, আমি দৌড় দিয়ে বাড়ি চলে আসতাম আর আম্মুকে বলতাম একটা ছেলেধরা আমাকে ধরে নিয়ে যেত আরেকটু হলেই। আম্মু হাসতো আর বলতো আমার বোকা ছেলে।
যাই হোক, গানটা আমার মধ্যে বেশ প্রভাব ফেলেছিলো। আমি প্রায়ই গুন গুন করে গাইতে চেষ্টা করতাম, যে লাইন ভুলে যেতাম সেখানে হুউউ হু হুউউউ করে চালিয়ে দিতাম। এখনও গানটা শুনলেই আমার চোখে সামনে কুয়াশার মধ্যে একটা মহিলাকে রেললাইনের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। সে অপেক্ষায় আছে কখন তার খোকা ঘরে ফিরবে… আর আম্মুর কথাগুলো মনে পড়ে। আমি পুরো ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যাই। আর ছেলেবেলার স্মৃতিগুলো ভাসতে থাকে।

আব্বু আম্মুর থেকে এখন বহু দূরে আমি। না, মুক্তিযুদ্ধে যাই নি, জীবন যুদ্ধে এসেছি। এখানেও হারিয়ে যাবার ভয় আছে, হেরে যাবার ভয় আছে। আব্বু আম্মু পাগলের মত অপেক্ষা করে আছে সন্তানের নিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য- সেটাকে অপূর্ণ করে ফেলব কিনা তার ভয় আছে। কতটুকু কি পারব জানি না তবে গানের খোকার মত হারিয়ে যাওয়া চলবে না, ছেলেবেলায় কথা দিয়েছিলাম ফিরে যাব…
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুলাই, ২০১৭ রাত ৯:২৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×